গুহা থেকে কুমারকে সঙ্গে নিয়ে তেজ সিং ও অন্যান্য আইয়াররা তিলিস্মের উদ্দেশে রওনা দিলেন। পথে এক রাত্রি যাপনের পরদিন সকালে তাঁরা যখন আবার যাত্রা শুরু করেছেন, ঠিক সেই সময় দূরে এক অশ্বারোহীকে দেখা গেল। আগন্তুক মুখোশধারী, এবং সে সোজাসুজি কুমারের দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটি কাছে এসে ঘোড়া থেকে নামল, মাটিতে কী একটা জিনিস রেখে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়াল। কুমার এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, একটি তিলিস্মি বই, আর তার সঙ্গে একটি চিঠি। সেটি দেখামাত্র তিনি এত আনন্দিত হলেন যে তেজ সিংকে বলে উঠলেন—
“তেজ সিং, কী আর বলব! এই বনদেবী তো আমাকে একের পর এক ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলছেন। নিঃসন্দেহে এই লোকটি তাঁরই দূত, যে আমার পথের উপর এই তিলিস্মি বইটি রেখে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। হায়, তাঁর ভালোবাসা আমাকে প্রায় পাগল করে তুলেছে! দেখি, এই চিঠিতে কী লেখা আছে।”
এই বলে কুমার চিঠিটি পড়লেন:
“দৈবক্রমে এই তিলিস্মি বইটি আমার হাতে এসে পড়েছে, তাই এটি আপনাকে দিলাম। এখন শীঘ্র তিলিস্ম ভেঙে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে উদ্ধার করুন। বেচারি নিশ্চয়ই খুব কষ্টে আছে। চুনারে যুদ্ধ চলছে; আপনিও সেখানে যান, এবং নিজের শৌর্য দেখিয়ে এই বিজয় নিজের নামে করুন।
—আপনার দাসী…
বিয়োগিনী।”
কুমার: তেজ সিং, তুমিও এটা পড়ো।
তেজ সিং: (চিঠিটি পড়ে) আমি বুঝতে পারছি না, এই বনদেবী কোনও মানুষ না কি স্বর্গের অপ্সরী। কী আশ্চর্য সব কাজ ওঁর হাতে সম্পন্ন হচ্ছে!
কুমার: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) হায়! আমার মাথায় যদি একটা চিন্তা থাকত, তবে না হয় মুক্তি পেতাম!
দেবী সিং: আমার পরামর্শ হল, আপনারা সবাই এখানেই থাকুন। আমি আগে চুনারে গিয়ে সমস্ত পরিস্থিতি জেনে আসি।
কুমার: ঠিক আছে। চুনার এখান থেকে মাত্র পাঁচ ক্রোশ দূরে। তুমি খবর নিয়ে এসো, তারপর আমরা এগোব। কারণ কোনও একটা বীরত্বের কাজ দেখিয়ে নিজেদের প্রকাশ করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে।
দেবী সিং চুনারের উদ্দেশে রওনা হলেন। কুমারকে আরও একদিন পথেই অপেক্ষা করতে হল। পরের দিন দেবী সিং ফিরে এসে কুমারের কাছে চুনারের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ, মহারাজ জয়সিংয়ের বন্দি হওয়ার খবর, এবং জিৎ সিঙের আইয়ারির ভূয়সী প্রশংসা করে সব জানালেন। বললেন, “যুদ্ধ এখনও চলছে। আমাদের সেনারা বেশ কয়েকবার দুর্গের সিংহদ্বার পর্যন্ত পৌঁছেও গেছে, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে; দরজা ভাঙা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু বুরুজ থেকে ছোঁড়া গোলার ঘায়ে আমাদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।”
এই কথা শুনে কুমার তেজ সিংকে বললেন, “যদি কোনও উপায়ে আমরা দুর্গের ভেতরে ঢুকে সিংহদ্বারটা খুলে দিতে পারি, তাহলে সেটা একটা বিরাট বীরত্বের কাজ হবে।”
তেজ সিং: নিঃসন্দেহে এটা একটা অত্যন্ত সাহসের কাজ হবে। হয় আমরা দরজা খুলব, নয়তো প্রাণ দেব।
কুমার: আমাদের মতো মানুষের জন্য যুদ্ধের চেয়ে মহৎ মৃত্যুর সুযোগ আর কী হতে পারে? হয় আমরা চুনার দখল করব, নয়তো বৈকুণ্ঠের সিংহাসন লাভ করব—দুদিক দিয়েই আমাদের দু’হাতে লাড্ডু!
তেজ সিং: বাহবা! এর চেয়ে বড় বীরত্ব আর কী হতে পারে! আসুন, আমরা ছদ্মবেশে দুর্গে প্রবেশ করি। কিন্তু এ কাজ দিনের আলোয় হওয়ার নয়।
কুমার: রাতেই হোক না, ক্ষতি কী? আমরা সারারাত দুর্গের ভেতরে লুকিয়ে থাকব, আর ভোরবেলা যখন যুদ্ধ পুরোদমে শুরু হবে, তখন সিংহদ্বারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। তখন তো সবাই বুরুজের উপর থাকবে; দরজার কাছে পঞ্চাশ-একশো জন লোক থাকলে সেটা খোলা এমন কিছু কঠিন কাজ হবে না।
দেবী সিং: কুমারের পরামর্শ ঠিক, কিন্তু জ্যোতিষীজিকে বাইরেই রেখে যেতে হবে।
জ্যোতিষী: কেন?
দেবী সিং: আপনি ব্রাহ্মণ, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ব্রহ্মহত্যার পাপ কুড়াব কেন? এটা ক্ষত্রিয়দের কাজ, আপনার নয়।
কুমার: হ্যাঁ পণ্ডিতজি, আপনার দুর্গে প্রবেশ করা উচিত হবে না।
জ্যোতিষী: আমি যদি আইয়ারি না জানতাম, তবে আপনার কথা মানা যেত। কিন্তু যে আইয়ারি জানে, বীরত্ব আর সাহস তার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে।
দেবী সিং: বেশ, তবে চলুন; আমাদের আর কী? বরং আমাদেরই ভাল।
কুমার: কীভাবে ভাল?
দেবী সিং: নিঃসন্দেহে পণ্ডিতজি আমাদের পরম বন্ধু; তিনি কখনও আমাদের সঙ্গ ছাড়বেন না। উনি মারা গেলেও ব্রহ্মরাক্ষস হয়ে যাবেন, তাতে আমাদের আরও বেশি সুবিধে হবে।
জ্যোতিষী: তাহলে কি আমার মুক্তিলাভ হবে না? তা যদি হয়, তাহলে আমিই বা তোমাকে ছাড়ব কেন? তুমিই তো আমার সবচেয়ে প্রিয়।
এই কথা শুনে কুমার অট্টহাস্য করে উঠলেন এবং নিজের ঘোড়ায় চড়ে আইয়ারদের সঙ্গে নিয়ে চুনারের দিকে রওনা হলেন। সন্ধ্যা নাগাদ তাঁরা চুনারে পৌঁছে গেলেন, এবং সেই রাত্রেই সুযোগ বুঝে দড়ির ফাঁস ছুঁড়ে পাঁচিল বেয়ে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.