এবার মহারাজ শিবদত্তের সভার কী অবস্থা হল, সেই কথা শুনুন। মহারাজ শিবদত্ত সিং এসে সভায় আসন গ্রহণ করলেন। রম্ভার আসতে দেরি দেখে তিনি এক চোবদারকে হুকুম দিলেন তাকে ডেকে আনার জন্য, আর চেতরাম ব্রাহ্মণকে পাঠালেন তেজ সিংকে নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পরেই চোবদার ফিরে এসে খবর দিল যে রম্ভা তার আস্তানায় নেই—কোথাও চলে গেছে। শুনে মহারাজ অবাক হলেন, কারণ মনে মনে তিনি রম্ভার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। রম্ভার জন্য দুঃখিত হয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ লোকজনকে তার খোঁজে পাঠাবার আদেশ দিলেন। ইতিমধ্যে চেতরাম আর এক দুঃসংবাদ নিয়ে এল—তেজ সিং কারাগারে নেই।
এবারে মহারাজের আর বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাওয়ার জোগাড়। গোটা সভা হতবাক—এক চমৎকার গায়িকা এসে সকলকে বোকা বানিয়ে নিজের রাস্তা ধরেছে। ঘিসীটা সিং আর চুন্নিলাল আইয়ারেরা নিবেদন করল, “মহারাজ, নিঃসন্দেহে ও কোনো আইয়ার ছিল, যে এই বেশে এসে তেজ সিংকে নিয়ে পালিয়েছে।” মহারাজ বললেন, “তা তো বটেই—কিন্তু সে যা কাজ করে গেছে, তা পুরস্কারের যোগ্য। আইয়ারেরাও তো তার গান শুনেছিল, তারাও তো সভায় হাজির ছিল; তাদের বুদ্ধিতে কী পাথর পড়েছিল যে তাকে চিনতে পারল না? তোমাদের আইয়ার বলে পরিচয় দিতে লজ্জা হওয়া উচিত!” এই বলে, দুঃখে ও ক্রোধে মহারাজ আসন ছেড়ে উঠে অন্তঃপুরে চলে গেলেন। সভায় যারা বসে ছিল, তারা যে যার বাড়ির পথ ধরল। সারা শহরে এই গল্প ছড়িয়ে পড়ল; যেদিকেই কান পাতা যায়, শুধু এই কথাই শোনা যায়।
পরের দিন মহারাজ ক্রুদ্ধ অবস্থায় দরবারে আসতেই এক চোবদার নিবেদন করল, “মহারাজ, যে গায়িকা এসেছিল সে আদতে একজন নারীই। সে-ই আবার চেতরাম মিশ্রের রূপ ধরে তেজ সিংকে নিয়ে গেছে। আমি এইমাত্র ওদের দুজনকে ওই শালাই জঙ্গলে দেখে এলাম।” এই কথা শুনে মহারাজের বিস্ময় আরও বাড়ল। তিনি হুকুম দিলেন, বেশ কিছু লোক গিয়ে ওদের ধরে আনুক; কিন্তু চোবদারটি নিবেদন করল, “মহারাজ, এভাবে গেলে ওদের ধরা যাবে না, ওরা পালিয়ে যাবে। ঘিসীটা সিং আর চুন্নিলাল আমার সঙ্গে যাক; আমি দূর থেকে ওদের দেখিয়ে দেব, আর এই দুজন কোনো কৌশলে ওদের ধরে ফেলবে।” এই বুদ্ধিটা মহারাজের পছন্দ হল, এবং তিনি দুই আইয়ারকে চোবদারের সঙ্গে যাওয়ার আদেশ দিলেন। চোবদারটি দুজনকে সেই জায়গায় নিয়ে গেল যেখানে সে তেজ সিংয়ের চিহ্ন দেখেছিল, কিন্তু সেখানে কাউকেই পাওয়া গেল না। তখন ঘিসীটা সিং জিজ্ঞাসা করল, “এবার কোন দিকে খুঁজব?” সে বলল, “ওরা কি সারাক্ষণ এই একটা গাছের নীচেই বসে থাকবে? আশেপাশে খুঁজে দেখুন—কোথাও না কোথাও থাকবেই!” ঘিসীটা সিং বলল, “বেশ, চলো—তুমিই পথ দেখাও।”
তারা এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করল, এমন সময় মাথায় দুধের ঝুড়ি নিয়ে এক গোয়ালিনীকে দেখা গেল। চোবদার তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি এদিকে কোথাও একজন পুরুষ আর একজন মহিলাকে দেখেছ?” সে বলল, “হ্যাঁ গো হ্যাঁ—ওই তো জঙ্গলের ভেতরে আমার কুঁড়েঘর; আমার অনেক গরু-মোষ আছে সেখানে। এই তো একটু আগে ওদের কাছেই দুই পয়সার দুধ বিক্রি করলাম, বাকিটা শহরে বেচতে নিয়ে যাচ্ছি।” এই শুনে চোবদার চার পয়সা বের করে তাকে পুরস্কার হিসেবে দিতে গেল; কিন্তু সে নিতে অস্বীকার করে বলল, “আমি শুধু শুধু টাকা নিই না। হ্যাঁ—তা যদি চার পয়সার দুধ কিনে খান, তাহলে আমার আর শহরে যাওয়ার খাটনিটা বাঁচে, আর আমিও আপনার কেনা হয়ে থাকব।” চোবদার বলল, “মন্দ কী—দুধ দাও।” গোয়ালিনী ঝুড়ি নামিয়ে দুধ ঢালতে শুরু করল। চোবদার দুই আইয়ারকে বলল, “এসো, তোমরাও একটু খাও।” দুই আইয়ারই বলল, “আমাদের ইচ্ছে নেই!” গোয়ালিনী বলল, “বেশ, আপনাদের যেমন ইচ্ছে।” চোবদার দুধ খাওয়া শেষ করে আবার দুই আইয়ারকে বলল, “বাহ্, কী দুধ! শহরে তো রোজই আকণ্ঠ দুধ খাও—একবার এটাও চেখে দ্যাখো, কী তার সোয়াদ!” তার পীড়াপীড়িতে দুই আইয়ারও দুধ খেল, আর গোয়ালিনীকে চার পয়সা দেওয়া হল।
এবার তিনজন তেজ সিংয়ের খোঁজে রওনা হল; কিছুটা যেতেই চোবদার বলল, “জানি না কেন—আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে।” ঘিসীটা সিং বলল, “আমারও একই অবস্থা।” চুন্নিলাল কিছু বলতে যাবে, এমন সময় সে পড়ে গেল। তার পিছু পিছু চোবদার আর ঘিসীটা সিংও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। গোয়ালিনী বেশি দূর যায়নি; তিনজনকে পড়তে দেখে সে দৌড়ে ফিরে এল, আর চোবদারের নাকের নীচে একটা লখলখা ধরে তাকে জ্ঞান ফেরাল। সেই চোবদারই ছিল তেজ সিং। জ্ঞান ফিরতেই সে নিজের আসল রূপে ফিরে এল। এরপর দুই আইয়ারকে আচ্ছা করে বেঁধে গাঁটরি বানানো হল—একটা চপলা আর অন্যটা তেজ সিং নিজেদের পিঠে তুলে নিয়ে নওগড়ের রাস্তা ধরল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.