Skip to content
Back to story
চন্দ্রকান্তা Matribhasa Bangla · একাদশ পরিচ্ছেদ
A fantasy-themed illustration for চন্দ্রকান্তা

একাদশ পরিচ্ছেদ

19.5K 2.8K 0

কুমার বাহাদুরের মনের অবস্থা তখন সম্পূর্ণ অন্যরকম। বুকের ভেতর এতদিন যে চিন্তাগুলো তোলপাড় করত, সব এখন শান্ত, নির্বাপিত। বাবা-মায়ের জন্য উদ্বেগ, বিজয়গড়ের চিন্তা, যুদ্ধের উন্মাদনা, তেজ সিংয়ের বন্ধুত্ব—চন্দ্রকান্তা আর চপলার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব উধাও হয়ে গেছে। তিনজন কেল্লা থেকে বেরিয়ে এলেন। দেবী সিং আগে আগে চললেন, তাঁর কাঁধে বাঁধা অবস্থায় মহারাজ শিবদত্ত। তেজ সিং আর দেবী সিংয়ের মাঝখানে কুমার বীরেন্দ্র সিং। তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে কুমারের কোনও হুঁশই নেই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা একসময় এক গভীর, ঘন জঙ্গলের মধ্যে এসে পৌঁছলেন। সেখানে তেজ সিংয়ের ইশারায় দেবী সিং মহারাজ শিবদত্তের বাঁধা শরীরটা মাটিতে নামিয়ে রাখলেন এবং নিজের চাদর দিয়ে একটা পাথর ঝেড়ে পরিষ্কার করে কুমারকে বসতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু কুমার যেমন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তেমনই রইলেন। দৃষ্টি তাঁর মাটির দিকে, মুখে কোনও কথা নেই।

কুমারের এই দশা দেখে তেজ সিংয়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মনে মনে ভাবলেন, ‘এঁকে বাঁচানো যাবে কী করে? কী আশ্চর্য অবস্থা! সারা মুখে যেন মৃত্যুর ছায়া নেমে এসেছে, নিজের শরীরের ওপর কোনও হুঁশ নেই। চোখের পাতা পড়ছে না, মণি দুটো মাটির দিকে স্থির, একচুলও নড়ছে না। এ কী কাণ্ড! চন্দ্রকান্তার সঙ্গে সঙ্গে কি কুমারেরও প্রাণ বেরিয়ে গেল? এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ তেজ সিং কুমারের হাত ধরে তাঁকে বসানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর হাঁটু একটুও ভাঁজ হলো না; বরং ধড়াস করে সটান মাটিতে আছড়ে পড়লেন। তাঁর মাথায় চোট লাগল, রক্ত ঝরতে লাগল—কিন্তু তখনও চোখের পাতা আগের মতোই খোলা, মণি স্থির, নড়চড় নেই। শুধু শ্বাসটা মাঝে মাঝে আটকে আটকে পড়ছে।

এবার তেজ সিং কুমারের জীবনের আশা ছেড়েই দিলেন। নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না, চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। এই দৃশ্য দেখে দেবী সিংয়েরও বুক ফেটে গেল, তিনিও তেজ সিংয়ের সঙ্গে বিলাপ করতে লাগলেন। তেজ সিং বারবার চিৎকার করে বলতে লাগলেন—‘হায় আমার কুমার, তুমি কি সত্যিই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে? হায়, কে জানে কোন অলক্ষণে মুহূর্তে রাজকন্যা চন্দ্রকান্তার প্রতি তোমার ভালোবাসা জন্মেছিল, যার পরিণাম যে এমন ভয়ঙ্কর হবে! এখন মনে হচ্ছে, তোমার আয়ু বুঝি এটুকুই ছিল!’ তেজ সিং যখন এইভাবে বিলাপ করছেন, ঠিক সেই সময় একদিক থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

‘না—কুমারের আয়ু অল্প নয়, অনেক বেশি; তাঁর মৃত্যু ঘটাতে পারে, এমন কেউ এখনও জন্মায়নি। রাজকন্যা চন্দ্রকান্তার প্রতি ভালোবাসা কোনও অলুক্ষণে মুহূর্তে জন্মায়নি, বরং অত্যন্ত শুভক্ষণেই জন্মেছিল, আর তার পরিণাম অত্যন্ত সুখের হবে। শুধু রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর বিবাহই হবে না, চুনারের সিংহাসনও কুমার বীরেন্দ্র সিংয়ের অধিকারে আসবে। শুধু তাই নয়, আরও অনেক রাজ্য তিনি জয় করবেন। চন্দ্রকান্তার গর্ভ থেকে তাঁর দুই তেজস্বী বীরপুত্রের জন্ম হবে, যারা তাঁর চেয়েও বড় নাম করবে। তোমরা কাঁদছ কেন?’

এক মুহূর্তে তেজ সিং আর দেবী সিংয়ের কান্না থেমে গেল। তাঁরা চারদিকে তাকাতে লাগলেন। তেজ সিং অবাক হয়ে ভাবলেন—কে হতে পারে? কার মুখ থেকে এমন মরা-মানুষ-বাঁচানো কথা বেরোল? কী বললেন তিনি? কুমারের মৃত্যু কেউ ঘটাতে পারবে না! কুমারের দুই পুত্র হবে! এ কেমন কথা? এদিকে যে কুমারের প্রাণ যায় যায় অবস্থা! লোকটাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তেজ সিং আর দেবী সিং চারদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন, কিন্তু কারও কোনও চিহ্ন পেলেন না। আবার সেই কণ্ঠস্বর শোনা গেল: ‘এদিকে তাকাও।’ শব্দ যেদিক থেকে আসছিল, সেদিকে মাথা তুলে তেজ সিং দেখলেন, জ্যোতিষী জগন্নাথ একটি গাছ থেকে নামছেন।

জ্যোতিষী জগন্নাথ গাছ থেকে নেমে তেজ সিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘মহাশয়, অবাক হবেন না। এই সমস্ত ঘটনা, যা যথাসময়ে ঘটবে, তা আমার নিজেরই গণনা করা। আর আমি মহারাজ শিবদত্তের লোক হয়ে আপনাদের হিতের কথা বলছি দেখেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই; কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কারণ স্পষ্ট হয়ে যাবে, আর আপনারা আমাকে আপনাদের সত্যিকারের বন্ধু হিসেবেই চিনতে পারবেন। কিন্তু আগে কুমারের ব্যবস্থা করুন; তারপর আমরা কথা বলব।’

এরপর, তেজ সিং আর দেবী সিংয়ের চোখের সামনেই জ্যোতিষী জগন্নাথ কাছাকাছি ঝোপ থেকে এক বিশেষ ধরনের গাছ ছিঁড়ে নিলেন, যার পাতা তিনকোনা, ফুল আকাশি রঙের আর ডাঁটা একেবারে সাদা আর খসখসে। তিনি সেটা দুহাতে ভালো করে পিষে তার দু-ফোঁটা রস কুমারের দুই চোখে আর দুই কানে দিলেন; বাকি ছিবড়েটুকু তাঁর তালুতে রেখে নিজের চাদরের একটা ফালি ছিঁড়ে সেটা বেঁধে দিলেন, তারপর কুমারের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় বসে রইলেন।

আধ দণ্ডও কাটল না, কুমারের চোখের রঙ বদলে গেল, চোখের পাতা নেমে এসে মণি ঢেকে দিল, ধীরে ধীরে তাঁর হাত-পা নড়তে শুরু করল, আর দু-তিনটে হাঁচি দিয়ে তিনি সম্বিৎ ফিরে পেয়ে উঠে বসলেন। তেজ সিং আর দেবী সিংয়ের সঙ্গে জ্যোতিষীকে বসে থাকতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার কী হয়েছিল?’ তেজ সিং সবটা খুলে বললেন। কুমার জগন্নাথকে প্রণাম করে বললেন, ‘প্রভু, আপনি আমার প্রতি এই কৃপা কেন দেখালেন? শীঘ্র বলুন, আমার মনে অনেক সংশয় হচ্ছে।’

জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, ‘কুমার, ঈশ্বরেরই ইচ্ছা যে আমার মন এখন থেকে আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চায়। মহারাজ শিবদত্ত এমন যোগ্য ব্যক্তি নন যে আমি তাঁর সেবায় নিজের জীবন বিপন্ন করব। তাঁর মানুষ চেনার চোখ নেই, গুণীর কদর করতে জানেন না। তাঁর সঙ্গে থাকা মানে নিজের গুণ মাটিতে ফেলে দেওয়া। গুণী মানুষের গুণের তিনি কখনও কদর করেন না; তিনি অত্যন্ত স্বার্থপর। যদি কারও হাতে তাঁর কাজ পণ্ড হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নজরও সেই লোকটির ওপর থেকে ঘুরে যায়, সে লোকটি যতই গুণী হোক না কেন। এছাড়া, তিনি ভীষণ অধার্মিক, কোনও ভদ্রলোক তাঁর অধীনে কাজ করতে চাইবে না; তাই শেষ পর্যন্ত আমার মন তাঁর ওপর থেকে উঠে গেছে। যদি কারও সঙ্গে থাকতেই হয়, তবে আপনাদের সঙ্গেই থাকব। আপনার মতো গুণগ্রাহী আর কাউকে দেখি না; অনেকদিন ধরেই এই আশা মনে পুষে রেখেছিলাম, কিন্তু এমন কোনও সুযোগ পাচ্ছিলাম না যাতে নিজের সততা প্রমাণ করে আপনাদের সঙ্গী হতে পারি—কারণ আমি যতই কৌশল করি না কেন, এক ঐয়ারের পক্ষে অন্য ঐয়ারের কাছে মন খোলা বড়ই কঠিন। আজ সেই সুযোগ এল, কারণ আজ আপনাদের ওপর যে ভয়ঙ্কর বিপদ এসেছিল, তা মহারাজ শিবদত্তের ছলনা আর চক্রান্তের ফলেই এসেছিল।’ এই বলে জ্যোতিষী চুপ করলেন।

জ্যোতিষীর এই শেষ কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠলেন। তিনজনই তাঁর আরও কাছে ঘেঁষে বসলেন। তেজ সিং বললেন, ‘হ্যাঁ জ্যোতিষী মহাশয়, এখনই আমাদের খুলে বলুন—শিবদত্ত কীভাবে ছলনা করেছেন?’ জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, ‘মহারাজ শিবদত্তের অভ্যাস হলো, যখনই তিনি কোনও বড় কাজের কথা ভাবেন, আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করেন; কিন্তু আমি পক্ষে বা বিপক্ষে যা-ই বলি না কেন, তিনি চলেন নিজের মর্জিমতো আর তার ফলে বিপদে পড়েন। পণ্ডিত বদ্রীনাথও এই নিয়ে প্রায়ই দুঃখ করতেন যে, যখন শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছামতোই কাজ করতে হবে, তখন আর জ্যোতিষীকে ডেকে পরামর্শ করার কী দরকার? কাল রাতে আপনাদের সঙ্গে যা করা হয়েছে, সেটাও আমি তাঁকে করতে বারণ করেছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি, আর তার ফল হলো এই যে ঐয়ার ঘসীটা সিং আর ভগবানদত্তের প্রাণ গেল। এই পুরো বিষয়টা আমি তখনই খুলে বলব, যখন আপনারা আমাকে আপনাদের ঐয়ার ও সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার বচন দেবেন।’

জ্যোতিষীর কথা শুনে কুমার তেজ সিংয়ের দিকে তাকালেন। তেজ সিং বললেন, ‘জ্যোতিষী মহাশয়, আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আপনাকে আমাদের দলে নেব—কিন্তু তার আগে আপনাকে নিজের সদিচ্ছার শপথ নিতে হবে।’

তেজ সিংয়ের মন থেকে সমস্ত সন্দেহ দূর করার জন্য জ্যোতিষী নিজের পৈতে হাতে নিয়ে শপথ করলেন; তখন তেজ সিং উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তাঁকে নিজেদের ঐয়ারদের দলে গ্রহণ করলেন। কুমার নিজের গলা থেকে একটি মূল্যবান হার খুলে জ্যোতিষীর গলায় পরিয়ে দিলেন। তখন জ্যোতিষী বললেন, ‘এবার আমার কাছে শুনুন, কেন কুমারকে মহলে বন্দী করা হয়েছিল আর কাল রাতের রক্তপাতের আসল কারণটাই বা কী ছিল।

‘আপনারা যখন রাজকন্যার খোঁজে শিবির থেকে রওনা হন, তখন ঐয়ার বদ্রীনাথ আপনাদের পথে দেখে ফেলেছিল। সে আপনাদের আগে সেই জায়গায় পৌঁছে চন্দ্রকান্তাকে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখার মতলবে গুহার ভেতরে তাঁকে আনতে গিয়েছিল; কিন্তু সে পৌঁছনোর আগেই রাজকন্যা সেখান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, তাই তাকে খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়। তারপর সে নাজিমকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের খুঁজতে বেরোয়, আর এই জঙ্গলে আপনাদের খুঁজে পেয়ে নিজের ঐয়ারি কাজে লাগায়। মাটির ঢেলাটা নাজিমই ছুঁড়েছিল; দেবী সিং তাকে ধরতে দৌড়েছিলেন; আর সেই ফাঁকে বদ্রীনাথ—যে আগেই তেজ সিংয়ের ছদ্মবেশে এসেছিল—কোনও কৌশলে আপনাকে অজ্ঞান করে কেল্লায় নিয়ে যায়। এরপর, যাতে আপনার মন থেকে চন্দ্রকান্তার ভালোবাসা একেবারে উপড়ে ফেলা যায় আর আপনি যাতে তাঁর আর খোঁজ না করেন বা তাঁর জন্য মহারাজ শিবদত্তের সঙ্গে যুদ্ধ না করেন, সেই উদ্দেশ্যে আমাদের দলের সবচেয়ে নবীন দুই ঐয়ার, ভগবানদত্ত আর ঘসীটা সিংকে চন্দ্রকান্তা আর চপলার সাজে সাজানো হয়েছিল—যাদের আপনি নিজের হাতে খতম করেছেন। বাকিটা তো আপনারা জানেনই।’

জ্যোতিষীর কথা শুনে কুমার আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। ‘সর্বনাশ! কী কাণ্ডই না এরা ঘটিয়েছে! কী ভয়ঙ্কর ছলনা! তাহলে এটা পরিষ্কার যে বেচারি চন্দ্রকান্তা জীবিত আছে, তার নিঃশ্বাস পড়ছে—যদিও সে কোথায় আছে, তা কেউ বলতে পারে না। বেশ, তারও খোঁজ পাওয়া যাবে!’

এরপর কী করা উচিত, তা নিয়ে সবাই মিলে পরামর্শ করলেন, এবং স্থির হলো যে—

মহারাজ শিবদত্তকে সেই গুহাতেই বন্দী করে রাখা হবে, যেখানে আগে ঐয়ারদের বন্দী করা হয়েছিল, এবং গুহামুখে দুটো তালা লাগানো হবে; কারণ প্রথম তালাটা—যেটা সিংহের মুখ থেকে জিভ টেনে খুলতে হয়—তার কৌশল এখন বদ্রীনাথ জেনে গেছে, কিন্তু দ্বিতীয় তালার কৌশল তেজ সিং ছাড়া আর কেউ জানত না।

কুমার বিজয়গড়ে ফিরে যাবেন, কারণ যতদিন মহারাজ শিবদত্ত বন্দী থাকবেন, ততদিন যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই; তবুও সাবধানতার জন্য সীমান্তে একদল সৈন্য মোতায়েন রাখতে হবে।

দেবী সিং কুমারের সঙ্গে যাবেন।

তেজ সিং এবং জ্যোতিষী জগন্নাথ রাজকন্যার খোঁজে বেরোবেন।

আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পর তাঁরা সবাই উঠে পড়লেন এবং সেই স্থান থেকে রওনা হলেন।

{=openxml} <w:p><w:r><w:br w:type="page"/></w:r></w:p>

0 Next
Continue to next part Up next দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.