Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

সর্বনাশ

3.8K 733 0

আমি বললুম, ‘বিমল, সঙ্কেতের মানে তো বোঝা গেল, এখন আমরা কি করব?

বিমল বাধা দিয়ে বললে, এতে আর কিন্তু-টিন্তু কিছু নেই কুমার,—আমাদের যেতেই হবে! এতবড় একটা অদ্ভুত ব্যাপার, এর শেষ পর্যন্ত না দেখলে আমার তৃপ্তি হচ্ছে না।

আমি বললুম, আমাদের সঙ্গে কে কে যাবে?

—কেউ না। খালি তুমি আর আমি।

—কিন্তু সে বড় দুর্গম জায়গা। লোকজন না নিয়ে কি যাওয়া উচিত?

বিমল বললে, কিছুই দুর্গম নয়, পথঘাট আমি সব চিনি, ‘রূপনাথের গুহা’ পর্যন্ত ঠিক যাব। তারপরের পথ কিরকম জানি না বটে, কিন্তু চিনে নিতে বেশী দেরি লাগবে না। তুমি বুঝি বিপদের ভয় করছ? ও-ভয় কোরো না। বিপদকে ভয় করলে মানুষ আজ এত বড় হতে পারত না। সোজা পথ দিয়ে তো শিশুও যেতে পারে, তাতে আর বাহাদুরি কি? বিপদের অগ্নিপরীক্ষায় হাসিমুখে যে সফল হয়, পৃথিবীতে তাকেই বলি মানুষের মত মানুষ!

আমি বললুম, কিন্তু গোঁয়ার্তুমি করে প্রাণ দিলে মানুষের মর্যাদা কি বাড়বে? আমি অবশ্য কাপুরুষ নই—তুমি যেখানে বল যেতে রাজি আছি! তবে অন্ধের মত কিছু করা ঠিক নয়—জানো তো, প্রবাদেই আছে—‘লাফ মারবার আগে চেয়ে দেখ’।

বিমল বললে, ‘যা ভাববার আমি সব ভেবে দেখেছি, এখন আর ভাবনা নয়।’

—কবে যাবে?

—আমি তো প্রস্তুত। কাল বল কাল, পরশু বল পরশু।

—এত তাড়াতাড়ি! যাবার আগে বন্দোবস্ত করতে হবে তো?

—বন্দোবস্ত করব আর ছাই! আমরা তো সেখানে ঘরসংসার পাততে যাচ্ছি না–এসব কাজে যতটা ঝাড়া-হাত-পায়ে যাওয়া যায়, ততই ভালো। গোটা-দুই ব্যাগ, আর আমরা জুটি প্রাণী—ব্যস?

—কোন পথে যাবে?

বিমল বললে, আমাদের কামরূপ পার হয়ে এই খাসিয়াপাহাড়ে উঠতে হবে। খাসিয়া-পাহাড়ের ঠিক পাশেই যমজ ভাইয়ের মত আর একটি পাহাড় আছে—তার নাম জয়ন্তী। এদের উপরে আছে—কামরূপ আর নবগ্রাম। পূর্বে আছে উত্তর-কাছাড়, নাগাপর্বত আর কপিলী নদী। দক্ষিণে আছে শ্রীহট্ট, আর পশ্চিমে গারো-পাহাড়।

—খাসিয়া-পাহাড় কি খুব উঁচু?

—হুঁ, উঁচু বৈকি! কোথাও চার হাজার, কোথাও পাঁচ হাজার, আবার কোথাও বা সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচু। পাহাড়ের ভেতর অনেক জলপ্রপাত আছে—তাদের মধ্যে চেরাপুঞ্জি নামে জায়গার কাছে ‘মুসমাই’ আর শিলং শহরের কাছে ‘বীডনস প্রপাত দুটিই বড়। প্রথমটির উচ্চতা এক হাজার আটশো ফুট, দ্বিতীয়টি ছয়শো ফুট উচ্চতায় প্রথম প্রপাতটি পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। পাহাড়ের মধ্যে উষ্ণ প্রস্রবণও আছে—তার জল গরম। খাসিয়াপাহাড়ে শীত আর বর্ষ ছাড়া আর কোন ঋতুর প্রভাব বোঝা যায় না—বৃষ্টি আর ঝড় তো লেগেই আছে। বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠমাসে বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত একটু বসন্তের আমেজ পাওয়া যায়। খাসিয়াপাহাড়ের চেরাপুঞ্জি তো বৃষ্টির জন্যে বিখ্যাত।’

বিমল হেসে বললে, 'খালি বাঘ-ভালুক কেন, সেখানকার জঙ্গলে হাতী, গণ্ডার, বুনো মোষ আর বরাহ সবই পাওয়া যায়, কিন্তু সাপ খুব কম?

আমি মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললুম, তবেই তো।

বিমল আমার পিঠ চাপড়ে বললে, কুমার, তুমি কলকাতার বাইরে কখনো যাওনি বলে বন-জঙ্গলকে যতটা ভয়ানক মনে করছ, আসলে তা তত ভয়ানক নয়। আর আমি সঙ্গে থাকব—তোমার ভয় কি? জানো তো, আমি এই বয়সেই ঢের বড় জন্তু শিকার করেছি। আমার দুটো বন্দুকের পাশ আছে-একটা তোমাকে দেব। তুমি আজও কিছু শিকার করনি বটে, কিন্তু আমি তো তোমাকে অনেকদিন আগেই বন্দুক ছুড়তে শিখিয়ে দিয়েছি—এইবার শিক্ষার পরীক্ষা হবে।

সেদিন আর কিছু না বলে বাড়ীমুখে হলুম। মনে ভয় হচ্ছিল বটে, আনন্দও হচ্ছিল খুব। নতুন নতুন দেশ দেখবার সাধ আমার চিরকাল। কেতাবে নানা দেশের ছবি দেখে আর গল্প পড়ে সেসব দেশে যাবার জন্যে আমার মন যেন উড় উড় করত। কখনো ইচ্ছে হতে সবিনসন ক্রুশোর মতন এক নির্জন দ্বীপে গিয়ে, নিজের হাতে কুঁড়েঘর বেঁধে মনের সুখে দিনের পর দিন কাটাই, কখনো ইচ্ছে হতে সিন্দবাদ নাবিকের মত ‘রক’ পাখির সঙ্গে আকাশে উঠি, তিমি মাছের পিঠে রান্না চড়াই, আর দ্বীপবাসী বৃদ্ধকে আছাড় মেরে জব্দ করে দিই। কখনো ইচ্ছে হতো ডুবো জাহাজে সমুদ্রের ভেতরে যাই আর পাতালরাজের ধন-ভাণ্ডার লুঠ করে নিয়ে আসি। এমনি কত ইচ্ছাই যে আমার হতো তা আর বলা যায় না,—বললে তোমরা সবাই শুনে নিশ্চয়ই খুব ঠাট্টার হাসি হাসবে।

আসল কথা কি, যকের ধন পাওয়ার সঙ্গে নতুন দেশ দেখবার আনন্দ ক্রমেই আমাকে চাঙ্গা করে তুললে। মনে যা কিছু ভয়-ভাবনা ছিল, সেই আনন্দের ঢেউ লেগে সমস্তই যেন কোথায় ভেসে গেল।

বাড়ীর কাছে আসতেই আমার আদরের কুকুর বাঘা আধহাত জিভ বার করে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আমাকে আগ-বাড়িয়ে নিতে এল।

আমি বললুম, কি রে বাঘ, আমার সঙ্গে খাসিয়া পাহাড়ে বেড়াতে যাবি?

বাঘা যেন আমার কথা বুঝতে পারলে। পিছনের দু পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, সামনের দু' পায়ে সে আমার কোমর জড়িয়ে ধরলে, তারপর আদর করে আমার মুখ চেটে দিতে এল। আমি তাড়াতাড়ি মুখ সরিয়ে নিয়ে তাকে নামিয়ে দিলুম।

আমার এই বাঘা বিলাতী নয়, দেশী কুকুর। কিন্তু তাকে দেখলে সে-কথা বোঝবার যো নেই। ভালোরকম যত্ন করলে দেশী কুকুরও যে কেমন চমৎকার দেখতে হয়, বাঘাই তার প্রেমাণ। তার আকার মস্ত বড়, গায়ের রং হলদে, তার উপর কালো কালো ছিট, অনেকটা চিতাবাঘের মত, তাই তার নাম রেখেছি বাঘা। ভয় কাকে বলে বাঘা তা জানে না, আর তার গায়েও বিষম জোর। একবার হাউণ্ড জাতের প্রকাণ্ড একটা বিলাতী কুকুর তাকে তেড়ে এসেছিল, কিন্তু বাঘার এক কামড় খেয়েই সে একেবারে মরোমরো হয়ে পড়েছিল। আমি ঠিক করলুম, বাঘকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব।

পরের দিন সকালে তখনো আমার ঘুম ভাঙেনি, হঠাৎ কে এসে ডাকাডাকি করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে। চেয়ে দেখি বিমল আমার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আশ্চর্য হয়ে উঠে বসে বললুম, কিহে, সকালবেলায় হঠাৎ তুমি যে?

বিমল হাপাতে হঁপাতে বললে, সর্বনাশ হয়েছে।

আমি তাড়াতাড়ি বললুম, সর্বনাশ হয়েছে। সে আবার কি?

বিমল বললে, কাল রাত্রে মড়ার মাথাটা আমার বাড়ী থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে!

—অ্যাঃ, বল কি?—আমি একেবারে হতভস্বের মত আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলুম!

পরামর্শ

আমি বললুম, মড়ার মাথা কি করে চুরি গেল, বিমল?

বিমল বললে, জানি না। সকালে উঠে দেখলুম, আমার পড়বার ঘরের দরজাটা খোলা, রাত্রে তালা-চাবি ভেঙে কেউ ঘরের ভিতর ঢুকেছে! বুকটা অমনি ধড়াস করে উঠল! মড়ার মাথাটা আমি টেবিলের টানার ভেতরে চাবি বন্ধ করে রেখেছিলুম। ছুটে গিয়ে দেখি, টানাটাও খোলা রয়েছে, আর তার ভেতরে মড়ার মাথা নেই।

আমি বলে উঠলুম, এ নিশ্চয়ই করালী মুখুয্যের কীর্তি। সেই-ই লোক পাঠিয়ে মড়ার মাথ চুরি করেছে। কিন্তু এই ভেবে আমি আশ্চর্য হচ্ছি, করালী কি করে জানলে যে মড়ার মাথাটা তোমার বাড়ীতে আছে?

বিমল বললে, করালী নিশ্চয়ই চারিদিকে চর রেখেছে! আমরা কি করছি, না করছি, সব সে জানে।

আমি বললুম, কিন্তু খালি মড়ার মাথাটা নিয়ে সে কি করবে? সঙ্কেতের মানে তো সে জানে না!

বিমল বললে, কুমার, শক্রকে কখনো বোকা মনে কোরো না! আমরা যখন সঙ্কেত বুঝতে পেরেছি, তখন চেষ্টা করলে করালাই বা তা বুঝতে পারবে না কেন?

আমি বললুম, কিন্তু সঙ্কেতের সবটাও যে আর মড়ার মাথার ওপরে নেই। মনে নেই, আমার হাত থেকে পড়ে কাল মড়ার মাথাট। চটে গিয়েছে?

বিমল কি যেন ভাবতে ভাবতে বললে, তবু বিশ্বাস নেই!

হঠাৎ আমার আর একটা কথা মনে পড়ল। আমি তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছ, ঠাকুরদার পকেট-বইখানাও কি চুরি গেছে?

বিমল বললে, ‘না, এইটুকুই যা আশার কথা। পকেট-বইখানা কাল রাত্রে আমি আর একবার ভালো করে পড়বার জন্যে উপরে নিয়ে গিয়েছিলুম। ঘুমোবার আগে সেখানা আমার মাথার তলায় বালিশের নীচে রেখে শুয়েছিলুম—চোর তা নিয়ে যেতে পারেনি।

আমি কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বললুম, যাক, তবু রক্ষে ভাই! যকের ধনের ঠিকানা আছে সেই পকেট-বইয়ের মধ্যে। ঠিকানাটা না জানলে করালী সঙ্কেত জেনেও কিছু করতে পারবে না! কিন্তু খুব সাবধান বিমল! পকেট-বইখানা যেন আবার চুরি না যায়।

বিমল বললে, সে বন্দোবস্ত আজকেই করব। পকেট-বইয়ের যেখানে যেখানে পথের কথা আর ঠিকানা আছে, সেসব জায়গা আমি কালি দিয়ে এমন করে কেটে দেব যে, কেউ তা আর পড়তে পারবে না।

আমি বললুম, তাহলে আমরাও মুস্কিলে পড়ব যে!

বিমল হেসে বললে, কোন ভয় নেই! ঠিকানা আর পথের বর্ণনা আর-একখানা আলাদা কাগজে নতুন একরকম সাঙ্কেতিক কথাতে আমি টুকে রাখব,—সে সঙ্কেত আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।

খানিকক্ষণ চুপ করে থাকবার পর আমি বললুম, এখন আমরা কি করব?

বিমল বললে, আগে মড়ার মাথাটা উদ্ধার করতে হবে?

আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, কি করে?

বিমল বললে, যেমন করে তারা মড়ার মাথা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছে?

আমি বললুম, চোরের উপর বাটপাড়ি?

বিমল বললে, তাছাড়া আর উপায় কি? আজ রাত্রেই আমি করালীর বাড়ীতে যেমন করে পারি ঢুকব! আমার সঙ্গে থাকবে তুমি?

আমি একটু ভেবড়ে গিয়ে বললুম, কিন্তু করালী যদি জানতে পারে, আমাদের চোর বলে ধরিয়ে দেবে যে! সে-ই যে মড়ার মাথাটা চুরি করেছে, তারও তো কোন প্রমাণ নেই?

বিমল মরিয়ার মত বললে, কপালে যা আছে তা হবে। তবে এটা ঠিক, আমি বেঁচে থাকতে করালী আমাদের কারুকে ধরতে পারবে না।

মনকে তবু বুঝ মানাতে না পেরে আমি বললুম, না ভাই, দরকার নেই। শেষটা কি পাড়ায় একটা কেলেঙ্কারি হবে?

বিমল বেজায় চটে গিয়ে বললে, ‘দূর ভীতু কোথাকার। এই সাহস নিয়ে তুমি যাবে রূপনাথের গুহায় যকের, ধন আনতে? তার চেয়ে মায়ের কোলের আদুরে খোকাটি হয়ে বাড়ীতে বসে থাক— তোমার পকেট-বই এখনি আমি ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি—এই বলেই বিমল হন হন করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

আমি তাড়াতাড়ি বিমলকে আবার ফিরিয়ে এনে বললুম, বিমল, তুমি ভুল বুঝছ—আমি একটুও ভয় পাইনি! আমি বলছিলুম কি— বিমল আমাকে বাধা দিয়ে বললে, তুমি কি বলছ, আমি তা শুনতে চাই না। স্পষ্ট করে বল, আজ রাত্রে আমার সঙ্গে তুমি করালীর বাড়ীতে যেতে রাজি আছ কি না?

আমি জবাব দিলুম—‘আছি।’

বিমল খুশি হয়ে আমার হাতদুটো আচ্ছা করে নেড়ে দিয়ে বললে, ‘হু, এই তো ‘গুড বয়ে’ র মত কথা। যদি মানুষ হতে চাও, ডানপিটে হও।

আমি হেসে বললুম, কিন্তু ডানপিটের মরণ যে গাছের আগায়?

এই সাহস নিসে তুমি যাবে রূপনাথের গুহায় যকের ধন আনতে!

বিমল বললে, বিছানায় শুয়ে থাকলেও মানুষ তো যমকে কলা দেখাতে পারে না। মরতেই যখন হবে, তখন বিছানায় শুয়ে মরার চেয়ে বীরের মত মরাই ভালো। তোমরা যাদের ভালো ছেলে বলসেই গোবর-গণেশ মিনমিনে ননীর পুতুলগুলোকে আমি দু-চোখে দেখতে পারি না। সায়েবের জুতো খেয়ে তাদেরই পিলে ফাটে, বিপদে পড়লে তারাই আর বাঁচে না, মরে বটে—তাও কাপুরুষের মত। এরাই বাঙালীর কলঙ্ক জগতে যেসব জাতি আজ মাথা তুলে বড় হয়ে আছে—বিপদের ভেতর দিয়ে, মরণের কুছ-পরোয় না রেখে তারা সবাই শ্রেষ্ঠ হতে পেরেছে। বুঝলে কুমার? বিপদ দেখলে আমার আনন্দ হয়।

0 Next
Continue to next part Up next চোরের উপর বাটপাড়ি
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.