কুমার নিরুদ্দেশ হবার পর তেজ সিং, দেবী সিং এবং জ্যোতিষী মশাই তার সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন—এই খবর পাওয়ামাত্র মহারাজ শিবদত্তের মনে পুনরায় বিশ্বাসভঙ্গের দুরভিসন্ধি জেগে উঠল। তিনি গোপনে তার আইয়ারদের ও দেওয়ানকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, “এখন কুমার শিবির ছেড়ে নিরুদ্দেশ, তার আইয়াররাও তার খোঁজে বেরিয়েছে। এই হল মোক্ষম সুযোগ। আমার ইচ্ছা, কুমারের শিবিরে হানা দিয়ে সব তছনছ করে দিই, আর যে বিপুল ধনসম্পদ সে তিলিস্ম থেকে উদ্ধার করেছে, তাও লুঠ করে নিই।”
এই কথা শুনে তার দেওয়ান এবং বদ্রীনাথ, পান্নালাল, রামনারায়ণ ও চুন্নীলাল—সকলেই তাকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করলেন। তারা বোঝালেন যে, কুমারের সাথে যখন সন্ধি হয়ে গেছে, তখন এমন কাজ করা তার উচিত হবে না। এখন শিবির দখল করে নিলেও বিশেষ কী লাভ হবে? উপরন্তু, নতুন করে শত্রুতা তৈরি করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এইরকম নানা কথায় তারা মহারাজকে নিরস্ত করতে চাইলেও শিবদত্ত তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। তার আইয়ারদের মধ্যে নাজিম আর আহমদ নামে দুজন ছিল, তারা শিবদত্তের পক্ষ নিল এবং আক্রমণের জন্য তাকে আরও উসকে দিল।
অবশেষে মহারাজ শিবদত্ত কুমার বীরেন্দ্র সিংয়ের শিবিরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে সেনাপতি ফতে সিংকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য আহ্বান করলেন। ফতে সিংও কম বীর ছিলেন না, সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে প্রায় এক প্রহর ধরে যুদ্ধ করলেন, কিন্তু শেষে শিবদত্তের হাতেই আহত হয়ে বন্দী হলেন।
সেনাপতি বন্দী হবার সঙ্গে সঙ্গেই সৈন্যদলের মনোবল ভেঙে গেল, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করল। মহারাজ শিবদত্তের হাতে কেবল শিবির আর তাঁবু ইত্যাদিই পড়ল। তিলিস্মি ধনরত্ন তার হস্তগত হল না, কারণ তেজ সিং আগেই কৌশলে সে সব নওলগড়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তিলিস্মি বইটা তার হাতে এল। এতে তিনি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে বললেন, “এবার আমি নিজেই এই তিলিস্ম ভেদ করব, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে ওই গুহা থেকে বের করে এনে বিয়ে করব।”
ফতে সিংকে কারাগারে নিক্ষেপ করে শিবদত্ত এক উৎসবের আয়োজন করলেন। নাচ-গানের আসর থেকে উঠে তিনি নিজের খাসকামরায় এসে পালঙ্কে শয়ন করলেন। সেই রাতেই তিনি তার পালঙ্ক থেকে উধাও হয়ে গেলেন। কে তাকে কোথায় নিয়ে গেল, কেউ জানতে পারল না। কেবল তার পালঙ্কের উপর সেই কাগজটা পাওয়া গেল, যার কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। শিবদত্তের অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গেই সেনাপতি ফতে সিংও কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন; চোখ খুলে তিনি নিজেকে এক নির্জন জঙ্গলে আবিষ্কার করলেন। কে তার বাঁধন খুলে দিয়েছে, তা জানার উপায় ছিল না। শুধু তাই নয়, শিবদত্তের হাতে পাওয়া তার ক্ষতগুলোতেও সুন্দরভাবে পট্টি বাঁধা ছিল, এবং তাতে যন্ত্রণার অনেক উপশম হয়েছিল।
ফতে সিং তিলিস্মের কাছে ফিরে এলেন। সেখানে তার বহু পলাতক সৈন্য তার সাথে যোগ দিল, এবং ধীরে ধীরে সেই ছত্রভঙ্গ সেনাদল পুনরায় একত্রিত হল। কিছুকাল পরেই খবর এল যে, মহারাজ শিবদত্তকেও কেউ বন্দী করে নিয়ে গেছে।
ফতে সিং তার কয়েকজন শ্রেষ্ঠ বীরকে সঙ্গে নিয়ে চুনারের দিকে রওনা হলেন। দুই ক্রোশ যেতে না যেতেই খবর এল যে মহারাজ জয়সিংহ তার সেনাবাহিনী নিয়ে এসে পৌঁছেছেন। চুনার অভিযান স্থগিত রেখে তিনি জয়সিংহকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে গেলেন এবং তার উদ্দেশ্যও যে একই, তা জানতে পেরে তার সঙ্গেই চুনারের দিকে অগ্রসর হলেন।
জয়সিংহের সেনাবাহিনী চুনার দুর্গ অবরোধ করল। শিবদত্তের সৈন্যরা দুর্গের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে ফটক বন্ধ করে দিল। তারা প্রাচীরে কামান বসিয়ে, রসদপত্র মজুত করে, বুরুজ আর কেল্লার পাঁচিল থেকে যুদ্ধ আরম্ভ করল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.