সকালে স্নান-আহ্নিক সেরে কুমার তিলিসমের কাজে হাত লাগানোর জন্য প্রস্তুত হলেন। তিন আইয়ারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তিলিসমের ভিতর প্রবেশ করলেন। আগের মতোই সেই ভূগর্ভস্থ ঘর ও কুঠুরিগুলির পথ ধরে তাঁরা বাগানে এসে পৌঁছলেন। সেই কালো পাথরের স্তম্ভশ্রেণীতে বসে তাঁরা তিলিসমি কিতাব খুললেন এবং পড়তে শুরু করলেন। তাতে লেখা ছিল—
“যখন তুমি ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামবে, সেখানকার ধোঁয়া থেকে মাথা বাঁচিয়ে তারগুলি কেটে দেবে, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্ত ধোঁয়া উধাও হয়ে যাবে। কালো পাথরের স্তম্ভশ্রেণীতে, শ্বেতপাথরের সিংহাসনের উপর তুমি একটি চৌকো লাল পাথর দেখেছিলে, যার গায়ে কিছু লেখা ছিল। সেটি স্পর্শ করলে যে কোনও মানুষের শরীরেই শিহরণ জাগে; শুধু তাই নয়, যে তাকে ছোঁয় সে মুহূর্তে মূর্ছিত হয়ে পড়ে যায়। কিন্তু ওই তারগুলি কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত শক্তি বিলুপ্ত হবে, কারণ আসলে এই ভূগর্ভস্থ কক্ষটি ভিতর ভিতর ওই সিংহাসনের পায়া পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং তারগুলি সেটির সঙ্গেই যুক্ত হয়ে নীচে মশলা ও নানা ভেষজের মধ্যে ডুবে আছে। দ্বিতীয় দিনে, আবার ওই ধোঁয়া-ভরা কক্ষে প্রবেশ করবে; তখন দেখবে কোনও ধোঁয়া নেই। মশাল জ্বেলে নির্ভয়ে ভিতরে যাও, আর দেখো তোমার জন্য কী বিপুল ধনরত্ন সেখানে সঞ্চিত আছে। সব বাইরে নিয়ে এসে তোমার ইচ্ছামতো জায়গায় রাখো। যতক্ষণ না সমস্ত সম্পদ সেই কক্ষ থেকে সম্পূর্ণরূপে বাইরে আনা হচ্ছে, ততক্ষণ তিলিসমের অন্য কোনও কাজে হাত দেবে না। কালো স্তম্ভশ্রেণীর মধ্যে শ্বেতপাথরের সিংহাসনের উপর যে চৌকো লাল পাথরটি আছে, সেটিও তুলে আনবে। আসলে ওটা একটা ছোট সিন্দুক, যার ভিতরে অনেক দুর্লভ জিনিস আছে। তার চাবি তুমি এই তিলিসমের মধ্যেই খুঁজে পাবে।”
কুমার পুরোটা আর একবার পড়লেন, তারপর সেই ধোঁয়া-ভরা ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হলেন। তেজ সিং, দেবী সিং এবং জ্যোতিষীজি মশাল জ্বেলে তাঁর পিছনে পিছনে নামলেন। তাঁরা সেই কক্ষটিতেই ঢুকলেন যেখানে অসংখ্য তার কাটা হয়েছিল। মশালের আলোয় এখন দেখা গেল, কাটা তারগুলি এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে; ঘরটা বেশ লম্বা আর চওড়া। চারদিকে শয়ে শয়ে লোহা আর রুপোর বড় বড় সিন্দুক রাখা। একদিকের দেওয়ালে একটা পেরেক থেকে একগোছা চাবি ঝুলছে।
কুমার চাবির গোছাটা পেড়ে নিলেন। দেখা গেল, ওগুলো সত্যিই সিন্দুকগুলোর চাবি। একটা সিন্দুক খুলতেই তিনি দেখলেন সেটা মেয়েদের হিরে-জড়ানো গয়নায় ঠাসা—সঙ্গে সঙ্গে সেটা বন্ধ করে তিনি আরেকটা খুললেন, যার মধ্যে অমূল্য কারুকার্যের সব তলোয়ার আর ছোরা, যেগুলির বাঁট দামী হিরে দিয়ে বাঁধানো। সেটাও বন্ধ করে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে তেজ সিংকে বললেন—
“কোনও সন্দেহ নেই এই কুঠুরিতে বিপুল ঐশ্বর্য লুকানো আছে। এখানে সবকটা খুলে দেখার প্রয়োজন নেই। এই সিন্দুকগুলো বাইরে বার করার ব্যবস্থা করুন; তারপর এক এক করে দেখে আমরা নওগড়ে পাঠিয়ে দেব। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো বার করে আনতে হবে।”
তেজ সিং উত্তর দিলেন, “আমরা যতই তাড়াহুড়ো করি না কেন, এই জায়গা থেকে সমস্ত সিন্দুক বের করতে দশ দিনের কম লাগবে না। আপনি যদি নওগড়ে পাঠানোর আগে প্রত্যেকটা খুলে দেখতে যান, তাহলে অনেক দিন নষ্ট হবে, আর তিলিসমের কাজও অকারণে পড়ে থাকবে। আমার মতে, সিন্দুকগুলো না খুলেই যেমন আছে নওগড়ে পাঠিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। আমাদের সব কাজ শেষ হলে তখন আমরা ওগুলো খুলে পরীক্ষা করতে পারব। এই উপায়ে, এগুলোর ভিতর থেকে কী বেরোলো তা কেউ জানতে পারবে না, আর শত্রুদের নজরও এর ওপর পড়বে না। ভগবানই জানেন এখানে কী পরিমাণ সম্পদ আছে, যা রক্ষা করার জন্য এত বড় এক তিলিসম তৈরি করা হয়েছে!”
এই পরামর্শ কুমারের বেশ পছন্দ হল, এবং দেবী সিং ও জ্যোতিষীজিও বললেন যে এটাই ঠিক হবে। চারজন ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং চেনা পথে সেই ধ্বংসস্তূপের স্তম্ভশ্রেণীতে ফিরে গেলেন; উপরের কক্ষের মুখটা পাথরের চাঁই দিয়ে ঢাকা দিয়ে, তিলিসমি চাবি দিয়ে তালা বন্ধ করে তাঁরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে নিজেদের তাঁবুতে ফিরে এলেন।
সেদিন তাঁরা তিলিসম থেকে বেশ সকালেই বেরিয়ে এসেছিলেন। তখনও দিনের দুই প্রহর বাকি। কুমার সেই তিলিসমি এবং কোষাগারের চাবির গোছা তেজ সিংয়ের জিম্মায় দিয়ে বললেন, “এখন ওই সিন্দুকগুলো বের করে নওগড়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.