বাস্তুহারা মরমনরা তাদের চুড়ান্ত আশ্রয়ে পৌঁছানোর আগে যেসব পরীক্ষা ও প্রাণান্তকর নিদারুণ দুর্ভোগ সহ্য করেছিল, তা স্মরণ করার উপযুক্ত ঠাঁই এটা নয়। মিসিসিপির কূল থেকে রকি পর্বতমালার পশ্চিম ঢাল পর্যন্ত তারা এমন এক অদম্য নিষ্ঠা নিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চলেছে, ইতিহাসে যার তুলনা মেলা ভার। বুনো মানুষ, হিংস্র পশু, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি আর ব্যাধি—প্রকৃতি তাদের পথে বাধা হিসেবে যা যা তুলে ধরেছিল, তার সবটুকুই তারা জয় করল অ্যাংলো-স্যাক্সনদের একগুঁয়ে জেদ দিয়ে। তবুও এই দীর্ঘ যাত্রা আর পুঞ্জীভূত ত্রাস ওদের মাঝের সবচেয়ে শক্ত মানুষের হূদয়েও কম্পন ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যখন তারা নিচে রোদঝলমলে সুবিস্তৃত ইউটা উপত্যকা প্রত্যক্ষ করল এবং নিজেদের নেতার মুখে শুনল যে এই সেই প্রতিশ্রুত ভূমি—এই কুমারী প্রান্তর চিরকালের জন্য তাদেরই হতে চলেছে, তখন এমন একজনও ছিল না যে সশ্রদ্ধ অন্তরে হাঁটু গেড়ে বসে ঈশ্বরকে ব্যাকুলভাবে ধন্যবাদ জানায়নি।
নেতা ইয়াং অচিরেই নিজেকে এক সংকল্পবদ্ধ নায়ক এবং দক্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রমাণ করলেন। মানচিত্র আঁকা হল, নকশা তৈরি হল, যেখানে ভবিষ্যতের শহরের রূপরেখা আঁকা হল। চারপাশে যার যার পদমর্যাদা ও যোগ্যতা অনুযায়ী জমিজমা ও খামার বণ্টন করা হল। ব্যবসায়ী ফিরল তার ব্যবসায়, কারিগরকে বসিয়ে দেওয়া হল তার পেশায়। দেখতে দেখতে শহরে যেন মায়াবলে গজিয়ে উঠল পথঘাট আর চৌরাস্তা। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে চলল জলনিকাশের নালা কাটা, বেড়া দেওয়া, বীজ বপন আর জঙ্গল সাফ করার কাজ। ফলাফল মিলল হাতেনাতে—পরবর্তী গ্রীষ্মেই গোটা প্রান্তর গমের সোনালি আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। অদ্ভুত এই বসতিটিতে সব কিছুরই শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে লাগল। আর সবার ওপরে, শহরের কেন্দ্রস্থলে তারা যে মহানিকেতন গড়ে তুলেছিল, তা দিন দিন আরও উঁচু আর বিশালাকার রূপ নিতে থাকল। ভোরের প্রথম আলো ফোটা থেকে শুরু করে গোধূলির রক্তিম আভা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত—যে পরমেশ্বর নানা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে তাদের নিরাপদে নিয়ে এসেছেন, তাঁর উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা সেই অনুপম সৌধে হাতুড়ির ঠোকাঠুকি আর করাতের ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ শব্দ এক মুহূর্তের জন্য থামত না।
মরুভূমির দুই দুর্দশাগ্রস্ত অনাহারী পথিক—জন ফেরিয়ার এবং সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে তার ভাগ্যকে নিজের ভাগ্যের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিল আর যাকে সে নিজের মেয়ে হিসেবে দত্তক নিয়েছিল—মরমনদের এই মহান তীর্থযাত্রার একেবারে শেষ পর্যন্ত ওদের সঙ্গেই পথ চলল। খণ্ডগ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া ছোট্ট লুসি ফেরিয়ার এল্ডার স্ট্যানজারসনের ক্যানভাসে ঘেরা ঘোড়ার গাড়িতে বেশ আরামেই দিন কাটাতে লাগল। সেই চলন্ত আস্তানায় তার সঙ্গী ছিল স্ট্যানজারসনের ৩ স্ত্রী আর তার ১২ বছরের একঘেয়ে, জাঁহাবাজ ছেলে। শৈশবের স্বাভাবিক সহজতায় মায়ের মৃত্যুর তীব্র ধাক্কা সামলে উঠে লুসি অল্প দিনেই পরিবারের মহিলাদের চোখের মণি হয়ে উঠল; তাঁবু-ঘেরা চলন্ত ঘরের এই নতুন জীবনটার সঙ্গে সে নিজেকে সুন্দর মানিয়ে নিল। এদিকে ফেরিয়ারও শারীরিক কষ্ট কাটিয়ে ওঠার পর একজন কাজের পথপ্রদর্শক আর অক্লান্ত শিকারি হিসেবে নিজের নাম তৈরি করল। নতুন সঙ্গীদের কাছে সে এত দ্রুত শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠল যে, যখন তাদের এই যাযাবর জীবনের অবসান ঘটল, তখন সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হল—নেতা ইয়াং এবং ৪ প্রধান এল্ডার (স্ট্যানজারসন, কেমবল, জনস্টন ও ড্রেবার) ছাড়া অন্য যে কোনও বাসিন্দার মতোই ফেরিয়ারকে এক বিশাল ও উর্বর জমি দেওয়া হবে।
এইভাবে প্রাপ্ত খামারে জন ফেরিয়ার নিজের জন্য একটা মজবুত কাঠের বাড়ি বানাল। পরবর্তী বছরগুলোতে তাতে ঘরের পর ঘর জুড়ে সেটিকে এক সুবিশাল বাংলোবাড়িতে রূপ দেওয়া হল। লোক হিসেবে সে ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী, লেনদেনে চৌকস আর কাজকর্মে দারুণ নিপুণ। তার লোহার মতো শক্ত শরীরে সে সকাল-সন্ধ্যা কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জমিজমাকে সোনায় মুড়িয়ে তুলল। ফলে যা হওয়ার তাই হল—তার খামার এবং সমস্ত সম্পত্তি আশাতীত বাড়তে লাগল। ৩ বছরের মাথায় সে আশপাশের প্রতিবেশীদের চেয়ে অবস্থাপন্ন হয়ে উঠল, ৬ বছরে বেশ সচ্ছল, ৯ বছরে বিত্তশালী, আর ১২ বছরের মাথায় পুরো সল্ট লেক সিটিতে তার সমকক্ষ ধনকুবের আধ ডজনের বেশি ছিল না। সেই মস্ত অভ্যন্তরীণ নোনা হ্রদ থেকে শুরু করে সুদূরের ওয়াসাচ পর্বতমালা পর্যন্ত জন ফেরিয়ারের নাম শোনেনি, এমন লোক মেলা ভার ছিল।
তবে একটা ব্যাপারে সে তার ধর্মভাইদের সংস্কারে আঘাত দিত—একমাত্র সেখানেই সে ছিল ব্যতিক্রম। সঙ্গীদের মতো একাধিক বিয়ে করে বিশাল পরিবার গড়ে তোলার ব্যাপারে তাকে কোন যুক্তিতেই রাজি করানো যেত না। এই জেদি প্রত্যাখানের পেছনে সে কখনও কোনও স্পষ্ট কারণ দর্শাত না, শুধু নিজের সংকল্পে অটল ও অনমনীয় হয়ে থাকত। অনেকে তাকে নতুন ধর্মগ্রহণের ব্যাপারে নিরুত্তাপ বলে মনে করত, আবার কেউ কেউ একে বলত তার অর্থের লোভ আর খরচ বাঁচানোর ফন্দি। আবার অন্যদের মুখে শোনা যেত তার যৌবনের কোনও পুরোনো প্রেমের গল্প—আটলান্টিকের তীরে তিলে তিলে শুকিয়ে মরা এক সোনালি চুলের কিশোরীর কথা। কারণ যাই হোক না কেন, ফেরিয়ার কঠোরভাবে কুমারব্রত পালন করে গেল। তবে অন্য সমস্ত বিষয়ে সে নবগঠিত সম্প্রদায়ের রীতিনীতি পুরোপুরি মেনে চলত, ফলে নিষ্ঠাবান ও নীতিমান মানুষ হিসেবে তার চারদিকে বেশ নামডাক হল।
সেই কাঠের বাড়ির চত্বরেই দিনে দিনে বড় হয়ে উঠতে লাগল লুসি ফেরিয়ার, এবং বাবার সমস্ত কাজে হাত লাগাতে লাগল। পাহাড়ের চঞ্চল হাওয়া আর পাইন গাছের সুবাস যেন এই কিশোরীর ধাত্রী ও মায়ের অভাব পূরণ করে দিয়েছিল। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে দীর্ঘাঙ্গী ও সতেজ হয়ে উঠল, গালে ফুটল লালচে আভা, আর পদক্ষেপে এল এক অপূর্ব সাবলীলতা। ফেরিয়ারের খামারের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাজপথের অনেক পথিকই গমের খেতের মধ্য দিয়ে তার ছিপছিপে তন্নী রূপ দেখে কিংবা বাবার মস্তং ঘোড়ার পিঠে চেপে পশ্চিমের প্রকৃত কন্যার মতো অনায়াস দক্ষতায় ছোটাতে দেখে স্মৃতির অতল থেকে পুরোনো আবেগ ফিরে পেত। দেখতে দেখতে কুঁড়িটি ফুলে বিকশিত হল। যে-বছর তার বাবা এলাকার সবচেয়ে ধনী কৃষক হিসেবে পরিচিতি পেল, সে-বছর লুসি হয়ে উঠল পুরো প্যাসিফিক অঞ্চলে দেখা সেরা মার্কিন রূপসীদের একজন।
তবে মেয়েটি যে শৈশব পেরিয়ে নারীতে পদার্পণ করেছে, তা প্রথম তার বাবার চোখে ধরা পড়েনি। সাধারণত এমন ক্ষেত্রে তা হয়ও না। সেই রহস্যময় পরিবর্তন এত সূক্ষ্ম আর এত ধীরগতিতে আসে যে তারিখ দিয়ে তাকে মাপা যায় না। খোদ মেয়েটি নিজেও তা বুঝতে পারে না—যতক্ষণ না কারও গলার স্বর বা হাতের স্পর্শ তার বুকে শিহরণ জাগায়, আর সে গর্ব ও ভয়ের এক অদ্ভুত দোলাচলে উপলব্ধি করে যে তার ভেতরে এক নতুন ও বিশাল সত্তার জন্ম হয়েছে। এমন মানুষের সংখ্যা কমই আছে যে জীবনের সেই স্মরণীয় দিনটি এবং নতুন জীবনের বার্তা বহন করে আনা ছোট্ট ঘটনাটির কথা মনে করতে পারে না। লুসি ফেরিয়ারের ক্ষেত্রে ঘটনাটি শুধু তার নিজের বা অন্যদের ভাগ্যের ওপরই প্রভাব ফেলেনি, বরং ঘটনাটি নিজেও ছিল বেশ সংকটজনক।
সেটি ছিল জুনের এক উষ্ণ সকাল। ল্যাটার ডে সেন্টদের ব্যস্ততা ছিল মৌমাছিদের মতোই—যে মৌমাছির চাককে তারা নিজেদের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিল। খেত-খামারে আর রাস্তাঘাটে মানুষের অবিরাম কর্মমুখরতার এক গুণগুণ শব্দ ভেসে উঠছিল। ধূলিধূসরিত রাজপথ ধরে বোঝাই খচ্চরের দীর্ঘ সারি পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছে, কারণ ক্যালিফোর্নিয়ায় তখন সোনার খনির নেশা ছড়িয়ে পড়েছে, আর মহাদেশ অতিক্রম করার মূল পথটি গেছে এই পুণ্যার্থীদের শহরের মধ্য দিয়েই। তা ছাড়া বাইরের চারণভূমি থেকে গবাদি পশু আর ভেড়ার পাল নিয়ে আসা হচ্ছিল, আর আসছিল ক্লান্ত-শ্রান্ত নতুন অভিবাসীদের দল—অনন্ত যাত্রায় মানুষ আর ঘোড়া দুটোই সমান শ্রান্ত। এই বিচিত্র ভিড়ের মধ্য দিয়েই চতুর সহিসের মতো নিখুঁত দক্ষতায় পথ করে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলল লুসি ফেরিয়ার। চঞ্চল শারীরিক কসরতে তার উজ্জ্বল মুখমণ্ডল আরক্তিম, আর পিঠের ওপর উড়ছে দীর্ঘ বাদামি চুল। শহরের ভেতর বাবার কিছু কেনাকাটা বা কাজ সেরে দেওয়ার তাড়া ছিল তার। তারুণ্যের নির্ভীক উদ্দামতায় সে আগেও যেমন বহুবার করেছে, তেমনই আজও ছুটে চলেছে—মনে কেবল কাজটুকুর চিন্তা। পথের ধূলিমলিন অভিযাত্রীরা হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল; এমনকি পশুর চামড়া বিক্রি করতে আসা নির্বিকার রেড ইন্ডিয়ানরাও সেই গৌরবর্ণা তরুণীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের চিরচেনা গম্ভীর মুখভাব ভুলে চেয়ে রইল।
শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছতেই সে দেখল রাস্তাটা আটকে রয়েছে প্রকাণ্ড এক গবাদি পশুর পালে, প্রান্তর থেকে আসা ৬ জন বুনো চেহারার রাখাল সেগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। অধৈর্য হয়ে লুসি পশুর পালের মাঝে একটা ফাঁকা মতো জায়গা দেখে ঘোড়া গলিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ভেতর ঢোকা মাত্রই পেছনে পশুগুলো আবার গাদাগাদি করে চেপে বসল, আর সে আটকে পড়ল ক্রুদ্ধ চোখ আর প্রকাণ্ড শিংওয়ালা ষাঁড়ের সেই চলন্ত স্রোতে। পশুপালনের অভিজ্ঞতা থাকায় সে প্রথমে ঘাবড়ে যায়নি; সুযোগ পেলেই সে ঘোড়াকে সজোরে চাপ দিয়ে এই ব্যূহ ভেদ করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দুর্ঘটনাবশতই হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক, একটা ষাঁড়ের তীক্ষ্ণ শিং সজোরে গিয়ে বিধল তার মস্তং ঘোড়াটার পাঁজরে। অমনি ঘোড়াটা যন্ত্রণায় খেপে গিয়ে ক্ষিপ্ত হুঙ্কার ছেড়ে পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে খাঁড়া হয়ে দাঁড়াল, এবং এমন মারাত্মকভাবে ছটফট করতে লাগল যে দাপুটে সওয়ারি ছাড়া আর যে কেউ হলে ছিটকে পড়ত। পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিল। ঘোড়ার প্রতিটা লাফ তাকে ফের সেই শিংগুলোর গায়ে আছড়ে ফেলছিল, আর তাতে তার ক্ষিপ্ততা কেবল বাড়ছিলই। জিন সামলে টিকে থাকাটাই তখন লুসির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সামান্য একটু ভুলচুল হওয়া মানেই সেই প্রকাণ্ড আতঙ্কিত পশুগুলোর খুরের তলায় পড়ে বীভৎস পেষণ আর সুনিশ্চিত মৃত্যু। এমন হঠাৎ বিপদে অনভ্যস্থ হওয়ায় মেয়েটির মাথা ঘুরতে লাগল, লাগামের ওপর থেকে তার হাতের মুঠো শিথিল হয়ে এল। ধুলোর কালো মেঘ আর পশুর পালের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ভাপ গলায় চেপে আসায় সে প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কানের কাছে একটা দরদি কণ্ঠস্বর তাকে অভয় দিল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা শক্তপোক্ত বাদামি হাত গিয়ে চেপে ধরল ভয়ার্ত ঘোড়াটার লাগাম, তারপর এক জোর ধাক্কায় পশুর পাল চিরে তাকে নিরাপদে পালের বাইরে নিয়ে এল।
“আশা করি আপনার গায়ে কোনও আঘাত লাগেনি, মিস?” বিনীত কণ্ঠে শুধাল তার প্রাণরক্ষণকারী।
সে চোখ তুলে যুবকটির তামাটে, কঠোর চেহারার দিকে তাকাল, আর দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, “বাব্বাঃ, ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! কে জানত সামান্য কটা গরু দেখে পনচো এমন ভয় পেয়ে খেপে উঠবে?”
“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আপনি জিন থেকে পড়ে যাননি,” যুবকটি গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে বলল। সে ছিল এক দীর্ঘকায়, উগ্র চেহারার তরুণ, চেপে বসেছিল একটা দাপুটে লালচে-বাদামি ঘোড়ার পিঠে। তার পরনে ছিল শিকারির খসখসে পোশাক, আর কাঁধে ঝুলছিল একটা লম্বা রাইফেল। “আমার মনে হয় আপনি জন ফেরিয়ারের মেয়ে,” সে মন্তব্য করল, “আপনাকে ওঁর বাড়ি থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে নামতে দেখেছি। বাড়ি গিয়ে ওঁকে জিজ্ঞেস করবেন তো, সেন্ট লুইসের জেফারসন হোপদের কথা ওঁর মনে আছে কিনা? উনি যদি সেই ফেরিয়ার হন, তবে আমার বাবার সঙ্গে ওঁর দারুণ খাতির ছিল।”
“তার চেয়ে আপনি নিজেই এসে জিজ্ঞেস করছেন না কেন?” লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বলল লুসি।
প্রস্তাবটা তরুণটির বেশ পছন্দ হল, তার কালো চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “তা-ই করব,” সে বলল, “আমরা গত ২ মাস ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরছি, কারও বাড়ি যাওয়ার মতো পোশাক-আশাক বা চেহারা আমাদের নেই। উনি যেমন দেখবেন, তেমনই মেনে নিতে হবে কিন্তু।”
“ওঁর আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর অনেক কারণ আছে, আর আমারও,” লুসি উত্তর দিল, “বাবা আমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসেন। গরুগুলো যদি আমাকে মাড়িয়ে দিত, তবে সে শোক উনি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না।”
“আমিও পারতাম না,” মৃদু স্বরে বলল তার সঙ্গী।
“আপনি! কেন, আপনার তাতে কী যায় আসে? আপনি তো আমাদের চেনা পরিচিতও নন!”
তরুণ শিকারির তামাটে মুখটা এই কথায় এতটাই বিষণ্ণ হয়ে উঠল যে লুসি ফেরিয়ার খিলখিল করে হেসে ফেলল।
“আহা, আমি ওভাবে বলতে চাইনি,” সে বলল, “অবশ্যই আপনি এখন আমাদের বন্ধু। আমাদের বাড়ি আপনাকে আসতেই হবে। এখন আমাকে ছুটতে হবে, নইলে বাবা আর আমাকে বাইরের কাজের ভরসা করবেন না। আসি তাহলে!”
“বিদায়,” উত্তর দিয়ে সে নিজের চওড়া কাউবয় টুপিটা কিছুটা উঁচিয়ে তার হাতটির দিকে সামান্য ঝুঁকে সম্ভাষণ জানাল। লুসি তার মস্তং ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে নিল, সপাটে এক চাবুক বসাল, আর ধুলোর ঝড় তুলে চওড়া রাস্তা ধরে তিরের বেগে ছুটে বেরিয়ে গেল।
তরুণ জেফারসন হোপ তার সঙ্গীদের সঙ্গে চুপচাপ মুখ গম্ভীর করে এগিয়ে চলল। সে আর তার দলবল রূপোর সন্ধানে নেভাদা পর্বতমালার বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল; নিজেদের আবিষ্কৃত খনিগুলো চালু করার মতো মূলধন জোগাড়ের আশাতেই তারা সল্ট লেক সিটিতে ফিরছিল। এতক্ষণ এই কাজের প্রতি জেফারসনের আগ্রহ সঙ্গীদের চেয়ে বিন্দুমাত্র কম ছিল না, কিন্তু আচমকা এই ঘটনাটা তার চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিল। সিয়েরা পর্বতের হাওয়ার মতোই প্রাঞ্জল ও সতেজ এই তরুণীর উপস্থিতি তার ভেতরে অগ্ন্যুৎপাতের মতো এক উদ্দাম আলোড়ন সৃষ্টি করল। মেয়েটি যখন চোখের আড়াল হয়ে গেল, তখন সে বুঝতে পারল তার জীবনে এক মহা সন্ধিক্ষণ এসে উপস্থিত হয়েছে—রূপোর ব্যবসাই হোক বা অন্য যাই হোক না কেন, এই নতুন আর সর্বগ্রাসী অনুরাগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। তার হূদয়ে যে ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল, তা কোনও চঞ্চল কিশোরের ক্ষণস্থায়ী খেয়াল নয়; তা ছিল দৃঢ় সংকল্প আর দূরন্ত মেজাজের এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের তীব্র, বুনো আবেগ। জীবনে যে কাজে হাত দিয়েছে, তাতেই জয়ী হওয়ায় সে অভ্যস্ত। মনে মনে সে শপথ করল—মানুষের সাধ্যাতীত চেষ্টা আর অধ্যবসায় দিয়ে যদি জয় করা যায়, তবে এই প্রেমে সে কিছুতেই হার মানবে না।
সেই রাতেই সে জন ফেরিয়ারের খামারবাড়িতে গিয়ে হাজির হল, এবং তারপর থেকে সেখানে এত ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করল যে বাড়ির সবার কাছে তার মুখটা অচেনা রইল না। উপত্যকার চারদেওয়ালে বন্দী থেকে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় জন ফেরিয়ার গত ১২ বছর ধরে বাইরের জগতের খবর বিশেষ কিছু পায়নি। জেফারসন হোপ তাকে সেই বাইরের পৃথিবীর সব খবর শোনাত—এমন গল্প বলার কায়দা ছিল তার, যা জন ফেরিয়ার আর লুসি দুজনকেই মুগ্ধ করে রাখত। সে ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার আদি অভিযাত্রীদের একজন; সেই উদ্দাম আর উত্তেজনাময় দিনে রাতারাতি ভাগ্য তৈরি আর ভাগ্য হারানোর কত অদ্ভুত গল্পই না সে শোনাত! সে কাজ করেছে চরের, পশুখোজার শিকারির, রূপো সন্ধানী অভিযাত্রীর আর বিশাল পশুখামারের রক্ষকের। যেখানেই দুঃসাহসিক রোমাঞ্চের গন্ধ পাওয়া গেছে, জেফারসন হোপ সেখানেই ছুটে গেছে। অচিরেই সে বৃদ্ধ কৃষকের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠল, আর বৃদ্ধও তার গুণের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। এমন মুহূর্তে লুসি চুপ করে থাকত, কিন্তু তার রাঙা গাল আর উজ্জ্বল, আনন্দিত চোখ দুটো স্পষ্ট বলে দিত যে সেই তরুণী হূদয় আর তার নিজের দখলে নেই। সরল বাবা হয়তো এসব লক্ষণ খেয়াল করেননি, কিন্তু যে পুরুষটি তার মন জয় করে নিয়েছে, তার নজর কিন্তু মোটেই এড়ায়নি।
গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় জেফারসন রাস্তা দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে ফটকের সামনে থামল। লুসি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে দেখে এগিয়ে এল। জেফারসন কাঠের বেড়ার ওপর লাগামটা ফেলে দীর্ঘ পদক্ষেপে বাঁধানো পথ ধরে হেঁটে এল।
“আমি চললাম, লুসি,” মেয়েটির দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তার মুখের দিকে পরম মমতায় তাকিয়ে সে বলল, “এখনই তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে বলব না, কিন্তু আমি যখন আবার ফিরে আসব, তুমি তখন আমার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত থাকবে তো?”
“আর সেটা কবে হবে?” লাজুক হেসে শুধাল লুসি।
“বেশি হলে মাস দুই। তখন এসে তোমাকে নিজের করে নিয়ে যাব, লক্ষ্মীটি। আমাদের মাঝে দাঁড়ানোর সাধ্য কারও হবে না।”
“আর বাবার কথা ভেবেছ?”
“উনি সম্মতি দিয়েছেন, শর্ত একটাই—আমাদের খনির কাজ যেন ঠিকঠাক চলে। সে বিষয়ে আমার কোনও ভয় নেই।”
“ওমা, তাই বুঝি! তোমরা দুজনে মিলে যখন সব ঠিক করেই ফেলেছ, তখন আর আমার কী বলার থাকতে পারে!” তার চওড়া বুকে গাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল লুসি।
“ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ!” আবেগঘন ধরা গলায় বলল যুবকটি, তারপর নিচে ঝুঁকে তাকে চুম্বন করল। “তাহলে সব ঠিক হয়ে গেল। এখানে যত বেশি দেরি করব, যাওয়া তত কঠিন হবে। গিরিখাতে সঙ্গীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বিদায়, আমার সোনা, বিদায়! ২ মাস পরেই আমাদের আবার দেখা হচ্ছে।”
কথা শেষ করেই সে নিজেকে লুসির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল, লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে ধূলিউড়িয়ে ঝড়ো বেগে ছুটে চলে গেল। পিছন ফিরে একবারও তাকাল না—যেন ভয় পাচ্ছিল, পেছনে ফেলে যাওয়া সেই প্রিয় রূপের দিকে একটিবার তাকালেই তার সংকল্প ডানা ভেঙে তলিয়ে যাবে। লুসি ফটকের মুখে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে চেয়ে রইল, যতক্ষণ না সে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। তারপর সে ধীর পায়ে ঘরে ফিরে এল—সমগ্র ইউটা প্রদেশের সবচেয়ে সুখী আর আনন্দময় তরুণীটি এখন সে-ই।
তৃতীয় অধ্যায়। ধর্মপ্রবর্তকের সঙ্গে জন ফেরিয়ারের কথা।
সল্ট লেক সিটি ছেড়ে জেফারসন হোপ আর তার সঙ্গীরা বিদায় নেওয়ার পর তিনটে সপ্তাহ কেটে গেছে। যুবকটির ফিরে আসার কথা এবং নিজের পালিতা কন্যাকে হারানোর আসন্ন সম্ভাবনার কথা ভেবে জন ফেরিয়ারের বুকটা বেদনায় মুচড়ে উঠত। তবুও লুসির সেই উজ্জ্বল, আনন্দময় মুখখানা দেখে কোনও যুক্তিতর্কের চেয়েও বেশি করে তিনি মনকে মানিয়ে নিচ্ছিলেন। নিজের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ অন্তরের গভীরে তিনি সব সময় স্থির করে রেখেছিলেন—এমন কিছু ঘটানো সম্ভব নয় যা তাকে নিজের মেয়েকে কোনও মারমন পুরুষের হাতে তুলে দিতে রাজি করাতে পারে। এই ধরনের বিবাহকে তিনি আদতে কোনও বিবাহ বলেই গণ্য করতেন না, বরং মানতেন এক পরম লজ্জা ও কলঙ্ক হিসেবে। মারমন ধর্মমত সম্পর্কে তার ধারণা যাই হোক না কেন, এই একটি বিষয়ে তিনি ছিলেন অটল, বজ্রকঠিন। তবে এ নিয়ে তাকে নিজের মুখ বুজেই থাকতে হত; কারণ সেই দিনগুলোতে সাধুদের এই মুলুকে অপ্রচলিত বা ভিন্ন মত প্রকাশ করা ছিল বেজায় বিপজ্জনক এক ব্যাপার।
হ্যাঁ, অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার—এতটাই বিপজ্জনক যে পরম সাধুপুরুষরাও মুখ থেকে ফস্কে বেরোনো কোনও কথার ভুল ব্যাখ্যা হয়ে তাদের ওপর দ্রুত প্রতিশোধ নেমে আসার ভয়ে কেবল রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে নিজেদের ধর্মীয় মতামত প্রকাশ করার সাহস পেতেন। অতীতে যারা নিজেরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, তারা এখন নিজেরাই চরম উৎপীড়কে পরিণত হয়েছে—আর সে উৎপীড়ন মারাত্মকতম রূপ ধারণ করেছে। সেভিলের ইনকুইজিশন, জার্মানির ফেমগেরিখট, কিংবা ইতালির গুপ্ত সমিতিগুলোও কখনও এতটা ভয়ঙ্কর চক্রান্তজাল ও দমনযন্ত্র কার্যকর করতে পারেনি, যা সেই সময় ইউটা অঙ্গরাজ্যের ওপর এক কালো ছায়া ফেলে রেখেছিল।
এর অদৃশ্য অস্তিত্ব এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্যময়তা এই সংগঠনকে দ্বিগুণ ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। মনে হত এটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান, অথচ তাকে দেখা যেত না, শোনাও যেত না তার সাড়াশব্দ। যে মানুষটি চার্চের বিরুদ্ধে গিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াত, সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যেত; সে কোথায় গেল বা তার কপালে কী ঘটল, তা কারও জানা থাকত না। তার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা ঘরে বসে তার পথ চেয়ে থাকত, কিন্তু গোপন বিচারকদের হাতে তার কী পরিণতি হয়েছে তা জানাতে কোনও পিতা আর কখনও ফিরে আসত না। একটি অবিবেচকের মতো কথা কিংবা একটি তাড়াহুড়োর কাজ ডেকে আনত অবধারিত ধ্বংস; অথচ মাথার ওপর ঝুলতে থাকা সেই ভয়ঙ্কর ক্ষমতার প্রকৃতি কেমন, তা কারও জানা ছিল না। তাই মানুষ যে ভয় আর তটস্থ অবস্থায় দিন কাটাত, আর জনমানবহীন প্রান্তরের বুকেও নিজেদের মনের চেপে রাখা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ফিসফিস করে বলতেও সাহস পেত না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
প্রথম প্রথম এই অস্পষ্ট ও ভয়ঙ্কর শক্তি কেবল সেই সব অবাধ্যদের ওপর প্রয়োগ করা হত, যারা মারমন ধর্ম গ্রহণ করার পর তা বিকৃত করতে বা ত্যাগ করতে চাইত। কিন্তু শীঘ্রই এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ল। প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সংখ্যা কমে আসছিল, আর নারীসমাজ ছাড়া বহুবিবাহের প্রথা তো নেহাতই এক নিষ্ফল তত্ত্ব। চারদিকে অদ্ভুত সব গুজব রটতে শুরু করল—যেসব অঞ্চলে কখনও রেড ইন্ডিয়ানদের দেখা মেলেনি, সেখানেও নতুন আগত অভিবাসীদের হত্যা ও তাদের শিবির লুণ্ঠন করার খবর ছড়াতে লাগল। প্রবীণ নেতাদের জেনানামহলে দেখা যেতে লাগল নতুন নতুন নারী—যে নারীরা তিলে তিলে শুকিয়ে মরত, ফুঁপিয়ে কাঁদত এবং যাদের মুখে লেগে থাকত এক নেভানো-না-যাওয়া বিভীষিকার ছাপ। রাতে পাহাড়ি পথে যাতায়াত করা পথিকের মুখে শোনা যেতে লাগল মুখোশধারী, নিঃশব্দ ও অতর্কিতে চলাচলকারী একদল সশস্ত্র লোকের কথা, যারা অন্ধকারের বুক চিরে ছায়ার মতো সরে যেত। এই সব কাহিনী আর গুজব ধীরে ধীরে স্পষ্ট রূপ নিতে লাগল, একের পর এক প্রমাণের ভিত্তিতে তা দৃঢ় হল, অবশেষে একটি নির্দিষ্ট নামে গিয়ে রূপ নিল। আজ পর্যন্ত পশ্চিমের নির্জন খামারগুলোতে 'ড্যানাইট বাহিনী' বা 'প্রতিশোধক দেবদূতদের' নামটি এক অশুভ ও বিপজ্জনক নাম হিসেবেই গণ্য হয়।
এই ভয়ঙ্কর পরিণতির নেপথ্যে থাকা সংগঠনটি সম্পর্কে বিশদ তথ্য মানুষের মনে আতঙ্ক কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিল। এই নিষ্ঠুর সমিতির সদস্য কারা, তা কারও জানা ছিল না। ধর্মের নামে সংঘটিত রক্তপাত ও সহিংসতার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের নাম রাখা হত পরম গোপনে। যে বিশ্বস্ত বন্ধুর কাছে আপনি পয়গম্বর ও তাঁর ধর্মপ্রচার সম্পর্কে নিজের মনের সংশয় প্রকাশ করছেন, সে-ই হয়তো রাতের আঁধারে আগুন আর তলোয়ার হাতে ভয়াবহ চরম প্রতিশোধ নিতে হাজির হওয়া মানুষদের একজন। ফলে প্রতিটি মানুষ তার প্রতিবেশীকে ভয় পেত, আর নিজের অন্তরের গহীনের কথা কারও কাছে মুখ ফুটে বলত না।
এক সুন্দর সকালে জন ফেরিয়ার যখন নিজের গমক্ষেতের উদ্দেশ্যে বেরোনোর তোড়জোড় করছিলেন, তখন দরজার খিল খোলার শব্দ শুনতে পেলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন এক দোহারা চেহারার, বাদামি-হলদেটে চুলের মধ্যবয়সী লোক পথ ধরে হেঁটে আসছে। দৃশ্যটা দেখেই তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল; কারণ এই লোক আর কেউ নয়—স্বয়ং মহান ব্রিঘাম ইয়ং! প্রচণ্ড আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল—কারণ তিনি জানতেন এই অসময়ের সাক্ষাতের ফল ভালো হতে পারে না—ফেরিয়ার মারমন প্রধানকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দরজার দিকে ছুটে গেলেন। কিন্তু অতিথি তার অভিবাদন গ্রহণ করলেন পরম উদাসীনতায়, আর গম্ভীর মুখে তার পিছু পিছু বসার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
"ভাই ফেরিয়ার," আসন গ্রহণ করে এবং নিজের হালকা রঙের পাপড়ির তল থেকে কৃষকটির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন, "প্রকৃত বিশ্বাসীরা তোমার পরম বন্ধু হয়েছে। মরুভূমিতে যখন তোমরা অনাহারে মরতে বসেছিলে, তখন আমরাই তোমাদের তুলে এনেছিলাম, নিজেদের খাদ্য ভাগ করে দিয়েছিলাম, নিরাপদ আশ্রয়ে এই মনোনীত উপত্যকায় নিয়ে এসেছিলাম, প্রচুর জমিজমা দিয়েছিলাম এবং আমাদের ছত্রচ্ছায়ায় তোমাদের ধনী হতে দিয়েছিলাম। এ কথা কি সত্য নয়?"
"হ্যাঁ, এ কথা সত্য," জবাব দিলেন জন ফেরিয়ার।
"এই সব কিছুর বিনিময়ে আমরা কেবল একটি শর্তই চেয়েছিলাম: তা হল, তুমি সত্য ধর্ম গ্রহণ করবে এবং তার সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সর্বতোভাবে মেনে চলবে। তুমি তা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলে, কিন্তু লোকমুখে যা শুনছি তা যদি সত্যি হয়, তবে তুমি সে কথা রক্ষা করোনি।"
"আর কীভাবে আমি তা অবহেলা করেছি?" প্রতিবাদের ভঙ্গিতে দু-হাত ছড়িয়ে প্রশ্ন করলেন ফেরিয়ার। "আমি কি সাধারণ তহবিলে দান করিনি? আমি কি উপাসনালয়ে হাজির হইনি? আমি কি—?"
"তোমার স্ত্রীরা কোথায়?" চারদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন ইয়ং। "তাদের ডাকো, আমি তাদের অভিবাদন জানাই।"
"আমি বিয়ে করিনি, তা সত্যি," ফেরিয়ার উত্তর দিলেন। "কিন্তু নারীর সংখ্যা কম ছিল, আর আমার চেয়ে আরও বেশি দাবিদার অনেকে উপস্থিত ছিল। তা ছাড়া আমি তো একলা মানুষ ছিলাম না; আমার দেখাশোনা করার জন্য আমার মেয়ে ছিল।"
"আমি সেই মেয়ের কথাই তোমার সঙ্গে বলতে চাই," মারমনদের দলপতি বললেন। "সে আজ ইউটার শোভাবর্ধনকারী এক পুষ্পে পরিণত হয়েছে, আর এই দেশের উচ্চপদস্থ অনেকেরই সুনজর পড়েছে তার ওপর।"
জন ফেরিয়ার মনের গভীরে কোঁকানি দিয়ে উঠলেন।
"তার সম্পর্কে কিছু কথা কানে এসেছে যা আমি অবিশ্বাসের ভান করতে চাই—রটেছে যে সে নাকি কোনও অ-মারমন পুরুষের প্রেমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই অলস লোকের অহেতুক কিসসা। পরম পবিত্র জোসেফ স্মিথের সংহিতার ত্রয়োদশ নিয়মটি কী? 'সত্য ধর্মের প্রতিটি কুমারী কন্যা যেন নির্বাচিত কোনো পুরুষকেই বিবাহ করে; কেননা সে যদি কোনো অ-মারমন পুরুষকে বিবাহ করে, তবে সে মহাপাপ সম্পাদন করে।' এই যদি হয় বিধান, তবে পবিত্র ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে তুমি তোমার মেয়েকে সেই বিধান লঙ্ঘন করতে দেবে, তা হতে পারে না।"
জন ফেরিয়ার কোনও উত্তর দিলেন না, তবে তিনি নার্ভাস হয়ে নিজের চাবুকটি নিয়ে খেলা করতে লাগলেন।
"এই একটি মাত্র বিষয়েই তোমার সমগ্র বিশ্বাসের পরীক্ষা হবে—চারজনের পবিত্র কাউন্সিলে এমন সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়েছে। মেয়েটি কমবয়সী, আমরা চাই না সে কোনো পাকা চুলের বৃদ্ধকে বিয়ে করুক, আবার তার পছন্দের অধিকারও আমরা একেবারে কেড়ে নিতে চাই না। আমাদের মতো প্রবীণদের ঘরে বহু গাভী [১] রয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের সন্তানদের জন্যও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। স্ট্যানগারসনের এক ছেলে আছে, আর ড্রেবারেরও এক ছেলে আছে, এবং তাদের যে কেউ আনন্দের সাথে তোমার মেয়েকে তাদের ঘরে বরণ করে নেবে। সে তাদের দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিক। তারা তরুণ, ধনী এবং সত্য ধর্মের অনুসারী। এ বিষয়ে তোমার মতামত কী?"
[১] হিবার সি. কেম্বল তাঁর একটি ধর্মোপদেশে নিজের একশো স্ত্রীকে নির্দেশ করতে এই অনুরাগময় বিশেষণের উল্লেখ করেছেন।
কুঁচকানো কপালে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন ফেরিয়ার।
"আমাদের কিছুটা সময় দিন," অবশেষে বললেন তিনি। "আমার মেয়ে খুব ছোট—তার বিয়ের বয়স এখনও ঠিকমতো হয়নি।"
"বাছাই করার জন্য সে এক মাস সময় পাবে," আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ইয়ং। "সেই সময় পার হলে সে তার সিদ্ধান্ত জানাবে।"
তিনি দরজা অতিক্রম করে বাইরে যাচ্ছিলেন, এমন সময় ঘুরে দাঁড়ালেন; তাঁর মুখখানা তখন রক্তবর্ণ আর চোখ দুটো থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে আগুন। "জন ফেরিয়ার," তিনি গর্জে উঠলেন, "পবিত্র চার জনের আদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তোমরা নিজেদের দুর্বল ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করার চেয়ে, তোমরা বাবা-মেয়ে সিয়েরা ব্লাঙ্কোর বুকে সাদা কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকলে অনেক ভালো হত!"
হাত তুলে হুমকির ভঙ্গি করে তিনি দরজার মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন, আর কঙ্করময় পথে তার ভারী জুতো ঘষে যাওয়ার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পেলেন ফেরিয়ার।
হাঁটুর ওপর কনুই রেখে তিনি তখনও চিন্তায় মগ্ন ছিলেন—কীভাবে মেয়ের কাছে কথাটা পাড়বেন, ঠিক এমন সময় একটা নরম হাত এসে স্পর্শ করল তার হাতখানা। মুখ তুলে তাকাতেই তিনি দেখলেন মেয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ফ্যাকাশে, ভীত মুখখানার দিকে এক পলক তাকিয়েই ফেরিয়ার বুঝে গেলেন—মাঝখানে যা যা ঘটে গেছে তার সবই লুসি শুনে ফেলেছে।
"আমি না শুনে থাকতে পারিনি," বাবার চাহনির উত্তরে লুসি বলল। "ওঁর গলা পুরো ঘরে গমগম করছিল। ওহ্ বাবা, বাবা, এখন আমরা কী করব?"
"ভয় পেয়ো না, মা," মেয়েকে নিজের কাছে টেনে এনে তার বাদামি চুলে চওড়া, খসখসে হাতটা আদরে বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন। "আমরা কোনো না কোনো একটা উপায় ঠিক বের করে ফেলব। এই ছেলেটার ওপর তোর টান নিশ্চয়ই এতটুকু কমেনি, তাই না?"
একটা ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না আর বাবার হাত চেপে ধরা—এই ছিল তার একমাত্র উত্তর।
"না, কমার তো কথা নয়। তুই যে তা বলবি, তাও আমি শুনতে চাই না। ছেলেটা একদম যোগ্য, আর সবচেয়ে বড় কথা সে একজন খাঁটি খ্রিস্টান—এখানকার লোকগুলোর হাজার প্রার্থনা আর উপদেশ আওড়ানোর চেয়েও যা অনেক বেশি দামী। কাল নেভাডার উদ্দেশ্যে একটা দল রওনা হচ্ছে, আমি কোনোভাবে তার কাছে একটা বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করব যাতে সে জানতে পারে আমরা কী বিপদে পড়েছি। আর সেই ছোকরাকে আমি যতটা চিনি, ও এমন গতিতে এখানে ছুটে আসবে যে বিজলি-টেলিগ্রাফও তার কাছে হেরে যাবে।"
বাবার এমন বর্ণনায় চোখের জলের মধ্য দিয়েই হেসে ফেলল লুসি।
"ও এলে আমাদের সবচেয়ে ভালো পরামর্শটাই দেবে। কিন্তু বাবা, আমি যে তোমায় নিয়ে ভীষণ ভয় পাচ্ছি। পয়গম্বরের বিরুদ্ধে যারা যায় তাদের নিয়ে কত ভয়াবহ সব গল্প শোনা যায়... তাদের সাথে নাকি সবসময় খুব ভয়ানক কিছু ঘটে যায়।"
"কিন্তু আমরা তো এখনও তার বিরুদ্ধে যাইনি," বাবা উত্তর দিলেন। "যখন যাব, তখন ঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভাবা যাবে। আমাদের হাতে পাক্কা একটা মাস সময় আছে; আমার মনে হয় সেই সময় শেষ হলে আমাদের ইউটা থেকে চম্পট দেওয়াই সবচেয়ে ভালো হবে।"
"ইউটা ছেড়ে চলে যাব!"
"সোজা কথায় সেটাই আসল কথা।"
"কিন্তু এই খামার?"
"যতটা পারি নগদে তুলে নেব, বাকিটা না হয় ছাইপাঁশ হিসেবে পড়ে থাকুক। সত্যি বলতে কী লুসি, এই কাজটা করার কথা আমি যে প্রথমবার ভাবছি তা নয়। এই লোকগুলো যেভাবে তাদের ওই অভিশপ্ত ধর্মপ্রবর্তকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে, সেভাবে কোনো মানুষের কাছে নতি স্বীকার করা আমার ধাতে নেই। আমি স্বাধীন হয়ে জন্মানো একজন আমেরিকান, আর এইসব জিনিস আমার কাছে একদম নতুন। বয়স হয়ে গেছে, নতুন করে এসব দাসত্ব শেখার দিন আর নেই। আর ও যদি এই খামারের কাছাকাছি ঘুরাঘুরি করতে আসে, তবে হয়তো উল্টোদিক থেকে ছিটকে আসা একটা তাজা কার্তুজের মুখে গিয়ে পড়তে হতে পারে।"
"কিন্তু ওরা যে আমাদের ছেড়ে যেতে দেবে না," আপত্তি তুলল মেয়ে।
"জেফারসন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর, আমরা সব ব্যবস্থা করে ফেলব। আপাতত তুই মন খারাপ করিস না রে মা, আর কেঁদে কেঁদে চোখ ফোলাস না, নয়তো তোকে এই অবস্থায় দেখলে সে এসে আমাকেই ধমকাবে! ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই, কোনো বিপদই হবে না।"
জন ফেরিয়ার পরম আত্মবিশ্বাসের স্বরেই এই সান্ত্বনার কথাগুলো বললেন, কিন্তু লুসি না খেয়াল করে পারল না যে সে রাতে তার বাবা দরজার খিল ও ছিটকিনিগুলো যেন একটু বেশি যত্ন নিয়েই পরীক্ষা করলেন, আর শোয়ার ঘরের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা পুরনো মরচে-পড়া শটগানটা সাবধানে পরিষ্কার করে তাতে তাজা কার্তুজ ভরে রাখলেন।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.