Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

নতুন বিপদের ভয়

3.8K 733 0

তিনদিন মামার বাড়ীতে খুব আদরে কাটিয়ে মায়ের কাছ থেকে মামি বিদায় নিলুম। মা কি সহজে আমাকে ছেড়ে দিতে চান? তবু তাকে আমরা যকের ধন আর বিপদ-আপদের কথা কিছুই বলনি, তিনি শুধু জানতেন আমরা আসামে বেড়াতে যাচ্ছি।

যাবার সময়ে বিমলকে ডেকে মা বললেন, দেখো পাবা, আমার শিবরাত্রির সলতেটুকুকে তোমার হাতে সঁপে দিলুম, ওকে সাবধানে রেখ?

বিমল বললে, ভয় কি মা, কুমার তো আর কচি খোকাটি নেই, ওর জন্যে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না।

মা বললেন, না বাছা, কুমারকে তুমি কোথাও একলা ছেড়ে দিও না-ও ভারি গোঁয়ার-গোবিন্দ, কি করতে কি করে বসবে কিছুই ঠিক নেই। ও যদি তোমার মত শান্তশিষ্টটি হত তাহলে আমাকে এত ভেবে মরতে হত না?

বিমল একটু মুচকে হেসে বললে, আচ্ছা মা, আমি তো সঙ্গে রইলুম, যাতে গোঁয়ার্তুমি করতে না পারে, সেদিকে আমি চোখ রাখব।

আমি মনে মনে হাসতে লাগলুম। মা ভাবছেন আমি গোঁয়ারগোবিন্দ আর বিমল শান্তশিষ্ট। কিন্তু বিমল যে আমার চেয়ে কত বড় গোঁয়ার আর ডানপিটে, মা যদি তা ঘুণাক্ষরেও জানতেন!

মায়ের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে আমি, বিমল আর রামহরি দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়লুম—বাঘা আমাদের পিছনে পিছনে আসতে লাগল। কিন্তু শান্তিপুরের স্টেশনের ভিতরে এসে, রেলগাড়ীকে দেখেই বাঘা পেটের তলায় ল্যাজ গুজে একেবারে যেন মুসড়ে পড়ল। সে বুঝলে, আবার তাকে জন্তুদের গাড়ীর ভিতরে নিয়ে গিয়ে একলাটি বেঁধে রেখে আসা হবে।

রাণাঘাটে নেমে আমরা আসল গাড়ী ধরলুম। বিমল খুশিমুখে বললে, যাক্ এবারে আর করালীর ভয় নেই। সে হয়তো এখন আসামে বসে নিজের হাত কামড়াচ্ছে, আর আমাদের মুণ্ডুপাত করছে?

আমি বললুম, আসাম থেকে করালী এখন কলকাতায় ফিরে থাকতেও পারে।

বিমল বললে, কলকাতায় কেন, সে এখন যমালয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই। চল, গাড়ীতে উঠে বসা যাক?

অনেক রাত্রে গাড়ী সারাঘাটে গিয়ে দাঁড়াল। যে-সময়ের কথা বলা হচ্চে, পদ্মার উপর তখনে সারার বিখ্যাত পুলটি তৈরি হয়নি। সারাঘাটে সকলকে তখন গাড়া থেকে নেমে স্টীমারে করে পদ্মার ওপারে গিয়ে আবার রেলগাড়ী চড়তে হত। কাজেই সারায় এসে আমাদেরও মাল-পত্তর নিয়ে গাড়ী থেকে নামতে হল।

আগেই বলেছি, আমি কখনো কলকাতার বাইরে পা বাড়াইনি। স্টীমারে চড়ে চারিদিকের দৃশ্য দেখে আমার যেন তাক লেগে গেল! কলকাতার গঙ্গার চেয়েও চওড়া নদী যে আবার আছে, এই পদ্মাকে দেখে প্রথম সেটা বুঝতে পারলুম। আকাশে চাঁদ উঠেছে আর গায়ে জ্যোৎস্না মেখে পদ্মা নেচে, ফুলে, বেগে ছুটে চলছে— রূপোর জল দিয়ে তার ঢেউগুলি তৈরী। মাঝে মাঝে সাদা ধবধবে বালির চর চোখের সামনে কখনো জেগে উঠছে, কখনো মিলিয়ে যাচ্ছে—স্বপ্নের ছবির মতন। আমার মনে হল ঐ নিরিবিলি বালির চরগুলির মধ্যে হয়তো এতক্ষণ পরীরা এসে হাসি-খুসি, খেলাধূলা করছিল। স্টীমারের গর্জন শুনে দৈত্য বা দানব আসছে ভেবে এখন তারা ভয় পেয়ে হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে মিশিয়ে গেছে!

বালির চর এড়িয়ে স্টীমার ক্রমেই অন্য তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, খালাসীরা জল মাপছে আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি বলছে। স্টীমারের একদিকে নানা জাতের মেয়ে-পুরুষ একসঙ্গে জড়ামড়ি করে বসে, শুয়ে, দাঁড়িয়ে গোলমাল করছে, আর একদিকে ডেকের উপরে উজ্জল আলোতে চেয়ার-টেবিল পেতে বাহার দিয়ে বসে সাহেব-মেমরা খানা খাচ্ছে। খানিকক্ষণ পরে অন্যদিকে মুখ ফেরাতেই দেখি, একটা লোক আড়-চোখে আমার পানে তাকিয়ে আছে। তার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হতেই সে হন হন করে এগিয়ে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল!

স্টীমার ঘাটে এসে লাগল। আমরা সবাই একে একে নীচে নেমে স্টেশনের দিকে চললুম। আসাম মেল তখন আমাদের অপেক্ষায় দাড়িয়ে ভোঁস ভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়ছিল—আমরাও তার পেটের ভিতর ঢুকে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলুম।       কামরার জানলার কাছে আমি বসেছিলুম। প্লাটফর্মের ওপাশে আর একখানা রেলগাড়ী—সেখানাতে দাঞ্জিলিঙের যাত্রীদের ভিড়। ফাষ্ট ও সেকেণ্ড ক্লাসের সায়েব-মেমের কামরার ভিতরে বিছানা পাতছিল—একঘুমে রাত কাটিয়ে দেবার জন্যে। তাদের ঘুমের আয়োজন দেখতে দেখতে আমারও চোখ ঢুলে এল। আমিও শুয়ে পড়বার চেষ্টা করছি—হঠাৎ আবার দেখলুম, স্টীমারের সেই অচেন লোকটা প্লাটফর্মের উপরে দাঁড়িয়ে তেমনি আড়-চোখে আমাদের দিকে বারে বারে চেয়ে দেখছে।

এবার আমার ভারি সন্দেহ হল। বিমলের দিকে ফিরে বললুম, ‘ওহে, দেখ দেখ?

বিমল বেঞ্চির উপর কম্বল পাততে পাততে বললে, আর দেখাশুনে কিছু নয়—এখন চোখ বুজে নাক ডাকিয়ে ঘুমোবার সময়?

—ওহে, না দেখলে চলবে না। স্টীমার থেকে একটা লোক বরাবর আমাদের ওপর নজর রেখেছে—এখনো সে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পাহারা দিচ্ছে!

শুনেই বিমল একলাফে জানলার কাছে এসে বললে, কৈ কোথায়?

—ঐ যে।

কিন্তু লোকটাও তখন বুঝতে পেরেছিল যে, আমরা তার উপরে সন্দেহ করেছি। সে তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে সেখান থেকে সরে পড়ল।

বিমল চিন্তিতের মত বললে, তাই তো, এ আবার কে?

—করালীর চর নয় তো?

— করালী? কিন্তু সে কি করে জানবে আজ আমরা এখানে আছি?

—হয়তো করালী আমাদের চালাকি ধরে ফেলেছে! সে জানত আমরা চার দিন পরেই আবার আসামে যাব। আসামে যেতে গেলে এ পথে আসতেই হবে। তাই সে হয়তো এইখানে এতদিন ঘাঁটি আগলে বসেছিল।

— অসম্ভব নয়। আচ্ছা, একবার নেমে দেখা যাক, করালী এই গাড়ীর কোন কামরায় লুকিয়ে আছে কিনা?—এই বলেই বিমল প্লাটফর্মের উপর নেমে এগিয়ে গেল।

গাড়ী যখন ছাড়ে-ছাড়ে, বিমল তখন ফিরে এল।

আমি বললুম, কি দেখলে?

—কিছু না। প্রত্যেক কামরায় তন্নভন্ন করে খুঁজেছি—করালী কোথাও নেই। বোধ হয় আমরা মিছে সন্দেহ করেছি?

বিমলের কথায় আবার আমি অনেকট নিশ্চিন্ত হলুম-যদিও মনের মধ্যে কেমন একটা খটকা লেগে রইল।

গাড়ী ছেড়ে দিলে।

বিমল বললে, ওহে কুমার, এই বেলা যতটা পারে ঘুমিয়ে নাও – আসামে একবার গিয়ে পড়লে হয়তো আমাদের আহার-নিদ্রা একরকম ত্যাগ করতেই হবে।

বিমল বেঞ্চির উপরে 'আঃ' বলে সটান লম্ব হল, আমিও শুয়ে পড়লুম। সুখের বিষয়, এ কামরায় আর কেউ ছিল না, সুতরাং ঘুমে আর ব্যাঘাত পড়বার ভয় নেই।

এ চোর কে?

আমরা খাসিয়া পাহাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি—সামনে বুদ্ধদেবেৰ এক পাথরের মূর্তি। গভীর রাত্রি, আকাশে চাঁদ নেই, সবদিকে অন্ধকার। মাথার অনেক উপরে তারাগুলো টিপ টপ করে জ্বলছে, তাদের আলোতে আশেপাশে ঝাপসা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো পাহাড়ের মাথা—আমার মনে হল সেগুলো যেন বড় বড় দানবের কালে কালে মায়ামূৰ্তি। তারা যেন প্রেতপুরীর পাহারাওয়ালার মত ওৎ পেতে হুমড়ি খেয়ে রয়েছে। এখনি হুড়মুড় করে আমাদের ঘাড়ের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে! চারিদিক এত স্তব্ধ যে গায়ে কাঁটা দেয়, বুক ছাৎ ছাৎ করে! শুধু রাত করছে—ঝিম্ ঝিম্ ঝিম্ ঝিম্ আর ভয়ে কেঁপে গাছপালা করছে—সর সর সর সর।

বিমল চুপিচুপি আমাকে বললে, এই বুদ্ধদেবের মূর্তি! এইখানেই যকের ধন আছে?

হঠাৎ কে খল খল করে হেসে উঠল—সে বিকট হাসির প্রতিধ্বনি যেন পাহাড়ের মাথাগুলো টপকে লাফাতে লাফাতে কোথায় কতদূরে কোন চির-অন্ধকারের দেশের দিকে চলে গেল।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলুম, রামহরি আঁতকে উঠে দু-হাতে মুখ ঢেকে ধুপ করে বসে পড়ল, বাঘা আকাশের দিকে মুখ তুলে ল্যাজ গুটিয়ে কেঁউ কেঁউ করে কাঁদতে লাগল।

বিমল সাহসে ভর করে বললে, কে হাসলে?

আবার সেই খল খল করে বিকট হাসি! কে যে হাসছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তবে সে হাসি নিশ্চয়ই মানুষের নয়। মানুষ কখনো এমন ভয়ানক হাসি হাসতে পারে না!

বিমল আবার বললে, কে তুমি হাসছ?

—আমি? উঃ, সে স্বর কি গম্ভীর!

—কে তুমি? সাহস থাকে আমার সামনে এস?

—আমি তোমার সামনেই আছি।

—মিথ্যে কথা! আমার সামনে খালি বুদ্ধদেবের মূর্তি আছে?

—হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! আমাকে বুদ্ধদেবের মূর্তি ভাবচ? চেয়ে দেখ ছোকরা, আমি যক!

বুদ্ধদেবের সেই মূর্তিটা একটু একটু নড়তে লাগল, তার চোখ ছটো ধক ধক করে জ্বলে উঠল।

বিমল বন্দুক তুললে। মূর্তিটা আবার খল খল করে হেসে বললে, তোমার বন্দুকের গুলিতে আমার কিছুই হবে না।

বিমল বললে, কিছু হয় কিনা দেখাচ্ছি? সে বন্দুকের ঘোড়া টিপতে উদ্যত হল।

আকাশ-কাঁপানো স্বরে মূর্তি চেঁচিয়ে বললে, 'খবৰ্দার! তোমার গুলি লাগলে আমার গায়ের পাথর চটে যাবে! বন্দুক ছুড়লে তোমারি বিপদ হবে।’.

—‘হোকগে বিপদ-বিপদকে আমি ডরাই না!

—জানো আমি আজ হাজার হাজার বছর ধরে এইখানে বসে আছি, আর তুমি কালকের ছোকরা হয়ে আমার শান্তিভঙ্গ করতে এসেছ? কি চাও তুমি?

—গুপ্তধন।

—হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! গুপ্তধন চাও,—ভারি আম্বা যে! এই গুপ্তধন নিতে এসে এখানে তোমার মত কত মানুষ মারা পড়েছে ত৷ জানো? ঐ দেখ তাদের শুকনো হাড়?

মূর্তির চোখের আলোতে দেখলুম, একদিকে মস্তবড় হাড়ের ঢিপি —হাজার হাজার মানুষের হাড়ে সেই ঢিপি অনেকখানি উঁচু হয়ে উঠেছে!

বিমল একটুও না দমে বললে, ও দেখে আমি ভয় পাই না— আমি গুপ্তধন চাই।

—আমি গুপ্তধন দেব না?

—দিতেই হবে।

—না, না, না?

—তাহলে বন্দুকের গুলিতে তোমার আগুন-চোখ কানা করে দেব!

গর্জন করে মূর্তি বললে, তার আগেই তোমাকে আমি বধ করব।

—তুমি তো পাথর, এক পা এগুতে পার না, আমি তোমার নাগালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তুমি কি করবে?

— হাঃ হাঃ হাঃ, চেয়ে দেখ এখানে চারিদিকেই আমার প্রহরীরা দাঁড়িয়ে আছে! আমার হুকুমে এখনি ওরা তোমাদের টিপে মেরে ফেলবে?

—কোথায় তোমার প্রহরী?

—প্রত্যেক পাহাড় আমার প্রহরী!

—ওরাও তো পাথর, তোমার মত নড়তে পারে না। ওসব বাজে কথা রেখে হয় আমাকে গুপ্তধন দাও —নয় এই তোমাকে গুলি করলুম!—বিমল আবার বন্দুক তুললে।

—তবে মর। প্রহরী! মূর্তির আগুন-চোখ নিবে গেল— সঙ্গে সঙ্গে পলক না যেতেই অন্ধকারের ভিতর অনেকগুলো পাহাড়ের মত মস্তবড় কি কতকগুলো লাফিয়ে উঠে আমাদের উপরে হুড়মুড় করে এসে পড়ল। বিষম এক ধাক্কায় মাটির উপর পড়ে অসহ্য যাতনায় চেঁচিয়ে আমি বললুম–বিমল –বিমল—

আমার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখলুম, রেলগাড়ীর বেঞ্চের উপর থেকে গড়িয়ে আমি নীচে পড়ে গেছি, আর বিমল আমার মুখের উপরে বুকে বলছে, ভয় কি কুমার, সে রাস্কেল পালিয়েছে?

তখনো স্বপ্নের ঘোর আমার যায়নি,—আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, যক আর নেই?

বিমল আশ্চর্যভাবে বললে, যকের কথা কি বলছ কুমার?

আমি উঠে বসে চোখ-কচলে অপ্রস্তুত হয়ে বললুম, বিমল, আমি এতক্ষণ একটা বিদঘুটে স্বপ্ন দেখছিলুম। শুনলে তুমি অবাক হবে?

বিমল বললে, আর গাড়ীর ভিতরে এখনি যে কাণ্ডটা হয়ে গেল, তা মোটেই স্বপ্ন নয়! শুনলে তুমিও অবাক হবে।

আমি হতভম্বর মত বললুম, গাড়ীর ভেতরে আবার কি কাণ্ড হল?

বিমল বললে, একটা চোর এসেছিল।

—চোর? বল কি?

—হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, একটা লোক আমাদের ব্যাগ হাতড়াচ্ছে! আমি তখনি উঠে তার রগে এক ঘুসি বসিয়ে দিলুম, সে ঠিকরে তোমার গায়ের উপরে গিয়ে পড়ল—সঙ্গে সঙ্গে তুমিও আঁতকে উঠে বেঞ্চির তলায় হলে চিৎপাত! লোকটা পড়েই আবার দাঁড়িয়ে উঠল, তারপর চোখের নিমেষে জানলা দিয়ে বাইরে একলাফ মেরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

—চলন্ত ট্রেন থেকে সে লাফ মারলে? তাহলে নিশ্চয়ই মারা পড়েছে!’

—বোধ হয় না। ট্রেন তখন একটা স্টেশনের কাছে আস্তে আস্তে চলছিল।

—আমাদের কিছু চুরি গিয়েছে নাকি?

—হুঁ। মড়ার মাথাটা। বলেই বিমল হাসতে লাগল।

—বিমল, মড়ার মাথাটা আবার চুরি গেল, আর তোমাব মুখে তবু হাসি আসছে?

—হাসব না কেন, চোর যে জাল মড়ার মাথা নিয়ে পালিয়েছে!

—“জাল মড়ার মাথা! সে আবার কি?

—তোমাকে তবে বলি শোনো। এ-রকম বিপদ যে পথে ঘটতে পারে, আমি তা আগেই জানতুম। তাই কলকাতা থেকে আসবার আগেই আমাদের পাড়ার এক ডাক্তারের কাছ থেকে আর একটা নতুন মড়ার মাথা জোগাড় করেছিলুম। নতুন মাথাটার উপরেও আসল মাথায় যেমন অঙ্ক আছে, তেমনি অঙ্ক ক্ষুদে দিয়েছি,— তবে এর মানে হচ্ছে একেবারে উল্টো! এই নকল মাথাটাই ব্যাগের ভেতরে ছিল। আমি জানতুম মড়ার মাথা চুরি করতে আবার যদি চোর আসে, তবে নকলটাকে নিয়েই সে তুষ্ট হয়ে যাবে। হয়েছেও তাই?

—‘বিমল, ধণ্যি তোমার বুদ্ধি! তুমি যে এত ভেবে কাজ কর, আমি তা জানতুম না। আসল মড়ার মাথা কোথায় রেখেছ?

অনেকের বাড়ীতে যেমন চোর-কুঠুরি থাকে, আমার ব্যাগের ভেতরেও তেমনি একটা লুকানো ঘর আছে। এ ব্যাগ আমি অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছি। মড়ার মাথা তার ভেতরেই রেখেছি।

—কিন্তু আমাদের পিছনে এ কোন নতুন শত্রু লাগল বল দেখি?

—শত্রু আর কেউ নয়—এ করালীর কাজ! সে আমার চালাকিতে ভোলেনি, নিশ্চয় এই গাড়ীতেই কোথাও ঘুপটি মেরে লুকিয়ে আছে।

—তবেই তো!

—‘কুমার, আবার তোমার ভয় হচ্ছে নাকি?

—ভয় হচ্ছে না, কিন্তু ভাবনা হচ্ছে বটে! এই দেখ না, করালীর চর যদি আজই ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে যেত?

—করালী আমাদের সঙ্গে নেই, এই ভেবে আমরা অসাবধান হয়েছিলুম বলেই আজ এমন কাণ্ড ঘটল। এখন থেকে আবার সাবধান হব—রামহরি আর বাঘাকে সর্বদাই কাছে কাছে রাখব, আর সকলে মিলে একসঙ্গে ঘুমবও না।

—‘করালী যখনি জানবে সে জাল মড়ার মাথা পেয়েছে, তখনি আবার আমাদের আক্রমণ করবে।

—আমরাও প্রস্তুত। কিন্তু সে যদি সাঙ্কেতিক লেখা এখনো পড়তে না পেরে থাকে, তবে এ জাল ধরা তার কর্ম নয়?

গাড়ী তখন উধ্বশ্বাসে ছুটছে আর আমাদের চোখের সুমুখ দিয়ে চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল বন-জঙ্গল-মাঠের দৃশ্যের পর দৃশ্য ভেসে যাচ্ছে —ঠিক যেন বায়োস্কোপের ছবির পর ছবি! আমার আর ঘুমোবার ভরসা হল না—বাইরের দিকে চেয়ে, বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলুম। প্রতি মিনিটেই গাড়ী আমাদের দেশ থেকে দূরে —আরও দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলছে, কত অজানা বিপদ আমাদের মাথার উপরে অদৃশ্যভাবে ঝুলছে! জানি না, এই পথ দিয়ে এ জীবনে কখনো দেশে ফিরতে পারব কি না!

ছাতকে

আজ আমরা শ্রীহট্টে এসে পৌছেছি।

বিমল বললে, কুমার, এই সেই শ্রীহট্ট।

আমি বললুম, হ্যাঁ, এই হচ্ছে সেই কমলালেবুর বিখ্যাত জন্মভূমি?

বিমল বললে, উঁহু, কমলালেবু ঠিক শ্রীহট্ট শহরে তো জন্মায় না, তবে এখানকার প্রধান নদী সুরমা দিয়েই নৌকায় চড়ে কমলালেবু কলকাতায় যাত্রা করে বটে। খালি কমলালেবু নয়, এখানকার কমলামধুও যেমন উপকারী, তেমনি উপাদেয়।

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, ও অঞ্চলে আরো কি পাওয়া যায়?

—‘পাওয়া যায় অনেক জিনিস, যেমন আলু, কুমড়ো, শশা, আনারস, তুলো, আখ, তেজপাতা, লঙ্কা, মরিচ, ডালচিনি আর চূণ প্রভৃতি। এসব মাল এ অঞ্চল থেকেই রপ্তানি হয়। কিন্তু এখানকার পান-সুপারির কথা শুনলে তুমি অবাক হবে!

—অবাক হব? কেন?

—বাংলা দেশের মত এখানে পানের চাষ হয় না, কিন্তু এদেশে পানের সঙ্গে সুপারির বড় ভাব। বনের ভেতরে প্রায়ই দেখবে, সুপারি-কুঞ্জেই পান জন্মেছে, সুপারি গাছের দেহ জড়িয়ে পানের লতা উপরে উঠেছে। তাছাড়া, এখানকার “সফলাং” আর একটি বিখ্যাত জিনিস।

—সফলাং! সে আবার কি?

—কেশুরের মত একরকম মূল। খাসিয়ারা খেতে বড় ভালবাসে।

সারাদিন আমরা শ্রীহট্টেই রইলুম। এখান থেকে আমাদের গন্তব্যস্থান খাসিয়া পাহাড়কে দেখতে পেলুম। মনে হল, এর বিশাল বুকের ভিতরে না জানি কত রহস্যই লুকানো আছে, সে রহস্যের মধ্যে ডুব দিলে আর থই পাব কিনা, তাই বা কে বলতে পারে? এ তো আর কলকাতার রাস্তার কোন নম্বর-জানা বাড়ীর খোঁজে যাচ্ছি না, এই অশেষ পাহাড়-বন-জঙ্গলের মধ্যে কোথায় আছে যকের ধন, কি করে আমরা তা টের পাব? এখন পর্যন্ত করালী বা তার কোন চরের টিকিট পর্যন্ত দেখতে না পেয়ে আমরা তবু অনেকটা আশ্বস্ত হলুম। বুঝলুম, জাল মড়ার মাথা পেয়ে করালী এতটা খুসি হয়েছে যে, আমাদের উপরে আর পাহারা দেওয়া দরকার মনে করছে না! বাঁচা গেছে। এখন করালীর এই ভ্রমটা কিছুদিন স্থায়ী হলেই মঙ্গল। কারণ তার মধ্যেই আমরা কেল্লা ফতে করে নিশ্চয় দেশে ফিরে যেতে পারব।

মাঝ-রাত্রে স্টীমারে চড়ে, সুরমা নদী দিয়ে পরদিন সকালে ছাতকে গিয়ে পৌছলুম।

সুরমা হচ্ছে শ্রীহট্টের প্রধান নদী। ছাতকও এই নদীর তীরে অবস্থিত। কলকাতায় ছাতকের চূণের নাম আমরা আগেই শুনেছিলুম। তবে এ চুণের উৎপত্তি ছাতকে নয়, চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে খাসিয়া পাহাড়ে এই চূণ জন্মে, সেখান থেকে রেলে করে ও নৌক৷ বোঝাই হয়ে ছাতকে আসে এবং ছাতক থেকে আরো নানা জায়গায় রপ্তানি হয়। চেরাপুঞ্জিতে খালি চূণ নয়, আগে সেখানে লোহার খনি থেকে অনেক লোহা পাওয়া যেত, সেই সব লোহায় প্রায় আড়াইশো বছর আগে বড় বড় কামান তৈরি হত। কিন্তু বিলাতী লোহার উপদ্রবে খাসিয়া পাহাড়ের লোহার কথা এখন আর কেউ ভুলেও ভাবে না। চূণ ও লোহা ছাড়া কয়লার জন্যেও খাসিয়া পাহাড় নামজাদা। কিন্তু পাঠাবার ভালো বন্দোবস্ত না থাকার দরুণ, এখানকার কয়লা দেশ-দেশান্তরে যায় না।

ছাতক জায়গাটি মন্দ নয়। এখানে থানা, ডাক্তারখানা, পোস্টআপিস, বাজার ও মাইনর ইস্কুল—কিছুরই অভাব নেই। একটি ডাক-বাংলোও আছে, আমরা সেইখানে গিয়েই আশ্রয় নিলুম। বিমলের মুখে শুনলুম, এখানে পিয়াইন নামে একটি নদী আছে, সেই নদী দিয়েই আমাদের নৌকায় চড়ে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত যেতে হবে—এ সময়ে নদীর জল কম বলে নৌকো তার বেশী আর চলবে না। কাজেই ভোলাগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক হেঁটে আমরা থারিয়াঘাটে যাব, তারপর পাথর-বাধানে রাস্তা ধরে খাসিয়া পাহাড়ে উঠব। আজ ডাক-বাংলোয় বিশ্রাম করে কাল থেকে আমাদের যাত্রা আরম্ভ।

ছাতক থেকে খাসিয়া পাহাড়ের দৃশ্য কি চমৎকার! নীলরঙের প্রকাণ্ড মেঘের মত, দৃষ্টি-সীমা জুড়ে আকাশের খানিকট ঢেকে খাসিয়া পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, যতদূর নজর চলে—পাহাড়ের যেন আর শেষ নেই! পাহাড়ের কথা আমি কেতাবে পড়ে হলুম, কিন্তু চোখে কখনো দেখিনি, পাহাড় যে এত সুন্দর তা আমি জানতুম না; আমার মনে হতে লাগল, খাসিয়া পাহাড় যেন আমাকে ইসারা করে কাছে ডাকছে—ইচ্ছে হল তখনি এক ছুটে তার কোলে গিয়ে পড়ি।

সন্ধ্যার সময় খানিক গল্পগুজব করে আমরা শুয়ে পড়লুম। বেশ একটু শীতের আমেজ দিয়েছিল, লেপের ভিতরে ঢুকে কি আরামই পেলুম!

বিমলও তার লেপের ভিতরে ঢুকে বললে, ঘুমিয়ে নাও ভাই, নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে নাও। কাল এমন সময়ে আমরা খাসিয়া পাহাড়ে, এত আরামের ঘুম আর হয়তে হবে না?

আমি বললুম, কিন্তু আমরা তো ঘুমবো, পাহার দেবে কে?

বিমল বললে, সে ব্যবস্থা আমি করেছি। দরজার বাইরে বারান্দায় রামহরি আর বাঘা শুয়ে আছে। তার ওপরে দরজাজানলাগুলোও ভেতর থেকে আমি বন্ধ করে দিয়েছি।

আমার উদ্বেগ দূর হল। যদিও শত্রুর দেখা নেই, তবু সাবধানে থাকাই ভালো!

0 Next
Continue to next part Up next বিনি-মেঘে বাজ
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.