Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

গাছের ফাঁকে ফাঁড়া

3.8K 733 0

আবার আমাদের চলা শুরু হয়েছে। এবারে আমরা প্রাণপণে এগিয়ে চলেছি। পিছনে যখন শক্র লেগেছে, তখন যত তাড়াতাড়ি গন্তব্যস্থানে গিয়ে পৌছানো যায়, ততই মঙ্গল।

কত বন-জঙ্গল, কত ঝরনা, খাদ, কত পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই পার হয়েই যে আমরা চলেছি আর চলেছি, তাঁর আর কোন ঠিকানা নেই। মাঝে মাঝে আমার মনে হতে লাগল, আমরা যেন চলবার জন্যেই জন্মেছি, আমরা যেন মৃত্যুর দিন পর্যন্ত খালি চলবই আর চলবই। দুপুরবেলায় পাহাড় যখন উনুনে পোড়ানো চাটুর মত বিষম তেতে ওঠে, কেবল সেই সময়টাতেই আমরা চলা থেকে রেহাই পেয়ে রেঁধে-খেয়ে কিছুক্ষণ গড়িয়ে নি। রাত্রে জ্যোৎস্না না থাকলে দায়ে পড়ে আমাদের বিশ্রাম করতে হয়। নইলে চলতে চলতে রোজ আমরা দেখি,—আকাশে উষার রঙিন আভাস মস্ত এক ফাগের থালার মতন প্রথম সূর্যের উদয়, বনের পাখির ডাকে সারা পৃথিবীর জাগরণসন্ধ্যার আভাসে মেঘে মেঘে রামধমুকের সাত-রঙ সমারোহের মধ্যে সূর্যের বিদায়, তারপর পরীলোক-থেকে-উড়িয়ে দেওয়া ফামুসের মত চাদের প্রকাশ। আবার, সেই চাঁদই কতদিন আমাদের চোখের সামনেই ক্রমে স্নান হয়ে প্রভাতের সাড়া পেয়ে মিলিয়ে যায়,—ঠিক যেন স্বপ্নের মায়ার মতন।

কিন্তু করালীর আর দেখা নেই কেন? এতদিনে আবার তার সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়া উচিত ছিল—কারণ এখন সে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে যে, পকেট-বইয়ে পথের কোন ঠিকানাই লেখা নেই। সে কি হতাশ হয়ে আমাদের পিছন ছেড়ে সরে পড়েছে, না আবার কোনদিন হঠাৎ কালবোশেখীর মতই আমাদের সামনে এসে মূৰ্তিমান হবে?

এমনিভাবে দিনরাত চলতে চলতে শেষে একদিন আমরা রূপনাথের গুহার স্বমুখে এসে দাঁড়ালুম। শুনেছি এই গুহার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হলে সুদূর চীনদেশে গিয়ে হাজির হওয়া যায়। একবার এক চীন-সম্রাট নাকি এই পথ দিয়েই ভারতবর্ষ আক্রমণ করতে এসেছিলেন। অবশ্য, এটা ইতিহাসের কথা নয়, প্রবাদেই এ কথা বলে। রূপনাথের গুহা বড় হোক আর ছোট হোক তাতে কিছু এসে যায় না, আর তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকারও নেই। কিন্তু এখানে এসে আমরা আশ্বস্তির হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম—কেননা এতদিন আমরা এই গুহার উদ্দেশেই এগিয়ে আসছিলুম এবং এখানে পৌছে অন্ততঃ এইটুকু বুঝতে পারলুম যে, এইবারে আমরা নিশ্চয়ই পথের শেষ দেখতে পাব। কারণ যে জায়গায় যকের ধন আছে, এখান থেকে সে জায়গাটা খুবই কাছে—মাত্র দিন-তিনেকের পথ।

বিমল হাসিমুখে একটা গাছতলায় বসে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল।

আমি তার পাশে গিয়ে বসে বললুম, বিমল, এখনি অতটা স্ফূতি ভালো নয়!

বিমল ভুরু কুঁচকে বললে, কেন?

—মনে কর, বৌদ্ধমঠে গিয়ে যদি আমরা দেখি যে, যকের ধন সেখানে নেই,—তাহলে?

—কেনই বা থাকবে না?

—যে সন্ন্যাসী আমার ঠাকুরদাদাকে মড়ার মাথা দিয়েছিল, সে যে বাজে কথা বলেনি, তার প্রমাণ?

—না, আমার দৃঢ় বিশ্বাস সন্ন্যাসী সত্যকথাই বলেছে। অকারণে মিছেকথা বলে তার কোন লাভ ছিল না তো!

আমি আর কিছু বললুম না।

বিমল বললে, ও-সব বাজে ভাবনা ভেবে মাথা খারাপ কোরো না। আপাততঃ আজকের মত এখানে বসেই বিশ্রাম কর। তারপর কাল আবার আমরা বৌদ্ধমঠের দিকে চলতে সুরু করব।

সূর্য অস্ত গিয়েছে। কিন্তু তখনো সন্ধ্যা হতে দেরি আছে। পশ্চিমের আকাশে রঙের খেলা তখনো মিলিয়ে যায়নি—দেখলে। মনে হয়, কারা যেন মেঘের গায়ে নানা রঙের জলছবি মেরে দিয়ে গেছে।

সেদিনের বাতাসটি আমার ভারি মিষ্টি লাগছিল। বিমল নিজের মনে গান গাইছে, আর আমি চুপ করে বসে শুনছি—তার গান বাস্তবিকই শোনবার মত। এইভাবে খানিকক্ষণ কেটে গেল।

হঠাৎ সামনের জঙ্গলের দিকে আমার চোখ পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল।

আমি বেশ দেখলুম, একটা গাছের আড়াল থেকে করালীর কুৎসিত মুখখান উঁকি মারছে! কুতকুতে চোখ দুটো তার গোখরো সাপের মত তীব্র হিংসায় ভরা। আমাদের সঙ্গে চোখাচোখি হবামাত্র মুখখানা বিদ্যুতের মত সাৎ করে সরে গেল।

আমি তাড়াতাড়ি বিমলের গা টিপলুম, বিমল চমকে গান থামিয়ে ফেললে।

চুপিচুপি বললুম, করালী! বিমল একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, কৈ?

আমি সামনের জঙ্গলের গাছটার দিকে দেখিয়ে বললুম, ঐখানে? বিমল তখনি সেইদিকে যাবার উপক্রম করলে। কিন্তু আমি বাধা দিয়ে বললুম, না, যেও না। হয়তো করালীর লোকেরাও ওখানে লুকিয়ে আছে। আচমকা বিপদে পড়তে পারে।

বিমল বললে, ঠিক বলেছ। কিন্তু আমি যে আর থাকতে পারছি না, কুমার। আমার ইচ্ছে হচ্চে, এখনি ছুটে গিয়ে শয়তানের টুটি টিপে ধরি।

আমি বললুম, না, না, চল, আমরা এখান থেকে সরে পড়ি। করালী ভাবুক, আমরা ওদের দেখতে পাইনি। তারপরে ভেবে দেখা যাবে আমাদের কি করা উচিত।

চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমরা সেখান থেকে চলে এলুম। বেশ বুঝলুম, করালী যখন আমাদের এত কাছে কাছে আছে, তখন কোন-না-কোন দিক দিয়ে একটা নতুন বিপদ আসতে আর বড় দেরি নেই। যকের ধনের কাছে এসেছি বলে আমাদের মনে যে আনন্দের উদয় হয়েছিল, করালীর আবির্ভাবে সেটা আবার কর্পূরের মতন উবে গেল। কি মুস্কিল, এই রাহুর গ্রাস থেকে কি কিছুতেই আমরা ছাড়ান পাব না?

0 Next
Continue to next part Up next পথের বাধা
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.