উঃ! করালীবাবু কি ভয়ানক লোক! ঠাকুরদাদার সঙ্গে সে চালাকি করতে গিয়েছিল, কিন্তু পেরে ওঠেনি। তারপর এতদিনেও আশা ছাড়েনি। আমি বেশ বুঝলুম, এই মড়ার মাথাটা কোথায় আছে তা জানবার জন্যেই করালী কাল আমাদের বাড়ীতে এসে হাজির হয়েছিল। রাত্রে এইটে চুরি করবার ফিকিরেই যে আমাদের বাড়ীতে চোর এসেছিল, তাতেও আর কোন সন্দেহ নেই। ভাগ্যে মড়ার মাথাটা আমি বাড়ীর পাশের খানায় ফেলে দিয়েছিলুম।
এখন কি করা উচিত? গুপ্তধনের চাবি তো এই খুলির মধ্যেই আছে, কিন্তু অনেকবার উণ্টেপাল্টে দেখেও আমি সেই অঙ্কগুলোর ল্যাজা-মুড়ে। কিছুই বুঝতে পারলুম না। পকেট-বইখানার প্রত্যেক পাতা উল্টে দেখলুম, তাতেও ঠাকুরদাদা এই সঙ্কেত বুঝবার কোন উপায় লিখে রাখেননি। ঠাকুরদাদার উপরে ভারি রাগ হল। আসল ব্যাপারটিই জানবার উপায় নেই!
তারপর ভেবে দেখলুম, জেনেই বা কি আর এমন হাতী-ঘোড়া লাভ হ! আমার বয়স সতেরো বৎসর। সেকেণ্ড ইয়ারে পড়ছি। জীবনে কখনো কলকাতার বাইরে যাইনি। কোথায় কোন কোণে আসাম আর খাসিয়া পাহাড়, আবার তার ভিতরে কোথায় আছে ‘রূপনাথের গুহা’—এসব খুঁজে বার করাই তো আমার পক্ষে অসম্ভব। তার উপরে সেই গভীর জঙ্গল, যেখানে দিনরাত বাঘভালুক-হাতীর হানা দিচ্ছে। সেকেলে এক বৌদ্ধমঠ, তার ভিতরে যকের ধন—সেও এক ভুতুড়ে কাও! শেষটা কি একলা সেখানে গিয়ে আলিবাবার ভাই কাসিমের মতন টাকার লোভে প্রাণটা খোয়াব? এসব ভেবেও বুকটা ধুকপুক করে উঠল।
হঠাৎ মনে হল বিমলের কথা। বিমল আমার প্রাণের বন্ধু, আমাদের পাড়ার ছেলে। আমার চেয়ে সে বয়সে বছর তিনেকের বড়, এ বৎসর বি-এ দেবে। বিমলের মত চালাক ছেলে আমি আর তুটি দেখিনি। তার গায়েও অসুরের মতন জোর, রোজ সে কুস্তি লড়ে-দুশে ডন, তিনশো বৈঠক দেয়। তার উপরে এই বয়সেই সে অনেক দেশ বেড়িয়ে এসেছে—এই গেল বছরেই তো আসামে বেড়াতে গিয়েছিল। তার কাছে আমি কোন কথা লুকোতুম না। ঠিক করলুম, যাওয়া হোক আর নাই হোক একবার বিমলকে এই মড়ার মাথাটা দেখিয়ে আসা যাক।
বৈকালে বিমলের বাড়ীতে গিয়ে হাজির হলুম-তখন সে বসে বসে বন্দুকের নল সাফ করছিল! আমাকে দেখে বললে, কিহে, কুমার যে! কি মনে করে?
আমি বললুম, একটা ধাঁধা নিয়ে ভারি গোলমালে পড়েছি ভাই!
বিমল বললে, কি ধাঁধা?
আমি মড়ার মাথার খুলিটা বার করে বললুম, এই দেখ?
বিমল অবাক হয়ে খুলিটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বললে, এ আবার কি?
আমি পকেট-বইখান তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললুম, আমার ঠাকুরদার পকেট-বই। পড়লেই সব বুঝতে পারবে?
বিমল বললে, আচ্ছা রোসে, আগে তাড়াতাড়ি বন্দুকটা সাফ করে নি। কাল পাখি-শিকারে গিয়েছিলুম। বন্দুকে ভারি ময়লা জমেছে?
বন্দুক সাফ করে, হাত ধুয়ে বিমল বললে, ব্যাপার কি বল দেখি কুমার? তুমি কি কোন তান্ত্রিক গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়েছ? তোমার হাতে মড়ার মাথা কেন?
আমি বললুম, আগে পকেট-বইখানা পড়েই দেখ না –
‘বেশ’ বলে বিমল পকেট-বইখানা নিয়ে পড়তে লাগল। খানিক পরেই দেখলুম, বিমলের মুখ বিস্ময়ে আর কৌতুহলে ভরে উঠছে!
পড়া শেষ করেই বিমল তাড়াতাড়ি মড়ার মাথাটা তুলে নিয়ে সেটাকে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলে। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, ভারি আশ্চর্য তো?
আমি বললুম, অঙ্কগুলো কিছু বুঝতে পারলে?
বিমল বললে, উঁহু?
—আমিও পারিনি।
—কিন্তু আমি এত সহজে ছাড়ব না। তুমি এখন বাড়ী যাও, কুমার! খুলিট। আমার কাছেই থাক। আমি এটার রহস্য জানবই জানব। তুমি কাল সকালে এস।
আমি বললুম, কিন্তু সাবধান!
বিমল বললে, কেন?
আমি বললুম, কেরালী মুখুয্যে এই খুলিট চুরি করবার জন্যে কাল আবার হয়তো তোমাদের বাড়ীতে মাথা গলাবে।
—আমি এত সহজে ঠকবার ছেলে নই হে?
—তা আমি জানি। তবু সাবধানের মার নেই। এই বলে আমি চলে এলুম।
পরের দিন ভোর না-হতেই বিমলের কাছে ছুটলুম। তার বাড়ীতে আমার অবারিত দ্বার। একেবারে তার পড়বার ঘরে গিয়ে দেখি, বিমল টেবিলের উপরে হেঁট হয়ে একমনে কি লিখছে, আর সামনেই মড়ার মাথাটা পড়ে রয়েছে। আমার পায়ের শব্দে চমকে তাড়াতাড়ি সে খুলিটাকে তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলতে গেল—তারপর আমাকে দেখে আশ্বস্ত হয়ে হেসে বললে, ও, তুমি! আমি ভেবেছিলুম অন্য কেউ?
—কাল তো অত সাহস দেখালে, আজ এত ভয় পাচ্ছ কেন?
—কাল? কাল সবটা ভালো করে তলিয়ে বুঝিনি। আজ বুঝছি, আমাদের এখন সাবধান হয়ে কাজ করতে হবে—কাক-পক্ষী যেন টের না পায়?
—অঙ্কগুলো দেখে কি বুঝলে?
—যা বোঝা উচিত, সব বুঝেছি।
আনন্দে আমি লাফিয়ে উঠলুম। চেঁচিয়ে বললুম, সব বুঝতে পেরেছ! সত্যি?
বিমল বললে, চুপ! চেঁচিয়ে না! কে কোথায় শুনতে পাবে বলা যায় না। ঠাণ্ডা হয়ে ঐখানে বোসো।
আমি একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললুম, খুলিতে কি লেখা আছে, আমাকে বল।
বিমল আস্তে আস্তে বললে, প্রথমটা আমিও কিছু বুঝতে পারিনি। প্রায় চার ঘণ্টা চেষ্টা করে যখন একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছি, তখন হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। অনেকদিন আগে একখানা ইংরিজী বই পড়েছিলুম। তাতে নানারকম সাঙ্কেতিক লিপির গুপ্তরহস্য বোঝানো ছিল। তাতেই পড়েছিলুম যে ইউরোপের চোর ডাকাতরা প্রায়িই একরকম সঙ্কেত ব্যবহার করে। তারা Alphabet অর্থাৎ বর্ণমালাকে যথাক্রমে সংখ্যা অর্থাৎ ১, ২, ৩ হিসাবে ধরে। অর্থাৎ one হবে A, two হবে B, three হবে C ইত্যাদি। আমি ভাবলুম হয়তো এই খুলিটাতেও সেই নিয়মে সঙ্কেত সাজানো হয়েছে। তারপর দেখলুম, আমার অনুমান মিথ্যা নয়। তখন এই সঙ্কেতগুলো খুব সহজেই পড়ে ফেললুম।
আমি আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠলুম, পড়ে কি বুঝলে বল?
বিমল আমার হাতে একখানা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললে, খুলির সঙ্কেতগুলো ছাবিবশটা ঘরে ভাগ করা। আমিও লেখাগুলো সেই ভাবেই সাজিয়েছি?
কাগজের উপরে এই কথাগুলো লেখা ছিল ; ‘ভাঙা দেউলের পিছনে সরলগাছ মূলদেশ থেকে পূবদিকে দশগজ এগিয়ে থামবে ডাইনে আটগজ এগিয়ে বুদ্ধদেব। বামে ছয়গজ এগিয়ে তিনখান। পাথর তার তলায় সাতহাত জমি খুড়লে পথ পাবে?’
আমি চিঠিখানা পড়ে মনে মনে বিমলের বুদ্ধির তারিফ করতে লাগলুম।
বিমল বললে, ‘সাঙ্কেতিক লিপিটা তোমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দি, শোনো। আমাদের বাংলা ভাষায় ‘অ’ থেকে শুরু করে ঁ পর্যন্ত বাহান্নটি বর্ণ। সেই বর্ণগুলিকে ১, ২, ৩ হিসাবে যথাক্রমে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ১ হচ্ছে অ, ২ হচ্ছে আ, ১৩ হচ্ছে ক, ৫২ হচ্ছে ঁ প্রভৃতি।
যেখানে ‘অ’-কার বা ‘এ’-কার প্রভৃতি আছে, সেখানে বর্ণের যেপাশে দরকার, সেই পাশে ব্রাকেটের ভেতর সংখ্যা লেখা হয়েছে। উদাহরণ দেখ ;—'ভ' বর্ণের সংখ্যা ৩৬, আর ‘আ’-কারের সংখ্যা হচ্ছে ২। অতএব, ৩৬ (২) সঙ্কেতে বুঝতে হবে ‘ভা’। ‘দ’ বর্ণের সংখ্যা ৩০, ‘এ’-কারের সংখ্যা হচ্ছে ৯। অতএব দে’ বোঝাতে লিখতে হবে (১) ৩০। ‘উ’কার বর্ণের তলায় বসে। সুতরাং ও ৩৫/৫ থাকলে বুঝতে হবে ‘বু'। 'উ'র মত ‘উ-কারের সংখ্যাও হচ্ছে ৫। চন্দ্রবিন্দুর সংখ্যা বাহান্ন, চন্দ্রবিন্দু উপরে বসে, কাজেই ‘খু’র সঙ্কেত ৫২/১৪/৫ যুক্ত-অক্ষরকে আলাদা করে ধরা হয়েছে, যেমন— বুদ্ধদেব। যিনি এই সংখ্যাগুলি লিখেছেন, তার বানান-জ্ঞান ততটা টনটনে নয়। কেননা ‘মূল’ ও ‘পূব তার হাতে পড়ে হয়েছে—‘মুল’ ও ‘পুব’। উ-র মত ঊ-কারের সংখ্যা হচ্ছে ৬। কিন্তু তিনি উ-কারের সংখ্যা উ-কারের ৬-এর স্থানে বসিয়েছেন— বর্ণের তলাকার ব্রাকেটে।
আমি মড়ার মাথার খুলিটা আর একবার পরখ করবার জন্যে তুলে নিলুম–কিন্তু দৈবগতিকে হঠাৎ সেখান ফসকে মার্বেল বাঁধানে মেঝের উপরে সশব্দে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি সেটা উঠিয়ে নিয়ে, তার উপরে একবার চোখ বুলিয়ে আমি বলে উঠলুম, ‘ঐ: যাঃ! খুলিটার খানিকট চটে গিয়েছে?
বিমল বললে, কোনখানটা?
আমি বললুম, গোড়ার চারটে ঘর-ভাঙা দেউলের পিছনে সরলগাছ—পর্যন্ত!
বিমল বললে, এই কাণ্ডটি যদি আগে ঘটত, তাহলে সমস্তই মাটি হয়ে যেত। যাক, তোমার কোন ভয় নেই,—সঙ্কেতগুলো আমি কাগজে টুকে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের সাবধান হতে হবে, অঙ্কগুলো রেখে কথাগুলো এখনি নষ্ট করে ফেলাই উচিত,—এই বলে সে সঙ্কেতের অর্থ-লেখা কাগজখান টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললে। যখন দরকার হবে, পাঁচ মিনিটের চেষ্টাতেই সঙ্কেতের অর্থ আমরা ঠিক বুঝতে পারব,–কিন্তু বাইরের কোন লোক খুলির সঙ্কেত দেখে কিছুই ধরতে পারবে না!
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.