এক এক গেলাস জল খেয়ে, ঠাণ্ডা হয়ে, দুজনে বাইরের ঘরে গিয়ে বসলুম। রাত তখন আড়াইটে।
বিমল বললে, আজ রাতে আর ঘুম নয়। কাল বৈকালের গাড়ীতে আমরা আসাম যাব।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, সে কি! এত তাড়াতাড়ি।
বিমল বললে, হুঁ তাড়াতাড়ি না করলে চলবে না। করালী রাস্কেল আমাদের ওপরে চটে রইল—মড়ার মাথা যে আমরাই আবার তার হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছি, এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে তা টের পেয়েছে! কখন কি ফ্যাসাদ বাঁধিয়ে বসবে কে তা জানে? কালই দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়তে হবে।
আমি আপত্তি জানিয়ে বললুম, মা গেছেন শান্তিপুরে, মামার বাড়ীতে। তাকে না জানিয়ে আমি কি করে যাব?
বিমল বললে, তাঁকে চিঠি লিখে দাও—আমার সঙ্গে তুমি আসামে বেড়াতে যাচ্ছ, বড় তাড়াতাড়ি বলে যাবার আগে দেখা করতে পারলে না।
আমি চিন্তিত মুখে বললুম, চিঠি যেন লিখে দিলুম, কিন্তু এত বড় একটা কাজে যাচ্ছি, অনেক বন্দোবস্ত করতে হবে যে! কালকের মধ্যে সব গুছিয়ে উঠতে পারব কেন?
বিমল বিরক্ত স্বরে বললে, তোমাকে বিশেষ কিছুই করতে হবে না, বন্দোবস্ত যা করবার তা আমিই করব অখন। তুমি খালি কাপড়চোপড় আর গোটাকতক কোট-প্যান্ট নিও-বুঝলে অকর্মর ধাড়ী?
—কেন? কোট-প্যাণ্ট আবার কি হবে?
—যেতে হবে পাহাড়ে আর জঙ্গলে। সেখানে ফুলবাবুর মত কাছা-কোঁচা সামলাতে গেলে চলবে না—তাহলে পদে পদে বিপদে পড়তে হবে।
আমি চুপ ক'রে ভাবতে লাগলুম। বিমল বললে, ভেবেছিলুম দুজনেই যাব। কিন্তু তুমি যেরকম নাবালক গোবেচারা দেখছি, সঙ্গে আর একজনকে নিলে ভালো হয়।
—কাকে নেবে?
—আমার চাকর রামহরিকে। সে আমাদের পুরানো লোক; বিশ্বাসী, বুদ্ধিমান আর তার গায়েও খুব জোর। আমার জন্যে সে হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে পারে?
—আচ্ছ, সে কথা মন্দ নয়। আমিও বাঘাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তাতে তোমার আপত্তি—
—চুপ? বলেই বিমল একলাফে দাঁড়িয়ে উঠল। তারপর ছুটে গিয়ে হঠাৎ ঘরের একটা জানলা দু-হাট করে খুলে দিলে। স্পষ্ট দেখলুম জানলার বাহির থেকে একখানা বিশ্ৰী কালো-কুচকুচে মুখ বিদ্যুতের মতন একপাশে সরে গেল। জানলায় কান পেতে নিশ্চয় কেউ আমাদের কথাবার্তা শুনছিল! বিমলও দাঁড়াল না— ঘরের কোণ থেকে একগাছা মাথা-সমান উঁচু মোট বাশের লাঠি নিয়ে একছুটে বেরিয়ে গেল! আমি ঘরের দরজায় খিল লাগিয়ে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলুম।
খানিক পরে বিমল ফিরে এসে আমাকে ডাকলে। আমি আবার দরজা খুলে দিয়ে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলুম, ব্যাপার কি? লোকটাকে ধরতে পারলে?
লাঠিগাছা ঘরের কোণে রেখে দিয়ে বিমল হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, না, পিছনে তাড়া করে অনেকদূর গিয়েছিলুম, কিন্তু ধরতে পারলুম না?
—লোকটা কে বল দেখি?
—কে আবার—করালীর লোক, খুব সম্ভব ভাড়াটে গুণ্ডা। কুমার, ব্যাপার কিরকম গুরুতর তা বুঝছ কি? লোকটা আমাদের কথা হয়তো সব শুনেছে?
—বিমল, তুমি ঠিক বলেছ, আমাদের আর দেরি করা উচিত নয়, আমরা কালকেই বেরিয়ে পড়ব।
—তা তো পড়ব, কিন্তু বিপদ হয়তো আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই যাবে।
—তার মানে?
—করালী বোধ হয় তার দলবল নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবে।
আমি একেবারে দমে গেলুম! বিমল বসে বসে ভাবতে লাগল। অনেকক্ষণ পরে সে বললে, যা-থাকে কপালে। তা বলে করালীর ভয়ে আমরা যে কেঁচোর মতন হাত গুটিয়ে ঘরের কোণে বসে থা কব, এ কিছুতেই হতে পারে না। কালকেই আমাদের যাওয়া ঠিক।
আমি কাতরভাবে বললুম, বিমল, গোঁয়ার্তুমি কোরো না?
বিমল চৌকির উপরে একটা ঘুষি মেরে বললে, আমি যাবই যাব। তোমার ভয় হয়, বাড়ীতে বসে থাকো। আমি নিজে যকের ধন এনে তোমার বাড়ীতে পৌছে দিয়ে যাব—দেখি, করালী হারে কি আমি হারি?
আমি তার হাত ধরে বললুম, বিমল, আমি ভয় পাইনি। তুমি যাও তো আমিও নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে যাব। কিন্তু ভেবে দেখ, শেষটা বন-জঙ্গলের ভেতরে একটা খুনোখুনি হতে পারে। করালীরা দলে ভারি, আমরা তার কিছুই করতে পারব না।’
বিমল অবহেলার হাসি হেসে বললে, করালীর নিকুচি করেছে। কুমার, আমার গায়েই খালি জোর নেই—বুদ্ধির জোরও আমার কিছু কিছু আছে। তুমি কিছু ভেব না, আমার সঙ্গে চল, করালীকে কিরকম নাকানি-চোবানি খাওয়াই একবার দেখে নিও।
আমি বিমলকে ভালোরকম চিনি। সে মিছে জাঁক কাকে বলে জানে না। সে যখন আমাকে অভয় দিচ্ছে, তখন মনে মনে নিশ্চয় কোন একটা নূতন উপায় ঠিক করেছে। কাজেই আমিও নিশ্চিন্তভাবে বললুম, আচ্ছ ভাই, তুমি যা বল আমি তাতেই রাজি!
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.