চুনারগড়ের কেল্লার অভ্যন্তরে, মহারাজা শিবদত্তের খাসমহলে একটি কুঠুরি। সেই কুঠুরির দরজায় লোহার শিকের ফটক লাগানো। তার ভেতরে হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি, দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মাথা হেঁট করে বসেছিলেন বীরেন্দ্র সিং। তাঁর সামনে পাহারায় টহল দিচ্ছিল কোমরবন্ধে ছুরি গোঁজা কয়েকজন রমণী। কুমার আপনমনে বিড়বিড় করছিলেন, “হায়, চন্দ্রকান্তার খবর পেয়েও বা লাভ কী হল? আগে তো অন্তত এটুকু জানতাম যে শিবদত্ত তাকে হরণ করে এনেছে, কিন্তু এখন কী বলব? হায় চন্দ্রকান্তা, তুমি কোথায়? তোমার অন্তর্ধান আমাকে যতটা পীড়া দিচ্ছে, এই হাতকড়া আর বেড়ি তার কাছে কিছুই নয়। আফসোস, যদি শুধু এইটুকু আশ্বাস পেতাম যে তুমি নিরাপদে আছ, নিজের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে গেছ, তাহলে এই কারাগারে অনাহারে-তৃষ্ণায় মরে যাওয়াটাও আমার কাছে আনন্দের হত। কিন্তু তোমার কোনও খবর না পাওয়া পর্যন্ত এ জীবন বড়ই তিক্ত। হায়, তুমি কী অবস্থায় আছ—তোমাকে কোথায় খুঁজব! এই হাতকড়া-বেড়ি এখন আমার কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো লাগছে। আহা, কী ভালো হত যদি এই মুহূর্তে কুমারীর খোঁজে আমি বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম, পায়ে কাঁটা ফুটত, রক্ত ঝরত, আর ক্ষুধা-তৃষ্ণা সত্ত্বেও শুধু তোমার সন্ধানে আমি অন্নজল ত্যাগ করতাম। হে ঈশ্বর, তুমি কিছুই করলে না! ভালোবাসার পথে আমি যে কতখানি অবিচল, সেই হিম্মত যদি তুমি দেখতে—কিন্তু তুমি তো আমার হাত-পা-ই বেঁধে দিয়েছ। হায়, যে মানুষকে তুমি নিজে গড়েছ, যাকে সবরকম সুখ দিয়েছ, তার হৃদয়কে কষ্ট দিয়ে, তাকে শেষ করে দিয়ে তুমি কী আনন্দ পাও?”
কুমার বীরেন্দ্র সিং যখন এই সব কথা বিড়বিড় করছিলেন, তাঁর চোখ দিয়ে জল ঝরছিল আর বুক থেকে বেরিয়ে আসছিল দীর্ঘশ্বাস। মাঝরাত ঘনিয়ে এসেছে। কুমার যে কুঠুরিতে বন্দি, তার সামনে একটা সুন্দর অলিন্দে চার-পাঁচটা প্রদীপ জ্বলছিল। কুমারের মন যখন খুব ব্যাকুল হয়ে উঠল, তিনি মাথা তুলে সেদিকে তাকালেন। হঠাৎ একদিক থেকে পাঁচ-সাতজন দাসী এসে হাঁড়ি, ঢোল, দেওয়ালগিরি, ঝাড়লণ্ঠন, মোমবাতিদান, পদ্মপ্রদীপ, মৃদঙ্গ-প্রদীপের মতো আরও নানা রঙের বাতি জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটা দিনের আলোর মতো ঝলমল করে উঠল। এরপর অলিন্দের মাঝখানে তারা এক মহামূল্যবান গদি পাতল। তারপর সব দাসীরা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কারও আসার অপেক্ষায় আছে। কুমার গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন—তিনি অবাক হচ্ছিলেন যে তাঁকে কেন অন্তঃপুরের ভেতরে বন্দি করা হয়েছে, যেখানে পুরুষের গন্ধ পর্যন্ত ঢোকা বারণ, আর এতে মহারাজা শিবদত্তেরই বা কী লাভ হতে পারে!
কিছুক্ষণ পরেই জাঁকজমকের সঙ্গে মহারাজা শিবদত্তকে আসতে দেখা গেল, যাঁকে দেখে বীরেন্দ্র সিং বিস্ময়ে চমকে উঠলেন। এবার এক অদ্ভুত দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল। তিনি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, মহারাজা শিবদত্তের ডান হাতে চন্দ্রকান্তা আর বাঁ হাতে চপলা, তাদের হাত ধরে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মাঝখানে পাতা গদিতে বসলেন। চন্দ্রকান্তা ও চপলাও মহারাজার দু’পাশে একেবারে গা ঘেঁষে বসল!
কুমার আর চন্দ্রকান্তার পরিচয় সেই ছেলেবেলা থেকে; কিন্তু আজকের মতো এমন রূপের ছটা আর লাবণ্যময়ী মূর্তিতে কুমার চন্দ্রকান্তাকে আগে কখনও দেখেননি। তাদের সামনে পানদান, আতরদান আর সবরকম বিলাসের সামগ্রী রাখা ছিল।
এই দৃশ্য দেখে কুমারের চোখে রক্ত জ্বলে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, “এসব কী হচ্ছে? চন্দ্রকান্তা এমন হাসিখুশি মুখে শিবদত্তের পাশে বসে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা করছে—এর মানে কী? তার মন থেকে কি আমার জন্য ভালোবাসা পুরোপুরি মুছে গেছে, আর বাবা-মায়ের প্রতি টানও উবে গেছে—যে সে আমার সামনে এমন আচরণ করছে? সে কি জানে না যে তার চোখের সামনেই আমি এই কুঠুরিতে বন্দির মতো পড়ে আছি? নিশ্চয়ই জানে। ওই তো—আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকাচ্ছে। আর চপলারই বা কী হল?—যে তেজ সিং-এর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিল, আর জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে এই শিবদত্তকেই বোকা বানিয়ে তেজ সিংকে উদ্ধার করেছিল? তখন তো মহারাজা শিবদত্তের জন্য তার কোনও ভালোবাসা ছিল না; আর এখন নিজের মালকিন চন্দ্রকান্তার সমান হয়ে শিবদত্তের পাশে বসেছে! হায়, হায়—নারীর চরিত্র বোঝা দায়। এদের বিশ্বাস করা সবচেয়ে বড় বোকামি। আফসোস, আমার ভাগ্যেই কি এমন নারীকে ভালোবাসা লেখা ছিল? এত উঁচু বংশের মেয়ে হয়ে কিনা এমন কাজ করল! হায়, আমার জীবন এখন বৃথা। আমি নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করব—কিন্তু চন্দ্রকান্তা আর চপলাকে কি শিবদত্তের জন্য জ্যান্ত রেখে যাব? কখনও না। এটা ঠিক যে বীরপুরুষরা নারীর উপর হাত তোলে না, কিন্তু আমার এখন দেখানোর মতো বীরত্বও নেই, জগতে মুখ তোলার জায়গাও নেই; এসব ভেবে আর লাভ কী? এখন ঠিক কাজ হবে—এই দুজনকে শেষ করে তারপর নিজের প্রাণ দেওয়া। তেজ সিংও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গী হবে। চলো, এই সব ঝঞ্ঝাট মিটিয়েই ফেলি!”
ঠিক সেই মুহূর্তে চন্দ্রকান্তা এক আদুরে ভঙ্গিতে মহারাজা শিবদত্তের গলা জড়িয়ে ধরল; আর বীরেন্দ্র সিংয়ের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এক প্রচণ্ড ঝটকায় তিনি হাতকড়া ভেঙে ফেললেন, এবং সেই একই আক্রোশে গরাদ দেওয়া দরজায় এমন লাথি মারলেন যে পাল্লাটা ভেঙে পড়ল। তারপর তিনি শিবদত্তের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে রাখা তলোয়ারটা তুলে নিয়ে কোষমুক্ত করে চন্দ্রকান্তার উপর এমন এক কোপ বসালেন যে এক মুহূর্তে তার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল, আর মুণ্ডহীন দেহটা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল। মহারাজা শিবদত্ত সামলে ওঠার আগেই তিনি চপলাকেও দু’টুকরো করে ফেললেন; কিন্তু মহারাজা শিবদত্তের গায়ে তিনি কোনও আঘাত করলেন না।
মহারাজা শিবদত্ত নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালেন; হঠাৎ কুমারের শক্তি আর ক্ষিপ্রতা দেখে তিনি এমন হতবাক হয়ে গেলেন যে তাঁর গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোল না, তাঁর পৌরুষ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তিনি কুমারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কুমার বীরেন্দ্র সিং হাতে রক্তাক্ত খোলা তলোয়ার নিয়ে তখনও দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় ধড়াম করে একটা শব্দ হল, আর তেজ সিং ও দেবী সিং হঠাৎ ভেতরে ঢুকলেন। তেজ সিং চিৎকার করে বললেন, “সাবাস! কী হিম্মত তোমার! মনটাকে বেশ শক্ত রেখেছ দেখছি!” এই বলে তিনি দ্রুত মহারাজা শিবদত্তের গলায় একটা ফাঁস ছুঁড়ে দিয়ে কষে টান মারলেন। শিবদত্তের অবস্থা তো আগে থেকেই সঙ্গিন ছিল, এবার গলায় ফাঁস আটকাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। দেবী সিং সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পুঁটুলির মতো বেঁধে নিজের পিঠে তুলে নিলেন। তেজ সিং কুমারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার সঙ্গে এসো, এখন আর একটাও কথা বোলো না—আমি খুব ভালো করেই জানি এই মুহূর্তে তোমার মনের অবস্থা কেমন।”
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.