তেজ সিং, দেবী সিং আর জ্যোতিষীজি চলে যাওয়ার পর কুমার বীরেন্দ্র সিং সারাটা রাত জেগেই কাটালেন, তাঁদের ফেরার অপেক্ষায়। রাত যত গভীর হতে লাগল, কুমারের মনও তত ব্যাকুল হয়ে উঠল। ভোর হয়-হয়, এমন সময় তিন আইয়ার শিবিরে এসে পৌঁছালেন। তেজ সিং-এর ইচ্ছে, এই বিবস্ত্র অবস্থাতেই কুমারের সামনে যাওয়া হোক। সেইমতো তিনজন ওই অবস্থাতেই তাঁর তাঁবুতে প্রবেশ করলেন।
কুমার বীরেন্দ্র সিং জেগেই ছিলেন, প্রদীপ জ্বলছিল। তিন আইয়ারের এই অদ্ভুত মূর্তি দেখে তিনি তো অবাক! জিজ্ঞাসা করলেন, “এ কী অবস্থা তোমাদের?” তেজ সিং বললেন, “আপাতত আমাদের দশাটাই দেখুন। দমটুকু ফেলার ফুরসত পেলে সব কথা খুলে বলছি।”
তিন আইয়ার নিজেদের পোশাক আনিয়ে পরলেন। ততক্ষণে সকাল বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কুমার তেজ সিংকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এবার বলো তো, কী এমন বিপদে পড়েছিলে তোমরা?”
তেজ সিং—এমন নাকাল হয়েছি যে জীবনে ভুলব না।
কুমার—কিরকম?
তেজ সিং—যার জন্য আপনি জীবন বাজি রেখেছেন, যার সন্ধানে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি, আপনার প্রতি তার ভালোবাসায় যে কোনও খামতি নেই, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন যে সে সব সময় এমন আত্মগোপন করে থাকে, আর তাতে তার কী লাভ হয়, তা-ই মাথায় আসছে না।
কুমার—কিছু কি জানতে পেরেছ?
তেজ সিং—জানতে পেরেছি বইকি! নিজের চোখে দেখেছি—আর তার শাস্তিও পেয়েছি এই হাল। ওর দলেও এমন সব আইয়ার আছে, একজন আরেকজনের চেয়ে সেরা। এটুকু আগে জানলে আমরা আরও সাবধানে পা ফেলতাম।
কুমার—খুলে বলো, আমিও একটু বুঝি।
তেজ সিং আদ্যোপান্ত সব ঘটনা খুলে বললেন। সব শুনে কুমার হেসে ফেললেন এবং জ্যোতিষীজিকে বললেন, “আপনার রমলবিদ্যাও ওদের কাছে জব্দ হয়েছে দেখছি।”
জ্যোতিষী—আর জিজ্ঞাসা করবেন না—ওরা সাক্ষাৎ প্রলয়!
কুমার—ওদের সম্বন্ধে যখন স্পষ্ট কিছু জানতে পারোনি, তখন এটা কি ভেবে দেখেছ যে এর মধ্যে শিবদত্তের আইয়ারদের কোনও কারসাজি থাকতে পারে?
জ্যোতিষী—না—শিবদত্তের আইয়ারদের সঙ্গে ওই মেয়েদের কোনও সম্পর্ক নেই, আর ওই মেয়েরাও তাদের কোনও খবর রাখে না। এটুকু আমি ভালমতোই নিশ্চিত করেছি।
তেজ সিং—যাক, এইটুকুই রক্ষে।
দেবী সিং—আজই আমরা বেরিয়ে ওদের খুঁজে বার করব।
তেজ সিং—তাহলে তিলিস্ম ভাঙার কাজ এগোবে কী করে?
কুমার—একদিন কাজ বন্ধ থাকলে আর কী এমন ক্ষতি হবে?
তেজ সিং—এই কথাতেই বোঝা যাচ্ছে, আপনার মন থেকে চন্দ্রকান্তার জন্য ভালোবাসা কমে গিয়েছে।
কুমার—কখনোই না! চন্দ্রকান্তার চেয়ে বেশি আমি এই জগতে আর কাউকে ভালোবাসি না। কিন্তু জানি না কেন—বনকন্যার আসল পরিচয় না জানা পর্যন্ত আমার মন শান্ত হবে না।
তেজ সিং (হেসে)—বেশ তো—আগে পণ্ডিত বদ্রীনাথ আইয়ারকে নিয়ে গিয়ে গুহায় বন্দী করা হোক, তারপর অন্য কথা ভাবা যাবে। নইলে ওরা ছাড়া পেয়ে পালাতে পারে।
কুমার—আজই ওকে নিয়ে গিয়ে বন্দী করো।
তেজ সিং—হ্যাঁ, আমি এখনই ওকে নিয়ে যাচ্ছি। ওখানে রেখে আজ রাতেই ফিরে আসব। পনেরো ক্রোশ রাস্তা এমন কিছু বেশি নয়। এই ফাঁকে দেবী সিং আর জ্যোতিষীজি বনকন্যার খোঁজে বেরিয়ে পড়ুন।
তেজ সিং-এর পরিকল্পনা মতো সব ঠিক হল। স্নানপুজো সেরে তিনি প্রস্তুত হলেন। খাবারের সঙ্গে বেহুঁশ হওয়ার ওষুধ মিশিয়ে বদ্রীনাথকে দেওয়া হল। সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তেজ সিং তাকে পুঁটলির মতো বেঁধে পিঠে চাপিয়ে গুহার দিকে রওনা দিলেন। কুমারও দেবী সিং আর জ্যোতিষীজিকে বনকন্যার সন্ধানে পাঠিয়ে দিলেন।
পণ্ডিত বদ্রীনাথের পুঁটলি পিঠে নিয়ে তেজ সিং যখন পাতালঘরে পৌঁছালেন, তখন সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। তিনি সিংহের মুখে হাত ঢুকিয়ে জিভটা ধরে টান দিতেই দ্বিতীয় তালাটা খুলে গেল, কিন্তু দরজা খুলল না। এবার তেজ সিং-এর আক্কেলগুড়ুম! তিনি আবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু দরজা একচুলও নড়ল না। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, কিন্তু কিছুই ভেবে পেলেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে বদ্রীনাথের পুঁটলিটা আবার পিঠে চাপিয়ে তিনি ফেরার পথ ধরলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.