তারপর এল কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। অগ্নির এই পরম পরীক্ষার সামনে নিজেকে প্রস্তুত করতে আয়েশা যেন সমস্ত শক্তি সংহত করে নিচ্ছিল; আর আমরা একে অপরকে জাপটে ধরে নিথর হয়ে অপেক্ষা করছিলাম।
অবশেষে বহু বহু দূর থেকে ভেসে এল শব্দের প্রথম অস্ফুট গুঞ্জন। সেই শব্দ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে বহুদূরে এক বিকট গর্জন আর আছড়ে পড়ার শব্দে রূপ নিল। শোনামাত্রই আয়েশা তার পাতলা মিহি পোশাকটা দ্রুত গা থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলল; কোমরের বসন থেকে সোনার নাগপাশটা আলগা করল; তারপর অপূর্ব কেশপাশ পোশাকের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়ে, সেই ঘন চুলের আড়ালেই নিজের পরিধানের পোশাকটি খসিয়ে নিল। শেষে চুলের ঢালের ওপর দিয়েই পুনরায় সোনার সাপের কোমরবন্ধটি পেঁচিয়ে বাঁধার কাজ সারল। প্রথম মানব আদমের সামনে হবা যেমন দাঁড়িয়েছিলেন, আমাদের সামনে সেও তেমনি এসে দাঁড়াল—দেহে তার পোশাক বলতে আর কিছুই নেই, শুধু মেঘবরণ ঘন কেশগুচ্ছ আর তা বেঁধে রাখার সোনার বন্ধনী। সে দৃশ্য কত যে রূপময়, কত যে দিব্য সুন্দর—আমার ভাষার সাধ্য নেই তা প্রকাশ করার। দূর থেকে আগুনের বজ্রচাকাগুলো আরও কাছে, আরও কাছাকাছি এগিয়ে আসতে লাগল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের কুন্দশুভ্র একখানা হাত ঘন চুল ঠেলে বের করে সে জড়িয়ে ধরল লিওর গলা।
"ওগো আমার প্রিয়, আমার ভালোবাসা!" অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠল সে, "তুমি কি কোনোদিন জানবে কতখানি ভালো আমি তোমাকে বেসেছি?" এই বলে লিও-র কপালে একটা চুমু এঁকে দিল সে, তারপর এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জীবনের আগুনের গতিপথে।
আমার মনে আছে, তার সেই কথা আর কপালে জড়িয়ে ধরা চুমে এক অপূর্ব করুণ স্পর্শ ছিল। যেন এক মায়ের স্নেহচুম্বন, যার সাথে মিশে আছে চিরন্তন এক আশীর্বাদ।
পাহাড় কাঁপানো গড়গড় শব্দে কানের কাছে আছড়ে পড়তে লাগল সেই গর্জন। যেন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে প্রকাণ্ড কোনো অরণ্য, খড়কুটোর মতো বাতাসে উড়ে পাহাড়ের কোল বেয়ে ধেয়ে আসছে নিচে। শব্দটা ক্রমশ কাছে, আরও কাছে এসে পৌঁছল। ঘূর্ণায়মান অগ্নিস্তম্ভের অগ্রদূত হিসেবে গোলাপি বাতাসে তীরের মতো বিঁধে যেতে লাগল তীব্র আলোর ঝলকানি। আর তার পরপরই দেখা গেল মূল অগ্নিস্তম্ভের প্রান্তভাগ। আয়েশা তার দিকে মুখ ফেরাল, বাহু দুটি বাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল তাকে। ধীরগতিতে ধেয়ে এসে সেই শিখা তাকে ঘিরে ফেলল লেলিহান জালে। আমি দেখলাম, তার সমস্ত অবয়ব বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে সেই আগুন। দেখলাম, জলের মতো দু-হাতে আগুন তুলে নিয়ে সে নিজের মাথায় ঢালছে। এমনকী তার হাঁ করা মুখের ভেতর দিয়ে সেই শিখাকে ফুসফুসে টেনে নিতেও দেখলাম—কী এক ভয়াল, অথচ অলৌকিক দৃশ্য!
তারপর সে স্তব্ধ হয়ে থামল, হাত দুটি প্রসারিত করে একদম নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে—মুখে ফুটে উঠল স্বর্গীয় এক দেবীসুলভ হাসি, যেন সে স্বয়ং সেই অগ্নিশিখার অধিষ্ঠাত্রী দেবী!
সেই রহস্যময় আগুন তার ঘনকালো লহর তোলা চুলের ভাঁজে ভাঁজে খেলা করে বেড়াতে লাগল, ঠিক যেন সোনালি জরির সুতোর মতো চুলে জড়িয়ে পাক খেতে লাগল। চুল সরে যাওয়া হাতির দাঁতের মতো শুভ্র বুক আর কাঁধে ঠিকরে পড়ল তার জ্যোতি; সুগঠিত গ্রীবা আর সুকোমল রূপরেখা বেয়ে তা নেমে এল নিচে, আর যেন আশ্রয় খুঁজে পেল তার সেই মহিমান্বিত জোড়া চোখে—যা সেই অলৌকিক অগ্নিসত্তার চেয়েও শতগুণ বেশি উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করে উঠল।
আহা, সেই আগুনের মাঝে দাঁড়িয়ে তাকে যে কী অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছিল! স্বর্গের কোনো পরী বা দেবদূতের রূপেও বোধহয় এতখানি মোহিত করার ক্ষমতা থাকে না। আজও সেই স্মৃতির কথা মনে পড়লে আমার বুক কেঁপে ওঠে—আমাদের বিস্ময়-বিমূঢ় মুখের দিকে চেয়ে তার সেই দাঁড়িয়ে হাসার দৃশ্য! মর্ত্যের জীবনের বাকি আয়ুর অর্ধেকটা আমি বিলিয়ে দিতে পারি, কেবল তাকে আর একটিবারের জন্য ওভাবে দেখার বিনিময়ে।
কিন্তু হঠাৎ—বর্ণনার অতীত দ্রুততায়—তার মুখে নেমে এল এক অদ্ভুত পরিবর্তন। যে পরিবর্তনকে কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, ব্যাখ্যাও করা যায় না, কিন্তু তা সত্ত্বেও তা স্পষ্ট পরিবর্তন। হাসিটা নিমেষে মিলিয়ে গেল, সেখানে দেখা দিল এক রুক্ষ, কঠোর ভাব; গোলগাল মুখটা যেন হঠাৎ কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল, যেন কোন এক চরম উদ্বেগের ছাপ পড়ে যাচ্ছে তাতে। সেই মহিমান্বিত চোখ দুটোও হারাল তাদের দ্যুতি, আর আমার মনে হল, তার নিখুঁত গড়ন আর ঋজুতাও যেন ভেঙে পড়তে লাগল।
নিজের চোখ দুটোকে রগড়ে নিলাম আমি—ভাবলাম হয়তো মনের কোনো ভুল দেখছি, কিংবা তীব্র আলোর প্রতিফলনে চোখে ধোঁকা লেগেছে। আর ঠিক তখনই সেই অগ্নিস্তম্ভটা ধীরে ধীরে বাঁক খেয়ে প্রকাণ্ড পৃথিবীর গভীর পেটের ভেতর বিকট শব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল, আর সেখানে দাঁড়িয়ে রইল আয়েশা।
আগুনটা চলে যাওয়ামাত্র সে লিওর দিকে এক পা বাড়াল—আমার মনে হল তার পায়ের গতিতে আর সেই আগের স্বচ্ছন্দ ছন্দ নেই—আর লিওর কাঁধে হাত রাখার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল। আমি তার বাহুটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কোথায় গেল তার সেই নিটোল সুষমা আর সৌন্দর্য? হাতটা শুকিয়ে রোগা আর কোণাকোণি হয়ে আসছে। আর তার মুখখানি—হে ঈশ্বর!—আমার চোখের সামনেই যে বুড়িয়ে যাচ্ছে তার মুখ! আমার ধারণা লিও-ও তা দেখতে পাচ্ছিল; কারণ সে আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে গেল।
"কী হয়েছে, আমার ক্যালিক্রেটিস?" সে বলে উঠল। কিন্তু তার গলার স্বর! সেই গম্ভীর আর শিহরণ জাগানো সুরের কী হল? গলাটা একেবারে চড়া আর খাঁজকাটা হয়ে ভেসে এল!
"কেন, কী হয়েছে—কী হল?" তালগোল পাকিয়ে সে বলে উঠল, "আমার মাথাটা যেন কেমন ঝিমঝিম করছে। আগুনের গুণাগুণ তো বদলে যেতে পারে না! জীবনের মূল নীতি কি বদলাতে পারে? বলো ক্যালিক্রেটিস, আমার চোখে কি কোনো সমস্যা হয়েছে? আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না যে!" এই বলে সে তার মাথায় হাত দিল, স্পর্শ করল চুলগুলো—আর ওরে চরম হরর! ভয়ঙ্কর কাণ্ড! সমস্ত চুল হুড়মুড় করে খসে পড়ল মেঝের ওপর!
"ওরে বাবা রে, দ্যাখো!—দ্যাখো!—দ্যাখো!" ভয়ে চোখ দুটো প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে আসা অবস্থায় চড়া সুরের চিৎকার করে উঠল জব, তার মুখে তখন ফেনা জমছে। "দ্যাখো!—দ্যাখো!—দ্যাখো! ও যে কুঁকড়ে যাচ্ছে! মেয়েটা যে বাঁদরে বদলে যাচ্ছে!" আর বলতে বলতেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, মুখে ফেনা আর দাঁতে দাঁত চেপে মৃগী রোগীর মতো ছটফট করতে লাগল।
একদম সত্যি কথা—সেই চরম ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা এখনো মনে পড়লে আমার কলম থেমে যায়, মাথা ঘুরে ওঠে—মেয়েটা সত্যি সত্যিই কুঁকড়ে যাচ্ছিল! তার মোহন রূপকে ঘিরে থাকা সোনার সাপটা কোমর গলে খসে পড়ল মাটিতে; সে দিন দিন ছোট, আরও ছোট হয়ে যেতে লাগল; গায়ের চামড়ার রঙ বদলে যেতে শুরু করল—সেই দুগ্ধফেননিভ শুভ্রতার বদলে গায়ের রঙ হয়ে উঠল নোংরা বাদামি আর হলুদ, ঠিক যেন শতাব্দীর প্রাচীন কোনো শুকিয়ে যাওয়া পার্চমেন্ট কাগজ!
সে মাথায় হাত বোলাবার চেষ্টা করল—কিন্তু সেই সুকোমল হাত এখন আর হাত নেই, তা যেন পাখির বাঁকা থাবা! মিশরীয় কোনো আধপোড়া মমি-র চর্মসার নখের মতো! আর ঠিক তখনই সে যেন বুঝতে পারল তার সাথে কী ভয়াবহ অঘটন ঘটে চলেছে! ওঃ, কী মারাত্মক চিৎকার করে উঠল সে! মেঝের ওপর গড়িয়ে গড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল সে!
সে ছোট হতে লাগল, আরও ছোট—যতক্ষণ না তা একটা মাঝারি বাঁদরের আকারে এসে ঠেকল। তার সমস্ত চামড়ায় অজস্র বলিরেখা কুঁকড়ে উঠল, আর সেই বিকৃত মুখের ওপর চেপে বসল অবর্ণনীয় বয়সের অমোছনীয় ছাপ! জীবনে এমন দৃশ্য আমি আর দেখিনি; পৃথিবীর কেউ কোনোদিন দেখেনি এমন জরাজীর্ণ বীভৎস চেহারা! আস্ত মাথার খুলিটা প্রায় আগের আকারেই রোদ পোহাচ্ছে, কিন্তু মুখমণ্ডলটা সঙ্কুচিত হয়ে দুই মাসের একটা সদ্যোজাত শিশুর আকৃতির চেয়ে বড় নয়! মানুষ যদি নিজের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, তবে যেন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে এমন দৃশ্য তাকে যেন কখনও দেখতে না হয়।
অবশেষে সে নিথর হয়ে পড়ে রইল, কিংবা হয়তো সামান্য একটু নড়াচড়া করছিল মাত্র। যে নারী মাত্র দুই মিনিট আগেও পৃথিবীর সেরা সুন্দরী, শ্রেষ্ঠা ও সবচেয়ে প্রতাপশালী নারী হিসেবে আমাদের দিকে চেয়ে ছিল, সে এখন আমাদের সামনে নিথর হয়ে পড়ে আছে নিজেরই খসে পড়া ঘন চূর্ণকুন্তলের পাশে—একটা বড়সড় বাঁদরের চেয়ে বড় নয় তার শরীর, আর দেখতে এমন বীভৎস—যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব! অথচ একবার ভেবে দেখুন—ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার মাথায় কথাটা খেলে গেল—এ কিন্তু সেই একই নারী!
সে মারা যাচ্ছিল—আমরা তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আর ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম! কারণ যতক্ষণ সে বেঁচে ছিল, তার মধ্যে চেতনা ছিল, আর কী চরম যন্ত্রণা যে সে অনুভব করছিল! হাড় জিরজিরে হাত দুটোর ওপর ভর দিয়ে সে নিজেকে একটু তুলল, আর কচ্ছপের মতো ধীরে ধীরে মাথাটা এপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে অন্ধের মতো চারপাশে তাকাল। সে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না, কারণ তার ধূসর চোখের ওপর পুরু শক্ত ছানি পড়ে গিয়েছিল। ওঃ, কী মর্মান্তিক করুণ আর বীভৎস সেই দৃশ্য! কিন্তু তখনও সে কথা বলতে পারছিল।
"ক্যালিক্রেটিস..." কাঁপাকাঁপা বুজো গলায় বলল সে, "আমাকে ভুলে যেও না, ক্যালিক্রেটিস! আমার এই দুর্গতির ওপর একটু করুণা কোরো... আমি আবার ফিরে আসব, আবার আগের মতো সুন্দরী হয়ে উঠব! আমি কসম খেয়ে বলছি—এ সত্যি! ওঃ... ওঃ... ওঃ..." আর বলতে বলতেই সে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মেঝের ওপর, আর তারপর সব নিঝুম।
আজ থেকে বিশ শতাব্দীরও আগে যে ঠিক জায়গাটায় সে পুরোহিত ক্যালিক্রেটিসকে হত্যা করেছিল, ঠিক সেইখানেই সে নিজে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল।
কতক্ষণ যে আমরা এভাবে অসাড় হয়ে পড়ে ছিলাম জানি না। হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে যখন আমি চোখ মেললাম, দেখলাম বাকি দুজন এখনও মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ে আছে। সেই গোলাপি আলো এখনও স্বর্গের ভোরের আলোর মতো ঠিকরে পড়ছে, আর জীবন-সত্তার বজ্রচাকাগুলো তাদের চিরাচরিত পথে ঘুরে চলেছে—কারণ আমার ঘুম ভাঙতেই দেখি সেই প্রকাণ্ড অগ্নিস্তম্ভটি দূরে চলে যাচ্ছে। আর সেখানে পড়ে আছে নোংরা হলুদ পার্চমেন্ট চামড়ায় মোড়া বীভৎস ছোট বাঁদরের মতো দেহটা—যা একদিন স্বয়ং সেই প্রতাপশালী মহীয়সী 'সে' (আয়েশা) ছিল! হায়! এ কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল না—এ ছিল এক করুণ, ভয়াবহ ও অভূতপূর্ব কঠোর বাস্তবতা!
কী ঘটেছিল এমন যে এমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটাল? প্রাণদায়ী আগুনের প্রকৃতি কি বদলে গিয়েছিল? নাকি তা সময়ে সময়ে প্রাণের নির্যাসের বদলে মৃত্যুর নির্যাস ছড়িয়ে দেয়? নাকি একবার সেই অলৌকিক শক্তিতে জারিত শরীর আর দ্বিতীয়বার তা সহ্য করতে পারে না—ফলে সময়ের ব্যবধান যাই হোক না কেন, দুটি প্রবেশ ক্রিয়া একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, আর দেহটি আবার সেই অবস্থায় ফিরে যায় যা আগুনের সংস্পর্শে আসার আগে ছিল? শুধুমাত্র এটাই হতে পারে আয়েশার হঠাৎ ও ভয়ঙ্করভাবে বুড়িয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ, যার ফলে তার দুই হাজার বছরের জমা হওয়া বয়স এক নিমেষে তার ওপর প্রভাব ফেলল।
আমার নিজের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, আমার সামনে পড়ে থাকা এই দেহটি ঠিক তেমনই এক নারীর শরীর—যাকে কোনো অলৌকিক উপায়ে বাইশ শত বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখা হলে শেষপর্যন্ত মৃত্যুর সময় তার যে চেহারা হওয়ার কথা ছিল, এ ঠিক তাই।
কিন্তু কে বলতে পারে আসলে কী ঘটেছিল? ঘটনা তো যা ঘটার ঘটে গেছে। সেই ভয়াবহ ঘণ্টার পর থেকে কতবার আমি ভেবেছি—এই ঘটনার নেপথ্যে বিধাতার হাত দেখতে পাওয়া কোনো কল্পনার বিষয় নয়। নিজের জীবন্ত সমাধিতে বন্দি আয়েশা যুগের পর যুগ ধরে তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করে বিশ্বের নিয়মে সামান্যই পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু ভালোবাসায় বলীয়ান, অমর যৌবন আর দেবীসুলভ সৌন্দর্যে মণ্ডিত, শত শত বছরের জ্ঞানে সমৃদ্ধ আয়েশা মানবসমাজকে ওলটপালট করে দিত, এমনকী হয়তো বদলে দিত সমগ্র মানবজাতির ভাগ্যকেই! তাই সে প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আর যতই শক্তিশালী সে হোক না কেন, সেই নিয়মই তাকে চিরতরে মুছে দিল—লজ্জা আর চরম বিদ্রূপের সাথে নিঃশেষ করে দিল তাকে!
কয়েক মিনিট ধরে মনে মনে এই ভয়াল চিন্তাগুলো তোলপাড় করতে লাগলাম, আর সেই প্রাণবন্ত আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে আমার শারীরিক শক্তি ফিরে এল। তারপর বাকি দুজনের কথা মনে পড়তেই টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালাম, তাদের জ্ঞান ফেরানো যায় কিনা দেখতে। কিন্তু তার আগেই আমি কুড়িয়ে নিলাম আয়েশার গায়ের পোশাক আর সেই পাতলা ওড়নাটা, যা দিয়ে সে সচরাচর মানুষের চোখ থেকে তার চোখধাঁধানো সৌন্দর্য ঢেকে রাখত; তারপর মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে—যাতে দৃশ্যটা আমাকে দেখতে না হয়—সেই মহীয়সী মৃতের ভয়ঙ্কর অবশেষকে, মানব সৌন্দর্য আর মানবজীবনের সেই করুণ নিদর্শনকে ঢেকে দিলাম। লিওর জ্ঞান ফিরে আসার আগেই আমি কাজটা তড়িঘড়ি সেরে ফেললাম, পাছে সে আবার ওই বিভীষিকা দেখতে পায়!
তারপর বালির ওপর পড়ে থাকা সেই সুবাসিত ঘন চুলের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে আমি উপুড় হয়ে থাকা জবের পাশে ঝুঁকলাম, তাকে কাত করে সোজা করলাম। করতে গিয়েই তার হাতটা যেভাবে পেছনে ঢলে পড়ল, তা আমার মোটেও পছন্দ হল না—শিরদাঁড়া বেয়ে যেন এক হিমেল স্রোত নেমে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম তার দিকে। এক নজর দেখাই যথেষ্ট ছিল। আমাদের পুরনো ও বিশ্বস্ত অনুচর জব আর বেঁচে নেই! যা কিছু সে দেখেছে আর সহ্য করেছে, তাতে তার স্নায়ু আগেই চুরমার হয়ে গিয়েছিল—আর এই শেষ চরম দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে ভয়ে বা ভীতিজনিত খিঁচুনির চোটেই তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। তার মুখের দিকে তাকালেই তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।
এ ছিল আরেকটা কঠোর আঘাত; কিন্তু আমরা কী চরম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম, তা হয়তো মানুষ অনুধাবন করতে পারবে একটি কথাতেই—সেই মুহূর্তে এই মৃত্যুর ধাক্কা আমাদের মনে খুব একটা দাগ কাটতে পারেনি। বেচারা জবের মারা যাওয়াটা তখন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা মনে হয়েছিল। মিনিট দশেক পর যখন লিওর হাত-পা কেঁপে উঠল আর সে কোঁকাতে কোঁকাতে জ্ঞান ফিরে পেল, তখন তাকে যখন বললাম জব মারা গেছে, সে কেবল একটা শব্দই উচ্চারণ করল—"ওঃ!" আর মনে রাখবেন, এ কিন্তু তার কোনো নিষ্ঠুরতা ছিল না; কারণ সে আর জব একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসত, আর আজও সে জবের কথা গভীর শোক ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করে। আসল কথা হল, তার স্নায়ু আর কিছু সহ্য করার অবস্থায় ছিল না। বীণায় যতই জোরে আঘাত করা হোক না কেন, তার থেকে তো কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সুর বের হতে পারে না!
যাই হোক, আমি লিওর সুশ্রূষায় লেগে পড়লাম—চরম স্বস্তির বিষয় হল সে মরে যায়নি, কেবল অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল—আর শেষমেশ আমি সফল হলাম, সে সোজা হয়ে বসল। আর ঠিক তখনই আমি দেখলাম আরেক ভয়াবহ কাণ্ড! যখন আমরা ওই বিভীষিকাময় জায়গায় পা রেখেছিলাম, তার কোঁকড়ানো চুলগুলো ছিল টকটকে কাঁচা সোনার মতো লালচে-সোনালি; এখন তা ধূসর হতে শুরু করেছে, আর বাইরের বাতাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই চুল একেবারে বরফের মতো সাদা হয়ে গেল! তা ছাড়া, তাকে যেন রাতারাতি কুড়ি বছর বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছিল।
"এখন কী করা যায় বল তো, ভাই?" একটা খাঁ খাঁ করা নির্জীব গলায় বলল সে—তখন তার মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়েছে আর যা ঘটেছে তা স্মরণে এসেছে।
"বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো মনে হয়," আমি জবাব দিলাম, "অবশ্য যদি না তুমি ওই ভেতরে ঢুকতে চাও..." আর এই বলে আমি আবার ঘুরে আসা অগ্নিস্তম্ভটার দিকে আঙুল দেখালাম।
"যদি নিশ্চিত জানতাম যে ওটা আমাকে মেরে ফেলবে, তবে আমি ওর ভেতরেই ঢুকে যেতাম," একটা শুকনো হাসি হেসে বলল সে। "আমারই ওই কুফুরি ইতস্তত করার দরুন এই সর্বনাশ ঘটল! আমি যদি দ্বিধা না করতাম, তবে সে আমাকে পথ দেখাতে যেত না! কিন্তু আমি তো নিশ্চিত নই। আগুনটা হয়তো আমার ওপর উল্টো প্রভাব ফেলবে। আমাকে হয়তো অমর বানিয়ে দেবে! আর ভাই, আমার তো সেই ধৈর্য নেই যে সে যেমন আমার জন্য দু-হাজার বছর অপেক্ষা করেছিল, আমিও তার ফিরে আসার জন্য আবার দু-হাজার বছর বসে থাকব! তার চেয়ে সময় এলেই আমি মরতে রাজি—আর আমার মনে হয় সেই সময় খুব বেশি দূরে নেই—তারপর নিজের মতো গিয়ে তাকে খুঁজে নেব। তোর ইচ্ছে হলে তুই যেতে পারিস আগুনে।"
কিন্তু আমি কেবল মাথা নাড়লাম; আমার উত্তেজনা ততক্ষণে নর্দমার জলের মতোই বাসি আর ঠান্ডা হয়ে গেছে, আর নশ্বর জীবনকে দীর্ঘায়িত করার প্রতি আমার বিতৃষ্ণা আগের চেয়েও প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। তা ছাড়া, সেই আগুনের প্রভাব কী হতে পারে তা আমাদের কারও জানা ছিল না। 'সে'-র ওপর তার ফল তো মোটেই আশাব্যঞ্জক হয়নি, আর কী কারণে এমন ফল হল তা-ও তো আমরা জানি না।
"ঠিক আছে ভাই," আমি বললাম, "আমরা তো আর এদের দুজনের মতো গতি হওয়া পর্যন্ত এখানে বসে থাকতে পারি না,"—এই বলে সাদা কাপড়ে ঢাকা ছোট স্তূপটা আর বেচারা জবের শক্ত হয়ে আসা লাশের দিকে আঙুল দেখালাম। "যদি যেতে হয় তবে এখনই বেরোনো ভালো। তবে হ্যাঁ, মনে হয় চেরাগগুলো নিভে গেছে।" একটা প্রদীপ তুলে নিয়ে দেখলাম—ঠিক তাই, তেল ফুরিয়ে নিভে গেছে।
"সুরহিতে আরও খানিকটা তেল আছে," উদাসীন গলায় বলল লিও, "অন্তত যদি ওটা ভেঙে না গিয়ে থাকে।"
আমি পাত্রটি পরীক্ষা করলাম—তা অক্ষত ছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে প্রদীপগুলোতে তেল ভরলাম—ভাগ্যিস তখনও কিছু তিসির সলতে না পুড়ে বাকি ছিল। তারপর দেশলাই জ্বেলে প্রদীপগুলো জ্বালিয়ে নিলাম। জ্বালানোর সময়ই আবার শুনতে পেলাম সেই অগ্নিস্তম্ভের এগিয়ে আসার শব্দ—নিজের অনন্তযাত্রায় সে আবার ঘুরে আসছে, যদি সত্যি সত্যিই ওটা একই অগ্নিস্তম্ভ হয়ে থাকে যা বৃত্তাকারে বারে বারে আবর্তিত হচ্ছে!
"চল, আরও একবার ওটাকে আসতে দেখি," লিও বলল, "এই দুনিয়ায় এমন জিনিস আমরা আর কোনোদিন দেখতে পাব না।"
কথাটা কৌতূহলবশত মনে হলেও কেমন যেন আমিও সায় দিলাম। তাই আমরা অপেক্ষা করলাম, যতক্ষণ না তা নিজের অক্ষের ওপর ধীরগতিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রকাণ্ড গর্জন আর আগুনের আলো ছড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমার মনে আছে, তখন আমি ভাবছিলাম কত হাজার বছর ধরে যে পৃথিবীর এই পাতালপুরীতে একই অলৌকিক ঘটনা ঘটে চলেছে, আর কত হাজার বছর ধরে তা ঘটে চলবে! আরও ভাবছিলাম, কোনো মরণশীল মানুষের চোখ কি কোনোদিন আর এর যাওয়া দেখতে পাবে, বা কোনো মরণশীল কান কি এর গুরুগম্ভীর রাজকীয় শব্দে শিহরিত ও মোহিত হবে? আমার মনে হয় না পাবে। আমার বিশ্বাস, আমরাই শেষ মানুষ যারা ওই অপার্থিব দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লাভ করেছি। দেখতে দেখতে তা চলে গেল, আর আমরাও পা বাড়ালাম।
কিন্তু রওনা হওয়ার আগে আমরা দুজন জবের বরফের মতো ঠান্ডা হাত দুটো হাতে তুলে নিয়ে করমর্দন করলাম। দৃশ্যটা বেশ থমথমে আর ভয়াবহ দেখালেও, বিশ্বস্ত মৃত বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আর অন্ত্যোষ্টি পালনের এটাই ছিল আমাদের সাধ্যের একমাত্র উপায়। তবে সাদা কাপড়ের নিচের সেই স্তূপটা আমরা আর অনাবৃত করিনি। ওই বিভীষিকাময় দৃশ্য আর দেখার কোনো ইচ্ছা আমাদের ছিল না। কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়েও হাজারগুণ ভয়াবহ পরিবর্তনের যন্ত্রণায় খসে পড়া সেই তরঙ্গায়িত চুলের স্তূপটার কাছে গেলাম আমরা; দুজনেই সেখান থেকে এক গোছা করে উজ্জ্বল চুল তুলে নিলাম—যে চুলের গোছা আজও আমাদের কাছে রয়ে গেছে, আয়েশার সেই পূর্ণ রূপ ও মহিমার একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে! লিও সেই সুবাসিত চুল নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল।
"সে আমাকে বারণ করেছিল তাকে ভুলে যেতে," বসে যাওয়া গলায় বলল সে, "আর কসম খেয়েছিল যে আমাদের আবার দেখা হবে! ঈশ্বরের দোহাই! আমি কোনোদিন তাকে ভুলব না। আমি শপথ করছি, যদি এখান থেকে আমরা জ্যান্ত বেরিয়ে যেতে পারি, তবে জীবনের বাকি দিনগুলোতে আমি আর কোনো নারীর দিকে ফিরেও তাকাব না, আর যেখানেই যাই না কেন, সে যেভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল, আমিও ঠিক তেমনি অনুগত হয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে যাব।"
"হ্যাঁ," মনে মনে ভাবলাম আমি, "যদি সে আবার আগের মতোই সুন্দরী হয়ে ফিরে আসে তো ভালো। কিন্তু ধরো যদি সে ঠিক ওই রূপ নিয়ে ফিরে আসে!"[১]
[১] সত্যি, কত ভয়ংকর একটা চিন্তা, যে নিজেদের রক্তসম্পর্কিত নয় এমন নারীদের প্রতি আমাদের প্রায় সমস্ত গভীর ভালোবাসা নির্ভর করে—অন্তত প্রথম দর্শনে—তাদের বাহ্যিক চেহারার ওপর। আমরা যদি তাদের হারিয়ে ফেলি, আর আবার যখন তাদের খুঁজে পাই তখন তারা দেখতে বীভৎস হয়ে যায়—যদিও ভেতরের মানুষটা একই থাকে—তবে কি আমরা তখনও তাদের সমান ভালোবাসব? —এল. এইচ. এইচ.
যাই হোক, তারপর আমরা চলে এলাম। আমরা চলে এলাম সেই দুজনকে স্বয়ং জীবনের উৎস ও প্রস্রবণের সামনে রেখে, কিন্তু মৃত্যুর শীতল কোলে সমর্পিত অবস্থায়। সেখানে শুয়ে থাকা অবস্থায় কী একলা আর কী অদ্ভুত অমিল দেখাচ্ছিল ওদের দুজনকে! ওই যে ছোট্ট স্তূপটা, তা দু-হাজার বছর ধরে ছিল গোটা মহাবিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানী, সুন্দরী ও গর্বিত এক সত্তা—তাকে কেবল নারী বললে ভুল হবে। সে তার নিজের মতো করে কুটিলও ছিল; কিন্তু আফসোস! মানুষের হৃদয়ের দুর্বলতা এমনই যে, তার কুটিলতা তার আকর্ষণকে বিন্দুমাত্র কমায়নি। বরঞ্চ বলা চলে, তা যেন তার মোহময়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল! সর্বোপরি তার সব কিছুই ছিল রাজকীয় মর্যাদার, আয়েশার মধ্যে হীন বা ছোট মানসিকতার কিছু ছিল না।
আর বেচারা জব! তার কুসংকেত সত্যি হল, তারও শেষ পরিণতি ঘটল। যা-ই হোক, অপূর্ব এক সমাধিস্থল পেয়েছে সে—নরফোকের কোনো চাষাভুষো কৃষক এত অদ্ভুত সমাধি পায়নি, পাবেও না; আর সর্বময়ী 'সে'-র অবশেষের সাথে একই সমাধিতে শায়িত হওয়া তো মুখের কথা নয়!
তাদের ওপর এবং যে অবর্ণনীয় গোলাপি আভায় তারা শুয়েছিল তার ওপর শেষ নজর বোলালাম আমরা, তারপর ভাষায় প্রকাশের অসাধ্য ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে স্থানটি ত্যাগ করলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম দুটি ভগ্নহৃদয় মানুষ—এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে কার্যত অমর জীবন পাওয়ার সুযোগকেও পায়ে ঠেলে দিলাম; কারণ জীবনকে যা মূল্যবান করে তোলে তা ততক্ষণে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে, আর আমরা জানতাম অনির্দিষ্টকালের জন্য বেঁচে থাকা মানে কেবল যন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করা। কারণ আমরা অনুভব করেছিলাম—হ্যাঁ, আমরা দুজনেই—যে একবার আয়েশার চোখের দিকে তাকালে, স্মৃতি আর সত্তা বজায় থাকা পর্যন্ত তাকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব! আমরা দুজনেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছি চিরকালের জন্য, আমাদের হৃদয়ে তার ছবি খোদাই হয়ে গেছে, আর কোনো নারী বা জগতের অন্য কোনো আকর্ষণ সেই অমলিন ছাপ মুছে ফেলতে পারবে না। আর আমি—ক্ষতটা তো ঠিক এইখানেই—তার কথা এভাবে ভাবার কোনো অধিকার আমার ছিল না, আজও নেই। সে যেমন আমাকে বলেছিল, তার কাছে আমার কোনো মূল্য ছিল না, আর কালের অতল গহ্বরে কোনোদিন হবেও না—যদি না পরিস্থিতি বদলে গিয়ে এমন একদিন আসে যখন দুটি পুরুষ একটি নারীকে ভালোবাসতে পারবে আর তিনজনই তাতে সুখী হবে! ভগ্নহৃদয় আমার এটুকুই একমাত্র আশা, তাও অতি ক্ষীণ আশা। এ ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। ইহকাল আর পরকালের যাবতীয় অর্ঘ্য দিয়ে আমি এই চরম মূল্য চুকিয়েছি, আর এটাই আমার একমাত্র পুরস্কার। লিওর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা, আর প্রায়শই তার ভাগ্যকে আমি ঈর্ষা করি; কারণ 'সে' যদি ঠিক বলে থাকে, আর শেষ মুহূর্তে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা যদি ব্যর্থ না হয়ে থাকে—নিজের অভিজ্ঞতার আলোতে যা ভুল হওয়া অসম্ভব বললেই চলে—তবে লিওর সামনে অন্তত একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে। কিন্তু আমার কিছু নেই; অথচ—মানুষের হৃদয়ের মূর্খতা আর দুর্বলতা দেখুন, আর জ্ঞানী ব্যক্তিরা তা থেকে শিক্ষা নিন—তবুও আমি অন্য কিছু চাই না! বলতে চাই, যা দিয়েছি আর যা আমাকে দিতেই হবে তা দিয়ে আমি সন্তুষ্ট, আর তার বিনিময়ে মনিবের মেঝের ঝরে পড়া প্রসাদ কুড়িয়ে নিতেও আমি রাজি—কয়েকটি মিষ্টি কথার স্মৃতি, সুদূর কোনো এক না-দেখা ভবিষ্যতে চেনার ভঙ্গিতে তার মিষ্টি একটুখানি হাসি, সামান্য একটু কোমল বন্ধুত্ব, আর তার ও লিওর প্রতি আমার নিষ্ঠার জন্য একটুখানি কৃতজ্ঞতার প্রদর্শন!
যদি এতেই প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ না পায়, তবে ভালোবাসা কাকে বলে তা আমার জানা নেই; আর শেষ কথা এই যে, মাঝবয়সের শেষ কোঠায় পৌঁছে কোনো মানুষের এমন দশা হওয়া সত্যিই চরম দুর্দশাজনক!
আমরা কোনো ঝামেলা ছাড়াই গুহাগুলো পেরিয়ে এলাম, কিন্তু যখন উল্টোনো শঙ্কুর মতো ঢালু জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম, তখন দুটো কঠিন সমস্যা আমাদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াল। প্রথমটা হল এই খাড়া চড়াই ওঠার অমানুষিক পরিশ্রম, আর দ্বিতীয়টা হল পথ খুঁজে পাওয়ার চরম দুষ্করতা। সত্যি বলতে, আসার সময় ভাগ্যক্রমে কয়েকটা অদ্ভুত আকৃতির পাথরের চিহ্ন যদি আমি মনে মনে টুকে না রাখতাম, তবে নিশ্চিতভাবেই আমরা কোনোদিন আর এখান থেকে বেরোতে পারতাম না। এই ভয়াল আগ্নেয়গিরির উদরে—কারণ এককালে নিশ্চয়ই এটা তেমনই কিছু একটা ছিল—আজীবন ঘুরে মরে অবশেষে ক্লান্তি আর হতাশায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হত। এমনিতেই আমরা কয়েকবার ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম, আর একবার তো বিশাল এক ফাটল বা গিরিখাতের মধ্যে পড়তেই যাচ্ছিলাম। সেই নিচ্ছিদ্র অন্ধকার আর থমথমে ভয়াবহ নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা বিশাল পাথর থেকে অন্য পাথরে হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া, আর লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় তার আকৃতি চিনে নেওয়ার চেষ্টা করা যে কী দুঃসহ কাণ্ড, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের মুখ দিয়ে প্রায় কোনো কথাই ফুটছিল না, বুকের ভিতরটা এতই ভারাক্রান্ত ছিল যে কথা বলার মানসিকতাই ছিল না; আমরা শুধু একগুঁয়ের মতো হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলছিলাম, কখনো পড়ে গিয়ে গায়ের চামড়া ছড়ে রক্ত পড়ছিল। আসলে আমাদের মনোবল তখন পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল, আমাদের কপালে কী লেখা আছে তা নিয়ে আর কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। শুধু প্রাণটা বাঁচানোর শেষ একটা চেষ্টা করা দরকার, মানুষের সহজাত বেঁচে থাকার আদিম তাগিদেই আমরা যেন কোনোমতে টেনে হিঁচড়ে চলছিলাম। এইভাবে প্রায় ৩ বা ৪ ঘণ্টা ধরে—ঠিক কতটা সময় তা বলতে পারব না, কারণ সময় দেখার মতো সচল কোনো ঘড়ি আমাদের কাছে আর অবশিষ্ট ছিল না—আমরা হেঁটে চললাম। শেষের ২ ঘণ্টা আমরা পুরোপুরি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, আর আমার ভয় হচ্ছিল যে আমরা হয়তো মূল আগ্নেয়গিরির পাশে অন্য কোনো ছোট খাদে গিয়ে পড়েছি। এমন সময় হঠাৎ করেই আমি একটা বিশালাকার পাথর চিনে ফেললাম, নামার সময় চূড়া থেকে কিছুটা নিচে যেটা আমরা দেখে গিয়েছিলাম। এই অন্ধকারের মধ্যে যে পাথরটা আমার চোখে পড়ল, সেটা একটা অলৌকিক ব্যাপারই বটে! সত্যি বলতে, আমরা সঠিক পথের সমকোণে হেঁটে পাথরটা পেরিয়েই গিয়েছিলাম, কিন্তু হুট করে একটা খটকা লাগায় আমি পিছন ফিরে অলসভাবে সেটা পরীক্ষা করতে গেলাম, আর সেটাই শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল।
এর পর বিশেষ কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমরা পাথুরে প্রাকৃতিক সিঁড়িটার সন্ধান পেলাম, এবং যথাসময়ে আবার সেই ছোট কুঠুরিটায় ফিরে এলাম, যেখানে সেই অশুভ যুগের সাধু নুট জীবনের দিনগুলো কাটিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
কিন্তু এবার এক নতুন আতঙ্ক আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। পাঠকদের হয়তো মনে আছে যে, জবের ভয় আর আনাড়িপনার কারণে, সেই বিশাল পাহাড়ী খাঁজ থেকে দোদুল্যমান পাথরটায় পার হওয়ার যে কাঠের তক্তাটা ছিল, সেটা তলার অতল গিরিখাতে তলিয়ে গিয়েছিল।
সেই তক্তা ছাড়া আমরা এখন ওপারে যাব কীভাবে?
উত্তর ছিল একটাই—আমাদের লাফ দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, নইলে এই কুঠুরিতে পচে ধুঁকে ধুঁকে না খেয়ে মরতে হবে। ব্যবধানটা অবশ্য খুব একটা বেশি ছিল না, আমার মনে হয় ১১-১২ ফুটের মতো হবে, আর লিও যখন কলেজের ছোকরা ছিল, তখন তো তাকে ২০ ফুটেরও বেশি লাফাতে দেখেছি; কিন্তু একবার তখনকার পরিস্থিতির কথা ভাবুন! দুজন মারাত্মক শ্রান্ত, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মানুষ, যাদের একজনের বয়স ৪০ পেরিয়ে গেছে; লাফ দেওয়ার জায়গাটা হল একটা দুলতে থাকা নড়বড়ে পাথর, আর ওপারে অবতরণ করার জায়গাটা মাত্র কয়েক ফুট চওড়া একটা থরথর করে কাঁপতে থাকা পাথরের খাঁজ—আর মাঝখানে এক সর্বনাশা ক্ষিপ্ত ঝড়ের মধ্যে পার হতে হবে এক অতল খাদ! ঈশ্বর জানেন, পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ হতে পারত না। কিন্তু আমি যখন এই ভয়াবহ দিকগুলো লিয়োর সামনে তুলে ধরলাম, সে সংক্ষেপে পুরো ব্যাপারটা এক কথায় শেষ করল। বলল, পছন্দটা যত নির্মমই হোক না কেন, আমাদের এই কুঠুরিতে ধুঁকে ধুঁকে নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা আর শূন্যে লাফিয়ে একমুহূর্তে মৃত্যুকে সঁপে দেওয়ার মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নিতেই হবে। অবশ্য এই যুক্তির বিরুদ্ধে আর কোনো তর্ক চলে না; তবে একটা কথা পরিষ্কার ছিল, এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে আমরা লাফালাফি করতে পারি না। একমাত্র পথ হল সূর্যাস্তের সময় গিরিখাত ভেদ করে আসা সেই আলোর রশ্মিটার জন্য অপেক্ষা করা। সূর্যাস্ত হতে আর কতটা দেরি বা কত সময় বাকি, সে সম্পর্কে আমাদের কারোরই বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। আমরা শুধু জানতাম যে আলোটা শেষ পর্যন্ত যখন আসবে, তখন তা বড়জোর ২ মিনিটের বেশি স্থায়ী হবে না; তাই আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই অনুযায়ী, আমরা ঠিক করলাম দোদুল্যমান পাথরটার চূড়ায় গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকব এবং তৈরি থাকব। এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া আরও সহজ হল কারণ আমাদের লণ্ঠনের তেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল—একটা লণ্ঠন তো সম্পূর্ণ নিভেই গিয়েছিল, আর অন্যটার সলতে নিভু নিভু শিখায় কাঁপা কাঁপা আলো দিচ্ছিল। তাই সেই মৃত্যু পথযাত্রী আলোর সাহায্যেই আমরা তাড়াতাড়ি কুঠুরি থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম এবং বিশাল পাথরটার গায়ে বেয়ে ওপরে উঠে গেলাম।
আমরা ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আলোটা একেবারে নিভে গেল।
আমাদের আগের আর এখনকার অবস্থানের পার্থক্যটা সত্যিই প্রচণ্ড ছিল। নিচে, সেই ছোট কুঠুরির মধ্যে আমরা শুধু মাথার ওপর ঝড়ের গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম—কিন্তু এখানে, সেই দোদুল্যমান পাথরের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আমরা সরাসরি ঝড়ের সমস্ত আক্রোশ আর তাণ্ডবের মুখে এসে পড়লাম। বাতাসের প্রবল ঝাপটা একবার এদিক থেকে আবার ওদিক থেকে এসে সেই বিশাল পাহাড়ী দেওয়াল আর পাথরের খাঁজে ধাক্কা খেয়ে গর্জে উঠছিল, যেন ১০,০০০ হতাশাগ্রস্ত আত্মা একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠছে! ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা সেখানে চরম আতঙ্ক আর মনের অপরিসীম যন্ত্রণায় শুয়ে রইলাম—সেই যন্ত্রণার বিবরণ দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আমরা শুনতে লাগলাম সেই নরককুণ্ডের বুনো ঝড়ের তাণ্ডবনৃত্য; ওপাশের পাহাড়ী খাঁজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাতাস যেন কোনো ভয়াল তানপুরার মতো গম্ভীর সুরে বাজছিল, আর এক পাহাড়ের চূড়া থেকে অন্য চূড়ায় সেই শব্দ প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। মানুষের কল্পনার কোনো দুঃস্বপ্ন, কিংবা কোনো গল্পকারের উদ্দাম কল্পনাও সেই জায়গার জ্যান্ত ভয়াবহতা আর রাতের সেই অদ্ভুত কান্নার সমতুল্য হতে পারে না। আমরা যেন কোনো জাহাজডুবি হওয়া নাবিকের মতো ভেলায় আঁকড়ে ধরে আছি, আর চারপাশের কালো, অতল শূন্যতায় ভেসে বেড়াচ্ছি। সৌভাগ্যবশত তাপমাত্রা খুব কম ছিল না; সত্যি বলতে বাতাসটা বেশ গরমই ছিল, তা না হলে আমরা জমে মারাই যেতাম। সুতরাং আমরা পাথরটা আঁকড়ে ধরে সেই শব্দ শুনতে লাগলাম। আর পাথরটার ওপর আমরা যখন চিত হয়ে শুয়ে ছিলাম, তখন এমন একটা ঘটনা ঘটল যা অত্যন্ত অদ্ভুত ও ইঙ্গিতপূর্ণ—যদিও নিঃসন্দেহে তা একটি কাকতালীয় ঘটনা মাত্র—কিন্তু সেটা আমাদের স্নায়ুর ওপর চাপ কমানোর বদলে যেন আরও বাড়িয়ে দিল।
পাঠকদের মনে থাকতে পারে যে, আমরা পাথরটায় পার হওয়ার আগে আয়েশা যখন সেই পাহাড়ী খাঁজে দাঁড়িয়েছিল, তখন ঝড় তার গায়ের পোশাক বা আলখাল্লাটা উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সেই অন্ধকার গিরিখাতের গভীরে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, আমরা দেখতে পাইনি সেটা কোথায় গেল। যাই হোক—ঘটনাটা বলতেও কেমন যেন লাগে, এতই তা অদ্ভুত! আমরা যখন দোল খাওয়া পাথরটার ওপর শুয়ে ছিলাম, ঠিক সেই আলখাল্লাটাই সেই কালো শূন্যতার বুক চিরে ভেসে এল, যেন মৃতপুরী থেকে আসা এক অতীত স্মৃতি! আর এসে পড়ল লিয়োর ওপর—তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই ঢেকে দিল। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি বস্তুটা কী, কিন্তু স্পর্শ করতেই চিনে ফেললাম। আর অমনি বেচারা লিয়ো, জীবনের প্রথমবার নিজের সমস্ত সংবরণ হারিয়ে ভেঙে পড়ল; আমি শুনলাম সে পাথরটার ওপর মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নিঃসন্দেহে আলখাল্লাটা পাহাড়ের কোনো খাঁজে আটকে ছিল, আর হঠাৎ এক বাতাসের ঝাপটায় উড়ে এসে এখানে পড়েছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘটনাটা ছিল মারাত্মক অদ্ভুত আর হৃদয়বিদারক।
এর কিছুক্ষণ পরেই, আগাম কোনো আভাস না দিয়েই, আলোর একখানা বিশালাকার লাল ছুরি অন্ধকারকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে চিরে বেরিয়ে এল—সেটা এসে আঘাত করল আমাদের সেই দুলতে থাকা পাথরে, আর তার তীক্ষ্ণ ডগা গিয়ে ঠেকল ওপাশের পাহাড়ী খাঁজটায়।
"এবার সময় এসেছে," লিয়ো বলল, "এখনই সুযোগ, নইলে আর কোনোদিন নয়।"
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের হাত-পা সোজা করে নিলাম, আর নিচে ভয়াবহ অতল গভীরে রক্তের মতো লাল আলোয় ছোপানো মেঘের খেলা দেখতে লাগলাম। তারপর সেই দুলতে থাকা পাথর আর ওপাশের কাঁপা পাথরের খাঁজটার মাঝখানের ফাঁকা শূন্যতার দিকে তাকালাম—আমাদের হৃদয় হতাশায় ভরে উঠল, আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলাম। নিশ্চিতভাবেই আমরা এত বড় শূন্যতা পার হতে পারব না—মরিয়া হলেও এটা অসম্ভব।
"প্রথমে কে যাবে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"তুমি আগে যাও, পুরোনো বন্ধু," লিয়ো জবাব দিল। "আমি পাথরের অন্য প্রান্তে বসে ওটাকে স্থির রাখার চেষ্টা করব। তুমি যতটা সম্ভব দৌড়ে এসে উঁচু হয়ে লাফ দেবে; আর আমাদের ওপর ঈশ্বর কৃপা করুন, এই আমি বলি।"
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। এর পর আমি এমন একটা কাজ করলাম যা লিয়ো ছোট শিশু থাকার পর থেকে আমি আর কখনো করিনি। আমি ঘুরে তার কাঁধে হাত রাখলাম এবং তার কপালে একটা চুমু খেলাম। শুনতে হয়তো একটু আবেগপ্রবণ ফরাসি কায়দার মনে হতে পারে, কিন্তু আসল কথা হল আমি এমন একজন মানুষের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিচ্ছিলাম, যাকে আমার নিজের পেটের সন্তান হলেও এর চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারতাম না।
"বিদায়, আমার বাছা," আমি বললাম, "আশা করি আমরা আবার যেখানেই যাই না কেন, আমাদের দেখা হবে।"
আসল কথা হল, আমি আর পরবর্তী ২ মিনিট বাঁচার আশা করছিলাম না।
তার পর আমি পাথরটার একবারে পেছনের প্রান্তে পিছু হটে গেলাম, এবং পেছন থেকে বাতাসের একটা জোরালো ঝাপটা আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাতাস আসতেই আমি প্রায় ৩৪-৩৫ ফুট লম্বা সেই বিশাল পাথরটার ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে শূন্যে এক উদ্দাম লাফ দিলাম! ওঃ! সেই ছোট্ট পাথরের চূড়াটাকে লক্ষ্য করে নিজেকে শূন্যে ছুঁড়ে দেওয়ার মুহূর্তে যে মাথা ঘোরানো আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না! আর যখন বুঝতে পারলাম যে আমার লাফটা নাগাল পায়নি—খাটো হয়ে গেছে, তখন যে কী ভয়াবহ হতাশার বিদ্যুৎ আমার মগজে খেলে গেল! কিন্তু সত্যি তাই হল, আমার পা দুটো কখনোই সেই খাঁজে পৌঁছল না, সেগুলো শূন্যে ঝুলতে লাগল, কেবল আমার হাত আর শরীরটা গিয়ে পড়ল খাঁজটার ওপর। একটা বুকফাটা চিৎকার দিয়ে আমি হাত দিয়ে পাথরটা আঁকড়ে ধরলাম, কিন্তু একটা হাত ফসকে গেল! আমি অন্য হাতটা আঁকড়ে ধরে পুরো ঘুরে গেলাম, ফলে যে পাথর থেকে লাফ দিয়েছিলাম সেটার দিকে মুখ ঘুরে গেল। আমি মরিয়ার মতো বাঁ হাতটা ওপরে বাড়িয়ে দিলাম এবং ভাগ্যক্রমে এবার পাথরের একটা উঁচু ঢিবি আঁকড়ে ধরতে পারলাম। সেই ভয়াল লাল আলোর মধ্যে নিচে হাজার হাজার ফুট শূন্যতা নিয়ে আমি ঝুলে রইলাম! আমার দুই হাত দিয়ে পাহাড়ী খাঁজের তলার দিকটা আঁকড়ে ধরেছিলাম, ফলে সেটির চুড়োটা আমার মাথায় ঠেকছিল। তাই গায়ে জোর থাকলেও নিজেকে টেনে ওপরে তোলার কোনো উপায় ছিল না। আমি বড়জোর ১ মিনিটের মতো এইভাবে ঝুলে থাকতে পারব, আর তার পর নিচে, অতল গহ্বরে খসে পড়ব। এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা যদি কেউ কল্পনা করতে পারে, তো করুক! আমি শুধু জানি যে সেই আধা মিনিটের মানসিক যন্ত্রণা আমার মাথা প্রায় বিগড়ে দিয়েছিল।
আমি শুনলাম লিয়ো একটা চিৎকার দিল, আর তার পরেই হঠাৎ দেখলাম সে শূন্যে কোনো পাহাড়ি হরিণের মতো লাফিয়ে উঠল! আতঙ্ক আর হতাশার তীব্র আবেগে সে এমন এক অসাধারণ লাফ দিল যে সেই ভয়াবহ গিরিখাত যেন নিমেষেই পার হয়ে গেল, এবং পাথরের খাঁজের ওপর শক্তভাবে অবতরণ করেই সে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল যাতে গড়িয়ে নিচে না পড়ে যায়। সে এসে আছড়ে পড়ার সাথে সাথে আমার মাথার ওপরের পাহাড়ী খাঁজটা কেঁপে উঠল। আর ঠিক তখনই আমি দেখলাম, লিয়োর লাফের ধাক্কায় যে বিশালাকার দোল খাওয়া পাথরটা তীব্রভাবে ডেবে গিয়েছিল, তার শরীরের ওজন সরে যেতেই সেটা স্প্রিংয়ের মতো পিছন দিকে এমন জোরে ছিটকে গেল যে এত শত শত বছর পর এই প্রথমবার তার ভারসাম্যের কেন্দ্র হারিয়ে গেল! এক ভয়াবহ বিকট শব্দে পাথরটা সোজা গিয়ে পড়ল সেই পাথুরে কুঠুরিটার ওপর—যেটা একদা মহামতি দার্শনিক নুটের আশ্রম ছিল। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, শত শত টন ওজনের সেই পাথরের ধ্বস জীবনদায়ী স্থানে যাওয়ার পথটিকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিল।
এই সবকিছু ঘটল চোখের নিমেষে, আর অদ্ভুত ব্যাপার হল, আমার সেই ভয়াবহ ঝুলন্ত অবস্থায় থেকেও আমি যেন অজান্তেই পুরো দৃশ্যটা খেয়াল করলাম। এমনকী আমার মনে আছে আমি ভাবছিলাম যে কোনো মানবসন্তান আর কোনোদিন ওই ভয়ঙ্কর পথ ধরে হেঁটে যেতে পারবে না।
পরমুহূর্তেই আমি অনুভব করলাম লিয়ো তার দুই হাত দিয়ে আমার ডান কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল। পাথরের খাঁজের ওপর চ্যাপ্টা হয়ে শুয়ে সে কোনোমতে আমার হাত নাগাল পেয়েছিল।
"তোমাকে বাঁ হাতটা ছেড়ে দিয়ে শরীরটা ঝুলিয়ে দিতে হবে," অত্যন্ত শান্ত আর ধীরস্থির কণ্ঠে সে বলল, "তার পর আমি তোমাকে টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করব, নয়তো আমরা দুজন একসাথে নিচে তলিয়ে যাব। তুমি কি তৈরি?"
উত্তর হিসেবে আমি প্রথমে আমার বাঁ হাত, আর তার পর ডান হাতটা ছেড়ে দিলাম; ফলে পাহাড়ের ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে আমার পুরো শরীরের ওজন লিয়োর বাহুদুটোর ওপর এসে ঝুলতে লাগল। সে এক রোমহর্ষক মুহূর্ত! আমি জানতাম সে প্রচণ্ড শক্তিশালী লোক, কিন্তু এই বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে শুয়ে থেকে আমাকে টেনে তুলে পাহাড়ের ওপরের খাঁজে পৌঁছানো কি তার সাধ্যে কুলোবে?
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি দোলার মতো ঝুলতে লাগলাম, আর লিয়ো নিজের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করতে লাগল। তার পর আমি আমার মাথার ওপর তার পেশী আর রগের মড়মড় শব্দ শুনতে পেলাম, এবং অনুভব করলাম আমাকে যেন কোনো ছোট শিশুর মতো শূন্যে তুলে ধরা হচ্ছে! অবশেষে আমি আমার বাঁ হাতটা পাথরের চারপাশে জড়িয়ে ধরতে পারলাম এবং বুকটা পাথরের ওপর তুলে দিতে পারলাম। বাকিটা খুব সহজ ছিল; আর ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি ওপরে উঠে এলাম, আর আমরা দুজন পাশাপাশি শুয়ে হাঁপাতে লাগলাম। আমাদের শরীর গাছের পাতার মতো থরথর করে কাঁপছিল আর ভয়ের হিমশীতল ঘামে গা ভেসে যাচ্ছিল।
আর তার পর, আগের মতোই, বাতির মতো নিভে গেল সেই আলো।
প্রায় আধা ঘণ্টা আমরা কোনো কথা না বলে ওভাবে শুয়ে রইলাম, তার পর অবশেষে নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যেই সেই বিশাল পাহাড়ী খাঁজ ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগলাম। পাহাড়ের যে দেওয়াল থেকে খাঁজটা দেওয়ালের পেরেকের মতো বের হয়ে এসেছে, সেটার কাছাকাছি পৌঁছাতেই আলোর পরিমাণ সামান্য বাড়ল, যদিও মাথার ওপর তখন রাত নেমে এসেছে। এর পর বাতাসের ঝাপটাও কমে এল, ফলে আমরা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে এগোতে পারলাম এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম গুহা বা সুড়ঙ্গের মুখে এসে পৌঁছলাম। কিন্তু এবার এক নতুন বিপত্তি এসে উপস্থিত হল: আমাদের লণ্ঠনের তেল শেষ হয়ে গেছে, আর লণ্ঠন দুটো যে সেই খসে পড়া বিশাল পাথরের তলায় পিষে গুঁড়ো হয়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের তেষ্ণা মেটানোর জন্য এক ফোঁটা জলও ছিল না, কারণ নুটের কুঠুরিতেই আমরা শেষ জলটুকু খেয়ে ফেলেছিলাম। এই শেষ পাথরে ভরা সুড়ঙ্গটা আমরা আলো ছাড়া কীভাবে পেরোব?
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে একমাত্র কাজ হল আমাদের স্পর্শানুভূতির ওপর ভরসা রাখা, আর অন্ধকারের মধ্যেই সুড়ঙ্গ পেরোনোর চেষ্টা করা। তাই আমরা হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম; ভয় হচ্ছিল যে দেরি করলে ক্লান্তি আমাদের গ্রাস করবে, আর আমরা হয়তো যেখানে আছি সেখানেই ঢলে পড়ে মারা যাব।
ওঃ, সেই শেষ সুড়ঙ্গটার কী ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা! জায়গাটা বড় বড় পাথরে ঠাসা ছিল, আর আমরা সেগুলোর ওপর হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে নিজেদের আঘাত করছিলাম, যতক্ষণ না ডজন ডজন ক্ষত থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। আমাদের একমাত্র দিশা ছিল গুহার দেওয়ালটা, যেটাতে হাত ঘষে ঘষে আমরা এগোচ্ছিলাম। অন্ধকারের মধ্যে আমরা এতটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম যে কয়েকবার এই আতঙ্কে আমাদের বুক কেঁপে উঠেছিল যে আমরা হয়তো দিক ভুল করে উল্টো পথে হেঁটে চলছি। আমরা দুর্বল থেকে আরও দুর্বল হতে হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এগিয়ে চললাম, কয়েক মিনিট পর পরই জিরিয়ে নেওয়ার জন্য থামতে লাগলাম, কারণ আমাদের শরীরের শক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। একবার তো আমরা ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, আর আমার মনে হয় বেশ কয়েক ঘণ্টাই ঘুমিয়েছিলাম, কারণ যখন ঘুম ভাঙল, তখন আমাদের হাত-পা সব আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল, আর কাটার ক্ষতগুলোর রক্ত জমাট বেঁধে চামড়ার ওপর শক্ত হয়ে শুকিয়ে গিয়েছিল। এর পর আমরা আবার নিজেদের টেনে টেনে এগোতে লাগলাম, অবশেষে যখন হতাশা আমাদের হৃদয়ে বাসা বাঁধছে, ঠিক তখনই আমরা আবার দিনের আলোর মুখ দেখতে পেলাম! আমরা নিজেদের সুড়ঙ্গের বাইরে পাহাড়ের গায়ের সেই পাথুরে ভাঁজে আবিষ্কার করলাম—পাঠকদের মনে থাকবে, যেখান দিয়ে সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ ছিল।
তখন কাকভোর—মিষ্টি বাতাস আর পরম পবিত্র আকাশের চেহারা দেখেই আমরা তা বুঝতে পারলাম, যা আর কোনোদিন দেখতে পাব বলে আশা করিনি। আমাদের হিসাবমতো, সূর্যাস্তের প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমরা সুড়ঙ্গে ঢুকেছিলাম, তার মানে সেই ভয়াবহ অভিশপ্ত জায়গাটা হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে আমাদের পুরো একটা রাত লেগে গেছে।
"আর একটা শেষ চেষ্টা, লিয়ো," আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, "বিল্লালি যদি চলে না গিয়ে থাকে, তবে আমরা সেই ঢালু জায়গায় পৌঁছে যাব যেখানে সে অপেক্ষা করছিল। এসো, ভেঙে পোড়ো না," কারণ সে মাটিতে উপুড় হয়ে ঢলে পড়েছিল। সে উঠে দাঁড়াল, আর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আমরা সেই ৫০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলাম—কীভাবে নামলাম, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই! আমার শুধু মনে আছে আমরা নিচে একটা স্তূপের মতো পড়ে গেলাম, আর তার পর কনুই আর হাঁটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সেই বনবীথির দিকে এগোতে লাগলাম, যেখানে 'তিনি' বিল্লালিকে তাঁর ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। কারণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আর এক কদম হাঁটার ক্ষমতাও আমাদের ছিল না। এইভাবে আমরা ৫০ গজের বেশি এগোইনি, এমন সময় হঠাৎ বাঁ দিকের গাছপালার মধ্য থেকে একজন বোবা লোক বেরিয়ে এল—সম্ভবত সে সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিল—আর আমরা আবার কী অদ্ভুত জাতের প্রাণী তা দেখতে দৌড়ে এল। সে হাঁ করে একদৃষ্টে চেয়ে রইল, তার পর আতঙ্কে হাত দুটো ওপরে তুলে প্রায় মাটিতে ঢলে পড়ার উপক্রম হল। পরমুহূর্তেই সে প্রায় ২০০ গজ দূরে অবস্থিত বনবীথির দিকে সর্বশক্তিতে ছুট দিল। আমাদের চেহারা দেখে সে যে আতঙ্কিত হবে তাতে আর আশ্চর্য কী! কারণ আমাদের দেখতে নিশ্চয়ই ভয়াবহ লাগছিল। প্রথমত লিয়ো, যার সোনালী কোঁকড়ানো চুল বরফের মতো ধবধবে সাদা হয়ে গেছে, জামাকাপড় শরীর থেকে ছিঁড়ে তছনছ, ক্লিষ্ট মুখ আর হাতগুলো আঘাত, কাটাছড়া আর রক্তজমাট ময়লায় একাকার—সে মাটিতে নিজেকে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে, সে এক চরম আতঙ্কজনক দৃশ্য! আর আমার চেহারা যে তার চেয়ে ভালো কিছু ছিল না, তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমি জানি, ২ দিন পর যখন একটা জলের জলাশয়ে নিজের মুখ দেখলাম, আমি নিজেকে নিজেই চিনতে পারিনি! আমি সৌন্দর্যের জন্য কখনো বিখ্যাত ছিলাম না, কিন্তু কুৎসিত রূপ ছাড়া আমার চেহারায় এমন একটা ছাপ পড়ে me গিয়েছিল যা আজ পর্যন্ত আমি মুছে ফেলতে পারিনি—গভীর ঘুম থেকে চমকে ওঠা কোনো মানুষের চোখের সেই বুনো চাহুনির সঙ্গে যার সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যায়। আর সত্যি বলতে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি বরং এতেই অবাক হই যে আমরা আমাদের মানসিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে যে সেখান থেকে বেঁচে ফিরে এলাম!
কিছুক্ষণ পরেই, আমার পরম স্বস্তির কারণ ঘটিয়ে দেখলাম বৃদ্ধ বিল্লালি আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আর সেই মুহূর্তেও তার গম্ভীর চেহারায় আতঙ্কের এক্সপ্রেশন দেখে আমি না হেসে পারলাম না।
"ওহ, আমার বাবুন! আমার বাবুন!" সে আর্তনাদ করে উঠল, "আমার প্রিয় পুত্র, এ কি সত্যি তোমরা আর সিংহ? আর ওর কেশর—যা পাকা গমের মতো সোনালী ছিল, তা বরফের মতো সাদা হয়ে গেছে কেন? তোমরা কোথা থেকে আসছ? আর সেই শূকর কোথায়, আর কোথায়ই বা '
তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে প্রথম যে অনুভূতির ছোঁয়া পেলাম, তা এক দারুণ অসাড়তা ও আড়ষ্টতা—মনে হল, কে যেন আমাকে কার্পেটের মতো ধুনে পিটিয়ে শেষ করে দিয়েছে! চোখ দুটো মেলতেই প্রথম যার ওপর গিয়ে নজর ঠেকল, সে আর কেউ নয়, আমাদের প্রবীণ বন্ধু বিল্লালি। আমার অস্থায়ী বিছানার পাশে বসে চিন্তামগ্ন মুখে দাড়ি খামচাচ্ছে বুড়ো। তাকে দেখামাত্র সাম্প্রতিক সব বীভৎস আর ভয়াল স্মৃতির ঢল নেমে এল মাথায়। বিশেষ করে চোখ গেল বিপরীত দিকে শুয়ে থাকা বেচারা লিওর দিকে—চেহারাটা পিটে ছাতু করে ফেলা হয়েছে, আর মাথার সোনার বরণ সেই অপূর্ব কুঞ্চিত চুলগুলো রাতারাতি হয়ে গেছে ধবধবে সাদা।[১] দৃশ্যটা দেখেই একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ দুটো বুজে ফেললাম আবার।
[১] তাজ্জবের ব্যাপার হল, ইদানীং লিওর চুলের সেই হারিয়ে যাওয়া রঙ কিছুটা হলেও ফিরতে শুরু করেছে—এখন ওগুলো হলদেটে ধূসর বর্ণ নিয়েছে। আশা করছি, সময় হলে হয়তো চুলের আগের রূপ পুরোপুরি ফিরে আসবে।—লু. হা. হ্যা.
“অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছ, আমার বাঘাশাবক,” বৃদ্ধ বিল্লালি বলল।
“কতক্ষণ, বাবা?” প্রশ্ন করলাম।
“একবার সূর্য উঠল আর একবার চাঁদ—এক দিন আর এক রাত কেটে গেছে তুমি আর সিংহ দুজনেই ঘুমিয়ে কাটিয়েছ। ওই দেখো, সে এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন।”
“ঘুম পরম আশীর্বাদ,” উত্তর দিলাম, “তা অতীতের সমস্ত ভয়াল স্মৃতিকে গলধঃকরণ করে।”
“বলো দেখি,” বুড়ো জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের ওপর ঠিক কী আফত নেমে এসেছিল? আর যিনি অমরা, যাঁর মৃত্যু অসম্ভব, সেই দেবীর মৃত্যুর অদ্ভুত আখ্যানটিই বা কী? বাছা, ভালো করে ভেবে দ্যাখো: যদি এ কথা সত্য হয়, তবে তোমার আর ওই সিংহের প্রাণসঙ্কট কিন্তু সুনিশ্চিত! সত্যি বলতে, যে কড়াইয়ে তোমাদের সেদ্ধ করা হবে, তা আগুনে লেগে লাল হতে চলেছে, আর যারা তোমাদের মাংস দিয়ে ভোজ সারবে, তাদের পেট খিদেয় চোঁচো করছে। তুমি কি জানো না, এই আমাহাগরের দল—আমার ছানাপোনা গুহাবাসীরা—তোমাদের কতটা ঘেন্না করে? এমনিতেই তো ভিনদেশি বলে ঘৃণা তো করেই, তার ওপর তোমাদের বাঁচাতে দেবী যাদের কঠোর সাজা দিয়েছিলেন, সেই স্বজাতিদের প্রতিশোধ নিতে তারা তোমাদের চরম শত্রু মনে করে। আর যদি তারা একবার জানতে পারে যে ‘হিয়া’ বা সেই পরম ভীতিপ্রদ ‘যাঁকে-সবাইকে-মানতেই-হবে’-র কাছ থেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে কড়াইয়ে ফেলে তোমাদের মাংস রান্না করতে তারা একমুহূর্ত দেরি করবে না। কিন্তু ভাই বাঘাশাবক, তোমার কাহিনীটা আমাকে স্পষ্ট করে বলো তো।”
বুড়োর এই পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে গল্পটা শুরু করলাম—অবশ্য সবটুকু ভেঙে বললাম না, কারণ সেটার কোনো দরকার ছিল না। তবে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যতটুকু বলা প্রয়োজন, ততটুকু বললাম। বুড়োকে বোঝাতে চাওয়া ছিল যে দেবী সত্যিই আর নেই, তিনি আগুনে পড়ে ভস্ম হয়ে গেছেন। কারণ আসল সত্যটা তাকে বলতে গেলে তার বোধগম্যের বাইরে চলে যেত। পালিয়ে আসার পথে যে ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে আমাদের আসতে হয়েছিল, সেটাও আংশিক বললাম। শুনে বৃদ্ধ গভীর ধাক্কা খেল। তবে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, আয়েশার মৃত্যুর খবর সে মন থেকে বিশ্বাস করল না। সে ভেবে নিল, আমরা হয়তো তাকে মৃত বলে ভুল করছি; কিন্তু আসলে তিনি কিছুকালের জন্য আত্মগোপন করেছেন মাত্র। বুড়ো জানাল, তার বাবার আমলে একবার দেবী বারো বছরের জন্য উধাও হয়েছিলেন। আর এ দেশের প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে যে, বহু শতক আগে নাকি পুরো এক প্রজন্ম ধরে তাঁকে কেউ দেখতে পায়নি। তারপর হঠাৎ একদিন আবার আবির্ভাব হয়ে তিনি নাকি এক নারীকে খতম করেছিলেন, যে নিজেকে রানি বলে দাবি করছিল। এ কথার ওপর আর কোনো তর্ক করলাম না, শুধু বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লাম। হায়! আমি তো হাড়ে হাড়ে জানি যে আয়েশা আর কোনোদিন ফিরবে না, অন্ততঃ বিল্লালি তার জীবনে তাঁকে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না।
“এখন,” শেষমেশ বিল্লালি বলল, “তুমি কী করতে চাও, আমার বাঘাশাবক?”
“কী জানি,” বললাম, “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, বাবা। এই মুলুক ছেড়ে পালানোর কি কোনো পথ নেই?”
সে মাথা নাড়ল।
“বড়ই কঠিন পথ। কোর নগরীর ভেতর দিয়ে যাওয়া অসম্ভব, সেখানে লোকজনের চোখে পড়ে যাবে। আর ওই হিংস্র লোকগুলো যখনই জানতে পারবে তোমরা একা, ব্যাস—” এইটুকু বলে মুখ টিপে হাসল বিল্লালি, যেন মাথায় টুপি পরার ভঙ্গিতে এক ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করল। “তবে ওই পাহাড়ের চূড়ার ওপর দিয়ে একটা পথ আছে, যার কথা আমি একসময় বলেছিলাম—যে পথ দিয়ে তারা গবাদি পশুদের চরাতে নিয়ে যায়। চারণভূমির ওপারে জলাভূমির মধ্য দিয়ে তিন দিনের সফর। তার পর কী আছে তা আমার জানা নেই, তবে শুনেছি সেখান থেকে সাত দিনের দূরত্বে এক বিশাল নদী বহমান, যা গিয়ে মিশেছে কালো জলে। যদি সেখানে পৌঁছাতে পারো, হয়তো বা নিস্তার মিলবে; কিন্তু কীভাবে পৌঁছাবে সেখানে?”
“বিল্লালি,” আমি বললাম, “একসময় আমি তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম, মনে আছে? সেই ঋণ শোধ করো, বাবা। আমার আর আমার বন্ধু এই সিংহের জীবন রক্ষা করো। তোমার শেষ সময় যখন ঘনাবে, তখন এ কথা মনে করে স্বস্তি পাবে; জীবনে যদি কোনো পাপ কাজ করে থাকো, তবে এই একটা পুণ্যকর্ম পাল্লায় ভারী হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া তোমার কথাই যদি সত্যি হয়, দেবী যদি আত্মগোপন করেই থাকেন, তবে ফিরে এসে তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।”
“আমার বাঘাশাবক পুত্র,” বৃদ্ধ উত্তর দিল, “ভেবো না যে আমার মনটা অকৃতজ্ঞ। আমি ভালো করেই মনে রেখেছি কীভাবে সেই কুকুরগুলো আমাকে ডুকরে মরতে দেখে হাসছিল, আর তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে। শোধবোধ আমি করবই। যদি তোমাকে বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে নিশ্চয়ই বাঁচাব। শোনো: কাল ভোরের আগেই তৈরি হয়ে নিয়ো। তোমাদের এই পাহাড় ডিঙিয়ে ওপারে জলাভূমির ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পালকি হাজির থাকবে। আমি আয়েশার সেই ভয়াল আদেশের নাম করেই এই বন্দোবস্ত করব; কারণ যে দেবীর হুকুম অমান্য করবে, তার ঠাঁই হবে হায়েনার পেটে! তারপর জলাভূমি পার হওয়ার পর নিজেদের পথ নিজেদেরই করে নিতে হবে—কপাল ভালো থাকলে হয়তো সেই সমুদ্রের মতো কালো জলে পৌঁছে যেতে পারবে। এখন দেখো, সিংহ জেগে উঠেছে, আমি যে খাবার তৈরি রেখেছি তা খেয়ে নাও।”
লিও পুরোপুরি সজাগ হওয়ার পর দেখা গেল তার শারীরিক অবস্থা যতটা খারাপ মনে হচ্ছিল ততটা নয়। আমরা দুজনেই চেটেপুটে পেট পুরে খেলাম; সত্যিই এই খাবারের তীব্র প্রয়োজন ছিল আমাদের। এরপর হেলেদুলে ঝরনার জলে গিয়ে স্নান সেরে এলাম এবং ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম একেবারে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় উঠে আবার পাঁচ জনের মতো খাবার সাবার করলাম। সারাদিন বিল্লালি আড়ালেই ছিল, নিঃসন্দেহে পালকি আর বাহকদের জোগাড় করতেই ব্যস্ত ছিল; কারণ গভীর রাতে ছোট্ট শিবিরের কাছে বহু মানুষের সাড়াশব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল।
ভোর হতেই বুড়ো নিজে হাজির হল। জানাল যে দেবীর ভয়ংকর নাম ভাঙিয়ে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সে প্রয়োজনীয় লোক ও জলাভূমি পার করে দেওয়ার জন্য দুজন পথপ্রদর্শক জোগাড় করতে পেরেছে। সে আমাদের অবিলম্বে রওনা হওয়ার তাগিদ দিল এবং জানাল যে বিশ্বাসঘাতকতার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে সে নিজেও সাথে যাবে। এই ধূর্ত প্রবীণ বর্বরের কাছ থেকে দুজন সম্পূর্ণ অসহায় অচেনা মানুষ হিসেবে এমন সহানুভূতির আচরণ দেখে চোখ ভিজে এল। এই বয়সে ভয়াবহ জলাভূমির মধ্য দিয়ে তিন দিনের সফর—আর তার ক্ষেত্রে তো আসা-যাওয়া মিলিয়ে ছয় দিন—মোটেই সহজ কথা নয়; কিন্তু আমাদের সুরক্ষার জন্য সে আনন্দের সাথেই রাজত্ব ছেড়ে প্রস্তুত হল। এতেই বোঝা যায়, এই ভয়ংকর আমাহাগরেরা—যাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং পৈশাচিক-নৃশংস আচার-অনুষ্ঠান বিশ্বজুড়ে জানা যেকোনো বর্বরের চেয়েও ভয়াবহ—তাদের মধ্যেও দয়ালু হৃদয়ের মানুষের অভাব নেই। অবশ্য স্বার্থের টানও হয়তো কিছুটা ছিল। সে হয়তো ভেবেছিল, দেবী যদি হঠাৎ আবির্ভূত হন তবে তাঁর কাছে আমাদের হিসেব দিতে হবে। তবু, সব হিসেব-নিকাশ বাদ দিলেও, এই পরিস্থিতিতে আমরা যা আশা করতে পারতাম তার চেয়ে ঢের বেশি করেছিল সে। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, যতদিন বেঁচে থাকব, আমার এই পাতানো বাবা বুড়ো বিল্লালির প্রতি এক গভীর ও সশ্রদ্ধ ভালোবাসা আমার মনে চিরজাগরূক থাকবে।
যাহোক, কিছু মুখে পুরে নিয়ে আমরা পালকিতে গিয়ে উঠলাম। দীর্ঘ বিশ্রাম ও ঘুমে আমাদের শরীর অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। তবে আমাদের মনের অবস্থা কেমন ছিল, তা পাঠকের কল্পনার ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।
এরপর শুরু হল পাহাড় ডিঙানোর সেই হাড়ভাঙা চড়াই। কখনো কখনো স্বাভাবিক পথ মিলছিল, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সেই আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ পথ ধরে ওপরে উঠতে হচ্ছিল—যা নিঃসন্দেহে অতীতে কোরের প্রাচীন অধিবাসীদের কাটা। আমাহাগরদের দাবি, তারা নাকি বছরে একবার তাদের বাড়তি গবাদি পশুদের এই পথ দিয়ে বাইরের চারণভূমিতে নিয়ে যায়; তবে আমার যা ধারণা, সেই পশুদের পায়ের জোর আর ভারসাম্য অতিমানবিক হতে হবে! স্বাভাবিকভাবেই এই চড়াইয়ে পালকি কোনো কাজে এল না, ফলে আমাদের হেঁটেই উঠতে হচ্ছিল।
দুপুরের মধ্যে আমরা সেই বিশাল খাড়া পাথুরে দেয়ালের চ্যাপ্টা মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম। সেখান থেকে চারপাশের দৃশ্য ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য আর মহিমান্বিত! একদিকে কোরের সুবিশাল প্রান্তর—যার ঠিক মাঝখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল সততার মন্দিরের থামওয়ালা ধ্বংসাবশেষ, আর অন্যদিকে দিগন্তবিস্তৃত এক বিষণ্ণ জঙ্গল আর জলাভূমি। আগ্নেয়গিরির খাদের মুখ দিয়ে তৈরি এই পাথুরে দেয়ালটি ছিল প্রায় দেড় মাইল চওড়া এবং তার উপরিভাগ পোড়া ছাই আর লাভাভস্মে ঢাকা। সেখানে কোনো গাছপালা গজাত না; শুধু মাঝে মাঝে জমে থাকা বৃষ্টির জলের ছোট ছোট গর্তগুলোই চোখকে একটু শান্তি দিচ্ছিল। সেই সুবিশাল প্রাচীরের চ্যাপ্টা চুড়োর ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা নামার পথ ধরলাম। ওপরে ওঠার মতো এতটা দুষ্কর না হলেও, নামার পথটাও ছিল সমান বিপজ্জনক ও কোমরভাঙা। সূর্যাস্ত পর্যন্ত লেগে গেল নামতে। সে রাতটা আমরা কাটিয়ে দিলাম নিচের জলাভূমির দিকে নেমে যাওয়া সুবিশাল পাহাড়ী ঢালে, নিরাপদে।
পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ শুরু হল সেই ভয়াল জলাময় নরককুণ্ডের বুক চিরে আমাদের সেই নিদারুণ নিঃসঙ্গ যাত্রা, যার বিবরণ আগেই দিয়েছি।
দীর্ঘ তিনটি দিন ধরে—দুর্গন্ধ, কাদা আর পদে পদে ছেয়ে থাকা মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে—আমাদের বাহকেরা সংগ্রাম করে এগিয়ে চলল। অবশেষে আমরা এসে পৌঁছালাম এক উন্মুক্ত, ঢেউখেলানো সমতলভূমিতে। সেখানে কোনো চাষবাস বা গাছপালা ছিল না বটে, কিন্তু নানা জাতের বন্য পশুতে এলাকাটি গিজগিজ করছিল। এটি ছিল সেই সবচেয়ে খাঁ খাঁ মরুসম দুর্গম এলাকার ওপারে, যেখানে পথপ্রদর্শক ছাড়া এক পা-ও এগোনো অসম্ভব। পরদিন সকালে এইখানেই আমরা কিছুটা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বুড়ো বিল্লালিকে বিদায় জানালাম। প্রবীণ বুড়ো তার ধবধবে সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমাদের আশীর্বাদ করল।
“বিদায়, আমার বাঘাশাবক পুত্র,” সে বলল, “আর বিদায় তোমাকেও, হে সিংহ। তোমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা আমার আর নেই। কিন্তু যদি কোনোদিন নিজেদের দেশে ফিরতে পারো, তবে আমার একটা উপদেশ মনে রেখো—না-জানি অচেনা কোনো মুলুকে আর পা বাড়িয়ো না; নইলে আর ফেরা হবে না, সাদা হাড়ের কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকতে হবে অভিযানের শেষ সীমানায়। বিদায়, আরও একবার বিদায়! আমি প্রায়ই তোমাদের কথা মনে করব, আর তুমিও আমাকে ভুলবে না, আমার বাঘাশাবক—কারণ তোমার চেহারাটা কদাকার হলেও তোমার হৃদয়টা খাঁটি!” তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল এবং পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। তার সাথে সাথে ফিরে চলল সেই দীর্ঘদেহী, গোমড়ামুখো বাহকের দল। আমাহাগরদের সেই শেষ দেখা পেলাম আমরা। যুদ্ধের ময়দান থেকে লাশ তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো খালি পালকিগুলো নিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলা সেই মিছিলের দিকে আমরা চেয়ে রইলাম, যতক্ষণ না জলাভূমির ঘন কুয়াশা তাদের ঢেকে ফেলে আমাদের দৃষ্টির আড়াল করল। বিশাল সেই প্রান্তরে নিঃসঙ্গ ও নিঃসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের দিকে এবং একে অপরের দিকে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে চারজন মানুষ কোরের এই জলামভূমিতে পা রেখেছিল; আর আজ তাদের দুজন মৃত, আর বাকি দুজন পার হয়ে এসেছে এমন সব অদ্ভুত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, স্বয়ং মৃত্যুর মুখচ্ছবিও যার চেয়ে ভয়ংকর হতে পারে না! মাত্র তিন সপ্তাহ—হাঁ, তিন-তিনটি সপ্তাহ! সময়কে তো ঘটনা দিয়ে মাপা উচিত, ঘণ্টার হিসেব দিয়ে নয়। আমাদের সেই তিমিশিকারের নৌকাটিকে শেষবার দেখার পর যেন দীর্ঘ ত্রিশটা বছর কেটে গেছে বলে মনে হল।
“আমাদের জাম্বেজি নদীর দিকে মুখ করে এগোতে হবে, লিও,” বললাম, “কিন্তু ঈশ্বর জানেন আমরা সেখানে কোনোদিন পৌঁছাতে পারব কিনা।”
লিও শুধু মাথা নাড়ল। ইদানীং সে বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। আমাদের সম্বল বলতে তখন পরনের জামাকাপড়, একটা কম্পাস, দুটো রিভলভার, এক্সপ্রেস রাইফেল আর প্রায় ২০০ রাউন্ড গুলি। আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটল সেই প্রাচীন, মহীয়ান আর সাম্রাজ্যময় কোরের ধ্বংসাবশেষে আমাদের অভিযানের ইতিহাস।
এর পর আমাদের ওপর দিয়ে যে অদ্ভুত ও বিচিত্র অ্যাডভেঞ্চারগুলো ঘটে গেছে, অনেক ভেবেচিন্তে আমি ঠিক করেছি যে তা এই পাতায় নথিভুক্ত করব না। এই বইতে আমি শুধু এমন এক অভূতপূর্ব ঘটনার সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছি যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাৎক্ষণিক প্রকাশের উদ্দেশ্যে এটি লেখা হয়নি; স্মৃতি তাজা থাকতেই আমাদের এই দীর্ঘ পথচলা ও তার পরিণতি কাগজে কলমে ধরে রাখাই ছিল উদ্দেশ্য, যা কোনোদিন লোকসমক্ষে প্রকাশ পেলে বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আমাদের দুজনের জীবিত অবস্থায় তা প্রকাশের কোনো ইচ্ছা এই মুহূর্তে আমাদের নেই।
বাকি কাহিনীর সাথে সাধারণ পাঠকের খুব একটা স্বার্থ জড়িত নেই, কারণ তা মধ্য আফ্রিকার অন্য যেকোনো দুঃসাহসী পর্যটকের অভিজ্ঞতার মতোই। শুধু এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, অবিশ্বাস্য কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে আমরা অবশেষে জাম্বেজি নদীতে পৌঁছাতে পেরেছিলাম, যা বিল্লালি আমাদের যেখানে ছেড়ে গিয়েছিল সেখান থেকে প্রায় একশো সত্তুর মাইল দক্ষিণে। সেখানে এক বন্য উপজাতি আমাদের ছয় মাস বন্দি করে রাখে—মূলত লিওর সেই কমবয়সী চেহারা আর মাথার বরফ-সাদা চুলের কারণে আমাদের তারা অলৌকিক সত্তা বলে মনে করত। তাদের হাত থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে আমরা জাম্বেজি নদী পার হয়ে দক্ষিণ দিকে ঘুরে বেড়াতে থাকি। যখন খিদেয় মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঠিক তখনই সৌভাগ্যক্রমে আমাদের সাথে দেখা হয়ে যায় এক পর্তুগিজ-সংকর হাতিশিকারীর, যে হাতির পালের পিছু নিয়ে মধ্য আফ্রিকার এতটা গভীরে চলে এসেছিল যেখানে সে আগে কখনো আসেনি। লোকটা আমাদের দারুণ আপ্যায়ন করল এবং শেষ পর্যন্ত তার সহায়তায়, অজস্র কষ্ট ও অ্যাডভেঞ্চার পার করে আমরা ডেলাগোয়া বে-তে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। কোরের জলাভূমি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে তখন আঠারো মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে। পৌঁছানোর পরদিনই আমরা ইংল্যান্ডগামী কেপ-ফেরতা একটা বাষ্পীয় জাহাজে চড়ে বসলাম। দেশে ফেরার এই জলযাত্রা ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক। অবশেষে সেই অসম্ভব ও অদ্ভুত অভিযানে বের হওয়ার ঠিক দুই বছরের মাথায় আমরা সাউদাম্পটনের বন্দরে পা রাখলাম। আর আজ, আমার কলেজের সেই একই পুরনো ঘরে বসে এই শেষ শব্দগুলো লিখছি—যে ঘরে প্রায় বাইশ বছর আগে এক স্মরণীয় রাতে লৌহমঞ্জুষাটি নিয়ে ঠোকর খেতে খেতে ঢুকেছিল আমার বেচারা বন্ধু ভিন্সি—আর লিও এখন আমার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে এগুলো দেখছে।
বিজ্ঞান ও বাইরের জগতের কাছে এই ইতিবৃত্তের সমাপ্তি এখানেই। কিন্তু লিও আর আমার জীবনের ক্ষেত্রে এর শেষ কোথায়, তা অনুমান করা আমার সাধ্যের অতীত। তবে আমাদের মন বলছে, শেষ এখনো হয়নি। যে কাহিনীর শুরু আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও আগে, তা সুবিদূর ও অস্পষ্ট ভবিষ্যতের দিকে আরও কতদূর যে প্রলম্বিত হবে কে জানে!
লিও কি সত্যিই সেই প্রাচীন ক্যালিক্রেটিসের পুনর্জন্ম, যার কথা শিলালেখে লেখা ছিল? নাকি চেহারার কোনো বংশানুক্রমিক অদ্ভুত মিল দেখে আয়েশা ধোঁকা খেয়েছিল? পাঠকদের এই ব্যাপারে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে হবে, যেমনটা অন্য অনেক বিষয়ে নিতে হয়। তবে আমার নিজস্ব মতামত রয়েছে—আর তা হল, আয়েশার ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
প্রায়ই রাতে আমি একা বসে থাকি, মনের চোখে তাকিয়ে থাকি অনাগত কালের সেই গহন অন্ধকারের দিকে, আর ভেবে অবাক হই—কী রূপ ও অবয়বে সেই মহামঞ্চের শেষ নাটকটি অভিনীত হবে, আর কোথায় বা তার পরবর্তী অঙ্কের পর্দা উঠবে! আর সেই চূড়ান্ত পরিণতি যখন রূপ নেবে—যা সুনির্দিষ্ট ভাগ্য আর অলঙ্ঘনীয় নিয়তির নিয়মে অবশ্যই ঘটবে—তখন সেই মিসরের রাজকুমারী ফারাও-বংশের রূপসী আমেনার্টাসের ভূমিকা কী হবে? যাঁর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে পুরোহিত ক্যালিক্রেটিস আইসিসের কাছে করা নিজের পবিত্র শপথ ভেঙেছিল, আর রুষ্ট দেবীর অলঙ্ঘনীয় অভিশাপ তাড়া করে নিয়ে এসেছিল লিবিয়ার উপকূল থেকে কোরের এই মৃত্যুপুরীতে?
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.