চপলা যখন তেজ সিংকে মুক্ত করতে চুনার গেল, চম্পা মনে মনে ভাবল—এতগুলো ঐয়ার এসে জুটেছে, আর আমি একা। শেষে না কোনও বিপদ ঘটে যায়। একটা উপায় বের করতেই হবে যাতে ঐয়ারদের ভয় দূর হয় আর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়। এই ভেবে সে এক বিশেষ ধরনের চূর্ণ তৈরি করল। রাতে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাও যখন নিজের পালঙ্কে শুতে গেলেন, তখন চম্পা সেই চূর্ণ জলে গুলে চন্দ্রকান্তার শোবার ঘরের দরজার দু’দিকে দুই গজ জায়গা জুড়ে লেপে দিল। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে রাজকুমারীর বিছানাতেই শুয়ে পড়ল। এই চূর্ণের গুণ ছিল এই যে, কোনও জায়গায় লেপে দেওয়ার পর শুকিয়ে গেলে, তার উপর পা পড়ামাত্র আতশবাজির মতো প্রচণ্ড শব্দ হত—অথচ চোখে দেখে বোঝার উপায় থাকত না যে ওখানে কিছু লেপা আছে। সারা রাত চম্পা নিশ্চিন্তে ঘুমালো। ঘরে কেউ ঢোকেনি। সকালে চম্পা জল দিয়ে সেই লেপ ধুয়ে ফেলল। পরের দিন সে আরেকটা ফন্দি আঁটল। সে মাটির একটা মাথা বানাল, তাতে হুবহু চন্দ্রকান্তার মুখের আদলে রং করল এবং রাজকুমারী যে বিছানায় ঘুমাতেন, সেই বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে মাথাটা রাখল। শরীরের জায়গায় কাপড় রেখে তার উপর একটা হালকা চাদর ছড়িয়ে দিল, কেবল মুখটা বাইরে রইল। চারিদিকে এমনভাবে প্রদীপ সাজিয়ে রাখল যাতে বিছানাটা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত থাকে, আর তার চারদিকে সেই একই চূর্ণ লেপে দিল। রাজকুমারীকে সে বলল, “আজ রাতে আপনি অন্য ঘরে বিশ্রাম নিন।” চন্দ্রকান্তা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অন্য একটা ঘরে গিয়ে শুলেন। যে ঘরে চন্দ্রকান্তা ঘুমালেন, তার দরজাতেও চম্পা সেই চূর্ণ লেপে দিল। আর যে ঘরে নকল মাথা সাজানো ছিল, তার পাশের একটা ছোট কুঠুরিতে চম্পা প্রদীপ নিভিয়ে শুয়ে রইল।
আধেক রাত পেরোলে সেই নকল মাথা সাজানো ঘরটা থেকে একটা ফাটার শব্দ এল। শব্দ শুনেই চম্পা এক লাফে উঠে পড়ল, ছুটে বাইরে গিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল এবং চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিল। গোলমাল শুনে অনেক দাসী ছুটে এসে জড়ো হল। তাদের মধ্যে একজন তাড়াতাড়ি মহারাজার কাছে খবর পৌঁছে দিল যে চন্দ্রকান্তার ঘরে চোর ঢুকেছে। এই কথা শুনে মহারাজাও ছুটে এলেন এবং মহলের পাহারারত দশ-পনেরোজন সিপাইকে তখনই হাজির হতে আদেশ দিলেন। সকলে এলে দরজা খোলা হল। ভিতরে ঐয়ার রামনারায়ণ আর পান্নালালকে দেখা গেল। অনেক লোক তাদের ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঐয়ার দুজনও নিজেদের ছোরা বের করে এলোপাথাড়ি চালাতে শুরু করল। চার-পাঁচজন সিপাইকে জখম করার পর অবশেষে তারা ধরা পড়ল। মহারাজা তাদের কয়েদ করে রাখার হুকুম দিলেন এবং চম্পার কাছে সব ঘটনা জানতে চাইলেন। চম্পা তার কৌশলের কথা সব খুলে বলল। মহারাজা অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে পুরস্কার দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “চপলা কোথায়?” সে বলল, “ওর শরীর খারাপ।” মহারাজা আর কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজের খাসকামরায় চলে গেলেন। সকালে দরবারে সেই ঐয়ারদের তলব করা হল। তারা এলে মহারাজা জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম কী?” পান্নালাল বলল, “সরতোড় সিং।” তার এই স্পর্ধায় মহারাজা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “এই বদমাশগুলোর মনে কোনও ভয়ডর নেই দেখছি। আচ্ছা—দুজনকেই নিয়ে যাও আর খুব কড়া পাহারায় আটকে রাখো।” আদেশ অনুযায়ী তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
মহারাজা হরদয়াল সিংকে জিজ্ঞেস করলেন, “তেজ সিংয়ের কোনও খবর পাওয়া গেল?” হরদয়াল সিং বললেন, “মহারাজ, এখনও পর্যন্ত কোনও সংবাদ মেলেনি। এই যে ঐয়ারগুলো ধরা পড়েছে—এদের যদি আচ্ছা করে ধোলাই দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো কিছু বলতে পারে।” মহারাজা বললেন, “তা বটে, কিন্তু তেজ সিং ফিরে এসে অসন্তুষ্ট হবে—ঐয়ারদের মারধর করা হল কেন? ওটা তো নিয়মবিরুদ্ধ। আচ্ছা, তেজ সিংয়ের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা যাক, তারপর যা উচিত মনে হবে করা যাবে। তবে একটা ব্যাপারে খেয়াল রেখো—সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থেকো, কারণ শিবদত্ত সিং যদি এখন আমাদের উপর চড়াও হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।” হরদয়াল সিং বললেন, “আমি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সজাগ আছি। কেবল একটি বিষয় মহারাজের কাছে একান্তে নিবেদন করার ছিল।”
দরবার শেষ হলে মহারাজা হরদয়াল সিংকে নির্জনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?” তিনি বললেন, “মহারাজ, তেজ সিং আমাকে প্রায়ই বলতেন—এমনকি কুমার বীরেন্দ্র সিং এবং তাঁর পিতাও বলেছেন—যে এখানকার সমস্ত মুসলমান ক্রূরের পক্ষ নিয়েছে, আর যতদূর সম্ভব ওদের ক্ষমতা কমানো উচিত। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, কথাটা সত্যি। এখন আপনি যা আদেশ দেন।” মহারাজা বললেন, “ঠিকই বলেছ, আমরাও তোমায় এই কথা বলব ভাবছিলাম। বেশ, আমরাও এখন তাই বলছি—চুপচাপ সমস্ত মুসলমানকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দাও।” হরদয়াল সিং বললেন, “যে আজ্ঞা মহারাজ, তাই হবে।” এই বলে তিনি মহারাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.