গভীর রাত্রি। একটা ঝুঁকে-পড়া পাহাড়ের তলায় আমরা আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের দিকে পাহাড় আর দুদিকে আগুন। বিমল আর রামহরি ঘুমাচ্ছে আমিও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি— কিন্তু ঘুমোইনি, কারণ এখন আমার পাতার দেবার পালা।
চাঁদের আলোর আজ আর তেমন জোর নেই; চারিদিকে আলো আর অন্ধকার যেন একসঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।
হঠাৎ বৌদ্ধমঠে যাবার পথের উপর দিয়ে খেযালের মত কি একটা জানোয়ার বারবার পিছনে তাকাতে তাকাতে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল—দেখলেই মনে হয় সে যেন কোন কারণে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।
মনে কেমন সন্দেহ হল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলুম বটে, কিন্তু চোখের কাছে একটু ফাঁক রাখলুম,—আর বন্দুকটাও কাপড়ের ভিতরেই বেশ করে বাগিয়ে ধরলুম।
এক, দুই, তিন মিনিট। তারপরেই দেখলুম, পাহাড়ের আড়াল থেকে উপরে একটা মানুষ বেরিয়ে এল...তারপর আর একজন... তারপর আরো একজন—তারপর একসঙ্গে দুইজন। সবশুদ্ধ পাঁচজন লোক!
আস্তে আস্তে চোরের মতন আমাদের দিকে তারা এগিয়ে আসছে। যদিও রাতের আবছায়ায় তফাৎ থেকে তাদের চিনতে পারলুম না— তবুও আন্দাজেই বুঝে নিলুম, তার কারা।
সব-আগের লোকটা আমাদের অনেকটা কাছে এগিয়ে এল। আমাদের সামনেকার আগুনের আভা তার মুখের উপরে গিয়ে পড়তেই চিনলুম—সে করালী!
একটা নিষ্ঠুর আনন্দে বুকটা আমার নেচে উঠল। এই করালী! এরই জন্যে কত বিপদে পড়তে হয়েছে, কতবার প্রাণ যেতে যেতে বেঁচে গেছে, এখনো এ আমাদের যমের বাড়ী পাঠাবার জন্যে তৈরী হয়ে আছে; ধরি ধরি করেও কোনবারেই একে আমরা ধরতে পারিনি— কিন্তু এবারে আর কিছুতেই এর ছাড়ান নেই।
বন্দুকট তৈরী রেখে একেবারে মড়ার মত আড়ষ্ট হয়ে পড়ে রইলুম। করালী আরো কাছে এগিয়ে আসুক না,—তারপরেই তার মুখের স্বপ্ন জন্মের মত ভেঙে দেব!
পা টিপে-টিপে করালী ক্রমে আমাদের কাছ থেকে হাত পনেরো-ষোলো তফাতে এসে পড়ল—তার পিছনে পিছনে আর চারজন লোক।
আগুনের আভায় দেখলুম, করালীর সেই কুৎসিত মুখখান আজ রাক্ষসের মতই ভয়ানক হয়ে উঠেছে। তার ডানহাতে একখানা মস্ত বড় চকচকে ছোরা, এখান নিশ্চয়ই সে আমাদের বুকের উপরে বসাতে চায়। তার পিছনের লোকগুলোরও প্রত্যেকেরই হাতে ছোরা, বর্শা বা তরোয়াল রয়েছে। এটা আমাদের খুব সৌভাগ্যের কথা যে, করালীর কেউ বন্দুক জোগাড় করে আনতে পারেনি। তাদের সঙ্গে বন্দুক থাকলে এতদিন নিশ্চয়ই আমরা বেঁচে থাকতে পারতুম না।
করালী আমাদের আগুনের বেড়াটা পেরিয়ে আসবার উদ্যোগ করলে।
বুঝলুম, এই সময়। বিদ্যুতের মতন আমি লাফিয়ে উঠলুম— তারপর চোখের পলক ফেলবার আগেই বন্দুকটা তুলে দিলুম একেবারে ঘোড়া টিপে। গুড়ুম।
বিকট এক চীৎকার করে করালী মাথার উপর দু-হাত তুলে মাটির উপরে ঘুরে পড়ে গেল।
তার পিছনের লোকগুলো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—তাদের দিকেও তার একবার বন্দুক ছুড়তেই তারা প্রাণের ভয়ে পাগলের মত দৌড়ে পালাল।
কিন্তু বন্দুকের গুলি বোধ হয় করালীর গায়ে ঠিক জায়গায় লাগেনি, কারণ মাটির উপরে পড়েই সে চোখের নিমেষে উঠে দাঁড়াল —তারপর প্রাণপণে ছুটে অন্ধকারে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার দোনলা বন্দুকে আর টোটা ছিল না, কাজেই তাকে আর বাধা দিতেও পারলুম না।
কয় সেকেণ্ড পরে ভীষণ এক আর্তনাদে নিস্তব্ধ রাত্রির আকাশ যেন কেঁপে উঠল—তেমন আর্তনাদ আমি জীবনে আর কখনো শুনিনি। তারপরেই আবার সব চুপচাপ —ও আবার কি ব্যাপার?
মিনিটখানেকের মধ্যেই এই ব্যাপারগুলো হয়ে গেল। ততক্ষণে গোলমালে বিমল, রামহরি আর বাঘাও জেগে উঠেছে।
বিমলকে তাড়াতাড়ি দু-কথায় সমস্ত বুঝিয়ে দিয়ে বললুম, কিন্তু ঐ আর্তনাদ যে কেন হল বুঝতে পারছি না। আমার মনে হল একসঙ্গে যেন জন-তিনেক লোক চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল।
বিমল সভয়ে বললে, কি ভয়ানক! নিশ্চয়ই অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে তারা ভাঙা পথের সেই ফাঁকের মধ্যে পড়ে গেছে। তারা কেউ আর বেঁচে নেই।
আমি বললুম, কিন্তু করালী ওদিকে যায়নি—সে এখনো বেঁচে আছে।
রামহরি বললে, আহা, হতভাগাদের জন্যে আমার ভারি দুঃখ হচ্ছে, শেষটা অপঘাতে মরল!
বিমল বললে, যেমন কর্ম, তেমনি ফল—দুঃখ করে লাভ নেই। করালীর যদি এখনো শিক্ষা না হয়ে থাকে, তবে তার কপালেও অপঘাত মৃত্যু লেখা আছে।
আমি বললুম, ‘অন্ততঃ কিছুদিনের জন্যে আমরা নিশ্চয় করালীর দেখা পাব না। সে মরেনি বটে, কিন্তু রীতিমত জখম যে হয়েছে, তাতে আর কোন সন্দেহ নেই?
বিমল বললে, আর তিনদিন যদি বাধা না পাই, তাহলে যকের ধন আমাদের মুঠোর ভিতর এসে পড়বেই—এ আমি তোমাকে বলে দিলুম।
আমি হেসে বললুম, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.