তেজ সিংয়ের ফেরা, সেই সুদর্শন যুবকের আগমন ও তার সঙ্গে বিনিময়, এবং চিঠি লেখা—এইসব করতে করতে দিনের অনেকটা সময় কেটে গেল। দুপুর গড়িয়ে দ্বিতীয় প্রহর। তেজ সিং বদ্রীনাথের ঘোর ভাঙিয়ে তাকে পাহারায় রাখলেন, তারপর কুমারকে বললেন, “এবার আপনি স্নানপূজা সেরে নিন, তারপর কী করা যায় তা ভাবা যাবে। দু-দিন ধরে তিলিস্মের কাজ একরকম বন্ধ হয়ে আছে।”
কুমার সভা ভঙ্গ করে স্নানপূজা সেরে শিবিরে এসে বসলেন। আইয়াররা আর ফতেসিং এলেন। তাঁরা তখনও কোনও কথাবার্তা শুরু করতে পারেননি, এমন সময় একজন চোবদার এসে খবর দিল: “বাইরে এক বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কিছু বলতে চায়। আমরা তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু সে কিছুই বলল না। সে বলছে, ‘যা বলার আমি কুমারকেই বলব, কারণ ব্যাপারটা ওঁরই।’”
কুমার বললেন, “ওকে এক্ষুনি ভেতরে নিয়ে এসো।” চোবদার বুড়িকে ভেতরে নিয়ে এল। তাকে দেখামাত্র তেজ সিংয়ের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল: “আরে! ডাইনী-পেত্নীর ঝাঁক কি আজ ছাড়া পেয়েছে নাকি?”
বুড়ি কথাটা শুনতে পেল। সে তার লাল চোখে তেজ সিংয়ের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমি কিছুই বলব না। আমি চললাম। আমার কী লোকসান? যা ক্ষতি হবে, তা কুমারেরই হবে।” এই বলে সে শিবির থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরল। কুমারের ইশারায় চোবদার তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে আনল।
এই স্ত্রীলোকটির চেহারাও ছিল বড় অদ্ভুত। বয়স আন্দাজ সত্তর হবে; চুল প্রায় সাদা; অর্ধেকের বেশি দাঁত পড়ে গেছে; কিন্তু সামনের দুটো বড় বড় বাঁকা দাঁত মুখের বাইরে প্রায় এক আঙুল বেরিয়ে আছে, হলদেটে ময়লার পুরু আস্তরণে ঢাকা। পরনে মোটা কাপড়ের শাড়ি, অত্যন্ত নোংরা, আর মাথার কাছে তেলচিটে হয়ে আছে। নাকে পিতলের মস্ত বড় এক নথ, আর পায়ে ঘুঙুর-লাগানো পিতলের মল ঝমঝম করছে।
তেজ সিং বললেন, “তা, কী চাই তোমার?”
বুড়ি।—একটু দম নিই, তারপর বলছি। আর তোমাকেই বা বলব কেন? যা বলার, সে তো আমি কুমারকেই বলব।
কুমার।—বেশ, আমাকেই বলো। কী বলবে?
বুড়ি।—আপনাকেই বলব। আপনার মস্ত বড় উপকারের কথা। (কাশতে লাগল।)
দেবী সিং।—এখন কি দেড় ঘণ্টা ধরে কাশতেই থাকবে, না কি কিছু বলবে?
বুড়ি।—এই রে, আবার একজন ফোড়ন কাটল!
কুমার।—না না, কেউ কিছু বলবে না।
বুড়ি।—শুধু একটা কথা—আমি যা বলব, তা আপনার ভালোর জন্যই, আর শুনে আপনি খুশিও হবেন; কিন্তু বদলে আমারও কিছু চাই।
কুমার।—হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাকেও আমরা খুশি করে দেব।
বুড়ি।—আগে দিব্যি দিয়ে বলুন যে আপনি নিজে বা আপনার কোনও লোক আমার কোনও ক্ষতি করবে না—মারধর বা বন্দি করার কথা তুলবে না।
কুমার।—ব্যাপারটা যখন আমাদের ভালোর জন্যই, তখন তোমাকে কেউ মারতে বা বন্দি করতে চাইবে কেন?
বুড়ি।—তা বটে—তবুও আমার ভয় করে; কারণ আমি আপনার জন্য এমন এক কাজ করে এসেছি যা আপনার আইয়াররা হাজার বছর চেষ্টা করলেও পারত না। তাই আমার ভয়, পাছে আপনার আইয়াররা হিংসায় জ্বলে আমাকে যন্ত্রণা দেয়।
বুড়ির কথা শুনে সকলে অবাক। ভাবতে লাগল, সে এমন কী উপকার করেছে যে এতখানি আস্ফালণ করছে। অবশেষে কুমার শপথ করলেন—“তুমি যা-ই বলো না কেন, আমি বা আমার কোনও লোক তোমার কোনও ক্ষতি করবে না।” তখন সে বলতে শুরু করল: “আমি আপনাদের সেই বনকন্যার পুরো খবর দিতে পারি, আর এমন এক উপায় বাতলে দিতে পারি যাতে আপনারা এক ঘড়ির মধ্যে গোটা তিলিস্ম ভেঙে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার সঙ্গে মিলিত হতে পারবেন।”
বুড়ির কথা শুনে সবাই আনন্দিত হয়ে উঠল। কুমার বললেন, “যদি সত্যিই তাই হয়, তবে শীঘ্র বলো ওই বনকন্যা কে, আর কীভাবেই বা এক ঘড়ির মধ্যে তিলিস্ম ভাঙা সম্ভব।”
বুড়ি।—আগে আমার পুরস্কারের কথাটা পাকা হোক।
কুমার।—তোমার কথা সত্যি হলে তুমি যা চাইবে, তা-ই পাবে।
বুড়ি।—তাহলে সেই মর্মে শপথ করুন।
কুমার।—বেশ—কী পুরস্কার নেবে? আগে শুনি।
বুড়ি।—এমন কিছু বড় নয়—শুধু এইটুকু যে আপনি আমাকে বিয়ে করবেন। বনকন্যা আর চন্দ্রকান্তাকে আপনি যখন খুশি বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু আমাকে আজই বিয়ে করতে হবে; কারণ আমি বহু বছর ধরে আপনার প্রেমে বিরহে শুকিয়ে মরছি—বলতে গেলে, আপনার কাছে আসার ফন্দি আঁটতে আঁটতেই বুড়ি হয়ে গেলাম। আজ ভাগ্যক্রমে আপনাকে হাতের মুঠোয় পেয়েছি; আর দেরি করবেন না, পাছে আমার যৌবন বয়ে যায় আর আপনাকে পরে পস্তাতে হয়।
বুড়ির কথা শুনে ক্রোধে কুমারের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, আর তাঁর আইয়াররা দাঁতে দাঁত ঘষতে লাগল। কিন্তু কী-ই বা করতে পারে? তারা নিরুপায়। কুমার যদি শপথ না করতেন, তবে বুড়িকে এমন উত্তমমধ্যম দেওয়া যেত যা সে জীবনেও ভুলত না।
তেজ সিং জ্যোতিষীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি বলুন তো, এ কোনও ছদ্মবেশী আইয়ার, নাকি সত্যিই যা দেখাচ্ছে তাই? কুমার শপথ না করলে কোনও না কোনও উপায়ে আমরা ঠিক ব্যাপারটা জেনে নিতাম।”
জ্যোতিষীজি নাকে হাত দিয়ে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করে বললেন, “এ কোনও আইয়ার নয়; একে যেমন দেখছেন, এ ঠিক তা-ই।” এবার তেজ সিং সত্যিই রেগে গেলেন। তিনি বুড়িকে বললেন, “তাহলে তুমি এখান থেকে দূর হও; আমরা কুমারের শপথ রক্ষা করেছি, তাই তোমাকে কেউ একটা কথাও বলেনি। এখন যদি দেরি করো, আমি কুকুর লেলিয়ে দেব। কী তামাশা! এখন এইরকম ডাইনীরাও কুমারের প্রেমে পড়তে শুরু করেছে!”
বুড়ি বলল, “আমার কথা যদি না শোনো, তবে পরে পস্তাবে। আমি তোমাদের সব কাজ পণ্ড করে দেব। দেখো—ওই যে সুরঙ্গঘর, ওতে এমন তালা কি আমিই লাগাইনি যে তোমরা খুলতে পারলে না, আর বদ্রীনাথের পুঁটলি ঘাড়ে করে ফিরে আসতে বাধ্য হলে? এখন আমি গিয়ে মহারাজ শিবদত্তকে মুক্ত করে দেব, আর নতুন করে হুলস্থূল বাধাব!”
এই বলে সে ক্রোধে রক্তচক্ষু মেলে শিবিরের বাইরে চলে গেল। তেজ সিংয়ের ইশারায় দেবী সিংও তার পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।
কুমার।—তেজ সিং, এই বুড়ি তো এক অদ্ভুত আপদ বলে মনে হচ্ছে। সে বলছে সুরঙ্গঘরে নাকি ওই-ই তালা লাগিয়েছিল।
তেজ সিং।—ব্যাপারটা কী, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
জ্যোতিষীজি।—ওর কথা যদি সত্যি হয়, তবে আমাদের ওপর বড় বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।
তেজ সিং।—ওর কথা সত্যি হোক বা মিথ্যে, শিবদত্ত মুক্ত হলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। যদি সত্যি হয়, আমি ওকে জ্যান্ত ছাড়ব না।
জ্যোতিষীজি।—এরকম লোককে মেরে ফেলাই উচিত।
তেজ সিং।—কুমার তো আর এই শপথ করেননি যে বাকি জীবনে ওকে কেউ কখনও কিছু করতে পারবে না।
কুমার। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে)—হায়, আমাকে এই দিনও দেখতে হল!
তেজ সিং।—আপনি চিন্তা করবেন না; দেখা যাক কী করা যায়। দেবী সিং ওর পেছনে গেছে—কোনও একটা সূত্র না পেয়ে সে ফিরবে না।
কুমার।—আজকাল তোমাদের আইয়ারিতে যেন গ্রহণ লেগেছে। বনকন্যার তো কোনও খোঁজই করতে পারলে না—এখন এই ডাকিনীর খোঁজ করবে?
কুমারের কথাগুলো তেজ সিং আর জ্যোতিষীজির বুকে তীরের মতো বিঁধল। কিন্তু তাঁরা কিছুই না বলে উঠে শিবির থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তাঁরা চলে যাওয়ার পর কুমার শিবিরে একা বসে রইলেন, নানারকম চিন্তায় ডুবে। কখনও চন্দ্রকান্তার অসহায়ত্ব আর তিলিস্মে বন্দি থাকার কথা ভাবেন; কখনও তিলিস্ম ভাঙতে দেরি হওয়া আর বনকন্যার কোনও পাকা খবর না পাওয়ার কথা ভাবেন; আবার কখনও এইমাত্র বিয়ে করতে আসা সেই ডাইনী বুড়ির কথা ভেবে মনে মনে দুঃখ আর আফসোস করতে লাগলেন। তাঁর মন একেবারে ভেঙে পড়ল। অবশেষে দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামল।
কুমার ফতেসিংকে ডাকলেন। সে এলে জিজ্ঞাসা করলেন, “তেজ সিং কোথায়?” ফতেসিং উত্তর দিল, “আমি কিছুই জানি না—তিনি জ্যোতিষীজিকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও গেছেন।”
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.