Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

মরণের হাসি

3.8K 733 0

মনটা কেমন দমে গেল। অতগুলো পাথর-চাপানো বন্ধ গর্ভের মধ্যে ধোয় এল কেমন করে? আগুন না থাকলে ধোয়া হয় না, কিন্তু গর্তের ভিতর আগুনই বা কোথেকে আসবে? আগুন তো জ্বালে মানুষেরই হাত! অনেক ভেবে কিছু ঠিক করতে পারলুম না।

সে রাত্রে মঠের একটা ঘরের ভিতরে আমরা আশ্রয় নিলুম। খাওয়া-দাওয়ার পর শোবার আগে বিমলকে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, হ্যাঁ, হে, তুমি যকের কথায় বিশ্বাস কর?

বিমল বললে, ‘হ্যাঁ, শুনেছি যক একরকম প্রেতযোনি। তারা গুপ্তধন রক্ষা করে। কিন্তু যক আমি কখনো চোখে দেখিনি, কাজেই তার কথা আমি বিশ্বাসও করি না।

আমি বললুম, তুমি ভগবানকে কখনো চোখে দেখনি, তবু ভগবানকে যখন বিশ্বাস কর, তখন যকের কথাতেও বিশ্বাস কর না কেন?

বিমল বললে, হঠাৎ যকের কথা তোলবার কারণ কি কুমার?

—কারণ আমার বিশ্বাস ঐ গুপ্তধনের গর্তের ভেতরে ভুতুড়ে কিছু আছে। নইলে—

—নইলে-টইলের কথা যেতে দাও। ভূত-দানব যাই-ই থাক, কাল আমি গর্তের মধ্যে ঢুকবই—দৃঢ়স্বরে এই কথাগুলো বলেই বিমল শুয়ে পড়ে কম্বল মুড়ি দিলে।

আমার বুকের ছমছমানি কিন্তু গেল না। রামহরির কাছ ঘেঁসে বসে বললুম, আচ্ছা রামহরি, তুমি যক বিশ্বাস কর?

—করি ছোটবাবু।

—তোমার কি মনে হয় না রামহরি, ঐ গর্তের ভেতরে যক আছে?

—যকই থাকুক আর রাক্ষসই থাকুক, খোকাবাবু যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাব—এই বলে রামহরিও লম্ব হয়ে শুয়ে পড়ল।

যেমন মনিব, তেমনি চাকর। দুটিতে সমান গোঁয়ার। আমি নাচার হয়ে বসে বসে পাহারা দিতে লাগলুম।.

ভোরবেলায় উঠেই আমরা আবার যথাস্থানে গিয়ে হাজির। গর্তের মুখ থেকে পাথরগুলো আবার সরিয়ে ফেলা-হল। খানিকক্ষণ অপেক্ষ করেও আজ কিন্তু ধোঁয় দেখতে পাওয়া গেল না।

বিমল আশ্বস্ত হয়ে বললে, বোধ হয় অনেককাল বন্ধ থাকার দরুণ গর্তের ভেতরে বাষ্প-টাষ্প কিছু জমেছিল, তাকেই আমরা ধোয় বলে ভ্রম করেছিলুম?

বিমলের এই অনুমানে আমারও মন সায় দিলে। নিশ্চিন্ত হয়ে বললুম, এখন আমাদের কি করা উচিত?

বিমল বললে,‘সুড়ঙ্গের ভেতরে যাব, তারপর ধন খুজে বার করব...কুমার, রামহরি, তোমরা প্রত্যেকে এক-একটা “ইলেকটিক টর্চ” নাও, কারণ মুড়ঙ্গের ভেতরটা নিশ্চয়ই অমাবস্যার রাতের মত অন্ধকার। এই বলে সে প্রথমে বাঘাকে গর্তের মধ্যে নামিয়ে দিলে, তারপর নিজেও নেমে পড়ল। আমরাও দুজনে তার অনুসরণ করলুম।

উঃ, সুড়ঙ্গের ভিতরে সত্যিই কি বিষম অন্ধকার, দু-চার পা এগিয়ে আমর ভুলে গেলুম যে, বাইরে এখন সূর্যদেবের রাজ্য। ভাগ্যে এই ‘বিজলী-মশাল’ বা ইলেকটিক টর্চগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল, নইলে ভয়ে এক পাও অগ্রসর হতে পারতুন না।

আমরা হেঁট হয়ে ক্রমেই ভিতরে প্রবেশ করেছি, কারণ সুড়ঙ্গের ছাদ এত নীচু যে, মাথা তোলবার কোন উপায় নেই।

আচম্বিতে পিছনে কিসের একটা শব্দ হল—সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। পিছনে ফিরে দেখলুম, সুড়ঙ্গের মুখের গর্ত দিয়ে বাইরের যে আলোটুকু আসছিল, তা আর দেখা যাচ্ছে না।

আবার সেইরকম একটা শব্দ। তারপর আবার,—আবার। আমি তাড়াতাড়ি ফের সুড়ঙ্গের মুখে ছুটে এলুম। যা দেখলুম, তাতে প্রাণ আমার উড়ে গেল!

সুড়ঙ্গের মুখ একেবারে বন্ধ! বিমলও এসে ব্যাপারটা দেখে স্তস্তিত হয়ে গেল। অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ, সকলের আগে কথা কইলে রামহরি। সে বললে, কে এ কাজ করলে?

বিমল পাগলের মতন গর্তের মুখে ঠেলা মারতে লাগল, কিন্তু তার অসাধারণ শক্তিও আজ হার মানলে—গর্তের মুখ একটুও খুলল না।

আমি হতাশভাবে বললুম, বিমল, আর প্রাণের আশা ছেড়ে দাও, এইখানেই জ্যান্ত আমাদের কবর হবে।

আমরা কথা শেষ হতে না হতেই কাশির মত খনখনে গলায় হঠাৎ খিলখিল করে কে হেসে উঠল। সে কি ভীষণ বিশ্ৰী হাসি, আমার বুকের ভিতরটা যেন মড়ার মত ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

হাসির আওয়াজ এল সুড়ঙ্গের ভিতর থেকেই। তিনজনেই বিজুলী-মশাল তুলে ধরলুম, কিন্তু কারুকেই দেখতে পেলুম না।

বিমল বললে,‘কে হাসলে কুমার?

আমি ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপপতে বললুম, যক, যক!

সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই খিলখিল করে খনখনে হাসি। মানুষে কখনও তেমন হাসি হাসতে পারে না। বাঘা পর্যন্ত অবাক হয়ে কান খাঁড়া করে সুড়ঙ্গের ভিতরের দিকে চেয়ে রইল।

পাছে আবার সেই হাসি শুনতে হয়, তাই আমি দুই হাতে সজোরে দুই কান বন্ধ করে মাটির উপর বসে পড়লুম।

0 Next
Continue to next part Up next ধনাগার
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.