Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

পিশাচ রহস্য

3.8K 733 0

পরের দিন সকালে উঠে দেখি, আর এক মুস্কিল। রামহরির কম্প দিয়ে জ্বর এসেছে। কাজেই সেদিন আমাদের সেখানেই থেকে যেতে হল—জ্বর-গায়ে রামহরি তো আর পথ চলতে পারে না! ক্রমাগত পথ চলে চলে আমাদেরও শরীর বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল, কাজেই এই হঠাৎ-পাওয়া ছুটিটা নেহাৎ মন্দ লাগল না।

সেদিনও বিমল দুটে পাখি মেরে আনলে, নিজের হাতেই আমরা রান্নার কাজটা সেরে নিলুম।

সন্ধ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালকের রাতের সেই ভুতুড়ে ব্যাপারটার কথা আবার আমার মনে পড়ে গেল। বিমলের কাছে সে কথা তুলতে-না-তুলতেই সে হেসেই সব উড়িয়ে দিল। আমি কিন্তু অত সহজেই মনটাকে হালকা করে ফেলতে পারসুম না— আমি যে স্বচক্ষে দেখেছি। ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে,

বাপ রে!

সেদিনও সরল কাঠের আগুন জেলে গুহার মুখটা আমরা বন্ধ করে দিলুম। আজ রামহরির অমুখ,—কাজেই আমাদের দু'জনকেই পাল করে পাহারা দিতে হবে। আজও প্রথম রাতে পাহারার ভার নিলে বিমল নিজে।

যখন আমার পালা এল, তখন গভীর রাত্রি। আজও চাঁদ ডুবে গেছে, আর অন্ধকারে বুকের ভিতর থেকে নানা অস্ফুট ধ্বনির সঙ্গে শোনা যাচ্ছে সেই গাছের পাতার মর্মরানি, ঝরনার ঝরঝরানি আর বকের ছানাদের কাতরানি।

গুহার মুখের আগুনটা কমে আসছে দেখে আমি কতকগুলো চ্যালাকাঠ তার ভিতরে ফেলে দিলুম। তারপরেই শুনলুম কেমন একটা শব্দ-গুহার বাইরে কে যেন খড়মড় করে শুকনে পাঙা মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রাণপণে তাকিয়েও সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে বিন্দুবিসর্গ কিছুই দেখতে পেলুম না, শব্দটাও একটু পরে থেমে গেল।

কিন্তু আমার বুক চিপ ঢিপ করতে লাগল।

বাঘা মনের সুখে কুণ্ডুলী পাকিয়ে, পেটের ভিতরে মুখ গুজে ঘুমোচ্ছিল, আমি তাকে জাগিয়ে দিলুম। বাঘা উঠে একটা হাই তুলে আর মাটির উপর একটা ডন দিয়ে নিয়ে, আমার পাশে এসে তুই থাবা পেতে বসল। একহাতে তার গলাটা জড়িয়ে ধরে আমি অনেকটা আশ্বস্ত হলুম।

আবার সেই শব্দ। বাঘার দিকে চেয়ে দেখলুম, সেও ছুই কান খাড়া করে ঘাড় বাকিয়ে শব্দটা শুনছে। তারপরেই সে একলাফে গুহার মুখে গিয়ে পড়ল, কিন্তু আগুনের জন্যে বাইরে যেতে না পেরে, সেইখানেই দাঁড়িয়ে গরগর করতে লাগল।

তার গজরানিতে বিমলের ঘুম ভেঙ্গে গেল, উঠে বসে সে বললে, আজ আবার কি ব্যাপার। বাঘা অমন করছে কেন?

আমি বললুম, বাইরে কিসের একটা শব্দ হচ্ছে, কে যেন চলে বেড়াচ্ছে?

সে কি কথা!—বলেই বিমল এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে বন্দুকটা নিয়ে বাগিয়ে ধরলে।

শব্দটা তখন থেমে গেছে—কিন্তু ও কি ও! আবার যে সেই দুটো জলন্ত চোখ অন্ধকারের ভিতর থেকে কটমট করে আমাদের পানে তাকিয়ে আছে!

বাঘা ঘেউঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠল, আমিও বলে উঠলুম—দেখ বিমল, দেখ?

কিন্তু আমি বলবার আগেই বিমল দেখেছিল, সে মুখে কিছু বললে না, চোখদুটোর দিকে বন্দুকটা ফিরিয়ে একমনে টিপ করতে লাগল।

চোখদুটে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছিল—হঠাৎ বিমল বন্দুকের ঘোড় টিপে দিলে, সঙ্গে সঙ্গে ধ্রুম্ করে শব্দ, আর একট। ভীষণ গর্জন, তারপরেই সব চুপ, চোখদুটোও আর নেই।

বিমল আমার দিকে ফিরে বললে, এই চোখদুটোই কাল তুমি দেখেছিলে?

—হ্যাঁ। এইবার তোমার বিশ্বাস হল তো?

—তা হয়েছে বটে, কিন্তু এ পিশাচের নয়, বাঘের চোখ?

—বাঘ?

—‘হ্যাঁ। বোধ হয় এতক্ষণে সে লীলাখেলা সাঙ্গ করেছে, তবু বলা তো যায় না, আজ রাত্রে আর বাইরে গিয়ে কাজ নেই-কি জানি একেবারে যদি মরে না থাকে—আহত বাঘ ভয়ানক জীব।

পরদিন সকালে উঠে দেখলুম–বিমল যা বলেছে তাই! গুহার মুখ থেকে খানিক তফাতে, পাহাড়ের উপরে একটা মরা বাঘ পড়ে রয়েছে—আমরা মেপে দেখলুম–পাকা ছয় হাত লম্বা বিমলের টিপ আশ্চর্য, বন্দুকের গুলি বাঘটার ঠিক কপালে গিয়ে লেগেছে।

0 Next
Continue to next part Up next মরণের মুখে
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.