জীবনে এমন বুক-দমানে হাসি শুনিনি,—সে হাসি শুনলে কবরের ভিতরে মড়াও যেন চমকে জেগে শিউরে ওঠে।
হাসির তরঙ্গে সমস্ত সুড়ঙ্গ কাঁপতে লাগল।
আমার মনে হল বহুকাল পরে সুড়ঙ্গের মধ্যে মানুষের গন্ধ পেয়ে যক আজ প্রাণের আনন্দে হাসতে সুরু করেছে – কতকাল অনাহারের পর আজ তার হাতের কাছে খোরাক গিয়ে আপনি উপস্থিত!
উপরে গর্তের মুখ বন্ধ—ভিতরে এই কাণ্ড! এ জীবনে আর যে কখনো চন্দ্র-সূর্যের মুখ দেখতে পাব না, তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই! হাসির আওয়াজ ক্রমে দূরে গিয়ে ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেল— কেবল তার প্রতিধ্বনিটা সুড়ঙ্গের মধ্যে গম গম করতে লাগল।
আর কোন বাঙালীর ছেলে নিশ্চয়ই আমাদের মতন অবস্থায় কখনো পড়েনি! আমরা যে এখনো পাগল হয়ে যাইনি, এইটেই আশ্চর্য!
তিনজনে স্তম্ভিতের মত বসে বসে পরস্পরের.মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলুম –কারুর মুখে আর বাক্য সরছে না।
বিমলের মুখে আজ প্রথম এই দুর্ভাবনার ছাপ দেখলুম। সে ভয় পেয়েছে কিনা বুঝতে পারলুম না, কিন্তু আমার মনে হল আজ সে বিলক্ষণ দমে গিয়েছে।...আর না দমে করে কি, এতেও যে দমবে না, নিশ্চয়ই সে মানুষ নয়!
প্রথম কথা কইলে রামহরি। আমাকে হাত ধরে টেনে তুলে বললে, বাবু, আর এ রকম করে বসে থাকলে কি হবে, একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো?
আমি বললুম, ব্যবস্থা আর করব ছাই। যতক্ষণ প্রাণটা আছে, নাচার হয়ে নিঃশ্বাস ফেলি এস?
বিমল বললে, কিন্তু গর্তের মুখ বন্ধ করলে কে?
আমি বললুম, যক।
বিমল মুখ ভেঙিয়ে বললে, যকের নিকুচি করেছে। আমি ওসব মানি না?
—না মেনে উপায় কি? ভেবে দেখ বিমল, যে গর্তের কথা কাকপক্ষী জানে না, সেই গর্তেরই মুখ হঠাৎ এমন বন্ধ হয়ে গেল কি করে?
বিমল চিন্তিতের মতন বললে, হ্যাঁ, সেও একটা কথা বটে।
—মনে আছে তো, কাল এই গর্তের ভিতর থেকে হু-হু করে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল?
—মনে আছে।
—আর এই বিশ্রী হাসি।
বিমল একেবারে চুপ।
হঠাৎ রামহরি চেঁচিয়ে উঠল—খোকাবাবু, দেখ—দেখ?
ও কী ব্যাপার। আমরা সকলেই স্পষ্ট দেখলুম, খানিক তফাতে সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে সে করে একটা আগুন চলে গেল।
আমি সরে এসে পাথর-চাপা গর্তের মুখে পাগলের মতন ধাক্কা মারতে লাগলুম–কিন্তু গর্তের মুখ একটুও খুলল না।
বিমল বললে, কুমার। বিজলী-মশালটা জ্বেলে আমার সঙ্গে এস। রামহরি, তুমি সকলের পিছনে থাক। আমি দেখতে চাই, ও আগুনটা কিসের!
আগুনটা তখন আর দেখা যাচ্ছিল না। বিমল বন্দুক বাগিয়ে ধরে এগিয়ে গেল, আমরাও তার পিছনে পিছনে চললুম। ভয়ে আমার বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।
খানিক দূরে গিয়েই সুড়ঙ্গটা আর একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে গিয়ে পড়েছে—সেইখানেই আগুনটা জ্বলে উঠেছিল।
সেইখানে দাঁড়িয়ে আমরা সতর্কভাবে চারিদিকে চেয়ে দেখলুম।
হাতকয়েক দূরে, মাটির উপরে কি যেন একটা পড়ে রয়েছে বলে মনে হল-বাঘা ছুটে সেইখানে চলে গেল।
বিজলী-মশালের আলোটা ভালো করে তার উপরে গিয়ে পড়তেই, বিমল বলে উঠল, ও যে দেখছি একটা মানুষের দেহের মত?
রামহরি বললে, কিন্তু একটুও নড়চে না কেন?
হঠাৎ আবার কে হেসে উঠল—হি-হি-হি-হি! কোথা থেকে কে যে সেই ভয়ানক হাসি হাসলে, আমরা কেউ তা দেখতে পেলুম না। সকলেই আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম-হাসির চোটে সমস্ত সুড়ঙ্গট আবার থর থর করে কাঁপতে লাগল!
আমি আঁতকে চেঁচিয়ে বললুম, পালিয়ে এস বিমল, পালিয়ে এস —চল আমরা গর্তের মুখে ফিরে যাই।
কিন্তু বিমল আমার কথায় কান পাতলে না—সে সামনের দিকে ছুটে এগিয়ে গেল।
সুড়ঙ্গ আবার স্তব্ধ। বিমল একেবারে সেই মামুষের দেহটার কাছে গিয়ে দাড়াল, তারপর হেঁট হয়ে তার গায়ে হাত দিয়েই বলে উঠল, কুমার, এ যে একটা মড়া!
সুড়ঙ্গের মধ্যে মানুষের মৃতদেহ। আশ্চর্য!
বিমল আবার বললে, কুমার, এদিকে এসে এর মুখের ওপরে ভালো করে আলোটা ধর তো!
আর এগুতে আমার মন চাইছিল না, কিন্তু বাধ্য হয়ে বিমলের কাছে যেতে হল।
আলোটা ভালো করে ধরতেই বিমল উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল— কুমার, কুমার, এ যে শম্ভু!
তাইতো, শম্ভুই তো বটে। চিং হয়ে তার দেহটা পড়ে রয়েছে, চোখ দুটো ভিতর থেকে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর তার গলার কাছটায় প্রকাণ্ড একটা ক্ষত।
বিমল হেঁট হয়ে শম্ভুর গায়ে হাত দিয়ে বললে, 'না, কোন আশা নেই—অনেকক্ষণ মরে গেছে।
আমি সেই ভয়ানক দৃশ্যের উপর থেকে আলোট সরিয়ে নিয়ে বললুম, কিন্তু-কিন্তু-শম্ভু এখানে এল কেমন করে?
বিমল চমকে উঠে বললে, তইতো, ও কথাটা তো এতক্ষণ আমার মাথায় ঢোকেনি-শম্ভু এই সুড়ঙ্গের সন্ধান পেল কোত্থেকে? আমি বললুম, শম্ভু যখন এসেছে, তখন করালীও নিশ্চয় সুড়ঙ্গের কথা জানে।
বিমল একলাফ মেরে বলে উঠল—কুমার, কুমার। আলোটা ভালো করে ধর —যকের ধন! যকের ধন কোথায় আছে, আগে তাই খুজে বার করতে হবে।
চারিদিকে আলোটা বারকতক ঘোরাতে-ফেরাতেই দেখা গেল, সুড়ঙ্গের এককোণে একটা দরজা রয়েছে।
বিমল ছুটে গিয়ে দরজাটা ঠেলে বললে, এই যে একটা ঘর! যকের ধন নিশ্চয়ই এর ভেতরে আছে।
অদৃশ্য বিপদ
ঘরের ভিতর ঢুকে আমরা সাগ্রহে চারিদিকে চেয়ে দেখলুম।
ঘরটা ছোট—ধুলো আর দুর্গন্ধে ভরা। আসবাবের মধ্যে রয়েছে খালি এককোণে একট পাথরের সিন্দুক—এ রকম সিন্দুক কলকাতার যাদুঘরে আমি একবার দেখেছিলুম।
বিমল এগিয়ে গিয়ে সিন্দুকের ডালাটা তখনই খুলে ফেললে, আমরা সকলেই একসঙ্গে তার ভিতরে তাড়াতাড়ি হুমড়ি খেয়ে উঁকি মেরে দেখলুম-কিন্তু হা ভগবান, সিন্দুক একেবারে খালি।
আমাদের এত কষ্ট, এত পরিশ্রম, এত আয়োজন –সমস্তই ব্যর্থ হল।
কেউ আর কোন কথা কইতে পারলুম না, আমার তো ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল।
অনেকক্ষণ পরে বিমল একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললে,“আমাদের একূল-ওকুল হুকুল গেল! যকের ধনও পেলুম না, প্রাণেও বোধহয় বাঁচব না!
আমি বললুম, বিমল, আগে যদি আমার মানা শুনতে। কতবার তোমাকে বলেছি ফিরে চল, যকের ধনে আর কাজ নেই।
রামহরি বললে, ‘আগে থাকতেই মুষড়ে পড়ছ কেন? খুঁজে দেখ, হয়তো আর কোথাও যকের ধন লুকানো আছে?
বিমল বললে, আর খোজাখুঁজি মিছে। দেখছ না, আমাদের আগেই এখানে অন্য লোক এসেছে, সে কি আর শুধু-হাতে ফিরে গেছে?
আমি বললুম, এ কাজ করালী ছাড়া আর কারুর নয়।
—হুঁ।
—“কিন্তু সে কি করে খোঁজ পেলে?
—খুব সহজেই। কুমার, আমরা বোকা-গাধার চেয়েও বোকা। করালী পালিয়েছে ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে পথ চলছিলুম—সে কিন্তু নিশ্চয়ই লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের পিছু নিয়েছিল। তারপর কাল যখন আমরা সুড়ঙ্গের মুখ খুলেছিলুম, সে তখন কাছেই কোথাও গা ঢাকা দিয়ে বসেছিল। কাল রাতেই সে কাজ হাসিল করেছে, আমরা যে কোনরকমে পিছু নিয়ে তাকে আবার ধরব, সে উপায়ও আর রেখে যায়নি। বুঝেছ কুমার, করালী গর্তের মুখ বন্ধ করে দিয়ে গেছে।
—কিন্তু শম্ভুকে খুন করলে কে?
—করালী নিজেই।
—কেন সে তা করবে?
—পাছে যকের ধনে শম্ভু ভাগ বসাতে চায়।
হঠাৎ আমাদের কানের উপরে আবার সেই ভীষণ অট্টহাসি বেজে উঠল—‘হা-হা-হা-হা-হা’'
আমি আর্তনাদ করে বলে উঠলুম, বিমল, শম্ভুকে খুন করেছে এই যক?
আবার–আবার সেই হাসি!
আমার হাত থেকে বিজলী-মশালটা কেড়ে নিয়ে বিমল-যেদিক থেকে হাসি আসছিল, সেইদিকে ঝড়ের মতন ছুটে গেল—তার পিছনে ছুটল রামহরি।
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একল বসে আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলুম—বিমল এত তাড়াতাড়ি চলে গেল যে, আমিও তার পিছু নিতে পারলুম না।
উঃ, পৃথিবীর বুকের মধ্যেকার সে অন্ধকার যে কি জমাট, লেখায় তা প্রকাশ করা যায় না—অন্ধকারের চাপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।
হঠাৎ আমার পিঠের উপরে ফোঁস করে কে নিঃশ্বাস ফেললে। চেঁচিয়ে বিমলকে ডাকতে গেলুম, কিন্তু গলা দিয়ে আমার আওয়াজই বেরুল না। সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাটির উপরে পড়ে গেলুম।
উঠে বসতে না বসতেই আমার পিঠের উপরে কে লাফিয়ে পড়ল এবং লোহার মতন শক্ত দুখান হাত আমাকে জড়িয়ে ধরলে।
আমি তার হাত ছাড়াবার চেষ্টা করলুম—সে কিন্তু অনায়াসে আমাকে শিশুর মত ধরে ঘরের মেঝের উপর চিৎ করে ফেললে— প্রাণপণে আমি চেঁচিয়ে উঠলুম–বিমল, বিমল, বিমল, বাঁচাও— আমাকে বাচাও?
আমার বুকের উপরে বসে সে হা-হা করে হাসতে লাগল – কিন্তু তার পরমুহূর্তেই সে হাসি আচম্বিতে বিকট এক আর্তনাদের মতন বেজে উঠল—সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকের উপর থেকে সেই ভূত না মানুষটা—ভগবান জানেন কি—মাটির উপর ছিটকে পড়ল।
তাড়াতাড়ি আমি উঠে বসলুম—অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলুম না বটে, কিন্তু শব্দ শুনে যেন বুঝলুম, ঘরের ভিতরে বিষম এক ঝটাপটি চলেছে।
ভূত, না জন্তু, না মানুষ?
কি যে করব, কিছুই বুঝতে না পেরে, দেওয়ালে পিঠ রেখে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলুম-ওদিকে ঘরের ভিতরে ঝাপটা-ঝাপটি সমানে চলতে লাগল।
তারপরেই সব চুপচাপ।
আলো নিয়ে বিমল তখনে ফিরল না, অন্ধকারে আমিও আর উঠতে ভরসা করলুম না। ঘরের ভিতরে যে খুব একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটেছে, তাতে আর কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু সে কাণ্ডটা যে কি, অনেক ভেবেও আমি তা ঠাউরে উঠতে পারলুম না।
হঠাৎ আমার গায়ের উপরে কে আবার ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে। আঁতকে উঠে একলাফে আমি পাঁচ হাত পিছনে গিয়ে দাঁড়ালুম। প্রাণপণে সামনের দিকে চেয়ে দেখলুম, অন্ধকারের মধ্যে দুটো জ্বলন্ত চোখ যেন আমার পানে তাকিয়ে আছে। খানিক পরেই চোখ দুটো ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল!
এবারে প্রাণের আশা একেবারেই ছেড়ে দিলুম। পায়ে পায়ে আমি পিছনে হটতে লাগলুম—সেই জ্বলন্ত চোখ দুটোর উপরে স্থির দৃষ্টি রেখে। হঠাৎ কি একট। জিনিসে পা লেগে আমি দড়াম করে পড়ে গেলুম এবং প্রাণের ভয়ে যত-জোরে-পারি চেঁচিয়ে উঠলুম. তারপরেই কিন্তু বেশ বুঝতে পারলুম-আমি একটা মানুষের দেহের উপর কাৎ হয়ে পড়ে আছি!
সে দেহ কার, তা জীবিত না মৃত, এসব ভাববার কোন সময় নেই—কারণ গেলবারের মতন এবারেও হয়তো আবার কোন শয়তান আমার পিঠের উপরে লাফিয়ে পড়বে—সেই ভয়েই কাতর হয়ে তাড়াতাড়ি চোখ তুলতেই দেখি, সুড়ঙ্গের মধ্যে বিজলী-মশালের আলো দেখা যাচ্ছে। আঃ, এতক্ষণ পরে!
আলো দেখে আমার ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল, তাড়াতাড়ি চেঁচিয়ে উঠলুম–বিমল, বিমল, শীগগির এস!
—কি হয়েছে কুমার-ব্যাপার কি? বলতে বলতে বিমল ঝড়ের মতন ছুটে এল—তার পিছনে রামহরি।
বিজলী-মশালের আলো ঘরের ভিতরে পড়তেই দেখলুম, ঠিক আমার সামনে, মাটির উপরে দুই থাবা পেতে বসে বাঘা জিভ বার করে অত্যন্ত হাঁপাচ্ছে। তার মুখে ও সর্বাঙ্গে টাটকা রক্তের দাগ।
বুঝলুম, এই বাঘার চোখ দুটো দেখেই এবারে আমি মিছে ভয় পেয়েছি। কিন্তু তার মুখে আর গায়ে এত রক্ত কেন?
হঠাৎ বিমল বিস্ময়ের স্বরে বললে, কুমার, কুমার, তুমি কিসের উপরে বসে আছ?
তখন আমার হুস হল – আমার তলায় যে একটা মানুষের দেহ।
একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে যা দেখলুম, তা আর জীবনে কখনো ভুলব না!
ঘরের মেঝের উপর মস্ত লম্বা একটা কালো কুচকুচে মানুষের প্রায় উলঙ্গ দেহ চিৎ হয়ে সটান পড়ে আছে। লম্বা লম্বা জটপাকানো চুল আর গোঁফদাড়িতে তার মুখখানা প্রায় ঢাকা পড়েছে—তার চোখ দুটো ড্যাব-ডেবে, দেখলেই বুক চমকে ওঠে, হাঁ-করা মুখের ভিতর থেকে বড় বড় হিংস্ৰ দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে—কে এ?...সেই অদ্ভুত মূর্তি দেখে সহজে বোঝা শক্ত যে, সে ভূত, না জন্তু, না মানুষ। বিমল হেঁট হয়ে দেখে বললে, ‘এর গলা দিয়ে যে হু-হু করে রক্ত বেরুচ্ছে।
আমি শুদ্ধস্বরে বললুম, বিমল, একটু আগে এই লোকটা আমাকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল।
—বল কি, তারপর—তারপর?
—তারপর ঠিক কি যে হল অন্ধকারে আমি তা বুঝতে পারিনি বটে, কিন্তু বোধহয় বাঘার জন্যই এ-যাত্রা আমি বেঁচে গেছি?
—বাঘার জন্যে!
—হ্যাঁ, সে-ই টুটি কামড়ে ধরে একে আমার বুকের উপর থেকে টেনে নামায়, বাঘার কামড়েই যে ওর এই দশা হয়েছে, এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি। দেখ দেখি, ও বেঁচে আছে কিনা?
বিমল পরীক্ষা করে দেখে বললে, না, একেবারে মরে গেছে।
রামহরি বাঘার পিঠ চাপড়ে বললে, ‘সাবাস বাঘ, সাবাস বাঘা, সাবাস।
বাঘ আহ্লাদে ল্যাজ নাড়তে লাগল; আমি আদর করে তাকে বুকে টেনে নিলুম।
বিমল বললে,“কিন্তু এ লোকটা কে?
রামহরি বললে, ‘উঁঃ, কি ভয়ানক চেহারা। দেখলেই ভয় হয়।
আমি বললুম, আমার তো ওকে পাগল বলে মনে হচ্ছে।’
বিমল বললে, হতে পারে। নইলে অকারণে তোমাকে মারবার চেষ্টা করবে কেন?
আমি বললুম, এতক্ষণে আর একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি। শম্ভু বোধহয় এর হাতেই মারা পড়েছে।
রামহরি বললে, কিন্তু এ সুড়ঙ্গের মধ্যে এল কি করে?
বিমল চুপ করে ভাবতে লাগল। অনেকক্ষণ পরে সে বললে, দেখ কুমার, হাসি শুনে কে হাসছে খুঁজতে গিয়ে আমরা মুড়ঙ্গের এক জায়গায় কতকগুলো জ্বলন্ত কাঠ আর পোড়া মাংস দেখে এসেছি। এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এ লোকটাই এই সুড়ঙ্গের মধ্যে বাস করত। আমাদের দেখে এ-ই এতক্ষণ হাসছিল—এ যে পাগল তাতে আর কোন সন্দেহ নেই।
আমি বললুম, কিন্তু সুড়ঙ্গের চারিদিক যে বন্ধ?
বিমল লাফ মেরে দাঁড়িয়ে আনন্দভরে বলে উঠল, কুমার, আমরা বেঁচে গেছি। এই অন্ধকূপের মধ্যে আমাদের আর অনাহারে মরতে হবে না।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, হঠাৎ তোমার এতটা আহ্লাদের কারণ কি?
বিমল বললে, কুমার, তুমি একটি নিরেট বোকা। এও বুঝছ না যে, এই পাগলাট যখন সুড়ঙ্গের মধ্যে বাসা বেঁধেছে, তখন কোথাও বাইরে যাবার একটা পথও আছে। সুড়ঙ্গের যে মুখ দিয়ে ঢুকেছি, সে মুখ তো বরাবরই বন্ধ ছিল, সুতরাং সেখান দিয়ে নিশ্চয়ই পাগলাটা আনাগোনা করত না। যদি বল সে বাইরে যেত না, তাহলে সুড়ঙ্গের মধ্যে জ্বালানি কাঠ আর মাংস এলো কোত্থেকে?
আমি বললুম, কিন্তু অন্য পথ থাকলেও আমরা তো তার সন্ধান জানি না।
বিমল বললে, সেইটেই আমাদের খুজে দেখা দরকার। মুড়ঙ্গের সবটা তো আমরা দেখিনি।
আমি বললুম, তবে চল, আগে পথ খুঁজে বার করতে হবে। যকের ধন তো পেলুম না, এখন কোনগতিকে বাইরে বেরুতে পারলেই বাঁচি?
বিমল বললে, যকের ধন এখনো আমাদের হাতছাড়া হয়নি। পথ যদি খুঁজে পাই, তাহলে এখনো করালীকে ধরতে পারব। এখানে আর দেরি করা নয়,-চলে এস।
বিমল আরো এগিয়ে গেল, আমরা তার পিছনে পিছনে চললুম। সুড়ঙ্গটা যে কত বড়, তার মধ্যে যে এত অলিগলি আছে, আগে আমরা সেটা বুঝতে পারিনি। প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে আমরা চারিদিকে আতিপাতি করে খুঁজে বেড়ালুম, কিন্তু পথ তবু পাওয়া গেল না। সেই চির-অন্ধকারের রাজ্যে আলো আর বাতাসের অভাবে প্রাণ আমাদের থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠছিল, কিন্তু উপায় নেই, কোন উপায় নেই! শেষটা হাল ছেড়ে দিয়ে আমি বললুম, বিমল, আর আমি ভাই পারছি না, পথ যখন পাওয়াই যাবে না, তখন এখানেই শুয়ে শুয়ে আমি শান্তিতে মরতে চাই। এই বলে আমি বসে পড়লুম।
বিমল আমার হাত ধরে নরম গলায় বললে, ভাই কুমার, এত সহজে কাবু হয়ে পড়লে চলবে না। পথ আছেই, আমরা খুঁজে বার করবই?
আমি সুড়ঙ্গের গায়ে হেলান দিয়ে বললুম, তোমার শক্তি থাকে তো পথ খুজে বার কর—আমার শরীর আর বইছে না?
হঠাৎ বাঘা দাঁড়িয়ে উঠে কান খাড়া করে একদিকে চেয়ে রইল— বিমলও আলোটা তাড়াতাড়ি সেইদিকে ফেরালে। দেখলুম— খানিক তফাতে একটা শেয়াল থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাদের পানে তাকিয়ে আছে।
বাঘা তাকে রেগে ধমক দিয়ে তেড়ে গেল, শেয়ালটা তো ভয় পেয়ে ছুট দিলে— ব্যাপারটা কি হয় দেখবার জন্যে বিমল বিজলী-মশালের আলোটা সেইদিকে ঘুরিয়ে ধরলে।
অল্পদুরে গিয়েই শেয়ালটা সুড়ঙ্গের উপরদিকে একটা লাফ মেরে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। বাঘা হতভম্বর মত সেইখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
শেয়ালটা কি করে পালাল দেখবার জন্যে বিমল কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গেল। তারপর আলোটা মাথার উপর তুলে ধরে সেখানটা দেখেই মহা আহ্লাদে চেঁচিয়ে উঠল, পথ পেয়েছি কুমার, পথ পেয়েছি!
বিমলের কথায় আমার দেহে যেন নূতন জীবন ফিরে এল, তাড়াতাড়ি উঠে সেইখানে ছুটে গিয়ে বললুম কৈ, কৈ?
—এই যে।
দেয়ালের একেবারে উপরদিকে ছোট একটা গর্তের মত, তার ভিতর দিয়ে বাইরের আলো রূপোর আভার মত দেখাচ্ছে। এতক্ষণ পরে পৃথিবীর আলো দেখে আমার চোখ আর মন যেন জুড়িয়ে গেল। বিমল বললে, ‘নিশ্চয় পাহাড় ধ্বসে এই পথের সৃষ্টি হয়েছে। কুমার, তুমি সকলের আগে বেরিয়ে যাও। রামহরি, তুমি আলোটা নাও, আমি কুমারকে গর্তের মুখে তুলে ধরি।
বিমল আমাকে কোলে করে তুলে ধরলে, গর্ত দিয়ে মুখ বাড়াতেই নীলাকাশের সূর্য, স্নিগ্ধ-শীতল বাতাস আর ফলে-ফুলে ভরা সবুজ বন যেন আমাকে অভ্যর্থনা করলে চিরজন্মের মতন সাদরে!
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.