Skip to content
Back to story
চন্দ্রকান্তা Matribhasa Bangla · চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
A fantasy-themed illustration for চন্দ্রকান্তা

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

19.5K 2.8K 0

কিছুক্ষণ পরেই চপলা আঁচল ভরে ফল নিয়ে ফিরল, কিন্তু এসে দেখে, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা সেখানে নেই। চপলা চারদিকে চোখ বোলাল, কিন্তু রাজকুমারীর টিকিটিও দেখতে পেল না। রাজকুমারী কি এই ভাঙা বাড়িটার ভেতরে ঢুকল? এই ধ্বংসস্তূপে? এই ভেবে চপলাও ভেতরে পা বাড়াল। চন্দ্রকান্তা তো বেশ সাহসের সঙ্গেই ঢুকেছিলেন; কিন্তু চপলা এগোল অত্যন্ত সতর্ক পায়ে, চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে, প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে। ফটক দিয়ে ভেতরে পা রাখার মুহূর্তেই দুদিকে দুটো হলঘর চোখে পড়ল—ইঁট-পাথরের স্তূপ, জায়গায় জায়গায় ছাদ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছবি আর পাথরের মূর্তিগুলো দেখে মনে হয় যেন এখনও একেবারে টাটকা।

চপলা অবাক চোখে মূর্তিগুলোর দিকে তাকাল—একটারও আস্ত শরীর নেই। কারও মাথা নেই, কারও পা নেই, কোনওটার হাত কাটা, কোনওটার আবার শরীরের অর্ধেকটাই উধাও। মূর্তিগুলোর মুখগুলোও অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর। এগিয়ে চলল চপলা। মাটি আর পাথরের বিশাল ঢিবি, যার উপর জংলি গাছ জন্মেছে, সেইসব টপকে সে অবশেষে এক খোলা চত্বরে এসে পৌঁছাল। আর দূর থেকেই সেই বকটাকে দেখতে পেল, যার পেটের মধ্যে এখন রাজকুমারী বন্দি।

অন্য সব খোঁজাখুঁজি ছেড়ে চপলা সোজা বকটার দিকে দৌড়ে গেল। বকটা তার ঠোঁট ফাঁক করল। চপলা ভীষণ অবাক হয়ে এক পা পিছিয়ে এল। বকটা আবার ঠোঁট বন্ধ করে নিল। সে ভাবতে লাগল—এখন কী করা যায়? এটা যে কোনও বড়সড় আইয়ারির কারসাজি তাতে সন্দেহ নেই; এর রহস্য ভেদ করতেই হবে। কিন্তু তার আগে রাজকুমারীকে খুঁজতে হবে; কারণ এই ধ্বংসস্তূপটা কোনও পুরোনো তিলিসম বলেই মনে হচ্ছে, আর রাজকুমারী হয়তো তারই মধ্যে কোথাও আটকা পড়েছেন। এই ভেবে সে অন্যদিকে সরে গিয়ে আবার খোঁজা শুরু করল।

চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা চত্বর; অনেক হলঘর আর কুঠুরি ভেঙে পড়েছে, কিন্তু অনেকগুলো এখনও আস্তই আছে। চপলা একদিক থেকে ঘরগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল। প্রথমে সে এমন একটা হলঘরে ঢুকল যার মাঝখানের ছাদটা ভেঙে পড়েছে; ঘরটা লম্বায় প্রায় একশো গজের মতো হবে। মাঝখানে মাটি আর সুরকির এক বিশাল ঢিবি, চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে রাশি রাশি হাড়গোড়, আর ঘরের কোণগুলো মাকড়সার ঘন জালে ঢাকা। মাটির ঢিবির ওপর থেকে অনেক ছোট ছোট অশ্বত্থ আর অন্য গাছের চারা গজিয়েছে। হলঘরের একপাশে একটা ছোট কুঠুরি দেখা গেল, তার ভেতরে ঢুকে চপলা একটা কুয়ো দেখতে পেল; উঁকি মেরে দেখল, ভেতরটা অন্ধকার।

এই কুয়োর ভেতরে কী আছে? বাকি জায়গার তুলনায় এই কুঠুরিটা এত পরিষ্কার কেন? কুয়োটাকেও বেশ পরিষ্কার বলেই মনে হল—পুরোনো কুয়োর ভেতরে সাধারণত গাছপালা গজিয়ে ওঠে, কিন্তু এটার মধ্যে সেসব কিছুই নেই—আর ভেতর থেকে এমন অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে যার কোনও অর্থই সে বুঝতে পারল না।

ব্যাপারটা কী তা জানার জন্য চপলা তার আইয়ারি ঝুলি থেকে কর্পূর বের করে, তার ভাঙা টুকরোগুলোতে আগুন ধরিয়ে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিল। সেগুলো যখন নীচে পৌঁছাল, জ্বলন্ত টুকরোগুলোর উজ্জ্বল আলোয় চারদিক স্পষ্ট হয়ে উঠল। এখন সে পরিষ্কার দেখতে পেল যে কুয়োর নীচের দিকটা বেশ চওড়া আর পরিষ্কার; কিন্তু তাতে জল নেই—জলের জায়গায় রয়েছে একটা ধবধবে সাদা পালঙ্ক, আর সেই পালঙ্কের ওপর এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর লম্বা দাড়ি ঝুলে পড়েছে, কিন্তু মাথা নিচু করে থাকায় তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর সামনে একটা ছোট কাঠের আসন, তার উপর নানা রঙের ফুল ছড়ানো। এই দৃশ্য দেখে চপলার গা ছমছম করে উঠল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সে কুয়োর পাড়ে বসে ভাবতে লাগল, কিন্তু কিছুই তার মাথায় এল না। এর মধ্যে ভেতরের জ্বলন্ত কর্পূরের টুকরোগুলোও নিভে গেল, আবার অন্ধকার নেমে এল।

সেই কুঠুরি থেকে একটা পথ অন্য একটা হলঘরের দিকে চলে গেছে। সেই পথ ধরে চপলা পরের হলঘরটায় এল। সেখানে যা দেখল তা আরও ভয়ঙ্কর, হৃৎকম্প ধরানো। আবর্জনা, হাড়গোড় আর নোংরার দিক থেকে এই হলঘরটা আগেরটাকে বহুগুণে ছাপিয়ে গেছে; এমনকি, সম্ভবত কোনও গাধা বা টাট্টু ঘোড়ার একটা আস্ত কঙ্কালও মাটিতে পড়ে আছে। সেটাকে পাশ কাটিয়ে চপলা হলঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।

সেখানে সে দেখল, মাটি থেকে প্রায় হাতছয়েক উঁচু একটা শ্বেতপাথরের বেদী, তাতে ওঠার জন্য নয়টি সুন্দর কারুকার্য করা সিঁড়ির ধাপ। বেদীর উপরে একটা কাঠের আসনে এক ব্যক্তি বসে আছে, তার হাতে একটা বই, দেখে মনে হচ্ছে সে পড়ছে; কিন্তু অনেকটা উঁচুতে হওয়ায় তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। বেদীর উপর উঠবে কি উঠবে না? উঠে পড়লে হয়তো কোনও ক্ষতি হবে না। একটা পা সিঁড়িতে রেখে দেখিই না কী হয়। এই ভেবে চপলা একটা পা সিঁড়ির ধাপে রাখল। পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড এক শব্দ হল, আর সিঁড়ির উপরের পাথরটা সিন্দুকের ঢাকনার মতো খুলে গিয়ে চপলার পা-টাকে এমন জোরে ছিটকে দিল যে, সেই আকস্মিক ধাক্কা আর আতঙ্কে সে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়িয়ে চপলা দেখল, সিঁড়ির যে পাথরটা সিন্দুকের ঢাকনার মতো খুলে গিয়েছিল, সেটা আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেছে।

চপলা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এই ভাঙা বাড়িটা এক অদ্ভুত তামাশা; নিশ্চিতভাবেই কোনও বড় মাপের আইয়ারের তৈরি। এর ভেতরে ঢুকে সবকিছু খুঁজে দেখা সহজ কাজ নয়—একটা সামান্য ভুলেই প্রাণ যেতে পারে। কিন্তু আমার ভয় কীসের? আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় চন্দ্রকান্তা এই বাড়ির মধ্যেই কোথাও আটকা পড়ে আছে, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। আমার প্রাণ গেলেও রাজকুমারীকে ছাড়া আমি এই বাড়ি ছেড়ে কিছুতেই যাব না। দেখি তো, এই সিঁড়ি আর এই বেদীর মধ্যে কী আইয়ারি লুকোনো আছে। কিছুক্ষণ ভাবার পর চপলা প্রায় দশ সের ওজনের একটা পাথর তুলে সিঁড়ির ধাপে রাখল। তার পা-টা যেমনভাবে ছিটকে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই প্রচণ্ড শব্দ করে পাথরটাও ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল।

চপলা প্রত্যেকটা সিঁড়ির ধাপে পাথর রেখে পরীক্ষা করল, আর প্রতিবারই একই আশ্চর্য কাণ্ড দেখতে পেল। এই বেদীর উপরে কী আছে তা যেভাবেই হোক দেখতে হবে; এই ভেবে সে অন্য ফন্দি আঁটল। বেদীর পাশে অনেক ইঁট আর পাথর জড়ো করে একটা ঢিবি তৈরি করল, আর তার উপর চড়ে উঁকি দিল। শ্বেতপাথরের আসনে এক ব্যক্তি দুই হাতে একটি বই ধরে বসে আছে; তার বয়স আন্দাজ ত্রিশ বছর হবে। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে সে বুঝল, এই লোকটিও পাথরের। চপলা ছোট্ট একটা নুড়ি তার মুখে ছুড়ে মারল; মূর্তিটা হয়তো পাথরের, কিন্তু কাজ করছিল জ্যান্ত মানুষের মতো। চপলা যে নুড়িটা তার মুখে ছুড়েছিল, সে সেটা এক হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আবার হাতটা আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনল। এরপর চপলা একটা ছোট নুড়ি তার পায়ের উপর রাখল; সে পা নাড়িয়ে নুড়িটা ফেলে দিল। চপলা এমনিতেই খুব চালাক আর নির্ভীক; কিন্তু এই পাথরের মূর্তির কাণ্ডকারখানা দেখে সে এতটাই ভয় পেয়ে গেল যে তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল। এবার সে অন্য দিকগুলো দেখতে চলল। পাশের একটা হলঘরে সে দেখল, মাঝখানে একটা তহখানার মতো; নীচে নামার জন্য সিঁড়ি রয়েছে, আর উপরে লোহার দুই পাল্লার দরজা, যা এখন খোলা।

চপলা দাঁড়িয়ে ভাবল: ভেতরে ঢোকা উচিত, নাকি উচিত নয়? যদি আমার পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তো আমি ভেতরেই আটকা পড়ে থাকব। এটাকেও একবার পরীক্ষা করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আগে একটা মাটির ঢেলা ভেতরে ফেলে দেখি; কিন্তু যদি দরজাটা কোনও মানুষ ঢুকলেই বন্ধ হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে তো মাটির ঢেলা পড়লেও বন্ধ হয়ে যাবে, আর তখন ভেতরে উঁকি দেওয়াও মুশকিল হবে। তাই এমন কোনও উপায় বের করতে হবে যাতে ভেতরে ঢোকার সময় পাল্লা দুটো বন্ধ না হতে পারে; আরও ভালো হয় যদি পাল্লা দুটোকেই ভেঙে ফেলা যায়।

এইসব ভাবতে ভাবতে চপলা দরজার কাছে গেল। প্রথমে সে ওটা ভাঙার চেষ্টা করল; কিন্তু পারল না, কারণ পাল্লাগুলো লোহার। ওগুলোতে কোনও কব্জা নেই, শুধু প্রত্যেক পাল্লার মাঝখানে একটা করে খিল লাগানো, যা মনে হচ্ছে মাটির গভীরে পোঁতা। মাটির নীচে সেই খিল কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, তা সে খুঁজে বের করতে পারল না।

চপলা কোমর থেকে তার কমন্দ্‌টা খুলে চার ভাঁজ করল, তারপর তার এক প্রান্ত খুব সাবধানে দরজার একটা পাল্লার সঙ্গে বাঁধল, আর অন্য প্রান্তটা কাছেই হলঘরের একটা থামের সঙ্গে বেঁধে দিল। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে তহখানার ভেতরে একটা পাথর ছুড়ে মারল। পাথরটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাতির ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ার মতো প্রচণ্ড এক গর্জন বেরিয়ে এল; আর সঙ্গে সঙ্গে একটা পাল্লা ঘুরে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেল, অন্যটাও বন্ধ হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু কমন্দে বাঁধা থাকায় সেটা ছিঁড়তে পারল না, আর ওই অবস্থাতেই আটকে রইল। চপলা বলল, “যাক, এখন এটা পরিষ্কার যে এই কমন্দ্‌টা পাল্লাটাকে খোলা রাখতে পারবে। এখন নির্ভয়ে নীচে নেমে দেখা যাক ওখানে কী আছে।” এই বলে চপলা তহখানার ভেতরে নামতে শুরু করল।

0 Next
Continue to next part Up next ১৫ পরিচ্ছেদ — চম্পার বিপদ
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.