সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, পশ্চিম আকাশে তখনও সূর্যের এক আবছা গোলক ঝুলছে। ছোট্ট একটা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক নির্জন প্রান্তরে, পাথরের এক চটানের উপর বসে দু’জন কথা বলছিলেন—বীরেন্দ্র সিং আর তেজ সিং।
বীরেন্দ্র সিং-এর বয়স একুশ কি বাইশ হবে। তিনি নওগড়ের মহারাজা সুরেন্দ্র সিং-এর একমাত্র পুত্র। তেজ সিং হলেন মহারাজা সুরেন্দ্র সিং-এর দেওয়ান জিৎ সিং-এর প্রিয় পুত্র এবং কুমার বীরেন্দ্র সিং-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু। যুবকটি যেমন ক্ষিপ্র, তেমনই চতুর। কোমরে শুধু একটা ছোরা, পাশে ঝোলানো একটা ছোট্ট থলি, আর হাতে এক গোছা দড়ি। কথা বলতে বলতেও তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চারদিকে ঘুরছিল। সামনেই একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে সুন্দর, সাজানো-গোছানো একটি ঘোড়া।
কুমার বীরেন্দ্র সিং বলছিলেন, “ভাই তেজ সিং, দেখ, কী ভয়ানক ব্যাধি এই প্রেম! আমাকে কী অবস্থায় এনে ফেলেছে! তুমি তো কতবার বিজয়গড় আর আমার মধ্যে চিঠিপত্র আদানপ্রদান করেছ—রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার কথা আমার কাছে এনেছ, আমার কথা তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছ। এতে তো সূর্যের আলোর মতোই স্পষ্ট যে আমি চন্দ্রকান্তাকে যতটা ভালোবাসি, তিনিও আমাকে ততটাই ভালোবাসেন। অথচ, তাঁর রাজ্য থেকে আমাদের রাজ্যের দূরত্ব মাত্র পাঁচ ক্রোশ হলেও আমরা কিছুই করে উঠতে পারছি না। এই চিঠিটাতেই দেখ না, চন্দ্রকান্তা লিখেছেন যেভাবেই হোক আমাকে যেন তাড়াতাড়ি তাঁর কাছে পৌঁছতে হয়।”
তেজ সিং উত্তর দিলেন, “আমি যে কোনও উপায়ে আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতে পারি, কুমার। কিন্তু ভেবে দেখুন, প্রথমত, চন্দ্রকান্তার বাবা মহারাজা জয়সিং আজকাল প্রাসাদের চারদিকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর মন্ত্রীর ছেলে ক্রূর সিং রাজকুমারীর জন্য পাগল, উপরন্তু সে তার দুই আইয়ার—নাজিম আলি আর আহমদ খানকে—প্রাসাদের উপর দিনরাত নজর রাখার জন্য নিযুক্ত করেছে। কারণ আপনার আর রাজকুমারীর প্রেমের পুরো কাহিনীটা এখন ক্রূর সিং আর তার আইয়ারদের কাছে পরিষ্কার। যদিও চন্দ্রকান্তা ক্রূর সিংকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন, আর মহারাজাও তাঁর মেয়েকে মন্ত্রীর ছেলের হাতে তুলে দেবেন না, তবু হতভাগাটা আশায় বেঁচে আছে। আর আপনার এই সম্পর্কটা তার চোখে বিষের মতো ঠেকছে। সে তার বাবার মাধ্যমে মহারাজা জয়সিং-এর কানে আপনাদের ঘনিষ্ঠতার কথা তুলেছে, আর সেই কারণেই পাহারা এত কঠোর করা হয়েছে। তাই আমি এখনই আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে রাজি নই—যতক্ষণ না আমি নিজে গিয়ে এই শয়তানগুলোকে জব্দ করে আসছি।”
“আমি এই মুহূর্তেই আর একবার বিজয়গড়ে গিয়ে চন্দ্রকান্তা আর চপলার সঙ্গে দেখা করব। কারণ চপলা নিজেও একজন আইয়ারি, চন্দ্রকান্তার সবচেয়ে প্রিয় সখী, আর সে রাজকুমারীকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ওই চপলা ছাড়া সেখানে আমার আর কোনও সহায় নেই। আমি শত্রুদের চাতুরী আর কলাকৌশল দেখে ফিরে আসার পরই আপনাকে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেব। এমন যেন না হয় যে, কিছু না বুঝে হঠকারিতা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই সেখানে ধরা পড়ে গেলাম আর বন্দী হলাম।”
বীরেন্দ্র: তোমার যা ভালো মনে হয় তাই করো। আমি তো কেবল নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখি, কিন্তু তোমার উপর আমার শক্তি আর আইয়ারি দুটোতেই ভরসা আছে।
তেজ সিং: আমি আরও শুনেছি, সম্প্রতি ক্রূর সিং-এর ওই দুই আইয়ার নাজিম আর আহমদ নাকি আবার এদিকে এসেছিল আর আমাদের মহারাজার সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখাও করে গেছে। কী কৌশলে যে তারা এটা করল, তা বলতে পারব না। আফসোস, আমি তখন এখানে ছিলাম না!
বীরেন্দ্র: মুশকিল তো এটাই—তুমি ক্রূর সিং-এর দুই আইয়ারকে জব্দ করতে চাও, আর তারা উল্টে তোমাকেই ধরার ফন্দি আঁটছে। ঈশ্বর রক্ষা করুন। আচ্ছা, তুমি এখন যাও, আর যেভাবেই হোক চন্দ্রকান্তার সঙ্গে আমার একবার দেখা করার ব্যবস্থা করো।
তেজ সিং তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন এবং বীরেন্দ্র সিংকে সেখানেই রেখে বিজয়গড়ের দিকে পায়ে হেঁটে রওনা দিলেন। অন্যদিকে বীরেন্দ্র সিং গাছ থেকে তাঁর ঘোড়াটাকে খুলে নিয়ে সওয়ার হলেন এবং নিজের দুর্গের দিকে চলে গেলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.