চুনারের কাছে, দুই পাহাড়ের মাঝখানে এক নালার ধারে সন্ধ্যাবেলা পণ্ডিত বদ্রীনাথ, রামনারাণ, পান্নালাল, নাজিম আর আহমদ বসে কথাবার্তা বলছিল।
নাজিম: আর কী বলব! আমাদের মালিক তো বেহেশতে চলে গেলেন, আর সমস্ত ঝঞ্ঝাট এসে পড়ল আমাদের ঘাড়ে।
আহমদ: এখনও তো জানাই গেল না, তাঁকে খুনটা করল কে।
বদ্রীনাথ: ওর নিজের পাপই ওকে মেরেছে; আর খুব শিগগিরই তোদের দুজনেরও ওই একই দশা হবে। নামে তোরা আইয়ার; কিন্তু আসলে বিশ্বাসঘাতক আর চোর-ছ্যাঁচোড় ছাড়া কিছুই নোস, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
নাজিম: কী—আমরা বিশ্বাসঘাতক?
বদ্রীনাথ: নিশ্চয়ই। এতে আবার জিজ্ঞেস করার কী আছে? যখন তোরা নিজেদের আসল মালিক মহারাজ জয়সিংহের প্রতিই বিশ্বস্ত থাকতে পারলি না, তখন আর কার প্রতি হবি? নিজেরা তো ডুবলিই, ক্রূর সিংয়ের প্রাণ নিলি, আর আমাদের মহারাজকেও বরবাদ করে ছাড়লি—শেষমেশ তাঁকে কয়েদখানায় ঢোকালি। আমার তো ইচ্ছে করছে, তোদের দুজনকে জুতোপেটা করে মেরে ফেলি।
আহমদ: মুখ সামলে কথা বল, নইলে কান ছিঁড়ে ফেলব!
এই কথা শুনে বদ্রীনাথ রাগে কাঁপতে লাগল। সে ওখান থেকেই একটা পাথর তুলে নিয়ে এমন জোরে আহমদের মাথায় ছুঁড়ে মারল যে আহমদ সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নরকের পথ ধরল। তার এই দশা দেখে নাজিম পালাতে গেল—কিন্তু বদ্রীনাথ আগে থেকেই ওদের দুজনের রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল; সে তাকে ছাড়বে কেন? সে গুলতিতে একটা বড় পাথর বসিয়ে ছুঁড়ল; সেই আঘাতেই নাজিমও মাটিতে পড়ে গেল, আর তখন পান্নালাল আর বাকিরা এসে লাথি মেরে মেরে তাকে একেবারে থেঁতলে দিল, এবং আহমদের পর ক্রূর সিংয়ের সঙ্গী হতে তাকেও পাঠিয়ে দিল। এই দুজনকে খতম করার পর চার আইয়ার আবার সেই জায়গাতেই বসে কথাবার্তা শুরু করল।
পান্নালাল: যাক, এবার আমাদের দরবারের বুকের কাঁটা দূর হল।
বদ্রীনাথ: মহারাজ এতে বিন্দুমাত্র দুঃখিত হবেন না।
পান্নালাল: সিংহাসন বাঁচানোর জন্য কোনও উপায় বের করতেই হবে। মহারাজ জয়সিংহ আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছেন, আর মহারাজ ছাড়া ফৌজ ময়দানে নেমে যুদ্ধ করতে পারবে না।
চুন্নী: কেল্লার ভেতরে বসে আর কতদিন লড়াই করব? কেল্লার মধ্যে মোটে দুমাসের রসদ আছে, তারপর কী হবে?
রামনারাণ: বেশি রসদ জোগাড় করে রাখার সুযোগও তো আমরা পাইনি।
বদ্রীনাথ: একটা উপায় আছে—কোনওভাবে মহারাজ জয়সিংহকে তাঁর শিবির থেকে সরাতে হবে; যদি উনি আমাদের কব্জায় চলে আসেন, তাহলে খোলা ময়দানে ওঁর ফৌজকে হারানো কঠিন হবে না।
পান্নালাল: তা তো করতেই হবে। যাঁর নুন খেয়েছি তাঁর জন্য প্রাণ দেওয়াটাই আমাদের ধর্ম।
রামনারাণ: কিন্তু আমাদের মহারাজও তো অধর্মের পথ ধরেছেন। বেচারা কুমার বীরেন্দ্র সিংয়ের কী দোষ?
চুন্নী: যা-ই হোক না কেন, আমাদের তো মালিকের পক্ষেই থাকতে হবে।
বদ্রীনাথ: নাজিম আর আহমদ—এই দুটো শনিই আমাদের মহারাজের ওপর ভর করেছিল, এখন তারা দূর হয়েছে। এবার আমি দুই রাজার মধ্যে নিশ্চয়ই সন্ধি করিয়ে দেব, আর তখন আমাদের ভাগ্যেই জুটবে বীরেন্দ্র সিংয়ের হয়ে গদা ধরা। আহা! কী চমৎকার, সাহসী আর সম্ভাবনাময় কুমার তিনি।
পান্নালাল: অনেক রাত হল। চলো—কোনও আইয়ারির প্যাঁচে মহারাজ জয়সিংহকে ধরে ফেলি আর কোনও গোপন পথে কেল্লার ভেতরে এনে তাঁকে বন্দী করে রাখি।
বদ্রীনাথ: আমি একটা আইয়ারির ফন্দি ভেবেছি—ওটাই সবচেয়ে ভালো হবে।
পান্নালাল: কী সেটা?
বদ্রীনাথ: আমরা প্রথমে ওঁর পাচককে ফাঁদে ফেলব। আমি তার রূপ ধরে রান্নাঘরে রান্না করব, আর তোমরা প্রত্যেকে রান্নাঘরের বাকি চাকরদের ফাঁদে ফেলে তাদের রূপ ধরে আমার সঙ্গে কাজ করবে। আমি খাবারে বেহুঁশ করার ওষুধ মিশিয়ে মহারাজকে খাওয়াব, আর তারপর তাঁর পাহারাদারদেরও। তাহলেই কাজ হাসিল।
পান্নালাল: বেশ—তুমিই পাচক সাজো, কারণ তুমি ব্রাহ্মণ বলে তোমার হাতে রান্না খেলে মহারাজ জয়সিংহের ধর্ম নষ্ট হবে না—এই দিকটাও মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু খেয়াল রেখো, কড়া মাত্রার ওষুধ দিও না, নইলে খুব তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যেতে পারে।
বদ্রীনাথ: আরে না না—আমি কি অত বোকা? আমি কি জানি না যে রাজারা খাওয়ার আগে অন্য কাউকে দিয়ে খাবার পরীক্ষা করিয়ে নেন? আমি এত হালকা মাত্রার ওষুধ মেশাব যে খাওয়ার দু-ঘণ্টা পর্যন্ত কেউ টেরও পাবে না যে সে কোনও ওষুধ মেশানো খাবার খেয়েছে।
রামনারাণ: ব্যস—তাহলে এটাই ঠিক রইল। চলো, ওঠা যাক।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.