প্রহরী সৈন্যের ছদ্মবেশে তেজ সিং দুর্গের ফটকের কাছে এসে পৌঁছলেন। ভোর হতে যে কজন সৈন্য জেগে উঠেছিল, তারা তাঁকে দেখে বলে উঠল, “জয়রাম সিং, কোথায় ছিলে হে? এখানে পাহারা নিয়ে হুলস্থূল কাণ্ড হয়ে গেছে। ঐয়ার বদরীনাথ সাহেব পাহারা পরিদর্শনে এসেছিলেন। তুমি নেই শুনে তিনি বেজায় খাপ্পা হয়ে নিজেই তোমার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন, এখনও ফেরেননি। তোমার জন্য আমাদের একচোট বকুনি খেতে হয়েছে!”
জয়রাম সিংয়ের ছদ্মবেশে তেজ সিং উত্তর দিলেন, “আমার শরীরটা ভালো ছিল না, পেটের গোলমালে বাইরে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকবার দাস্ত হওয়ায় ফিরতে দেরি হয়ে গেল। এখনও পেটটা ঠিক হয়নি। ভাই, জান থাকলে তবেই তো জাহান। মনিব রাগ করুন বা খুশি হোন, শরীরের এই প্রয়োজন তো আর আটকানো যায় না। আমি আবার যাচ্ছি, এক্ষুনি ফিরে আসব।” এই বলে নকল জয়রাম সিং সটান আবার হাঁটা দিলেন।
প্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে তেজ সিং আঁচ করতে পারলেন যে বদরীনাথ এখানে এসেছিল এবং তাঁরই খোঁজে বেরিয়ে গেছে। তাই তিনি সাবধান হলেন। তিনি ভাবলেন, বদরীনাথ ফিরে আসার সময়েও যদি আমি এখানে থাকি, তাহলে সে নিশ্চয়ই আমাকে চিনে ফেলবে। সুতরাং এখানে থাকা আর উচিত নয়। এই ভেবে তিনি কিছুটা দূরে সরে গিয়ে এক ভিখারির ছদ্মবেশ নিলেন এবং বদরীনাথের ফেরার অপেক্ষায় পথের ধারে বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরেই দূর থেকে বদরীনাথকে আসতে দেখা গেল। তার পিছনে পিঠে একটা বোঁচকা নিয়ে নাজিম, আর নাজিমের পিছনে সেই সৈন্যটি, যার ছদ্মবেশ তেজ সিং ধরেছিলেন।
বদরীনাথকে এইভাবে দলবলসমেত আসতে দেখে তেজ সিং হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, পরিস্থিতি ভালো ঠেকছে না। পিছনে যে সৈন্যটা আসছে, তাকে তো আমি একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে এসেছিলাম। কুমার আর দেবী সিংও তো ওখানেই ছিলেন। কোনও বড় গোলমাল না হলে এরা এই সৈন্যটিকে উদ্ধার করতে পারত না। নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে। নাজিমের পিঠের ওই বোঁচকার মধ্যে হয় কুমার নয়তো দেবী সিং আছেন। কিন্তু এখন মুখ খোলার সময় নয়, কারণ এখানে এদের ছাড়া আমাদের সাহায্য করার মতো আর কেউ নেই।
এই ভেবে তেজ সিং চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে রইলেন। ওরা বোঁচকাসুদ্ধ দুর্গের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং যে পথে কুমার আর দেবী সিংকে ছেড়ে এসেছিলেন, সেই পথেই ফিরে চললেন। দেবী সিং গভীর হতাশায় সেই পাথরের উপর বসে কী যেন ভাবছিলেন, এমন সময় তেজ সিং সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখামাত্রই দেবী সিং ছুটে গিয়ে তাঁর পায়ে পড়লেন এবং যন্ত্রণায় ভেঙে পড়া গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “গুরুজি, কুমার শত্রুর হাতে বন্দী হয়েছেন!”
তেজ সিং পাথরটার উপর বসে বললেন, “আচ্ছা, সব খুলে বলো তো আমায়—কী হয়েছে!”
দেবী সিং যা যা ঘটেছিল, সব খুলে বললেন। তেজ সিং বললেন, “দেখছ, আজকাল আমাদের ভাগ্য কীরকম বিগড়েছে! চারিদিকে শুধু দুশ্চিন্তা, কিন্তু কী-ই বা করার আছে? বেচারি চন্দ্রকান্তা আর চপলা কে জানে কী অবস্থায় আছে, তাদের কথাই তো ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না; তার উপর আবার কুমারের এই দশা—এ তো একেবারে গোদের উপর বিষফোঁড়া।”
অনেকক্ষণ ধরে দেবী সিং আর তেজ সিং এইভাবেই কথাবার্তা বললেন। তারপর উঠে দুজনেই এক পথের পথিক হলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.