বিমলের জ্ঞান হলে পর আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কি করে তুমি গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়লে?
বিমল বললে, করালীর পিছনে পিছনে যেই আমি গুহার মধ্যে গিয়ে ঢুকলুম, সে অমনি ঐ অন্ধকার গলির মধ্যে সেঁধিয়ে পড়ল। আমিও ছাড়লুম না, গলির ভিতরে ঢুকে সেই অন্ধকারেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলুম, তারপর দুজনের ধস্তাধস্তি শুরু হল। কিন্তু আমরা কেউ জানতুম না যে, ওখানে আবার একটা গহ্বর আছে, ঠেলাঠেলি জড়াজড়ি করতে করতে দুজনেই হঠাৎ তার ভেতরে পড়ে গেলুম।
আমি শিউরে বলে উঠলুম, অ্যাঁঃ! করালী তাহলে এখনো গহ্বরের মধ্যে আছে?
—হ্যাঁ কিন্তু বেঁচে নেই।
—সে কি?
—যদিও অন্ধকারে সেখানে চোখ চলে না, তবু আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি, সে ডুবে মরেছে। কারণ, আমরা জলে পড়বার পর ঠিক আমার পাশেই দু-চারবার ঝপাঝপ, শব্দ হয়েই সব চুপ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই সে সাতার জানত না, জানলে জলের ভেতরে শব্দ হত।
আমি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলুম, আর যকের ধনের বাক্সটা?
বিমল একটা বিষাদ-ভরা হাসি হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, আমি যখন করালীকে জড়িয়ে ধরি, তখনে সে বাক্সটা ছাড়েনি। আমার বিশ্বাস, বাক্সট নিয়েই সে জলপথে পরলোকে যাত্রা করেছে।
—“কিন্তু বাক্সটা যদি গলির ভেতরে পড়ে থাকে? বলেই আমি বিজলী-মশালটা নিয়ে আবার গুহার ভিতরকার গলির মধ্যে গিয়ে ঢুকলুম। কিন্তু মিছে আশা, সেখানে বাক্সের চিহ্নমাত্রও নেই। আর একবার সেই বিরাট গগ্বরের দিকে তীক্ষদৃষ্টিতে চেয়ে দেখলুম, অনেক নীচে অন্ধকার-মাখা-জলরাশি মৃতের মতন স্থির ও স্তব্ধ হয়ে আছে, এই একটু আগেই সে যে একটা মানুষের প্রাণ ও সাত-রাজার ধনকে নিষ্ঠুরভাবে গ্রাস করে ফেলেছে, তাকে দেখে এখন আর সে সন্দেহ করবারও উপায় নেই।
হতাশভাবে বাইরে এসে অবসন্নের মতন বসে পড়লুম। বিমল শুধোলে, কেমন, পেলে না তো?
মাথা নেড়ে নীরবে জানালুম—না।
—তা আমি আগেই জানি। করালী প্রাণে মরেছে বটে, কিন্তু যকের ধন ছাড়েনি। শেষ জিৎ তারই।
স্তব্ধ হয়ে বসে রইলুম। দুঃখে, ক্ষোভে, বিরক্তিতে মনটা আমার ভরে উঠল; এত বিপদ, এত কষ্টভোগের পর এতবড় নিরাশ! আমার ডাক-ছেড়ে কাঁদবার ইচ্ছা হতে লাগল।
বিমলও হতাশভাবে মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে রামহরি বললে, তোমরা দুজনে অমন মন-মরা হয়ে থাকলে তো চলবে না। যকের ধন ভাগ্যেই নেই তাতে হয়েছে কি?
প্রাণে বেঁচেছ এই ঢের। যা হাতে না আসতেই অত বিপদ, এত ঝঞ্ঝাট, যার জন্যে এতগুলো প্রাণ গেল, তা পেলে না জানি আরো কত মুস্কিলই হত! এখন ঘরের ছেলে ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে চল।
বিমল মাথা তুলে হেসে বললে, ঠিক বলেছ রামহরি। আঙুর যখন নাগালের বাইরে, তখন তাকে তেতো বলেই মনকে প্রবোধ দেওয়া যাক। যকের ধন কি মানুষের ভোগে লাগে? করালী ভূত হয়ে চিরকাল তা ভোগ করুক—দরকার নেই আর তার জন্যে মাথা ঘামিয়ে। আপাততঃ বড়ই ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে, কুমার! তুমি একবার চেষ্টা করে দেখ, পাখিটাখি কিছু মারতে পারো কি না। ততক্ষণে রামহরি ভাত চড়িয়ে দিক, আর আমি ওষুধ মালিস করে গায়ের ব্যথা দূর করি।
আমি বললুম, কাজেই।
বিমল বললে, ‘আহারের পর নিদ্রা, তারপর দুর্গা বলে স্বদেশের দিকে যাত্রা, কি বল?
আমি বললুম, অগত্যা।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.