তেজ সিং চলে যাওয়ার পর জ্যোতিষী একা হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, রমল শাস্ত্রের সাহায্যে জেনে নেওয়া যাক চন্দ্রকান্তা আর চপলা কোথায় আছে। ঝোলা খুলে, সরঞ্জাম বের করে রমলের ছক পাতলেন তিনি, তারপর শুরু করলেন গণনা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গভীর মনোযোগে তিনি কীসব হিসেবনিকেশ করলেন। হঠাৎই জ্যোতিষীর মুখে আনন্দের আভা ফুটে উঠল, ঠোঁটের কোণে দেখা দিল মৃদু হাসি। তড়িঘড়ি রমলের সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে তিনি সেই সুড়ঙ্গের দিকেই ছুটলেন, যেদিকে তেজ সিং মহারানীকে নিয়ে গেছেন। তিনি তো সাধারণ লোক নন, আয়ার! ছোটার সময় কোনও কার্পণ্য করলেন না, একেবারে ঝড়ের বেগে ছুটলেন।
তেজ সিং হনহন করে এগিয়ে চলেছেন। ক্রোশ পাঁচেক গেছেন, এমন সময় পেছন থেকে আওয়াজ এল, “দাঁড়াও—দাঁড়াও!” ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, জ্যোতিষী জগন্নাথ অত্যন্ত দ্রুতবেগে ছুটে আসছেন। তিনি থামলেন, কিন্তু মনে খটকা লাগল, উনি এত ব্যস্ত হয়ে আসছেন কেন?
জ্যোতিষী কাছে আসতেই তাঁর মুখের হাসি দেখে তেজ সিং আশ্বস্ত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? এভাবে ছুটে আসছেন যে?”
জ্যোতিষী: কী আর হবে? আমি তোমার সঙ্গে ওই সুড়ঙ্গে যাব।
তেজ: কেন?
জ্যোতিষী: সেটা গেলেই জানতে পারবে। এখানে বলব না।
তেজ: তাহলে দরজার কাছে তোমার চোখে পট্টি বাঁধতে হবে। কারণ বদ্রীনাথ কুমারকে ধোঁকা দিয়ে প্রথম তালার রহস্য জেনে ফেলার পর আমরা আর একটা তালা লাগিয়েছি। সেটা অনেকদিন ধরেই তৈরি ছিল, কিন্তু আলস্যের কারণে ব্যবহার করা হয়নি, কারণ ওটা খুলতে আর বন্ধ করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে, এই তালার রহস্য আমরা কাউকে বলব না।
জ্যোতিষী: আমি চোখে পট্টি বাঁধব না, আর ওই সুড়ঙ্গে যাবই। তুমি যতই গজরাতে থাকো না কেন, আমাকে নিয়েই যাবে।
তেজ: বেশ! তাহলে শুনি, খবরটা কী?
জ্যোতিষী: খবর? এ তো যাকে বলে একেবারে সোনায় সোহাগা! রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে আমি ওখানে গিয়েই দেখিয়ে দেব!
তেজ: সত্যি! ঠিক করে বলো!
জ্যোতিষী: যদি আমার কথা মিথ্যে হয়, ওই সুড়ঙ্গের মধ্যেই আমাকে হালাল করে দিও।
তেজ: বাহ্! বেশ বলেছ! আমাকে দিয়ে তোমাকে মারিয়ে তোমার কী লাভ? ব্রহ্মহত্যার পাপ তো আমার ঘাড়ে চাপবে!
জ্যোতিষী: তারও উপায় আছে, যাতে তোমার ঘাড়ে ব্রহ্মহত্যার পাপ না চাপে।
তেজ: কী উপায়?
জ্যোতিষী: তেমন কিছু না। আগে আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিয়ো, তারপর হালাল কোরো।
এই কথা শুনে তেজ সিং হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “ঠিক আছে ভাই, চলো। কী আর করা যাবে, তোমার কথাই মানতে হল।”
পরদিন সন্ধ্যায় ওরা সুড়ঙ্গের দরজার কাছে পৌঁছল। জ্যোতিষীর সামনেই তেজ সিং তালা খুলতে লাগলেন। প্রথমে সিংহের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জিভটা টেনে বের করলেন, তারপর দ্বিতীয় তালাটা খোলার ব্যবস্থা করলেন।
দরজার দু’পাশে দুটো মার্বেল পাথরের ফলক দেওয়ালে গাঁথা ছিল। তেজ সিং ডানদিকের ফলকটায় একটা লাথি মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা আওয়াজ করে ফলকটা দেওয়ালের ভেতরে ঢুকে মাটির সঙ্গে সমান হয়ে গেল। দেখা গেল, হাতখানেক চওড়া একটা ছোট বেদীর ওপর একটা সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। তেজ সিং সেটার গলা ধরে স্ক্রুর মতো কয়েকবার ঘোরাতেই দরজাটা খুলে গেল। মহারানীর পুঁটলিটা নিয়ে তেজ সিং আর জ্যোতিষী ভেতরে ঢুকলেন। তেজ সিং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ভেতরে বাঁদিকের দেওয়ালে মানুষের হাত ঢোকার মতো একটা গর্ত ছিল। তেজ সিং তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কী একটা করলেন, কিন্তু জ্যোতিষী সেটা ঠিকমতো দেখতে পেলেন না।
জ্যোতিষী জিজ্ঞেস করলেন, “ভেতরে কী আছে?” তেজ সিং উত্তর দিলেন, “ভেতরে একটা চাবি আছে, সেটা ঘোরালে বাইরের ওই পাথরের ফলকটা বন্ধ হয়ে যায়, যেটাতে আমি লাথি মেরেছিলাম আর যার পেছনে সাপটা ছিল। এই গর্তটা শুধু পাথরটা বন্ধ করার জন্য, এটা দিয়ে খোলা যায় না। খোলার জন্য বাইরে থেকে আগের মতোই ব্যবস্থা করতে হয়।”
দরজা বন্ধ করে ওরা এগিয়ে চললেন। ভেতরে খোলা জায়গায় এসে মহারানীর পুঁটলি খুলে তাঁকে সংজ্ঞায় ফিরালেন এবং বললেন, “আমাদের সঙ্গে চলুন, আপনাকে মহারাজের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।” মহারানী তাঁদের সঙ্গে চললেন। তেজ সিং জ্যোতিষীকে জিজ্ঞেস করলেন, “এবার বলো, চন্দ্রকান্তা কোথায়?” জ্যোতিষী বললেন, “আমি তো এর আগে কখনও এখানে আসিনি যে সব জায়গা চিনব। চলো, আগে মহারাজ শিবদত্তকে খুঁজে বের করা যাক, চন্দ্রকান্তাও পাওয়া যাবে।”
মহারাজ শিবদত্তকে খুঁজতে খুঁজতে ওরা এগোতে লাগলেন এবং শেষে সেই ঝর্ণার ধারে এসে পৌঁছলেন যার কথা আগে লেখা হয়েছে। হঠাৎ সকলের চোখ পড়ল মহারাজ শিবদত্তের ওপর, যিনি ওপারে একটা বড় পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। ওপরের দিকে মুখ তুলে তিনি কী যেন দেখছেন।
মহারানী স্বামীকে দেখামাত্র প্রায় জ্ঞানহারা হয়ে গেলেন। জলের গভীরতা কত, কীভাবে পার হবেন, কিচ্ছু জিজ্ঞেস না করে ঝাঁপ দিলেন। জল কমই ছিল। ওপারে পৌঁছে কাঁদতে কাঁদতে শিবদত্তের পায়ে আছড়ে পড়লেন। মহারাজ তাঁকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ততক্ষণে তেজ সিং আর জ্যোতিষীও ঝর্ণা পার হয়ে মহারাজ শিবদত্তের কাছে পৌঁছে গেছেন।
শিবদত্ত জ্যোতিষীকে দেখামাত্র জিজ্ঞেস করলেন, “এ কী! আপনি এখানে কী করে? আপনিও কি তেজ সিং-এর হাতে ধরা পড়েছেন?”
জ্যোতিষী বললেন, “না, আমি তেজ সিং-এর হাতে ধরা পড়তে যাব কেন? তিনি তো দয়া করে আমাকে নিজের দলে নিয়েছেন। আমি এখন বীরেন্দ্র সিং-এর সঙ্গে আছি, তোমার সঙ্গে আমার আর কোনও সম্পর্ক নেই।”
জ্যোতিষীর কথা শুনে মহারাজের ভয়ানক রাগ হল। তিনি রক্তচক্ষু করে তাঁর দিকে তাকালেন। জ্যোতিষী বললেন, “মিছিমিছি রাগ করে কী হবে? যার যেখানে ইচ্ছে থাকে। যে সম্মান দেয়, তার কাছে থাকাই উচিত। মনে করে দেখো, তুমি আমার সঙ্গে কত রূঢ় ব্যবহার করেছ। আমি যে একজন ব্রাহ্মণ, সেটুকুও তোমার মনে ছিল না। এখন আর আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে লাভ কী?”
জ্যোতিষীর কথা শুনে শিবদত্ত মাথা নিচু করলেন, কোনও উত্তর দিলেন না। ঠিক সেই সময় একটা ক্ষীণ, দুর্বল কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “তেজ সিং!”
তেজ সিং মাথা তুলে যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে তাকালেন। চোখে পড়ল চন্দ্রকান্তাকে। তাঁকে দেখামাত্র তেজ সিং-এর চোখেও জল এসে গেল। আহা, কী দৃশ্য! চুল খোলা, মুখ শুকিয়ে গেছে, শরীর ধুলোমাখা, পোশাক ছিন্নভিন্ন। একটা পাহাড়ের ওপর, ছোট্ট একটা গুহার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি ডাকছেন, “তেজ সিং! তেজ সিং!”
তেজ সিং সেদিকে ছুটলেন, ভাবলেন পাহাড়ে চড়ে রাজকুমারীর কাছে পৌঁছবেন, কিন্তু পারলেন না। কোনও পথ খুঁজে পেলেন না। অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে, অন্য উপায় না দেখে, ওপরে ওঠার জন্য কমন্দ ছুঁড়লেন, কিন্তু সেটা এক-চতুর্থাংশও গেল না। জ্যোতিষীর কমন্দটাও নিয়ে নিজেরটার সঙ্গে গিঁট বেঁধে আবার ছুঁড়লেন—এবারও অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছল না। যতরকম উপায় ছিল সব চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনওটাই কাজে এল না। শেষে বাধ্য হয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, “রাজকুমারী, আপনি ওখানে গেলেন কী করে?”
তেজ সিং-এর গলা রাজকুমারীর কানে পরিষ্কার পৌঁছল, কিন্তু রাজকুমারীর গলা অত্যন্ত ক্ষীণ হওয়ায় তেজ সিং-এর কানে পুরোপুরি এল না। তিনি কিছু একটা উত্তর দিলেন, কিন্তু বোঝা গেল না। শুধু এইটুকু শোনা গেল, “ভাগ্য… এলাম… পথ… উদ্ধার…!”
আহা, রাজকুমারীর সঙ্গে ঠিক করে কথাও বলা যাচ্ছে না! এই ভেবে তেজ সিং অত্যন্ত ব্যথিত হলেন, কিন্তু কী-ই বা করার আছে? রাজকুমারী আরও কিছু বললেন, কিন্তু তার কিছুই বোঝা গেল না, শুধু বোঝা গেল কেউ একজন কথা বলছে। তেজ সিং আবার চিৎকার করে বললেন, “ভয় পাবেন না, আমি আপনাকে নামানোর কোনও না কোনও উপায় বের করবই।”
রাজকুমারী মুখে আর কিছু বললেন না। সেখানে একটা বুনো গাছ ছিল, যার পাতাগুলো বেশ বড় আর মোটা। তিনি একটা পাতা ছিঁড়লেন, একটা ছোট পাথরের ছুঁচলো ডগা দিয়ে তার ওপর কিছু লিখলেন। তারপর নিজের শাড়ির আঁচল থেকে একটুকরো কাপড় ছিঁড়ে তাতে পাতাটা আর একটা ছোট নুড়ি বেঁধে এমনভাবে ছুঁড়লেন যে সেটা ঝর্ণার ধারে এসে পড়ল, খানিকটা জলের মধ্যে। তেজ সিং সেটা খুঁজে বের করে আনলেন। গিঁট খুলে পাতাটা ভালো করে দেখলেন—তাতে লেখা ছিল, “তুমি আগে গিয়ে কুমারকে এখানে নিয়ে এসো।”
তেজ সিং পাতাটা জ্যোতিষীকে দেখিয়ে বললেন, “তুমি এখানে থাকো, আমি কুমারকে ডেকে আনি। ততক্ষণে তুমি রাজকুমারীকে নামানোর কোনও উপায় ভাবো।” জ্যোতিষী বললেন, “ঠিক আছে, তুমি যাও। আমি একটা উপায় ভাবছি।”
মহারানীও এসব স্পষ্টই দেখছিলেন, কিন্তু রাজকুমারী পাতায় কী লিখে ছুঁড়ে দিলেন বা তেজ সিং এখন কোথায় যাচ্ছেন, তা বুঝতে পারলেন না। তবে চন্দ্রকান্তার অসহায় অবস্থা দেখে মহারানীর চোখে জল এসে গেল, তিনি একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তেজ সিং সেখান থেকে রওনা হয়ে গুহার দরজা খুললেন, বাইরে বেরিয়ে এলেন, দুটো তালাই আবার বন্ধ করলেন এবং বিজয়গড়ের দিকে যাত্রা করলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.