বিজয়গড়ের অভ্যন্তরে, ক্রূর সিং তার খাস কামরায় নিজের দুই আইয়ার—নাজিম ও আহমদের সঙ্গে নিভৃতে শলা-পরামর্শ করছিল।
ক্রূর: শোনো নাজিম, মহারাজের মনের ভাবটা হল এইরকম: ‘আমি নিজে রাজা হয়ে, আমারই মন্ত্রীর ছেলেকে কী করে জামাই করি?’ আর ওদিকে চন্দ্রকান্তা তো বীরেন্দ্র সিংয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এবার বলো, আমার মতলব কী করে হাসিল হবে? যদি চন্দ্রকান্তাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি, তাহলেই বা কোথায় পালাব, কোথায় নিরাপদে আশ্রয় নেব? আর তারপর মহারাজ আমার বাবার ওপর কী ভীষণ বিপদই না নামিয়ে আনবেন! তার চেয়ে ভালো হয়, আমি যদি প্রথমে কোনও কৌশলে বীরেন্দ্র সিং আর তার আইয়ার তেজ সিংকে ধরে ফেলি। তারপর তাদের এমন কোথাও নিয়ে গিয়ে শেষ করে দেব, যাতে হাজার বছরেও কেউ তাদের টিকি খুঁজে না পায়। তারপর সুযোগ বুঝে মহারাজকে খতম করার ফন্দি আঁটব। তাহলেই এক নিমেষে আমি সিংহাসনের মালিক হয়ে যাব, আর চন্দ্রকান্তাকে নিয়ে পরম ভোগবিলাসে জীবন কাটাতে পারব। কিন্তু একটা কথা বলো দেখি—মহারাজের মৃত্যুর পর আমি সিংহাসনের মালিক হব কী করে? প্রজারা আমাকে রাজা বলে মেনে নেবে কেন?
নাজিম: আমাদের মহারাজের রাজ্যে কাফেরদের চেয়ে মুসলমানের সংখ্যাই বেশি। আমি তাদের সবাইকে আপনার পক্ষে নিয়ে আসতে পারি। আমি তাদের সবাইকে শপথ করিয়ে এই ব্যাপারে রাজি করাতে পারি যে, মহারাজের পর তারা আপনাকেই রাজা বলে মেনে নেবে। কিন্তু তার একটা শর্ত আছে—কাজ হাসিল হয়ে গেলে আপনাকেও আমাদের ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, গ্রহণ করতে হবে।
ক্রূর সিং: যদি তাই হয়, তবে আমি মনপ্রাণ দিয়ে তোমাদের শর্ত মেনে নিলাম।
আহমদ: তাহলে তো খুবই ভালো কথা। আপনি এই মর্মে নিজের হাতে একটা অঙ্গীকারপত্র লিখে আমার হাতে দিন। আমি সেই লেখা আমার সমস্ত মুসলমান ভাইদের দেখিয়ে তাদের আপনার দলে ভিড়িয়ে নেব।
ক্রূর সিং তৎক্ষণাৎ সেই অঙ্গীকারপত্র লিখে দিল—কাজ হাসিল হলে সে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করবে। লেখাটি সে নাজিম আর আহমদের হাতে তুলে দিতেই আহমদ ক্রূর সিংকে বলল, ‘সমস্ত মুসলমানদের একজোট করার দায়িত্ব এখন আমাদের। আপনি এ নিয়ে আর ভাববেন না। কিন্তু আমাদের দুজনের জন্যও একটা অঙ্গীকারনামা লেখা দরকার—সেটা হল, আপনি রাজা হওয়ার পর আমরা দুজন আপনার উজির পদে নিযুক্ত হব। তারপর দেখবেন আমাদের বুদ্ধির খেল, দেখবেন কী করে চোখের পলকে আমরা দুনিয়া ওলটপালট করে দিই।’
এক মুহূর্তে ক্রূর সিং এই দ্বিতীয় অঙ্গীকারপত্রটিও লিখে দিল। তা দেখে দুজন আইয়ার যারপরনাই খুশি হল। তখন নাজিম বলল, ‘এইবেলা চলো, চন্দ্রকান্তার কী হালচাল একবার দেখে আসা যাক। এই সন্ধ্যেটা আমাদের কাজের জন্য একেবারে ঠিকঠাক। রাজকুমারী নিশ্চয়ই এখন বাগানে নেমেছে আর তার প্রিয় সখী চপলার কাছে নিজের দুঃখের কথা বলছে। বীরেন্দ্র সিং আর চন্দ্রকান্তার মধ্যে এখন কী চলছে, তা জেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে মোটেই কঠিন হবে না।’
এই বলে দুই আইয়ার ক্রূর সিংয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.