Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

দুটো জ্বলন্ত চোখ

3.8K 733 0

বিমলের গল্প শুনে আমার আঁৎটা কেমন ছাং-ছাৎ করতে লাগল, গুহার বাইরে আর চাইতেই ভরসা হল না—কে জানে, সেখানে ঝোপঝাপের মধ্যে কোন বিদ্‌কুটে চেহারা ওৎ পেতে বসে আছে হয়তো!

আমার মুখের ভাব দেখে বিমল হেসে বললে, ও কি হে কুমার, তোমার ভয় করছে নাকি?

—তা একটু একটু করছে বৈকি?

—এই না বললে, তুমি ভূত মানে না?

—হুঁ, আগে মানতুম না, কিন্তু এখন আর মানি না বলে মনে হচ্ছে না?

—ভয় কি কুমার, আমার বিশ্বাস এ গল্পটার একবর্ণও সত্যি নয়, আগগোড়া গাঁজাখুরি। ভূতের গল্পমাত্রই রূপকথা, পাছে লোকে বিশ্বাস না করে, তাই তাকে সত্যি বলে আসর জমানো হয়।

কিন্তু তবু আমার মন মানল না, বিমলকে কিছুতেই আমার কাছছাড়া হতে দিলুম না। ভয়ের চোটে রামহরির রান্না রামপাখির মিষ্টি মাংস পর্যন্ত তেমন তারিয়ে খেতে পারলুম না।

গুহার বাইরের দিকে বিমল অনেকগুলো সরল কাঠ ছড়িয়ে আগুন জ্বেলে বললে, কোন জীবজন্তু আর আগুন পেড়িয়ে এগিয়ে আসতে পারবে না। তোমরা দুজনে এখন ঘুমোও—আমি জেগে পাহারা দি। আমার পর কুমারের পালা, তারপর রামহরির।

ছাতকের ডাক-বাংলোর সেই ব্যাপারের পর থেকে রোজ রাত্রেই আমরা এমনি পালা করে পাহারা দি।

আমি আর রামহরি গায়ের কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম।. মাঝরাত্রে বিমল আমাকে ঠেলে তুলে বললে, কুমার, এইবার তোমার পালা?

শীতের রাত্রে লেপ ছাড়তে কি সাধ যায়—বিশেষ এই বনেজঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে! কিন্তু তবু উঠতে হল,—কি করি, উপায় তো আর নেই!

গুহার সামনের আগুন নিভে আসছিল, আরো খানকতক কাঠ তাতে ফেলে দিয়ে, কোলের উপরে বন্দুকটা নিয়ে দেয়াল ঠেসে বসলুম।

চাঁদ সেদিন মাঝরাত্রের আগেই অস্ত গিয়েছিল, বাইরে ঘুট-ঘুট করছে অন্ধকার। পাহাড়, বন, ঝোপঝাপ সমস্ত মুছে দিয়ে, জেগে আছে খালি অন্ধকারের এক সীমাহীন দৃশ্য, আর তারই ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে ঝরনার আশ্রান্ত ঝঝর, শতশত গাছের একটানা মর-মর, লক্ষ লক্ষ ঝিঝির একঘেয়ে ঝিঁ ঝিঁ ঝিঁ —।

হঠাৎ আর একরকম শব্দ শুনলুম। ঠিক যেন অনেকগুলো আঁতুড়ের শিশু কাঁদছে টেঁয়্য—টেঁয়্যা—টেঁয়্যা!

আমার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল, এই নিশুত রাতে, এমন বনবাদাড়ে এতগুলো মানুষের শিশু এল কোত্থেকে? একে আজ বিশ্রী একটা ভূতের গল্প শুনেছি, তার উপরে গহন বনের এক থমথমে অন্ধকার রাত্রি, তার উপরে আবার এই বেয়াড়া চীৎকার। মনের ভিতরে জেগে উঠল যত-সব অসম্ভব কথা।

আবার সেই অদ্ভূত কাঁদুনি।

আমার মনে হল এ অঞ্চলের যত ভূত-পেত্নী বাসা ছেড়ে চরতে বেরিয়ে গেছে, আর বাপ-মায়ের দেখা না পেয়ে ভুতুড়ে খোকারা এক সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে কান্নার কনসার্ট।

ভয়ে সিটিয়ে ভাবছি—আর একটু কোণ ধে সে বসা যাক, এমন সময়ে—ও কি ও!

গুহার বাইরে—অন্ধকারের ভিতরে দু'দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতন চোখ একদৃষ্টিতে আমার পানে তাকিয়ে আছে।

বুক আমার উড়ে গেল—এ চোখছটো যে ঠিক সেই শ্মশানের পিশাচের মত...এখানে পিশাচ আছে নাকি?

ধীরে ধীরে চোখদুটো আরো কাছে এগিয়ে এসে আবার স্থির হয়ে রইল। আমার মনে হল, আঁধার সমুদ্রে সাঁতার কাটছে যেন ফুটে আগুন-ভাটা।

আমি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলুম না—ঠক্ ঠক্‌ করে কাঁপতে কাঁপতে বন্দুকটা কোন রকমে তুলে ধরে দিলুম তার ঘোড়া টিপে—গুড় ম করে ভীষণ এক আওয়াজ হল,—সঙ্গে সঙ্গে জ্বলন্ত চোখদুটে গেল নিবে।

বন্দুকের শব্দে বিমল, রামহরি আর বাঘ। একসঙ্গেই জেগে উঠল, বিমল ব্যস্ত হয়ে বললে—কুমার, কুমার, ব্যাপার কি?

আমি বললুম, পিশাচ, পিশাচ।

—পিশাচ কি হে?

—হ্যাঁ, ভয়ানক একটা পিশাচ এসে ফুটে জ্বলন্ত চোখ মেলে আমার পানে তাকিয়েছিল, আমি তাই বন্দুক ছুড়েছি?

বিমল তখনি আমার হাত থেকে বন্দুকটা টেনে নিলে। তারপর একহাতে লণ্ঠন, আর একহাতে বন্দুক নিয়ে আগুন টপকে গুহার বাইরে গিয়ে চারিদিকে তন্ন তন্ন করে দেখে এসে বললে, কোথাও কিছু নেই। ভূতের গল্প শুনে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে কুমার, তুমি ভুল দেখেছ?

এমন সময় আবার সেই ভূতুড়ে খোকারা কোত্থেকে কেঁদে উঠল। আমি মুখ শুকিয়ে বললুম, ঐ শোনো?

—কি?

—ভূতেদের খোকার কাঁদছে। রামহরি, তুমিও শুনেছ তো?

বিমল আর রামহরি দুজনেই একসঙ্গে হে হে করে হাসি শুরু করে দিলে।

আমি রেগে বললুম, তোমরা হাসছ যে? এ কি হাসির কথা?

বিমল হাসতে হাসতে বললে, শহরের বাইরে তো কখনো পা দাওনি, শহর ছাড়া দুনিয়ার কিছুই জানো না—এখনো একটি আস্ত বুড়ো খোকা হয়ে আছ। যা শুনছ, তা ভূতেদের খোকার কান্না নয়, বকের ছানার ডাক।

—বকের ছানার ডাক?

—হ্যাঁ গো হ্যাঁ। কাছেই কোন গাছে বকের বাস আছে। বকের ছানার ডাক অনেকটা কচিছেলের কান্নার মত।

বেজায় অপ্রস্তুত হয়ে গেলুম। কিন্তু সেই জ্বলন্ত চোখদুটো তো মিথ্যে নয়। বিমল যতই উড়িয়ে দিক, আমি স্বচক্ষে দেখেছি—আর আমি যে ভুল দেখিনি, তা দিব্যি-গেলে বলতে পারি। কিন্তু আজ যে-রকম বোকা বনে গেছি, তাতে এদের কাছে সে ব্যাপার নিয়ে আপাততঃ কোন উচ্চবাচ্য না করাই ভালো।

0 Next
Continue to next part Up next পিশাচ রহস্য
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.