আগের রাতের চেয়েও কুমারের এই রাতটা আরও বেশি যন্ত্রণায় কাটল। তিনি বারবার সেই বারোয়া পড়তে লাগলেন। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই তিনি শয্যাত্যাগ করলেন, স্নান সেরে পূজাপাঠ করলেন, তারপর জঙ্গলে যাওয়ার জন্য তেজ সিংকে ডেকে পাঠালেন। তেজ সিং এলেন। আজও তিনি কুমারকে যেতে বারণ করতেন, কিন্তু কুমার কোনও কথাই শুনলেন না। তখন তেজ সিং সেই তিলিস্মি ফুলগুলোর মধ্যে থেকে গোলাপ ফুলটা নিয়ে জলে ঘষে কুমার আর ফতেসিংকে খাইয়ে দিলেন। তারপর বললেন, “এবার যেখানে খুশি যান, কেউ আপনাদের অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। তবে কেউ যদি গায়ের জোরে ধরে নিয়ে যায়, তার কথা আমি দিতে পারব না।” কুমার বললেন, “গায়ের জোরে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে, এমন সাধ্য কার আছে?”
পাঁচজন মিলে জঙ্গলের দিকে বেরিয়ে পড়লেন। কিছুটা যাওয়ার পর তিন আইয়ার কুমার আর ফতেসিং-এর থেকে আলাদা হয়ে যে যার নিজের পথে চলে গেলেন। কুমার বীরেন্দ্র সিং আর ফতেসিং এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলেন। ঘুরতে ঘুরতে কুমার অনেকটা দূরে চলে এলেন। তাঁরা দেখলেন, উলটো দিক থেকে দুজন মুখোশধারী অশ্বারোহী তাঁদের দিকেই এগিয়ে আসছে। আরোহী দুজন কুমারের থেকে সামান্য দূরে এসে থামল। তাদের একজন ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে কী একটা জিনিস রাখল, তারপর আবার ঘোড়ায় চেপে বসল। কুমার সেদিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি কাছে পৌঁছোতেই আরোহী দুজন বলে উঠল, “এই বই আর চিঠিটা নিয়ে নিন।” এই বলে তারা সেখান থেকে চলে গেল।
কুমার কাছে গিয়ে দেখলেন—সেই তিলিস্মি বইটাই পড়ে আছে, তার ওপর একটা চিঠি, আর পাশে দোয়াত-কলম আর কাগজ। আনন্দে কুমারের মন ভরে উঠল। তিনি বইটা তুলে নিয়ে ফতেসিং-এর দিকে ফিরে বললেন, “এ কী অদ্ভুত ব্যাপার—বইটা ফেলে রেখে চলে গেল! গলার আওয়াজ শুনে তো মনে হল, যে আরোহী আমাকে এটা নিতে বলল, সে একজন নারী। দেখি তো, চিঠিতে কী লেখা আছে।” এই বলে তিনি চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন। তাতে লেখা ছিল—
“আমার মন আপনার প্রতি আসক্ত, আর আপনি যাঁকে ভালোবাসেন, তিনি তিলিস্মের মধ্যে বন্দি হয়ে আছেন। তাঁর কোনও ক্ষতি হলে আপনার হৃদয়ে আঘাত লাগবে। আপনার সুখেই আমার সুখ—তাই এই বই আপনার হাতে তুলে দিলাম। আনন্দে তিলিস্ম ভঙ্গ করুন, চন্দ্রকান্তাকে উদ্ধার করুন, শুধু আমাকে ভুলে যাবেন না—আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের নামে শপথ রইল। এই চিঠির উত্তর লিখে সেই একই জায়গায় রেখে দিন, যেখান থেকে বইটা তুলেছেন।”
চিঠি পড়া শেষ হতেই কুমার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লিখলেন—
“যে মুহূর্তে প্রথম আপনাকে এই তিলিস্মি বই হাতে দেখেছিলাম, সেই মুহূর্ত থেকেই আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমার মন তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। যেদিন আমার দুই প্রিয়তমাকে একসঙ্গে দেখে চোখ জুড়োবে, সেই দিনটাকেই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের দিন বলে মনে করব। কিন্তু হায়, আপনি আমার মুখ দেখতেও ঘৃণা করেন।
—আপনারই, বীরেন্দ্র।”
উত্তর লেখা শেষ করে কুমার সেই একই জায়গায় চিঠিটা রেখে দিলেন। আরোহী দুজন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কুমার অনেকক্ষণ পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করলেন, কিন্তু তারা কাছে এল না। কুমার যখন কিছুটা দূরে সরে গেলেন, তখন তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে চিঠির উত্তরটা তুলে নিল, এবং কুমারের চোখের সামনেই দেখতে দেখতে উধাও হয়ে গেল। কুমারও ফতেসিংকে সঙ্গে নিয়ে নিজের শিবিরে ফিরে এলেন।
রাতের কয়েক ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর তেজ সিং এবং বাকিরাও ফিরে এসে কুমারের শিবিরে জড়ো হলেন। তেজ সিং বললেন, “আজও আমরা কারও কোনও সন্ধান পাইনি—শুধু এদিক-ওদিক কয়েকজন মুখোশধারী অশ্বারোহীকে ঘুরতে দেখেছি। আমি তাদের পিছু নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি, কারণ তারাও খুব সতর্কভাবে ঘোড়া ছোটাচ্ছিল। তবে কাল আমরা ঠিক তাদের খুঁজে বের করবই।”
কুমার বললেন, “দেখুন, আপনারা এত খেটেখুটে কিছুই পেলেন না, আর আমি—আমি কী দারুণ আইয়ারি দেখিয়েছি! হারানো জিনিস আবার খুঁজে পেয়েছি। এই দেখুন—তিলিস্মি বই!” এই বলে তিনি বইটা তেজ সিং-এর সামনে রাখলেন।
তেজ সিং বললেন, “আপনি কী আইয়ারি দেখিয়েছেন, তা আমাদের ভালোই জানা আছে—কিন্তু বলুন তো, এই বই আপনার হাতে এল কী করে? এ তো এক আশ্চর্য কাহিনি!”
এরপর কুমার পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন, কীভাবে তিনি বইটা ফিরে পেয়েছেন, চিঠিটাও দেখালেন, আর নিজে যে উত্তর লিখেছেন, সেটাও পড়ে শোনালেন।
জ্যোতিষী বললেন, “এটাই স্বাভাবিক—কারণ উনি একজন উচ্চবংশীয়া নারী; তিনি কোনওভাবেই কুমারকে কষ্ট দিতে পারতেন না। তাছাড়া, এই চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি কুমারের বিষয়ে সবকিছুই জানেন—অথচ আমরা অনুমানও করতে পারছি না যে উনি কে হতে পারেন!”
কুমার বললেন, “তেজ সিং-এর লজ্জা হওয়া উচিত—এত বড় একজন আইয়ার হয়েও দু-চারজন রমণীকে খুঁজে বের করতে পারছেন না!”
তেজ—এমন সন্ধান আমি ঠিকই বের করব যাতে আপনি খুশি হয়ে যাবেন। কিন্তু এখন যেহেতু বইটা পাওয়া গেছে, তাই আগে তিলিস্মের কাজ শেষ করতে হবে।
কুমার—আর ওঁরা কি ততদিন পর্যন্ত বসে থাকবেন?
তেজ—তাহলে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার জন্য আপনার এখন কোনও চিন্তাই নেই?
কুমার—কেন থাকবে না? রাজকুমারীর ভালোবাসা আমার শিরায়-শিরায় বইছে। কিন্তু আপনিও বিচার করে বলুন—এই রমণীর ভালোবাসাও কি কম সত্যি! আমার জন্য উনি তো রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে আমার থেকেও বড় করে দেখেছেন।
তেজ—আমি বলছি না যে আপনি তাঁর ভালোবাসাকে মর্যাদা দেবেন না—কিন্তু তিলিস্মের কথাও তো আপনার ভাবা উচিত।
কুমার—তাহলে আপনিই এমন কোনও উপায় বের করুন যাতে দুটো কাজই হয়।
তেজ—তাই হবে। দিনের বেলায় আমরা তিলিস্ম ভাঙার কাজ করব, আর রাতে ওই রমণীদের সন্ধান করব।
এই রাতটাও এভাবেই কেটে গেল। সকালে নিত্যকর্ম সেরে কুমার বীরেন্দ্র সিং, তেজ সিং আর জ্যোতিষী তিলিস্মি বই সঙ্গে নিয়ে তিলিস্মের ভেতরে প্রবেশ করলেন। বইয়ের মধ্যে যেমন লেখা ছিল, সেই অনুযায়ী তাঁরা তিলিস্ম ভাঙার কাজে লেগে পড়লেন।
তিলিস্মি বইয়ের শুরুতেই এই নিয়মটা লেখা ছিল—যিনি তিলিস্ম ভাঙবেন, তাঁকে দিনের এক প্রহর বাকি থাকতেই তিলিস্ম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, এবং তারপর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত তিলিস্ম ভাঙার আর কোনও কাজ করা যাবে না।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.