Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

অবাক কাণ্ড

3.8K 733 0

কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলুম জানি না। যখন জ্ঞান ল, চোখ চেয়ে দেখলুম, রামহরি আমার মুখের উপরে হুমড়ি খেয়ে আছে। আমাকে চোখ চাইতে দেখে সে হাঁপ ছেড়ে বললে, কি হয়েছে ছোটবাবু, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেন?

কেন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলুম, প্রথমটা আমার তা মনে পড়ল না—আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলুম–একেবারে বোবার মত।

রামহরি বললে, তোমার ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে আমার ভারি ভয় হল। বাঘাকে সেইখানেই বেঁধে রেখে তোমাকে খুঁজতে আমিই এইদিকে এলুম—

এতক্ষণে আমার সব কথা মনে পড়ল—রামহরিকে বাঁধা দিয়ে পাগলের মত লাফিয়ে উঠে বললুম—রামহরি, রামহরি–আমিও ওদের খুন করব।

রামহরি আশ্চর্য হয়ে বললে, কাদের খুন করবে ছোটবাবু, তুমি কি বলছ!

বন্দুকটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে আমি বঙ্গলুম, যারা বিমলকে খাদে ফেলে দিয়েছে।

—খোকাবাবুকে খাদে ফেলে দিয়েছে। অ্যাঁ—অ্যাঁ, রামহরি চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল।

আমি বললুম, এখন তোমার কান্না রাখো রামহরি। এখন আগে চাই প্রতিশোধ। নাও, ওঠ—বিমলের বন্দুকটা নিয়ে এইদিকে এস। আমি ঝোপ থেকে বেরিয়ে দাঁড়ালুম-ঠিক করলুম সামনে যাকে দেখব তাকেই গুলি করে মেরে ফেলব কুকুরের মত।

কিন্তু কেউ তো কোথাও নেই। খাদের পাশে খোলা জমি ধু-ধু করছে—সেখানে জনপ্রাণীকেও দেখতে পেলুম না।

রামহরি পিছন থেকে বললে, তুমি কাকে মারতে চাও ছোটবাবু?

দাঁতে দাঁত ঘষে আমি বললুম, কেরালীকে। কিন্তু এর মধ্যেই দলবল নিয়ে সে কোথায় গেল?

—করালী—স্তম্ভিত রামহরির মুখ দিয়ে আর কোন কথা বেরুল না।

—হ্যাঁ রামহরি, করালী। তারই হুকুমে বিমলকে ফেলে দিয়েছে?

রামহরি কঁদিতে কাঁদতে বললে, কোনখানে খোকাবাবুকে ফেলে দিয়েছে?

আমারও গলা কান্নায় বন্ধ হয়ে এল। কোনরকমে সামলে নিয়ে হতাশভাবে আমি বললুম, রামহরি, বিমলের খোজ নেওয়া আর মিছে।...ঐখান থেকে হাত-পা বেঁধে তাকে খাদের ভেতর ফেলে দিয়েছে। অত উঁচু থেকে ফেলে দিলে লোহাই গুড়ো হয়ে যায়, মামুষের দেহ তো সামান্ত ব্যাপার। বিমলকে আর আমরা দেখতে পাব না।

রামহরি মাথায় করাঘাত করে বললে, খোকাবাবু সঙ্গে না থাকলে কোন মুখে আবার মা-ঠাকুরুণের কাছে গিয়ে দাঁড়াব? না, এ প্রাণ আমি রাখব না। আমিও পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মরব। এই বলে সে খাদের ধারে ছুটে গেল।

অনেক কষ্টে আমি তাকে থামিয়ে রাখলুম। তখন সে মাটির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

যেখান থেকে বিমলকে নীচে ফেলে দিয়েছে, আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালুম। তারপর ধারের দিকে ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলুম, বিমলের দেহটা নজরে পড়ে কিনা।

নীচের দিকে তাকাতেই আমার মাথা ঘুরে গেল। উঃ, এমন গভীর খাদ জীবনে আমি কখনো দেখিনি—ঠিক খাড়াভাবে নীচের দিকে কোথায় যে তলিয়ে গেছে, তা নজরেই ঠেকে না! তলার দিকটা একেবারে ধোঁয়া ধোঁয়া—অস্পষ্ট!

হঠাৎ একটা অদ্ভূত জিনিস আমার চোখে পড়ল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে হাত পনেরো নীচেই পাহাড়ের খাড়া গায়ে একটা বুনো গাছের পুরু ঝোপ দেখা যাচ্ছে,--আর—আর সেই ঝোপের উপরে কি ও-টা? —ও যে মানুষের দেহের মত দেখতে।

প্রাণপণে চেঁচিয়ে আমি বললুম, রামহরি, রামহরি, দেখবে এস?

রামহরি তাড়াতাড়ি ছুটে এল—সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের উপরে দেহটাও নড়ে উঠল।

আমি ডাকলুম, বিমল, বিমল?

নীচে থেকে সাড়া এল, কুমার, এখনো আমি বেঁচে আছি ভাই?

আবার আমি অজ্ঞানের মত হয়ে গেলুম—আনন্দের প্রচণ্ড আবেগে। রামহরি তো আমোদে আটখানা হয়ে নাচ সুরু করে দিলে। অনেক কষ্টে আত্মসংবরণ করে আমি বললুম, রামহরি, ধেই ধেই করে নাচলে তো চলবে না, আগে বিমলকে ওখান থেকে তুলে আনতে হবে যে।

রামহরি তখনি নাচ বন্ধ করে, চোখ কপালে তুলে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, তাই তো ছোটবাবু, ওখানে আমরা কি করে যাব, নামবার যে কোন উপায় নেই?

উঁকি কি মেরে দেখলুম বিমলের কাছে যাওয়া অসম্ভব—পাহাড়ের গা বেয়ে মানুষ তো আর টিকটিকির মত নীচে নামতে পারে না! ওদিকে বিমল যে-রকম বেকায়দায় হাজার ফুট নীচু খাদের তুচ্ছ একটা ঝোপের উপরে আটকে আছে—

এমন সময়ে নীচে থেকে বিমলের চীৎকার আমার ভাবনায় বাধা দিলে। শুনলুম, বিমল চেঁচিয়ে বলছে, কুমার, শীগগির আমাকে তুলে নাও,—আমি ক্রমেই নীচের দিকে সরে যাচ্ছি।

তাড়াতাড়ি মুখ বাড়িয়ে আমি বললুম, কিন্তু কি করে তোমার কাছে যাব বিমল?

বিমল বললে, আমার ব্যাগের ভেতরে দড়ি আছে, সেই দড়ি আমার কাছে নামিয়ে দাও।

—কিন্তু তোমার হাত-পা যে বাঁধা, দড়ি ধরবে কেমন করে?

—কুমার, কেন মিছে সময় নষ্ট করছ, শীগগির দড়ি ঝুলিয়ে দাও।

বিমলের ব্যাগটা সেইখানেই পড়ে ছিল— ভাগ্যে করালীরা সেটাও নিয়ে যায়নি। রামহরি তখনই তার ভিতর থেকে খানিকটা মোট দড়ি বার করে আনলে।

জোর বাতাস বইছে আর প্রতি দমকাতেই ঝোপটা দুলে দুলে উঠছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিমলের দেহ নেমে যাচ্ছে নীচের দিকে। কি ভয়ানক অবস্থা তার! আমার বুকটা ভয়ে ঢিপ ঢপ করতে লাগল।

বিমল বললে, দড়িটা ঠিক আমার মুখের কাছে ঝুলিয়ে দাও। আমি দাঁত দিয়ে দড়িটা ভালো করে কামড়ে ধরলে পর তোমরা দুজনে আমাকে ওপরে টেনে তুলো।

আমি একবার সার্কাসে একজন সাহেবকে দাঁত দিয়ে আড়াই মণ ভারি মাল টেনে তুলতে দেখেছিলুম। জানি বিমলের গায়ে খুব জোর আছে, কিন্তু তার দাত কি তেমন শক্ত হবে?

হঠাৎ বিষম একটা ঝোড়ো বাতাস এসে ঝোপের উপরে ধাক্ক। মেরে বিমলের দেহকে আরো খানিকটা নীচের দিকে নামিয়ে দিলে— কোনরকমে দেহটাকে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে বিমল একরকম আলগোছেই শূণ্যে ঝুলতে লাগল। তার প্রাণের ভিতরটা তখন যে কি রকম করছিল, সেট। তার মড়ার মত সাদা মুখ দেখেই বেশ বুঝতে পারলুম। হাওয়ার আর একটা দমকা এলেই বিমলকে কেউ আর বাঁচাতে পারবে না।

তাড়াতাড়ি দড়ি ঝুলিয়ে দিলুম–একেবারে বিমলের মুখের উপরে। বিমল প্রাণপণে দড়িটা কামড়ে ধরলে।

আমি আর রামহরি দুজনে মিলে দড়ি ধরে টানতে লাগলুম— দেখতে দেখতে বিমলের দেহ পাহাড়ের ধারের কাছে উঠে এল; তার মুখ তখন রক্তের মতন রাঙা হয়ে উঠেছে—সামান্য দাঁতের জোরের উপরেই আজ নির্ভর করছে তার বাঁচন-মরণ!

রামহরি বললে, ছোটবাবু, তুমি একবার একলা দড়িটা ধরে থাকতে পারবে? আমি তাহলে খোকাবাবুকে, হাতে করে ওপরে তুলে নি?

আমি বললুম, পারব।

রামহরি দৌড়ে গিয়ে বিমলকে একেবারে পাহাড়ের উপরে, নিরাপদ স্থানে তুলে ফেললে। তারপর তাকে নিজের বুকের ভিতরে টেনে নিয়ে আনন্দের আবেগে কাঁদতে লাগল। আমি গিয়ে তার বাঁধন খুলে দিলুম।

বললুম, বিমল, কি করে তুমি ওদের হাতে গিয়ে পড়লে?

বিমল বললে, নিজের মনে গান গাইতে গাইতে আমি এগিয়ে যাচ্ছিলুম, ওরা বোধহয় পথের পাশে লুকিয়ে ছিল, হঠাৎ পিছন থেকে আমার মাথায় লাঠি মারে, আর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।

আমি বললুম, তারপর যা হয়েছে, আমি সব দেখেছি। তোমাকে যে আবার ফিরে পাব, আমরা তা একবারও ভাবতে পারিনি।

বিমল হেসে বললে, হ্যাঁ, এতক্ষণে নিশ্চয় আমি পরলোকে ভ্রমণ করতুম—কিন্তু ভাগ্যে ঠিক আমার পায়ের তলাতেই ঝোপটা ছিল। রাখে কৃষ্ণ মারে কে?

আমি মিনতির স্বরে বললুম, বিমল, আর আমাদের যকের ধনে কাজ নেই—প্রাণ নিয়ে ভালোয় ভালোয় দেশে ফিরে যাই চল।

বিমল বললে, তেমন কাপুরুষ আমি নই৷ তোমার ভয় হয়, তুমি যাও। আমি কিন্তু শেষ পর্যন্ত না দেখে এখান থেকে কিছুতেই নড়ব না?

0 Next
Continue to next part Up next গাছের ফাঁকে ফাঁড়া
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.