Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

শাপে বর

3.8K 733 0

সারারাত জিনিস-পত্তর গুছিয়ে, ভোরের মুখে ঘণ্টাখানেক গড়িয়ে যথাসময়ে আমরা বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লুম। আমাদের দলে রইল বিমলের পুরানো চাকর রামহরি ও আমার কুকুর বাঘ। দুটো বড় বড় ব্যাগ, একটা ‘সুটকেস ও একটা ‘ইকমিক কুকার’ ছাড়া বিমল আর কিছু সঙ্গে নিতে দিলে না।

ব্যাগ দুটোর ভিতরে কিন্তু ছিল না, এমন জিনিস নেই। ছুরিছোরা, কাঁচি, নানারকম ওষুধভরা ছোট একটি স্বাক্স, ফটো তুলবার ক্যামেরা, ইলেকটিক ‘টর্চ বা মশাল, 'ফ্লাস্ক', ( যার সাহায্যে দুধ, জল বা চা ভরে রাখলে চব্বিশ ঘণ্টা সমান ঠাণ্ড বা গরম থাকে), গোটকতক বিস্কুট, ফল ও মাছ-মাংসের টিন (অনেক দিনে যা নষ্ট হবে না), আসাম সম্বন্ধে খানকয়েক ইংরেজী বই, ছাতা, ছোট ছোট দুটো বালিস আর সতরঞ্চি, কাফ্রির সেই দুটো মুখোস (বিমলের মতে পরে ও-দুটোও কাজে লাগতে পারে) প্রভৃতি কত রকমের জিনিসই যে এই ব্যাগ দুটোর ভিতরে ভরা হয়েছে, তা আর নাম করা যায় না। ‘সুটকেসের ভিতরে আমাদের জাম-কাপড় রইল। আমরা প্রত্যেকেই এক এক গাছা মোটা দেখে লাঠি নিলুম—দরকার হলে এ লাঠি দিয়ে মানুষের মাথা খুব সহজেই ভাঙা যেতে পারবে। অবশ্য, বিমল বন্দুক দুটোও সঙ্গে নিতে ভুললে না।

বাড়ী ছেড়ে বেরুবার সময় মনটা যেন কেমন-কেমন করতে লাগল। দেশ ছেড়ে কোথায় কোন বিদেশে, পাহাড়ে-জঙ্গলে বাঘ-ভালুক আর শত্রুর মুখে পড়তে চললুম, যাবার সময়ে মায়ের পায়ে প্রণাম পর্যন্ত করতে যেতে পারলুম না-কে জানে এ জীবনে আর কখনো ফিরে এসে মাকে দেখতে পাব কিনা! একবার মনে হল বিমলকে বলি যে, আমি যাব না? কিন্তু পাছে সে আমাকে ভীরু ভেবে বসে, সেই ভয়ে মনকে শক্ত করে রইলুম।

বিমলও আমার মুখের পানে তাকিয়ে মনের কথা বোধহয় বুঝতে পারলে। কারণ, হঠাৎ সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কুমার, তোমার মন কেমন করছে?

আমি সত্য কথাই বললুম—তো একটু একটু করছে বৈকি?

—‘মায়ের জন্যে?

—ভেব না। খুব সম্ভব আজকেই হয়তো তোমার মাকে তুমি দেখতে পাবে।

আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, কি করে? আমরা তে যাচ্ছি আসামে?

—তা যাচ্ছি বটে!—বলেই বিমল একবার সন্দেহের সঙ্গে পিছন দিকে চেয়ে দেখলে—তার চোখ-মুখের ভাব উদ্বিগ্ন। সে নিশ্চয় দেখছিল শত্রুরা আমাদের পিছু নিয়েছে কিনা! কিন্তু কারুকেই দেখতে পাওয়া গেল না।

বিমলের বাড়ীর গাড়ী আমাদের স্টেশনে নিয়ে যাবার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আমরা গাড়ীতে গিয়ে চড়ে বসলুম। গাড়ী ছেড়ে দিলে। বিমল সারা পথ অন্যমনস্ক হয়ে রইল। মাঝে মাঝে তেমনি উদ্বেগের সঙ্গে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পেছনপানে চেয়ে দেখতে লাগল৷

শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে আমরা গাড়ী থেকে নামলুম। একবার চারিদিকে সতর্ক চোখে চেয়ে দেখে আমি বললুম, বিমল, আপাতত আমাদের কোন ভয় নেই। করালীরা আমাদের পিছু নিতে পারেনি।

বিমল সে কথার কোন জবাব না দিয়ে বললে, তোমরা এইখানে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি টিকিট কিনে আনি।

টিকিট কিনে ফিরে এসে, বিমল আমাদের নিয়ে স্টেশনের ভিতর গিয়ে ঢুকল। বাঘাকে জন্তুদের কামরায় তুলে দিয়ে এল। বাঘা বেচারী এত লোকজন দেখে ভড়কে গিয়েছিল। সে কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়তে রাজি হল না, শেষট বিমল শিকল ধরে তাকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল।

গাড়ী ছাড়তে এখনো দেরি আছে। কামরার মধ্যে বেজায় গরম দেখে, আমি গাড়ী থেকে নেমে পড়ে প্লাটফর্মের উপর পায়চারি করতে লাগলুম। ঘুরতে ঘুরতে গাড়ীর একেবারে শেষ দিকে গেলুম। হঠাৎ একটা কামরার ভিতর আমার নজর পড়ল—সঙ্গে সঙ্গে আমার সারা দেহে কাটা দিয়ে উঠল। আমি সভসে দেখলুম, কামরার ভিতরে করালী বসে আছে। দুজন মিশকালে গুণ্ডার মত লোকের সঙ্গে হাতমুখ নেড়ে সে কি কথাবার্তা কইছিল—আমাকে দেখতে পেলে না। আমি তাড়াতাড়ি ছুটে নিজেদের গাড়ীতে এসে উঠে পড়লুম।

বিমল বললে, ‘কিহে কুমার, ব্যাপার কি? চোখ পালে তুলে ছুটতে ছুটতে আসছ কেন?

আমি বললুম, বিমল, সর্বনাশ হয়েছে!

বিমল হেসে বললে, কিছুই সর্বনাশ হয়নি! তুমি করালীকে দেখেছ তো? তা আর হয়েছে কি? সে যে আমাদের সঙ্গ ছাড়বে না, আমি তা অনেকক্ষণই জানি। যাক, তুমি ভয় পেও না, চুপ করে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকো?

বিমল যত সহজে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলে, আমি ত৷ পারলুম না। আস্তে আস্তে এককোণে গিয়ে বসে পড়লুম বটে, মন কিন্তু বিমর্ষ হয়ে রইল। বিমল আমার ভাব দেখে মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। এদিকে গাড়ী ছেড়ে দিলে।

জানি না, কপালে কি আছে। জঙ্গলের ভিতরে অপঘাতেই মরতে হবে দেখছি! করালীর সঙ্গে কত লোক আছে তা কে জানে? সে যখন আমাদের পিছু নিয়েছে, তখন সহজে কি আর ছেড়ে দেবে? আমি খালি এইসব কথা ভেবে ও নানারকমের বিপদ কল্পনা করে শিউরে উঠতে লাগলুম।

বিমল কিন্তু দিব্য আরামে সামনের বেঞ্চে পা তুলে দিয়ে বসে নিজের মনে কি একখানা বই পড়তে লাগল।

গাড়ী একটা স্টেশনে এসে থামল। বিমল মুখ বাড়িয়ে স্টেশনের নাম দেখে আমাকে বললে, ‘কুমার, প্রস্তুত হও। পরের স্টেশন রাণাঘাট। এইখানেই আমরা নামব।

এ আবার কি কথা! আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, রাণাঘাটে নামব! কেন?

—সেখান থেকে শান্তিপুরে, তোমার মামার বাড়ীতে মায়ের কাছে যাব।

—হঠাৎ তোমার মত বদলালে কেন?

—মত কিছুই বদলায়নি,—আজ কি করব, কাল থেকেই আমি তা জানি। কিন্তু তোমাকে কিছু বলিনি। এই দেখ, আমি শান্তিপুরের টিকিট কিনেছি। এর কারণ কিছু বুঝলে কি?

—না।

—আমি বেশ জানতুম, করালী আমাদের পিছু নেবে। কালকেই তার চর শুনে গেছে, আমরা আসামে যাব। আজও সে জানে, আমরা আসাম ছেড়ে আর কোথাও যাব না। সে তাই ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে গাড়ীর ভিতরে বসে থাকুক, আর সেই ফাকে আমরা রাণাঘাটে নেমে পড়ি। দিন-দুয়েক তোমার মামার বাড়ীতে বসে বসে আমরা তো মজা করে পোলাও কালিয়া খেয়ে নি। আর ওদিকে করালী যখন জানতে পারবে আমরা আর গাড়ীর ভিতরে নেই, তখন মাথায় হাত দিয়ে একেবারে বসে পড়বে। নিশ্চয় ভাববে যে আমরা তাকে ভুলিয়ে অন্য কোন পথ দিয়ে যকের ধনের খোঁজে গেছি। সে হতাশ হয়ে কলকাতার দিকে ফিরবে, আর আমরা তোমার মায়ের আশীৰ্বাদ মাথায় নিয়ে সোজা আসামের দিকে যাত্রা করব। আর কেউ আমাদের পিছু নিতে পারবে না।

আমার পক্ষে এটা হল শাপে বর। ওদিকে করালীও জব্দ, আর এদিকে আমারও মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল,—একেই বলে লাঠি না ভেঙে সাপ মারা! বিমলের দু'খানা হাত চেপে ধরে আমি বলে উঠলুম, ভাই, তুমি এত বুদ্ধিমান! আমি যে অবাক হয়ে যাচ্ছি?

গাড়ী রাণাঘাটে এসে থামতেই আমরা টপাটপ, নেমে পড়লুম— কেউ আমাদের দেখতে পেলে ন!

0 Next
Continue to next part Up next নতুন বিপদের ভয়
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.