জালিম খানের সন্ধানে বদ্রীনাথ যাত্রা করল। কী তার পরিকল্পনা, কোন উপায়ে সে জালিম খানকে পাকড়াও করবে, সে খবর কারও কাছেই ছিল না। জালিম খান তার শেষ ইশতেহারে মহারাজকে এই বলে হুমকি দিয়েছিল যে, এবার সে সরাসরি রাজপ্রাসাদেই হানা দেবে।
এই ঘোষণার প্রভাব মহারাজের ওপর সাংঘাতিকভাবে পড়ল। প্রহরার ব্যবস্থা চারগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হল। মহারাজ নিজে সারা রাত জেগে থাকতে শুরু করলেন; তলোয়ারের বাঁট সর্বক্ষণ তাঁর হাতের মুঠোয় থাকত। বদ্রীনাথের আগমনে মনে কিছুটা ভরসা জন্মেছিল; কিন্তু জালিম খানের পিছু নিয়ে সে রওনা হওয়ার ঠিক পরদিনই শহরের সমস্ত চৌরাস্তায় আর বড় বড় রাস্তায় ফের এক ইশতেহার সাঁটা থাকতে দেখা গেল। তেমনই একখানা কাগজ এক গুপ্তচর দরবারে এনে মহারাজের সামনে রাখল, আর দেওয়ান হরদয়াল সিং সশব্দে সেটি পড়ে শোনালেন। লেখা ছিল এই:
“মহারাজ জয়সিংহ,
সাবধান থেকো, আর পণ্ডিত বদ্রীনাথের ঐয়ারির ওপর ভরসা কোরো না। ঐ কালকের ছোকরা আর কী-ই বা করতে পারবে? আজ পর্যন্ত তোমার শত্রু বলতে ছিল শুধু জালিম খান; এখন আমিও এসে গেছি। পনেরো দিনের মধ্যে আমি এই শহর ছারখার করে দেব, আর আজ থেকে ঠিক চার দিনের মাথায়, রাত বারোটায়, বদ্রীনাথের কাটা মুণ্ডু হাতে নিয়ে আমি তোমার খাস মহলে প্রবেশ করব। সতর্ক থেকো! তখনও দেখি আমায় ধরতে কে আসে। দেখি কোন মায়ের ব্যাটা এগিয়ে আসে! মহারাজের যে কোনও শত্রু যদি আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়—সে যেন রাত বারোটায় ‘তেতি-চোটি’ নামের জায়গায় এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
— খুনি আফত খান”
এই ইশতেহার দেখে মহারাজের যা কিছু বুদ্ধি-শুদ্ধি অবশিষ্ট ছিল, তাও উবে গেল। তাঁর মনে হল, এই মুহূর্তেই বিজয়গড় ছেড়ে পালানো উচিত; কিন্তু পৌরুষ আর অহংকার সে পথে বাধা দিল।
তিনি দ্রুত দরবার ভঙ্গ করে দেওয়ান হরদয়াল সিংকে সঙ্গে নিয়ে দেওয়ানখানায় প্রবেশ করলেন, এবং এই নতুন খুনি আফত খানের বিষয়ে আলোচনায় বসে গেলেন।
মহারাজ: এখন কী করা যায়? একজন তো আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল; এখন এই আফত খান এসে হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে দেওয়ার জোগাড় করেছে। এই দুজনকে যদি ধরা না যায়, তবে আমাদের রাজত্বে ধিক্কার।
হরদয়াল: বদ্রীনাথ আসায় আশা হয়েছিল যে সে জালিম খানকে ধরে ফেলবে; কিন্তু এখন তো দেখছি নিজের প্রাণ বাঁচানোই তার পক্ষে মুশকিল হবে।
মহারাজ: যদি কোনও উপায়ে আজকের এই খবরটা নওগড়ে পৌঁছানো যেত, তবে খুব ভালো হত। ওখান থেকে বদ্রীনাথের সাহায্যের জন্য অন্য কোনও ঐয়ারকে পাঠিয়ে দেওয়া হত।
হরদয়াল: নওগড়ে যে লোককেই পাঠানো হবে, সে প্রাণ হারাবে; কেবল যদি এক-দুশো সিপাইয়ের পাহারায় চিঠি পাঠানো যায়, তবে হয়তো তা পৌঁছতে পারে।
মহারাজ: (ক্রুদ্ধস্বরে) নামেই এখানে পঞ্চাশজন গুপ্তচর রয়েছে, বছরের পর বছর বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছে; অথচ আজ তাদের দিয়ে একটাও কাজ হচ্ছে না। কেউ জালিম খানের খবর আনতে পারে না, আবার কেউ নওগড়ে একটা চিঠি পৌঁছে দেওয়ারও যোগ্য নয়!
হরদয়াল: একজন গুপ্তচরের মৃত্যুর পর সকলেরই সাহস উবে গেছে।
মহারাজ: বেশ—আজ সন্ধ্যায় আমাদের সব গুপ্তচরকে বাগানে নিয়ে এসো। হয় তাদের দিয়ে কোনও কাজ হবে, নয়তো সবাইকে তোপের মুখে রেখে উড়িয়ে দেওয়া হবে; তারপর যা করার আমরাই দেখব। আমি নিজেই ঐ বদমাশটাকে ধরব।
হরদয়াল: মহারাজের যেমন আজ্ঞা।
মহারাজ: এখন যাও; যা বললাম সে বিষয়ে চিন্তা কোরো।
মহারাজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেওয়ান হরদয়াল সিং নিজের বাসভবনের দিকে রওনা হলেন, কিন্তু কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না, কারণ মহারাজ তখন ভয়ঙ্কর রেগে আছেন। সব গুপ্তচরদের দিয়ে যে কোনও কাজই হবে না, আর অকারণে তারা সবাই তোপের মুখে উড়ে যাবে, এই সম্ভাবনাই প্রবল। তাছাড়া তিনি আরও ভাবলেন: মহারাজ যখন নিজেই এই বদমাশদের পিছু ধাওয়া করতে প্রাসাদ থেকে বেরোবেন, তখন আমারও প্রাণ যাবে—বেঁচে থাকার আর আশা কোথায়?
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.