সেই সকাল থেকে আমরা ভাঙা জায়গাটার ধারে গিয়ে সরল গাছের গোড়ার উপরে ক্রমাগত কুড়লের ঘা মারছি আর মারছি। এমনভাবে আমরা গাছ কাটছি, যাতে করে পড়বার সময়ে সেটা ঠিক ভাঙা জায়গার উপরে গিয়ে পড়ে।
দুপুরের সময় গাছটা পড় পড় হল। আমরা খুব সাবধানে কাজ করতে লাগলুম, কারণ আমাদের সমস্ত আশা-ভরসা এখন এই গাছটার উপরেই নির্ভর করছে—একটু এদিক-ওদিক হলেই সকলকে ধুলে-পায়েই বাড়ীর দিকে ফিরতে হবে।
গাছটা পড়তে আর দেরি নেই, তার গোড়া মড়মড় করে উঠল।
বিমল বললে, আর গোটাকয়েক কোপ। ব্যাস, তাহলেই কেল্লা ফতে।
টিপ করে ঠিক গোড়া ঘেসে মারলুম আরো বার কয়েক কুড়লের ঘা৷
বিমল বলে উঠল, হুঁশিয়ার, সরে দাঁড়াও, গাছটা পড়ছে?
আমি আর রামহরি একলাফে পাশে সরে দাঁড়ালুম। মড় মড় মড়—মড়াৎ। গাছটা হুড়মুড় করে ভাঙা জায়গাটার দিকে হেলে পড়ল।
বিমল বললে, ব্যাস! দেখ কুমার, আমাদের পোল তৈরী।
গাছটা ঠিক মাঝখানকার ফাঁকটার উপর দিয়ে পাহাড়ের ওপারে গিয়ে পড়েছে, তার গোড়া রইল এদিকে, আগা রইল ওদিকে। যা চেয়েছিলুম তাই...
আহার আর বিশ্রাম সেরে আমরা আবার বৌদ্ধমঠের দিকে অগ্রসর হলুম। রোদ্দুরে পাহাড়ে-পথ তেতে আগুন হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সেসব কষ্ট আমরা আজ গ্রাহের মধ্যেই আনলুম না, মনে মনে দৃঢ়পণ করলুম যে, আজ মঠে না গিয়ে কিছুতেই আর জিরোন নেই।
সূর্য অস্ত যায় যায়। মঠও আর দূরে নেই। তার মেঘ-ছোয়া মন্দিরটার ভাঙা চুড়া আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে জেগে আছে। এদিকে-ওদিকে আরো কতকগুলো ছোট ছোট ভগ্নস্তুপও দূর থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আরো খানিক এগিয়ে দেখলুম, আমাদের দু-পাশে কারুকার্য করা অনেক গুহা রয়েছে। এইসব গুহায় আগে বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীরা বাস করতেন, এখন কিন্তু তাদের ভিতর জনপ্রাণীর সাড়া নেই।
গুহাগুলোর মাঝখান দিয়ে পথটা হঠাৎ একদিকে বেঁকে গেছে। সেই বাঁকের মুখে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলুম আমাদের সামনেই মঠের সিংহদরজা।
আমরা সকলেই একসঙ্গে প্রচণ্ড উৎসাহে জয়ধ্বনি করে উঠলুম। বাঘা আসল কারণ না বুঝেও আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল, ঘেউ ঘেউ ঘেউ। অনেকদিন পরে আবার সেই পোড়ো মন্দিরটার চারিদিক সরগরম হয়ে উঠল।
বিমল দু-হাত তুলে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, যকের ধন আজ আমাদের।
আমি বললুম, চল, চল, চল। আগে সেই জায়গাট খুজে বার করি।
সিংহদরজার ভিতর দিয়ে আমরা মন্দিরের আঙিনায় গিয়ে পড়লুম। প্রকাও আঙিন—চারিদিকে চকবন্দী ঘর, কিন্তু এখন আর তাদের কোন শ্ৰী-ছাদ নেই। বুনো চার-গাছে আর জঙ্গলে পা ফেলে চলা দায়, এখানে-ওখানে ভাঙা পাথর ও নানারকম মূর্তি পড়ে রয়েছে, স্থানে স্থানে জীবজন্তুর রাশি রাশি হাড়ও দেখলুম। বোধ হয় হিংস্র পশুরা এখন সন্ন্যাসীদের ঘরের ভিতর আস্তানা গেড়ে বসেছে, বাইরে থেকে শিকার ধরে এনে এখানে বসে নিশ্চিন্তভাবে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে নেয়।
আমি বললুম, বিমল, মড়ার মাথাটা এইবার বার কর, সঙ্কেত দেখে পথ ঠিক করতে হবে।
বিমল বললে, তার জন্য ভাবনা কি, সঙ্কেতের কথাগুলো আমার মুখস্থই আছে। এই বলে সে আউড়ে গেল –ভাঙা দেউলের পিছনে সরল গাছ। মূলদেশ থেকে পূর্বদিকে দশ গজ এগিয়ে থামবে। ডাইনে আট গজ এগিয়ে বুদ্ধদেব। বামে ছয় গজ এগিয়ে তিনখানা পাথর। তার তলায় সাত হাত জমি খুড়লে পথ পাবে।
আমি বললুম, তাহলে আগে আমাদের ভাঙা দেউল খুজে বার করতে হবে।
বিমল বললে, খুজতে হবে কেন? দেউল বলতে এখানে নিশ্চয় বোঝাচ্ছে ঐ প্রধান মন্দিরকে। ও মন্দিরটাও তো ভাঙা। আচ্ছা, দেখাই যাক না।
আমরা বড় মন্দিরের পিছনের দিকে গিয়ে উপস্থিত হলুম।
রামহরি বললে ‘বাহঃ, ঠিক কথাই যে! মন্দিরের পিছনে ঐ যে সরল গাছ।
তাই বটে। মন্দিরের পিছনে অনেকটা খোলা জায়গা, আর তার; মধ্যে সরল গাছ আছে মাত্র একটি, কিছু ভুল হবার সম্ভাবনা নেই।
চারিদিকে মাঝে মাঝে ছোট-বড় অনেকগুলো বুদ্ধদেবের মূর্তি রয়েছে,—কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। ভাঙা, আভাঙা পাথরও পড়ে আছে অগুন্তি।
বিমল বললে, এরি মধ্যে কোন একটি মূর্তির কাছে আমাদের যকের ধন আছে। আচ্ছ, সরল গাছ থেকে পুবদিকে এই দশ গজ এগিয়ে থামলুম। তারপর ডাইনে আট গজ,—হুঁ, এই যে বুদ্ধদেব। বাঁয়ে ছয় গজ –কুমার, দেখ দেখ, ঠিক তিনখানাই পাথর পরে পরে সাজানো রয়েছে। মড়ার মাথার সঙ্কেত তাহলে মিথ্যে নয়। আহ্লাদে বুক আমার দশখানা হয়ে উঠল—মনের আবেগ আর সহ্য করতে না পেরে আমি সেই পাথরগুলোর উপরে ধুপ করে বসে পড়লুম।
বিমল বললে, ওঠ – ওঠ। এখন দেখতে হবে, পাথরের তলায় সত্যি সত্যিই কিছু আছে কি না?
আমরা তিনজনে মিলে তখনি কোমর বেঁধে পাথর সরিয়ে মাটি খুড়তে লেগে গেলুম।
প্রায় হাত-সাতেক খোড়ার পরেই কুড়ুলের মুখে মুখে কি-একটা শক্ত জিনিস ঠক্ ঠক্ করে লাগতে লাগল। মাটি সরিয়ে দেখা গেল, আর একখানা বড় পাথর।
অল্প চেষ্টাতেই পাথরখানা তুলে ফেলা গেল—সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম গর্তের মধ্যে সত্য-সত্যই একটা বাঁধানো সুড়ঙ্গ-পথ রয়েছে।
আমাদের তখনকার মনের ভাব লেখায় খুলে বলা যাবে না। আমরা তিন জনেই আনন্দবিহবল হয়ে পরস্পরের মুখের পানে তাকিয়ে বসে রইলুম।
কিন্তু হঠাৎ একটা ব্যাপারে বুকটা আমার চমকে উঠল। গর্তের ভেতর থেকে হু হু করে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।
–বিমল, দেখ–দেখ!
বিমল সবিস্ময়ে গর্তের দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, তাই তো, কি কাণ্ড! এতদিনের বন্ধ গর্তের ভেতর থেকে ধোয়া আসছে কেমন করে?
তখন সন্ধ্যা হতে আর বিলম্ব নেই—পাহাড়ের অলিগলি ঝোপঝাপের ধারে ধীরে অন্ধকার জমতে সুরু হয়েছে, চারিদিক এত স্তব্ধ যে পাখিদের সাড়া পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
গর্ত থেকে ধোঁয়া তখনও বেরুচ্ছে, আর কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।
বিমল আস্তে আস্তে বললে, সামনেই রাত্রি, আজ আর হাঙ্গামে কাজ নেই। কাল সকালে সব ব্যাপার বোঝা যাবে। এস, গর্তের মুখে আবার পাথর চাপিয়ে রাখা যাক।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.