Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

পথের বাধা

3.8K 733 0

কি তুর্গম পথ! কখনো প্রায় খাড়া উপরে উঠে গেছে, কখনো পাহাড়ের শিখরের চারিদিকে পাক খেয়ে, আবার কখনো বা ঘুটফুটে অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে পথটা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এ পথে নিশ্চয় লোক চলে না, কারণ পথের মাঝে মাঝে এমন সব কাটাজঙ্গল গজিয়ে উঠেছে যে, কুড়ল দিয়ে কেটে না পরিস্কার করে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। ঠাকুরদাদার পকেট-বইয়ে যদি পথের ঠিকানা ভালো করে না লেখা থাকত, তাহলে নিশ্চয় আমরা এদিকে আসতে পারতুম না। পকেট-বইখানা এখন আমাদের কাছে নেই বটে, কিন্তু পথের বর্ণনা আমরা আলাদা কাগজে টুকে নিজেদের সঙ্গে সঙ্গেই রেখেছিলুম।

পথটা খারাপ বলে আমরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতেও পাবছিলুম না বিশ মাইল পথ আমরা অনায়াসে একদিনেই পেরিয়ে যেতুম, কিন্তু এই পথটা পার হতে আমাদের ঠিক পাঁচদিন লাগল।

কাল থেকে মনে হচ্ছে, আমরা ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন মানুষ নেই। চারিদিক এত নির্জন আর এত নিস্তব্ধ যে, নিজেদের পায়ের শব্দে আমরা নিজেরাই থেকে থেকে চমকে উঠছি। মাঝে মাঝে বাঘা যেই ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে, আর আমন চারিধারে পাহাড়ে পাহাড়ে এমন বিষম প্রতিধ্বনি তে জেগে উঠছে যে, আমার মনে হতে লাগল, পাহাড়ের শিখরগুলো যেন হঠাৎ আমাদের পদশব্দে জ্যান্ত হয়ে ধমকের পর ধমক দিচ্ছে। পাখিগুলো পর্যন্ত আমাদের সাড়া পেয়ে কিচির-মিচির করে ডেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়ে পালাচ্ছে—যেন এ পথে আর কখনো তারা মানুষকে হাঁটতে দেখেনি।

পাঁচ দিনের দিন, সন্ধ্যার কিছু আগে, খানিক তফাৎ থেকে আমাদের চোখের উপরে আচম্বিতে এক অপূর্ব দৃশ্য ভেসে উঠল। সারি সারি মন্দিরের মতন কতকগুলো বাড়ী- সমস্তই যেন মিশকালো রঙে তুলি ডুবিয়ে, আগুনের মত রাঙা আকাশের পটে কে একে রেখেছে। একটা উচু পাহাড়ের শিখরের উপরে মন্দিরগুলো গড়া হয়েছে। এই নিস্তব্ধতার রাজ্যে শিখরের উপরে মুকুটের মত সেই মন্দিরগুলোর দৃশ্য এমন আশ্চর্যরকম গম্ভীর যে, বিস্ময়ে আর সন্ত্রমে খানিকক্ষণ আমরা আর কথাই কইতে পারলুম না।

সকলের আগে কথা কইল বিমল। মহা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল— বৌদ্ধমঠ!

আমিও বলে উঠলুম—যকের ধন?

রামহরি বললে, আমাদের এতদিনের কষ্ট সার্থক হল।

বাঘা আমাদের কথা বুঝতে পারলে না বটে, কিন্তু এটা অনায়াসে বুঝে নিলে যে, আমরা সকলেই খুব খুসি হয়েছি। সেও তখন আমাদের মুখের পানে চেয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।

আনন্দের প্রথম আবেগ কোনরকমে সামলে নিয়ে আবার তাড়াতাড়ি অগ্রসর হলুম। মঠ তখনো আমাদের কাছ থেকে প্রায় মাইল-খানেক তফাতে ছিল—আমরা প্রতিজ্ঞা করলুম, আজকেই ওখানে না গিয়ে কিছুতেই আর বিশ্রাম করব না।

সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই ঘন হয়ে উঠল। বিমল আমাদের আগে আগে যাচ্ছিল। আচমকা সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে উঠল-- ‘সর্বনাশ!

আমি বললুম, কি হল বিমল?

বিমল বললে, উঁঃ, মরতে মরতে ভয়ানক বেঁচে গেছি?

—কেন, কেন?

খবৰ্দার। আর এগিয়ে না, দাঁড়াও। এখানে পাহাড় ধ্বসে গেছে, আর পথ নেই?

মাথায় যেন বজ্র ভেঙে পড়ল—পথ নেই। বিমল বলে কি?

সাবধানে দু-চার পা এগিয়ে যা দেখলুম, তাতে মন একেবারে দমে গেল। পথের মাঝখানকার একটা জায়গা ধ্বসে গিয়ে গভীর এক ফাঁকের স্মৃষ্টি হয়েছে, ফাঁকের মুখটাও প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ফুট চওড়া। সেই ফাঁকের মধ্যেও নেমে যে পথের এদিক থেকে ওদিক দিয়ে উঠব, এমন কোন উপায়ও দেখলুম না। পথের দুপাশে যে খাড়া খাদ রয়েছে, তা এত গভীর যে দেখলেও মাথা ঘুরে যায়। এ কি বিড়ম্বন, এতদিনের পরে, এত বিপদ এড়িয়ে, যকের ধনের সামনে এসে শেষটা কি এইখান থেকেই বিফল হয়ে ফিরে যেতে হবে?

আমার সর্বাঙ্গ এলিয়ে এল, সেইখানেই আমি ধুপ করে বসে পড়লুম।

খানিকক্ষণ পরে মুখ তুলে দেখলুম, ঠিক সেই ভাঙা জায়গাটার ধীরে একটা মস্ত উঁচু সরল গাছের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বিমল কি ভাবছে।

আমি বললুম, তার কি দেখছ ভাই, এখানে বসবে এস, আজ এইখানেই রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে, কাল আবার বাড়ীর দিকে ফিরব?

বিমল রাগ করে বললে, এত সহজেই যদি হাল ছেড়ে দেব, তবে মানুষ হয়ে জন্মেছি কেন?

আমি বললুম, হাল ছাড়ব না তো কি করব বল? লাফিয়ে তো আর ঐ ফাঁকটা পার হতে পারব না, ডানাও নেই যে, উড়ে যাব।

বিমল বললে, তোমাকে লাফাতেও হবে না, উড়তেও বলছি না। আমরা হেঁটেই যাব।

আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, হেঁটে! শূণ্য দিয়ে হেঁটে যাব কিরকম?

বিমল বললে, শোন বলছি। এই ফাঁকটার মাপ সতেরো আঠারো ফুটের বেশী হবে না, কেমন?

—হ্যাঁ।

—আচ্ছা, ভাঙা পথের ঠিক ধারেই যে সরল গাছটা রয়েছে, ওটা আন্দাজ কত ফুট উঁচু হবে বল দেখি?

—সতেরো-আঠারো ফুটের চেয়ে ঢের বেশী।

—বেশ, তাহলে আর ভাবনা কি? আমরা কুড়ল দিয়ে কুপিয়ে গাছের গোড়াটা এমনভাবে কাটব, যাতে করে পড়বার সময়ে গাছটা পথের ঐ ভাঙা অংশের ওপরেই গিয়ে পড়ে। তাহলে কি হবে বুঝতে পারছ তো?

আমি আহলাদে একলাফ মেরে বললুম, ওহে, বুঝেছি। গাছটা ভাঙা জায়গার ওপরে পড়লেই একটা পোলের মত হবে। তাহলেই তার ওপর দিয়ে আমরা ওধারে যেতে পারব। বিমল, তুমি হচ্ছ বুদ্ধির বৃহস্পতি! তোমার কাছে আমরা এক একটি গরুবিশেষ।

বিমল বললে, বুদ্ধি সকলেরই আছে, কিন্তু কাজের সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সকলেই সমানভাবে বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে পারে না বলেই তো মুস্কিলে পড়তে হয়...যাক, আজ আমাদের এইখানেই বিশ্রাম। কাল সকালে উঠেই আগে গাছটা কাটবার ব্যবস্থা করতে হবে।

0 Next
Continue to next part Up next বাধার উপরে বাধা
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.