চপলা ফল পাড়তে গেলে একা বসে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার মন চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, চপলা যতক্ষণ ফল নিয়ে আসছে, আমি এই ভাঙা বাড়িটা একবার ঘুরে দেখি। এখন এর দশা যতই খারাপ হোক না কেন, এককালে নিশ্চয়ই এর জুড়ি মেলা ভার ছিল।
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা উঠে সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঢুকলেন। এই ভাঙাচোরা অট্টালিকার সিংহদ্বারটি কিন্তু বেশ মজবুত আর পোক্ত ছিল। যদিও তাতে কোনও কপাট লাগানো ছিল না, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় যে এককালে এখানে কাঠ বা লোহার তৈরি বিশাল কোনও দরজা ঝোলানো থাকত।
ভেতরে ঢুকে রাজকুমারী দেখলেন, বাড়িটা এক বিশাল চতুষ্কোণ চত্বর। ভেতরের মহলগুলো ভেঙে গেলেও চারপাশের পাঁচিল আর বাইরের ঘরগুলো মোটামুটি অক্ষত। তিনি আরও এগিয়ে একটা থামওয়ালা দালানের কাছে এলেন। সেটার ছাদ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু থামগুলো এখনও খাড়া। চারপাশে ছড়ানো ইট-পাথরের স্তূপের মধ্যে দিয়ে সাবধানে পা ফেলে তিনি এগিয়ে চললেন। মাঝখানে একটা খোলা উঠোন দেখে তিনি মনোযোগ দিয়ে সেদিকে তাকালেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে এখানে একসময় বাগান ছিল, কারণ মার্বেল পাথরের তৈরি ফুলের কেয়ারিগুলো তখনও চোখে পড়ছে, আর জল দেওয়ার ছোট ছোট নালাগুলোও অক্ষত। অযত্নে পড়ে থাকা অনেক ফোয়ারাও দেখা গেল, যদিও সবগুলোর উপরেই মাটির আস্তরণ জমে গেছে। সেই ধ্বংসস্তূপের ঠিক মাঝখানে পাথরে খোদাই করা এক বিশাল সারস পাখি দাঁড়িয়ে ছিল। তার কারুকার্য আর গঠনশৈলী কাছ থেকে দেখার জন্য তিনি সেটির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং মনে মনে শিল্পীর অসামান্য দক্ষতার প্রশংসা করতে লাগলেন।
সারসটি ছিল শ্বেতপাথরের, আর সেটি বসানো ছিল মানুষের কোমর সমান উঁচু ও চওড়া একটি কালো পাথরের স্তম্ভের উপর। তার পা দেখা যাচ্ছিল না; দেখলে মনে হবে যেন পেট দিয়ে পাথরের উপর চেপে বসে আছে। তার বেড় পনেরো হাতের কম হবে না। লম্বা ঠোঁট, ডানা আর পালকের বিন্যাস এমন নিপুণভাবে তৈরি যে শিল্পীর প্রশংসা বারবার মুখে এসে পড়ছিল। আরও ভাল করে দেখার জন্য তিনি কাছে যাওয়ার কথা ভাবলেন। যেই না কাছে পৌঁছেছেন, অমনি পাখিটা মুখ খুলল! এই দৃশ্য দেখে চন্দ্রকান্তা চমকে উঠলেন, ভাবতে লাগলেন এর মানে কী হতে পারে। তাঁর মনে সামান্য ভয়ও জাগল। তিনি পাখিটার সামনে থেকে সরে পাশে দাঁড়ালেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই পাখিটা তার ডানা মেলে দিল।
চপলার সাহচর্যে রাজকুমারী বেশ সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। যখনই এই ধরনের কোনও প্রসঙ্গ উঠত, চপলা বলত যে দুনিয়াতে ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই, তন্ত্রমন্ত্র সব বাজে গালগল্প, যা কিছু ঘটে সবই আইয়ারদের কারসাজি। রাজকুমারীও এই কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। এই কারণেই সারসটার মুখ খোলা বা ডানা মেলা দেখে চন্দ্রকান্তা তেমন ভয় পেলেন না। তাঁর জায়গায় অন্য কোনও কোমল স্বভাবের নারী থাকলে হয়তো ভয়েই মারা যেত। যখন তিনি পাখিটাকে ডানা মেলতে দেখলেন, তখন রাজকুমারী তার পিছন দিকে গেলেন। সারসটার পিছনে মাটিতে একটা পাথর পোঁতা ছিল। যেই না তিনি তার উপর পা রেখেছেন, অমনি পাখিটা একবার নড়ে উঠল, ঝট করে ঘুরে গেল, আর ঠোঁট দিয়ে রাজকুমারীকে তুলে নিয়ে আস্ত গিলে ফেলল। তারপর আবার আগের মতো ঘুরে নিজের জায়গায় ফিরে এসে ডানা গুটিয়ে মুখ বন্ধ করে নিল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.