Skip to content
An adventure-themed illustration for যকের ধন

মরণের মুখে

3.8K 733 0

দিন-তিনেক পর রামহরির অসুখ সেরে গেল, আমাদেরও যাত্রা আবার সুরু হল। আবার আমরা পাহাড়ের পথ ধরে অজানা রহস্যের দিকে এগিয়ে চললুম।

বিমল বললে, আমি একটু এগিয়ে যাই, আজকের পেটের খোরাক যোগাড় করতে হবে তো,—পাখি-টাখি কিছু মেলে কিনা দেখা যাক।—এই বলে সে বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে হনহন করে এগিয়ে চলল, খানিক পরেই আঁকাবাঁকা পথের উপরে আর তাকে দেখা গেল না—কেবল শুনতে পেলুম গলা ছেড়ে সে গান ধরেছে—

‘আগে চল, আগে চল ভাই!

পড়ে থাকা পিছে মরে থাকা মিছে,

বেঁচে মরে কিবা ফল ভাই।

ক্রমে সে গানের আওয়াজও আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। রামহরির শরীর তখনে বেশ কাহিল হয়েছিল, সে তাড়াতাড়ি চলতে পারছিল না, কাজেই আমাকে বাধ্য হয়েই তার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হল।

সেদিন সকালের রোদটি আমার ভারি ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল যেন সারা পাহাড়ের বুকের উপরে কে কাঁচা সোনার মত মিঠে হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে। হরেকরকম পাখির গানে চারিদিক মাৎ হয়ে আছে, গাছপালার উপরে সবুজের ঢেউ তুলে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর এখানে-ওখানে আশেপাশে গোছা-গোছ। রঙিন বনফুল ফুটে, সোহাগে তুলে তুলে মাথা নেড়ে যেন বলছে—আমাদের নিয়ে মালা গাথা, আমাদের আদর কর, আমাদের মনে রেখ–ভুলো না?

কচি-কচি ফুলগুলিকে দেখে মনে হল, এরা যেন বনদেবীর খোকা-খুকি। আমি বেছে বেছে অনেক ফুল তুললুম, কিন্তু কত আর তুলব—এত ফুল দুনিয়ার কোন ধনীর মস্ত মস্ত বাগানেও যে ধরবে না।

এমনি নানা জাতের ফুল এদেশের সব জায়গাতেই আছে। কিন্তু আমাদের স্বদেশ যে কত বড় ফুলের দেশ, আমরা নিজেরাই সে খবর রাখি না। আমরা বোকার মত হাত গুটিয়ে বসে থাকি, আর এই সব ফুলের ভাণ্ডার দু-হাতে লুট করে নিয়ে যায় বিদেশী সাহেবরা। তারপর বড় বড় শহরের বাজারে সেই সব ফুল চড়া দামে বিকিয়ে যায়—কেনে অবশ্ব সাহেবরাই বেশী। এ থেকেই বেশ বুঝতে পারি, আমাদের ব্যবসা-বুদ্ধি তো নেই-ই—তারপরে সবচেয়ে যা লজ্জার কথা, স্বদেশের জিনিসকে ও আমরা তাদর করতে শিখিনি।

এই ভাবতে ভাবতে পথ চলছি, হঠাৎ রামহরি বলে উঠল, ছোটবাবু, দেখুন—দেখুন!

আমি ফিরে বললুম, কি?

রামহরি আঙুল দিয়ে মাটির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে। পথের উপর একটা বন্দুক পড়ে রয়েছে। দেখেই চিনতে পারলুম, সে বিমলের বন্দুক।

দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম, পথের মাঝখানে বন্দুক ফেলে বিমল গেল কোথায়? সে তো বন্দুক ফেলে যাবার পাত্র নয়।

ব্যাপারটা সুবিধের নয়, একটা কিছু হয়েছেই। তারপর মুখ তুলেই দেখি, বাঘা একমনে একটা জায়গা শুকছে, আর একটা কাতর কুইকুই শব্দ করছে।

এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখি, সেখানে খানিকটা রক্ত চাপ বেঁধে রয়েছে।

রামহরি প্রায় কেঁদে ফেলে বললে, খোকাবাবু নিশ্চয় কোন বিপদে পড়েছেন।

আমি বললুম, হ্যাঁ। রামহরি, আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু কি বিপদ?

রামহরি বললে, কি করে বলব ছোটবাবু, এখানে যে বাঘভালুক সবই আছে।

আমি বললুম, বাঘে মানুষ খায় বটে, কিন্তু ব্যাগ নিয়ে তো যায় না! বিমল বাঘের মুখে পড়েনি, তাহলে বন্দুকের সঙ্গে তার ব্যাগটাও এখানে পড়ে থাকত।

—তবে খোকাবাবু কোথায় গেলেন? এই বলেই রামহরি চেঁচিয়ে বিমলকে ডাকবার উপক্রম করলে।

আমি তাড়াতাড়ি তাকে বাধা দিয়ে বললুম, চুপ, চুপ,—চেঁচিও না। আমার বিশ্বাস বিমল শত্রুর হাতে পড়েছে, আর শক্রর কাছেই আছে, চ্যাঁচালে আমরাও এখনি বিপদে পড়ব।

—তাহলে উপায়?

—তুমি এইখানে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকে। বাঘাকেও ধরে রাখে, নইলে বাঘাও হয়তো চেঁচিয়ে আমাদের বিপদে ফেলবে। আমি আগে এদিক-ওদিক একবার দেখে আসি।

বাঘার গলায় শিকলি বেঁধে রামহরি পথের পাশেই একটা ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে বসল।

প্রথমে কোনদিকে যাব আমি তা বুঝতে পারলুম না। কিন্তু একটু পরেই দেখলুম, খানিক তফাতে আরো রক্তের দাগ রয়েছে— আরো খানিক এগিয়ে দেখলুম আরো রক্তের দাগ। তৃতীয় দাগের পরেই একটা ঝোপের পাশে খুব সরু পথ, সেই পথের উপরে লম্বা দাগ—যেন কারা একটা মস্ত বড় মোট ধুলোর উপর দিয়ে টেনেহিচড়ে নিয়ে গিয়েছে।

আমি সেই সরু পথ ধরলুম—সে পথেও মাঝে মাঝে রক্তের দাগ দেখে বুঝতে দেরি লাগল না যে, এইদিকে গেলেই বিমলের দেখা পাওয়া যাবে।

কিন্তু বিমল বেঁচে আছে কি? এ রক্ত কার? তাকে ধরে নিয়ে গেলই বা কারা? সে কি ডাকাতের হাতে পড়েছে?–কিন্তু এসব কথার কোন উত্তর মিলল না।

আচম্বিতে আমার পা থেমে গেল—খুব কাছেই যেন কাদের গলা শোনা যাচ্ছে।

আমার হাতের বন্দুকটা একবার পরখ করে দেখলুম, তার ছুটে ঘরেই টোটা ভরা আছে। তারপর ঝোপের পাশে পাশে গুড়ি মেরে খুৱ সন্তপর্ণে সামনের দিকে অগ্রসর হলুম।

আর বেশী এগুতে হল না—সরু পথট। যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে অল্প খানিকট। খালি জমি, তারপরেই পাহড়ের খাদ। —

যে দৃশ্য দেখলুম জীবনে তা ভুলব না। সেই খোলা জমির উপরে জন কয়েক লোক দাঁড়িয়ে আছে—তাদের একজনকে দেখেই চিনলুম সে করালী!

আর একদিকে পাহাড়ের খাদের ধারেই একট, বড় গাছ হেলে পড়েছে এবং তারই তলায় পড়ে রয়েছে বিমলের দেহ। তার মাথা ও মুখ রক্তমাখা, আর হাত ও কোমরে দড়ি বাঁধা। বিমলের উপরে হুমড়ি খেয়ে বসে আছে করালীর দলের আর-একটা লোক।

শুনলুম, করালী চেঁচিয়ে বলছে, ‘বিমল, এখনো কথার জবাব দাও। তোমার ব্যাগের ভেতরে পকেট-বই নেই, সেখান কোথায় আছে বল।

কিন্তু বিমল কোন উত্তর দিলে না। —তাহলে তুমি মরতে চাও?

বিমল চুপ।

করালী বললে, শম্ভু!

যে লোকটা দড়ি ধরেছিল, মুখ ফিরিয়ে বললে, ‘আজ্ঞে।

লোকটাকে চিনলুম, ছাতকের ডাক-বাংলোয় দেখেছিলুম। করালী বললে, দেখ শম্ভু, আর একমিনিটের মধ্যে বিমল যদি আমার কথার জবাব না দেয়, তবে তুমি ওকে তুলে খাদের ভেতরে ছুড়ে ফেলে দিও।

কয়েক সেকেণ্ড কেটে গেল, আমার বুকটা ধুকপুক করতে লাগল, কি যে করব কিছুই স্থির করতে পারলুম না।

করালী বললে, “বিমল, এই শেষবার তোমাকে বলছি। যদি সাড়া না দাও, তবে তোমার কি হবে বুঝতে পারছ তো? একেবারে হাজার ফুট নীচে পড়ে তোমার দেহ গুড়িয়ে ধুলো হয়ে যাবে, একটু চিহ্ন পর্যন্ত থাকবে না।

বিমল তেমনি বোবার মতন রইল। আর এ দৃশ্য সহ করা অসম্ভব। ঠিক করলুম করালী যা জানতে চায়, আমিই তার সন্ধান দেব! কাজ নেই আর যকের ধনে, টাকার চেয়ে প্রাণ ঢের বড় জিনিস। মনস্থির করে আমি উঠে দাঁড়ালুম।

করালী বললে, বিমল, এখনো তুমি চুপ করে আছ? এতক্ষণ পরে বিমল বললে, পকেট-বই পেলেই তো তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?

করালী বললে, নিশ্চয়।

বিমল বললে, ব্যাগের মধ্যে আমার একটা জামার ভেতরদিককার পকেট খুঁজলেই তুমি পকেট-বই পাবে।

ব্যাগটা করালীর সামনেই পড়ে ছিল, সে তখনই তার ভিতরে হাত পুরে দিল। একটু চেষ্টার পরেই পকেট-বই বেরিয়ে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে করালীর মুখে একটা পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু এ হাসি দেখে এত বিপদেও আমার হাসি পেল। কারণ আমি জানি, পকেট-বই থেকে পথের ঠিকানার কথা বিমল আগেই মুছে দিয়েছে। এত বিপদেও বিমল ভয় পেয়ে বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেনি, —ধণ্যি ছেলে যা হোক।

বিমল বললে, তোমাদের মনের আশা তো পূর্ণ হল, এইবার আমাকে ছেড়ে দাও।

করালী কর্কশ স্বরে বললে, ‘হ্যাঁ, ছেড়ে দেব বৈকি—শত্রুর শেষ রাখব না। শম্ভু, আর কেন, ছোড়াকে নিশ্চিন্তপুরে পাঠিয়ে দাও।

বিমল চেঁচিয়ে বলে উঠল, করালী! শয়তান! তুমি— কিন্তু তার কথা শেষ হতে না হতেই শম্ভু বিমলকে ধরে হিড়হিড় করে টেনে খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে একেবারে ঠেলে ফেলে দিলে এবং চোখের পলক না পড়তেই বিমলের দেহ ঝুপ করে নীচের দিকে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের উপরে একটা অন্ধকারের পর্দা নেমে এল বা মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে যেতে যেতে আবার আমি শুনলুম —করালীর সেই ভীষণ অট্টহাসি...তারপরেই আমি একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেলুম।

0 Next
Continue to next part Up next অবাক কাণ্ড
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.