সেই মায়াবী ধ্বংসস্তূপে প্রবেশ করে তারা প্রথমে সেই সভাকক্ষে গেল, যেখানে পাথরের চাতালে শায়িত ছিল সেই প্রস্তর-মানব। এখানে, এই স্থানেই কুমার তিলিস্ম ভাঙার কাজে হাত দিলেন।
চাতালটার মাথার দিক থেকে পাঁচ হাত দূরে কুমার নিজের হাতে মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন। এক গজ গভীর খোঁড়ার পর তিনি একটা সাদা পাথরের চাঁই দেখতে পেলেন, তাতে তোলার জন্য লোহার এক মজবুত আংটা লাগানো। আংটায় হাত গলিয়ে তিনি পাথরটা তুলে ফেললেন। একটা ভূগর্ভস্থ কুঠুরি বেরিয়ে পড়ল, নীচে নামার জন্য সিঁড়িও কাটা ছিল।
তেজ সিং একটা মশাল জ্বালালেন, আর সেই আলোয় সকলে নীচে নামল। তারা দেখল ঘরটা একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কোথাও একবিন্দু ধুলো বা ময়লার চিহ্নমাত্র নেই; আর ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের এক সুন্দর মূর্তি দাঁড় করানো, যার এক হাতে পেরেক আর অন্য হাতে একটা হাতুড়ি।
কুমার মূর্তির হাত থেকে হাতুড়ি আর পেরেকটা নিলেন, পেরেকটা তার বাঁ কানের ওপর বসিয়ে হাতুড়ি দিয়ে ঘা মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে মূর্তির ঠোঁট দুটো নড়তে শুরু করল, আর তার ভেতর থেকে সঙ্গীতের মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসতে লাগল—মনে হচ্ছিল যেন মূর্তিটা গান গাইছে।
কিছুক্ষণ এইভাবেই চলল, তারপর হঠাৎ মূর্তিটা ডান আর বাঁ—এই দু-ভাগে চিরে গেল, আর তার পেট থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট একটা গোলাপের ঝাড়, উচ্চতায় হবে আট আঙুল। তাতে কয়েকটা ফুল ফুটে আছে, আর একটা ডাল থেকে ঝুলছে একখানা চাবি। এর সঙ্গেই পাওয়া গেল ছোট্ট একটা তামার পাত, যার ওপর কিছু লেখা ছিল। কুমার সেটা পড়লেন—
‘এই গাছটি আমাদের রাজবৈদ্য আজাইবদত্ত যৌগিক পদার্থ দিয়ে নির্মাণ করেছেন। এর ফুল থেকে চিরকাল গোলাপের সুগন্ধ নির্গত হবে, যা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। আপনার সভার এক বিরল অলঙ্কার হিসেবে বৈদ্যমশাই এই অতুলনীয় গাছটি আপনার জন্য উপহারস্বরূপ রেখে দিয়েছেন।’
এটা পড়ে কুমার অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং জ্যোতিষীর দিকে ফিরে বললেন, “কী চমৎকার জিনিসই না পেলাম! দেখুন, এই মুহূর্তেও ফুলগুলো থেকে কী মিষ্টি গন্ধ বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।”
তেজ সিং—এতে কোনও সন্দেহ নেই।
দেবী সিং—একটার চেয়ে আর একটার কারিগরি আরও অদ্ভুত!
কুমার কথা শেষ করতে না করতেই ঘরের একদিকের একটা দরজা খুলে গেল। এতক্ষণ ঘরের অন্ধকারে কোনও দরজার চিহ্নমাত্রও দেখা যায়নি, কিন্তু এই দরজাটা খুলতেই হুড়মুড় করে আলো এসে ঢুকল। মশাল নিভিয়ে দিয়ে তারা সেই দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারা দেখল একটা ছোট কিন্তু সুন্দর বাগান—ঠিক সেই বাগান, যেখানে চপলা এসেছিল, আর যার বর্ণনা আমরা আগের খণ্ডে দিয়েছি।
তিলিস্মি বইয়ের নির্দেশ অনুসারে কুমার মূর্তির পেট থেকে পাওয়া চাবিটায় একটা দড়ি বাঁধলেন। হাতে দড়িটা ধরে, চাবিটাকে মাটির ওপর দিয়ে টেনে টেনে তিনি বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। সমস্ত পথ আর কুঞ্জবন ঘুরে আসার পর একটা ফোয়ারার গোড়ায় চাবিটা মাটিতে আটকে গেল। এখানে তারাও থেমে গেল। কুমারের আদেশে তারা সবাই সেই জায়গাটা খুঁড়তে লেগে গেল। দু-তিন হাত খোঁড়ার পরেই জ্যোতিষী বললেন, “দিনের আর এক প্রহর মাত্র বাকি আছে, আমাদের তিলিস্ম থেকে বেরোতে হবে।”
কুমার চাবিটা তুলে নিলেন, আর চারজন সেই কুঠুরির পথেই ফিরে এসে ওপরে উঠে এল এবং সেই সভাকক্ষে পৌঁছল যেখানে প্রস্তর-মানব তার চাতালে ঘুমিয়ে ছিল। মাথার দিক থেকে খোঁড়া সেই পাথরের চাঁইটা এবার উল্টে কুঠুরির মুখে চাপা দিয়ে দিল। চাঁইটার দু-দিকেই তোলার জন্য আংটা ছিল, আর তলার দিকে একটা তালা লাগানো ছিল। মূর্তির পেট থেকে পাওয়া সেই চাবি দিয়েই এই তালাটাও বন্ধ করে দেওয়া হল।
চারজন ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে কুমারের তাঁবুতে ফিরে এল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর তেজ সিং, দেবী সিং আর জ্যোতিষী কুমারের অনুমতি নিয়ে বনকন্যার খোঁজে জঙ্গলের দিকে রওনা দিল। দিনের আলো তখন আর ঘণ্টা দুয়েক বাকি।
এই তিন ঐয়ার বেশি দূর যায়নি, এমন সময় দেখল তাদের আগে আগে এক মুখোশধারী ঘোড়সওয়ার চলেছে। দেবী সিং আর বাকিরা গাছের আড়ালে আড়ালে তার পিছু নিল। ঘোড়সওয়ার সামান্য পশ্চিম দিকে ঘুরে চুনারের দিকে সোজা চলল। পথে সে কয়েকবার থামল, পেছন ফিরে তাকাল, তারপর আবার চলতে শুরু করল।
সূর্য ডুবল, আর অন্ধকার রাত্রি তার সাম্রাজ্য বিস্তার করল। রাতের অন্ধকারে নিবিড় অরণ্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। এখন শুধু খুরের নীচে শুকনো পাতার খসখসানির শব্দ শুনেই এই তিন ঐয়ারকে এগোতে হচ্ছিল। রাত এক ঘণ্টা গড়িয়ে গেলে তারা জঙ্গলের প্রান্তে এসে পৌঁছল।
মুখোশধারী সওয়ার ঘোড়া থেকে নামল। সেখানে অনেকগুলো ঘোড়া বাঁধা ছিল। সে-ও তাদের পাশে নিজের ঘোড়াটা বাঁধল; একপাশে জাবনার স্তূপ পড়ে ছিল, সেখান থেকে কিছুটা নিয়ে ঘোড়ার সামনে রেখে সে পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল।
সেই মুখোশধারীর পিছু পিছু গিয়ে, রাত এক প্রহর গড়িয়ে গেলে এই তিন ঐয়ার গঙ্গার তীরে এসে পৌঁছল। দূর থেকে তারা জলের ওপর দুটো আলো দেখতে পেল, যেন দুটো চাঁদ গঙ্গাজীর বুকে নেমে এসেছে। নদীর ওপর একটা সাদা আভা ছড়িয়ে ছিল। কাছে গিয়ে তারা দেখল, একটা সুসজ্জিত নৌকোর ওপর কয়েকজন সুন্দরী রমণী বসে আছে। তাদের মাঝখানে, একটা উঁচু গদিতে বসে আছে এক তরুণী, কোমল এক যুবতী, যার আভিজাত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে দিচ্ছিল আর যার চাঁদের মতো মুখ দূর থেকেও ঝলমল করছিল। তার দু-পাশে দুটো প্রদীপ জ্বলছিল।
মুখোশধারী তীরে পৌঁছেই একটা তীক্ষ্ণ শিস দিল, সঙ্গে সঙ্গে নৌকো থেকেও একটা শিসের আওয়াজ ভেসে এল, যেন কেউ উত্তর দিল। নৌকোর দুজন মহিলা উঠে দাঁড়াল; নীচে নেমে, বড় নৌকোর পাশে বাঁধা একটা ডিঙি খুলে তারা তীরে নিয়ে এল, এবং মুখোশধারীকে নৌকোয় তুলে নিল।
এবার তিন ঐয়ার নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল।
তেজ সিং—বাহবা! দুটো জ্বলন্ত চাঁদের মতো প্রদীপের মাঝে নৌকোর ওপর মেয়েগুলোকে কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে।
জ্যোতিষী—এ তো পরীদের আসর বসেছে। এসো, সাঁতরে ওদের কাছে যাই।
দেবী সিং—জ্যোতিষীজী, সাবধান! পরীরা আবার আপনাকে তুলে না নিয়ে যায়, তাহলে আমাদের দল থেকে একজন বন্ধু কমে যাবে।
তেজ সিং—আমার যতদূর মনে হচ্ছে, কুমার এদেরই দেখেছিলেন।
দেবী সিং—এতে কোনও সন্দেহ নেই।
জ্যোতিষী—তাহলে সাঁতার কাটছ না কেন? এমনভাবে জল এড়িয়ে চলছ, যেন কোনও বুড়ো আফিমখোর।
দেবী সিং—তাহলে আর আপনাকে সঙ্গে এনে কী লাভ হল? আপনার তো কত নামডাক শুনেছিলাম—জ্যোতিষী এই, জ্যোতিষী সেই, কূটনীতির চাকা, জ্ঞানের চরকা—আর এখানে সামান্য কটা মেয়েরই কোনও কিনারা করতে পারছেন না!
জ্যোতিষী—কী আর বলব? মনে হচ্ছে এরা আমার চেয়েও বড় ওস্তাদ। ওরা সবাই নিজেদের নাম পাল্টে ফেলেছে। আসল নাম খুঁজতে গেলে সব অদ্ভুত অদ্ভুত নাম উঠে আসে। একজনের নাম বিয়োগিনী, আর একজনের যোগিনী, একজনের ভূতনি, আর একজনের ডাকিনী—বলুন তো, এগুলো কি ওদের আসল নাম বলে বিশ্বাস করতে হবে?
তেজ সিং—তাহলে নাম পাল্টেছে কেন?
জ্যোতিষী—আমাদের বোকা বানানোর জন্য।
দেবী সিং—বেশ, নাম ছাড়ুন—ওদের আস্তানার খোঁজ করুন।
জ্যোতিষী—রমল ফেলে ওদের আস্তানার কথা জিজ্ঞেস করলে ফল আসে, ওদের বাস জলের ওপর। তাহলে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে ওরা জলেই থাকে—অর্থাৎ, ওরা মাছ?
তেজ সিং—সেসব তো ঠিক আছে—কিন্তু দেখুন না, ওরা জলচর কি না?
জ্যোতিষী—শুনুন ভাই—রমল শাস্ত্রে চারটে তত্ত্ব সবসময় গোলমাল বাধায়: হাওয়া, জল, মাটি আর আগুন। যদি কেউ কোনও জ্যোতিষী বা রমলজ্ঞকে বোকা বানাতে চায়, তাহলে এই চারটে জিনিস নিয়ে চালাকি করে তাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দিতে পারে। বেচারা জ্যোতিষীর তখন আর কিছু করার থাকে না, বইপত্তর-পঞ্জিকা সব বেকার বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
তেজ সিং—কীভাবে? বুঝিয়ে বলুন, যাতে আমরাও বুঝতে পারি। সময়মতো কাজে লাগতে পারে।
জ্যোতিষী—সব সময়ের অপেক্ষা। আপাতত যে কাজে এসেছ, সেটা করো। এসো, সাঁতার কাটি।
তেজ সিং—চলো।
তিন ঐয়ার নৌকোর দিকে সাঁতরে চলল। কোমরে ঐয়ারির ঝোলা বেঁধে, বাকি পোশাক তীরে খুলে রেখে তারা জলে নামল। কিন্তু চারবার হাত চালাতেও পারেনি, এমন সময় তাদের পেছন থেকে একটা শিসের আওয়াজ এল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে নৌকোর প্রদীপগুলো নিভে গেল, যেন কেউ চট করে সেগুলো জলে ফেলে দিয়েছে। এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার ছেয়ে গেল, নৌকো আর দেখা যাচ্ছিল না। দেবী সিং বলল, “এই তো—এবার সাঁতার কাটো!”
তেজ সিং—এই মেয়েরা তো সাংঘাতিক শয়তান দেখছি!
জ্যোতিষী—আমি তো প্রথমেই বলেছিলাম এরা সাক্ষাৎ আপদ। এবার তো বুঝলে আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম—এরা আমাদের জ্যোতিষশাস্ত্রকে তামাশা বানিয়ে ছাড়ল।
দেবী সিং—চলো, তীরে ফিরে যাই। ওরা আমাদের খুব বিশ্রীভাবে অপমান করল। মনে হচ্ছে, তীরে কেউ পাহারাদার হয়ে আমাদের ওপর নজর রাখছিল। আমরা সাঁতার শুরু করতেই সে শিস দিয়েছে—আর বাতিগুলো নিভে গেছে। সঙ্কেতটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।
জ্যোতিষী—হতভাগাটা শিস দেওয়ার জন্য আর সময় পেল না, ঠিক আমরা জলে নামার পরেই দিল? যদি আগে দিত, তাহলে আর আমাদের ভিজতে হত না।
তিন ঐয়ার তীরে ফিরে এসে পরার জন্য নিজেদের পোশাক খুঁজতে লাগল—কিন্তু পোশাকের কোনও চিহ্নই নেই।
দেবী সিং—জ্যোতিষীজী, আপনাকে সেলাম—এই দেখুন, আমাদের পোশাক পর্যন্ত গায়েব! আক্ষেপ হচ্ছে, এই মুহূর্তে যদি ওই মেয়েগুলোর একটাকেও হাতে পেতাম, তাহলে কাঁচা চিবিয়ে খেতাম!
তেজ সিং—আমি তো ওদের প্রশংসাই করব—দারুণ ঐয়ারি দেখিয়েছে।
দেবী সিং—হ্যাঁ হ্যাঁ, যত পারো প্রশংসা করো, যাতে কাছাকাছি কোথাও থাকলে ওদের মধ্যে কারও দয়া হয় আর আমাদের আর বেশি জ্বালাতন না করে।
জ্যোতিষী—আর কী জ্বালাতন করবে? আমাদের তো পোশাক পর্যন্ত খুলে নিয়েছে!
তেজ সিং—চলো, শিবিরে ফিরে যাই। এখন আর কিছু করার নেই।
মাঝরাত পেরিয়ে গিয়েছিল যখন ঐয়ারির কৌশলে পর্যুদস্ত হয়ে, এই তিনজন একেবারে দিগম্বর অবস্থায় নিজেদের দুর্দশায় কাঁপতে কাঁপতে শিবিরের দিকে রওনা দিল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.