তার কথামতো পরদিনই আমাদের দেখা হল। দেখতে গেলাম বেকার স্ট্রিটের ২২১বি নম্বরের সেই ফ্ল্যাটটা, যার কথা সে আগের দিন বলেছিল। বাসাটায় দুটো বেশ আরামদায়ক শোবার ঘর আর আলো-বাতাসে ভরা চওড়া একটা বসার ঘর ছিল। ঘর সাজানো গুছানো, আর দুটো বড় বড় জানালা দিয়ে প্রচুর আলো আসে। সবদিক থেকেই জায়গাটা এত চমৎকার আর দুজনের মধ্যে ভাড়া ভাগ করে নেওয়ার চুক্তিটা এতই সাশ্রয়ী মনে হল যে, কথা না বাড়িয়ে আমরা ওখানেই পাকা কথা সেরে ফেললাম এবং তখনই ঘরের দখল নিলাম। সেদিন সন্ধ্যায়ই আমি হোটেল থেকে নিজের জামাকাপড় ও মালপত্র নিয়ে চলে এলাম, আর তার পরদিন সকালে শেরলক হোমসের কয়েকটা বাক্সপ্যাটরা আর চামড়ার ব্যাগ নিয়ে পদার্পণ ঘটল। এরপর দু-একদিন আমাদের কাটল জিনিসপত্র খুলে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততায়। কাজ শেষ হতেই আমরা ধীরে ধীরে থিতু হলাম এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করলাম।
হোমসের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকা মোটেও কঠিন কিছু ছিল না। লোকটার আচার-ব্যবহার ছিল বেশ শান্ত আর জীবনযাপন নিয়মমাফিক। রাত দশটার পর সে জেগে আছে—এমনটা কদাচিৎ ঘটত; আর সকালে আমার ঘুম ভাঙার আগেই সে প্রাতরাশ সেরে বাইরে বেরিয়ে পড়ত। কখনও কখনও সে সারা দিন কাটাত রসায়ন গবেষণাগারে, কখনও কাটাত শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষে, আবার কখনও তাকে দেখা যেত সুদীর্ঘ পদযাত্রায়—মনে হত সেই হাঁটার খেয়াল তাকে শহরের সবচেয়ে নিঃস্ব ও অপরাধপ্রবণ বস্তি এলাকার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। কাজের মেজাজ যখন তাকে পেয়ে বসত, তখন তার কর্মশক্তির তুলনা ছিল না; কিন্তু মাঝে মাঝেই একটা নিষ্ক্রিয়তার প্রতিক্রিয়া এসে ভর করত তার ওপর, আর টানা কতগুলো দিন সে বসার ঘরের সোফায় চুপচাপ শুয়ে কাটাত—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করত না, শরীরের একটা পেশিও নাড়াত না। এমন সব মুহূর্তে তার চোখে একরকম স্বপ্নের মতো শূন্য চাহনি ফুটে উঠত; তার জীবনযাপন অত্যন্ত সংযমী ও পরিচ্ছন্ন না হলে আমি হয়তো সন্দেহ করে বসতাম যে সে কোন নেশাদ্রব্যে আসক্ত।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটতে লাগল। হোমসের প্রতি আমার আগ্রহ আর তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য ঠিক কী—তা জানার কৌতূহল ক্রমেই আরও গভীর ও তীব্র হয়ে উঠল। তার শারীরিক গঠন আর চেহারার ধরনটাই এমন ছিল যে, অসতর্ক পথচারীর নজরও তার দিকে পড়তে বাধ্য। উচ্চতায় সে ছিল ছয় ফুটেরও কিছু বেশি, আর এতটাই কৃশকায় যে দেখে মনে হত সে যেন আরও উঁচু। ঝিমুনির যে বিরতিগুলোর কথা আমি আগে বলেছি, সেগুলো ছাড়া বাকি সময় তার চোখ দুটো থাকত ধারালো আর তীব্র ত্বরিত। তার সরু, বাজপাখির মতো বাঁকানো নাকটা তাকে একধরনের সতর্ক আর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ভাব দিত। তার থুতনিটাও ছিল বেশ স্পষ্ট ও চৌকো—যা এক দৃঢ়চেতা মানুষের লক্ষণ। তার দু-হাত প্রায় সর্বদাই কালির ছোপ আর রকমারি রাসায়নিকের দাগে লেপটে থাকত; তবুও স্পর্শে তার অসাধারণ সূক্ষ্মতা ছিল—যা আমি প্রায়ই লক্ষ্য করেছি, যখন সে নানা ধরনের সূক্ষ্ম ও ভঙ্গুর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করত।
পাঠক হয়তো আমাকে অত্যন্ত গায়ে-পড়া অনধিকারচর্চাকারী বলে ধরে নিতে পারেন, যখন আমি স্বীকার করছি যে এই লোকটা আমার কৌতূহলকে কতটা উসকে দিয়েছিল আর তার নিজের ব্যাপারে চেপে যাওয়া স্বভাবের দেওয়াল ভেঙে সত্যিটা জানার জন্য আমি কতটা চেষ্টা করতাম। তবে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দয়া করে মনে রাখবেন, তখন আমার জীবন কতটা লক্ষ্যহীন ছিল আর আমাকে ব্যস্ত রাখার মতো উপাদান কতটা কম ছিল। আবহাওয়া খুব মনোরম না হলে শরীর আমাকে বাইরে যেতে দিত না, আর এমন কোনও বন্ধুও আমার ছিল না যে এসে আমার একঘেয়ে দৈনন্দিন জীবনকে খানিকটা দোলা দিয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে আমার সঙ্গীকে ঘিরে থাকা সেই ছোট্ট রহস্যটুকুকে আমি আঁকড়ে ধরেছিলাম এবং তার জট ছাড়াতে নিজের দিনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করছিলাম।
সে যে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছে না, তা সে নিজেই আমার এক প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেছিল—স্ট্যামফোর্ডের ধারণাই সঠিক ছিল। আবার বিজ্ঞানের কোনও ডিগ্রি পাওয়া বা বিদ্বৎসমাজে প্রবেশ করার মতো প্রথাগত পড়াশোনাও সে করছে বলে মনে হল না। তবুও নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে তার মেধা ও অনুরাগের সীমা ছিল না। এক অদ্ভুত সীমানার মধ্যে তার জ্ঞান ছিল এতটাই বিস্তৃত ও নিখুঁত যে তার নানা পর্যবেক্ষণ শুনে আমি তাজ্জব বনে যেতাম। নিশ্চয়ই কোনও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে না থাকলে কেউ এত পরিশ্রম করে এমন নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে না। উদ্দেশ্যহীন পাঠকেরা খুব কমই এমন সুনির্দিষ্ট ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে। উপযুক্ত কোনো কারণ ছাড়া কোনো মানুষই খুটিনাটি বিষয় দিয়ে নিজের মগজকে ভারী করে তোলে না।
তার জ্ঞানের মতো তার অজ্ঞতাও ছিল সমান চমকপ্রদ। সমকালীন সাহিত্য, দর্শন কিংবা রাজনীতি সম্পর্কে সে প্রায় কিছুই জানত না বললেই চলে। থমাস কার্লাইল থেকে একটা উদ্ধৃতি দেওয়াতে সে অত্যন্ত সরলভাবে জানতে চাইল, লোকটা কে আর সে জীবনে কী করেছে! তবে আমার বিস্ময় চরম সীমায় পৌঁছাল যখন প্রসঙ্গক্রমে জানতে পারলাম যে সে কোপারনিকাসের তত্ত্ব কিংবা সৌরজগতের গঠন সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও ওয়াকিবহাল নয়। এই উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কোনও সভ্য মানুষ জানে না যে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে—এটা আমার কাছে এতই অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য ঠেকছিল যে আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
"আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ অবাক হয়েছেন," আমার অবাক হওয়ার ভঙ্গি দেখে হেসে বলল সে, "এখন যখন জেনেই ফেলেছি, তখন এটা ভুলে যাওয়ার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব।"
"ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবেন!"
"ব্যাপারটা বুঝুন," সে ব্যাখ্যা করল, "আমি মনে করি মানুষের মগজটা মূলত একটা ছোট খালি চিলেকোঠার ঘরের মতো। সেখানে আপনি আপনার পছন্দমতো আসবাবপত্র এনে সাজাবেন। বোকা লোক তার সামনে যা পায়—যত হাবিজাবি জিনিস—সব সেই ঘরে এনে তোলে। ফলে যে জ্ঞানটা তার কাজে লাগত, সেটা ভিড়ের চাপে হারিয়ে যায়; অথবা অন্তত অন্য বস্তুর স্তূপের নিচে এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে যায় যে দরকারের সময়ে সেটার আর খোঁজ মেলে না। কিন্তু একজন চতুর কারিগর তার মগজ-চিলেকোঠায় কী তুলছে তা নিয়ে ভীষণ সতর্ক। তার কাজের জন্য যে হাতিয়ারগুলো দরকার, সেগুলো ছাড়া অন্য কিচ্ছু সে সেখানে রাখবে না। কিন্তু সেই দরকারি হাতিয়ারের ভাণ্ডারটা হবে বিশাল আর একেবারে পরিপাটিভাবে সাজানো। ওই ছোট ঘরটার দেয়ালগুলো রবারের তৈরি আর তা যত খুশি প্রসারিত হতে পারে—এমনটা ভাবা মস্ত ভুল। বিশ্বাস করুন, এমন একটা সময় আসে যখন প্রতিটা নতুন তথ্য ঢোকানোর জন্য আপনি আগের জানা কোনও তথ্য ভুলে যান। তাই অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়কে ঠেলে বের করে না দেওয়াটাই হল আসল বুদ্ধিমানের কাজ।"
"কিন্তু সৌরজগত!" আমি প্রতিবাদ জানিয়ে উঠলাম।
"আরে ছাই! ওসব নিয়ে আমি কী করব?" অধৈর্য হয়ে মাঝে থামিয়ে দিল সে, "আপনি বলছেন আমরা নাকি সূর্যের চারপাশে ঘুরি। আমরা যদি চাঁদের চারপাশে ঘুরি, তাতেও আমার বা আমার কাজের এক কড়াকান্তির তফাত হবে না।"
সেই কাজটা ঠিক কী—আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার হাবভাবে বুঝলাম এই প্রশ্নটা সে মোটেই পছন্দ করবে না। তবুও আমাদের এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে লাগলাম এবং তার থেকে নিজের মতো একটা অনুমানে পৌঁছানোর চেষ্টা করলাম। সে বলেছে, যে জ্ঞান তার মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়, তা সে অর্জন করবে না। অতএব, তার মধ্যে যত জ্ঞান রয়েছে তার সবই নিশ্চয়ই তার কাজের উপযোগী। মনের ভেতর হিসেব করে দেখলাম কোন কোন বিষয়ে সে অসাধারণ পারদর্শী। এমনকি একটা পেন্সিল নিয়ে কাগজ-কলমে সবকটা পয়েন্ট টুকেও ফেললাম। তালিকাটা শেষ করে সেটির দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই হেসে ফেললাম। কাগজটায় লেখা ছিল এইরকম—
শেরলক হোমসের জ্ঞানের পরিধি:
১. সাহিত্য জ্ঞান—শূন্য। ২. দর্শন শাস্ত্র—শূন্য। ৩. জ্যোতির্বিজ্ঞান—শূন্য। ৪. রাজনীতি—সামান্য। ৫. উদ্ভিদবিজ্ঞান—অসমভাবে বিস্তৃত। বেলাডোনা, আফিম ও বিষাক্ত পদার্থের বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। তবে ব্যবহারিক বাগান করার ব্যাপারে কিছুই জানে না। ৬. ভূতত্ত্ববিজ্ঞান—ব্যবহারিক, তবে সীমিত। এক পলক দেখেই বিভিন্ন মাটির তফাত বলে দিতে পারে। হাঁটাহাঁটি করে ফেরার পর নিজের ট্রাউজার্সে লাগা কাঁদার ছিটে দেখিয়ে সে তার রঙ আর ঘনত্ব বিচার করে বলে দিতে পেরেছে লন্ডনের কোন এলাকা থেকে তা লেগেছে। ৭. রসায়নশাস্ত্র—অত্যন্ত গভীর ও প্রগাঢ়। ৮. শারীরস্থান (অ্যানাটমি)—নিখুঁত, কিন্তু অসংগঠিত। ৯. চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর সাহিত্য—অসীম। চলতি শতাব্দীতে ঘটা প্রতিটা বীভৎস ঘটনার খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে। ১০. বেহালা বাজাতে খুব দক্ষ। ১১. লাঠিখেলা, বক্সিং এবং তলোয়ার চালনায় অত্যন্ত পারদর্শী। ১২. ব্রিটিশ আইনকানুন সম্পর্কে ভালো ব্যবহারিক জ্ঞান আছে।
তালিকাটা এতদূর লেখার পর আমি হতাশ হয়ে সেটা আগুনে ছুঁড়ে ফেললাম। স্বগত বলে উঠলাম, "এই সবকটা বিদ্যার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে লোকটা আসলে কী চড়কগাছ বানাতে চাইছে আর কোন পেশায় এই সবগুলোর একসঙ্গে প্রয়োজন হতে পারে—তা যদি খুঁজতে বসি, তবে তো আমার এই চেষ্টা এখনই ছেড়ে দেওয়াই ভালো!"
ওপরের তালিকায় আমি তার বেহালা বাজানোর দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছি। সেই ক্ষমতাটা ছিল সত্যিই অসাধারণ, তবে তার অন্য সব দক্ষতার মতোই অদ্ভুত ও খামখেয়ালি। সে যে কঠিন কঠিন সুর আর বড় বড় স্বরলিপি বাজাতে পারে, তা আমি ভাল করেই জানতাম; কারণ আমার অনুরোধে সে মেন্ডেলসনের 'লিডার' এবং আমার পছন্দের আরও কিছু সুর বাজিয়ে শুনিয়েছে। কিন্তু যখন সে একা থাকত, তখন খুব কমই কোনো জানা সুর বা স্বীকৃত কোনো সুর বাজাতে চেষ্টা করত। সন্ধ্যায় আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে, চোখ দুটো বুজে, কোলের ওপর রাখা বেহালাটায় আনমনে ছড় টানত সে। কখনও সেই সুর হতো গম্ভীর ও বিষাদময়, আবার কখনও অদ্ভুত আর আনন্দদায়ক। এটা পরিষ্কার যে সুরগুলো তার মনের মধ্যকার চিন্তাভাবনাগুলোকেই প্রতিফলিত করত; তবে বেহালার সুর তার চিন্তায় সাহায্য করত নাকি বাজানোটা স্রেফ তার খামখেয়ালির ফল ছিল—তা আমি বুঝে উঠতে পারতাম না। এই বিরক্তিকর খেয়ালি সুরের বিরুদ্ধে আমি হয়তো বিদ্রোহই করে বসতাম, কিন্তু আমার ধৈর্য পরীক্ষার ক্ষতিপূরণ হিসেবে সে সাধারণত শেষবেলায় একের পর এক আমার প্রিয় সুরগুলো দ্রুত বাজিয়ে শোনাত।
প্রথম এক সপ্তাহের মতো আমাদের এখানে কোন অভ্যাগত বা দর্শনার্থী আসেনি; আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম যে লোকটা বুঝি আমার মতোই নিঃসঙ্গ আর বন্ধুহীন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই টের পেলাম যে সমাজে বিভিন্ন স্তরের বহু লোকের সঙ্গে তার জানাশোনা রয়েছে। তার মধ্যে ছিল এক ক্ষুদ্রে, ফ্যাকাশে, ইঁদুরমুখো, কালো চোখের লোক—যার নাম মি. ল্যাস্ট্রেড বলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল; সে সপ্তাহে অন্তত তিন-চারবার আসত। একদিন সকালে বেশ আধুনিক পোশাক পরা এক যুবতী এল এবং আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রয়ে গেল। সেদিন বিকেলেই এল এক পাকাচুলের জীর্ণ পোশাকের লোক—দেখতে অনেকটা ইহুদি হকারদের মতো, লোকটাকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল; আর তার ঠিক পেছনেই এসে ঢুকল এক চটি-জুতো পরা প্রৌঢ়া। অন্য একদিন এক বৃদ্ধ, সাদা চুলের ভদ্রলোক এসেছিলেন হোমসের সঙ্গে দেখা করতে; আর একদিন এলেন ভেলভেটের পোশাক পরা এক রেলওয়ের কুলি। যখনই এই সব আজব টাইপের মানুষজন উপস্থিত হত, শেরলক হোমস বিনয়ের সঙ্গে বসার ঘরটা ব্যবহার করার অনুমতি চাইত, আর আমি আমার শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকতাম। আমাকে এই অসুবিধায় ফেলার জন্য সে সবসময় ক্ষমা চেয়ে বলত, "আমাকে এই ঘরটা ব্যবসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, আর এই মানুষগুলো হল আমার মক্কেল।" আবার একটা সুযোগ এল সরাসরি প্রশ্ন করার, কিন্তু অপরের গোপন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ভদ্রতা আমাকে আবারও আটকে দিল। তখন ভেবেছিলাম এসব বিষয়ে কথা না বলার পেছনে নিশ্চয়ই তার বড় কোনো কারণ আছে, কিন্তু শীঘ্রই সে নিজেই কথাটা তুলে সেই ভুল ভেঙে দিল।
দিনটা ছিল ৪ঠা মার্চ—আমার দিনটার কথা স্পষ্ট মনে থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। সেদিন অন্য দিনের চেয়ে একটু সকালেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। উঠে দেখি শেরলক হোমসের তখনও প্রাতরাশ শেষ হয়নি। বাড়িওয়ালি আমার দেরিতে ওঠার অভ্যাসে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে আমার জন্য টেবিল সাজানো বা কফি তৈরি রাখা হয়নি। মানুষের অহেতুক খিটখিটে স্বভাববশত আমি ঘণ্টা বাজিয়ে রুক্ষ গলায় জানিয়ে দিলাম যে আমি তৈরি। তারপর টেবিল থেকে একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে সময় কাটানোর জন্য উল্টাতে লাগলাম, আর ওদিকে আমার সঙ্গী নিঃশব্দে সেঁকা রুটি চিবোতে লাগল। পত্রিকাটার একটা প্রবন্ধের শিরোনামে পেন্সিলের দাগ দেওয়া ছিল, স্বাভাবিকভাবেই আমার চোখ আটকে গেল সেখানে।
প্রবন্ধটার নামটা ছিল বেশ চটকদার—"জীবনের গ্রন্থ"। সেখানে দেখানো হয়েছে একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক মানুষ তার চোখের সামনে দিয়ে যাওয়া সব কিছু নিখুঁত ও ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষা করে কতটা জানতে পারে। লেখাটা আমার কাছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর গাঁজাখুরি কল্পনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ বলে মনে হল। যুক্তির বাঁধন বেশ শক্ত হলেও সিদ্ধান্তগুলো বড্ড অস্বাভাবিক আর অতিরঞ্জিত মনে হল। লেখকের দাবি—মুখের সাময়িক অভিব্যক্তি, পেশির সামান্য স্পন্দন কিংবা চোখের এক পলক চাহনি দেখেই নাকি মানুষের মনের একদম ভেতরের চিন্তা ধরে ফেলা সম্ভব! তার মতে, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে পারদর্শী কাউকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। তার সিদ্ধান্তগুলো ইউক্লিডের জ্যামিতিক সূত্রের মতোই অভ্রান্ত! সাধারণ মানুষের কাছে এই ফলাফলগুলো এতই চমকপ্রদ ঠেকবে যে, আসল কৌশলটা না জানা পর্যন্ত তারা তাকে কোনো জাদুকর বা গুণিন বলে ভুল করতেই পারে।
লেখক লিখেছেন: "এক ফোটা জল পর্যবেক্ষণ করে একজন তাত্ত্বিক লোক আটলান্টিক মহাসাগর বা নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অস্তিত্ব অনুমান করে নিতে পারে—এমনকি সে যদি জীবনে কখনও তার নামও না শুনে থাকে। বস্তুত পুরো জীবনটাই হল এক সুবিশাল শৃঙ্খল, যার মাত্র একটা আংটা দেখলেই বাকিটার রূপ বোঝা যায়। অন্য সব শিল্পের মতোই, 'অনুমান ও বিশ্লেষণ বিজ্ঞান'-কে আয়ত্ত করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল সাধনা; আর মানুষের এই সংক্ষিপ্ত জীবন পরম সিদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। জটিল মানসিক ও নৈতিক বিষয়গুলোতে হাত দেওয়ার আগে একজন গবেষকের উচিত প্রাথমিক বিষয়গুলোতে সিদ্ধহস্ত হওয়া। কোনও মানুষের মুখোমুখি হলেই যেন এক পলকে তার অতীতের ইতিহাস এবং তার পেশা চিনে নেওয়া যায়। এই অভ্যাসকে ছেলেমানুষি মনে হলেও, এটা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে ধারালো করে আর কোথায় এবং কীভাবে দেখতে হবে তা শেখায়। মানুষের হাতের নখ, কোটের হাতা, জুতো, প্যান্টের হাঁটু, তর্জনী ও বুড়ো আঙুলের কড়া, মুখের অভিব্যক্তি এবং জামার কাফ—এই প্রতিটি জিনিস দিয়ে একজন মানুষের পেশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সবকটি সংকেত পাওয়ার পরও একজন দক্ষ পর্যবেক্ষক সত্য উন্মোচন করতে পারবে না—তা ভাবাই যায় না।"
"কী তথাকথিত বাজে বকা!" চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, টেবিলের ওপর পত্রিকাটা আছড়ে ফেলে বললাম, "জীবনে এমন অসংলগ্ন বস্তাপচা লেখা আমি পড়িনি।"
"কী হয়েছে?" শেরলক হোমস জিজ্ঞেস করল।
"আরে, এই লেখাটা!" প্রাতরাশে বসতে বসতে ডিম খাওয়ার চামচটা দিয়ে পত্রিকাটার দিকে নির্দেশ করে বললাম, "দেখছি আপনিও এটা পড়েছেন, পেন্সিলের দাগ দেওয়া রয়েছে। স্বীকার করছি বেশ ঝরঝরে ভাষায় লেখা। কিন্তু পড়ে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে! নিশ্চিত কোনো আরামপ্রিয় ঘরে-বসা অলস মাথার ধান্ধা এটা, যে নিজের পড়ার ঘরের নির্জনতায় বসে বসে এসব মনগড়া তত্ত্ব বানিয়েছে। একদম অবাস্তব! আমি লোকটাকে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলের থার্ড ক্লাস কামরায় বসিয়ে দিয়ে সহযাত্রীদের পেশা বলতে বলব—দেখি কেমন পারে! হাজার টাকায় এক টাকা বাজি রাখতে পারি, সে হেরে ভূত হয়ে যাবে।"
"আপনি আপনার টাকাটা হারাবেন," শান্ত গলায় মন্তব্য করল শেরলক হোমস, "আর লেখাটার কথা বলছেন? ওটা আমি নিজেই লিখেছি।"
"আপনি!"
"হ্যাঁ, পর্যবেক্ষণ আর অনুমান—দুটোর প্রতিই আমার সহজাত ঝোঁক আছে। যে তত্ত্বগুলোকে আপনার এত আজগুবি মনে হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবে অত্যন্ত কাজের—এতটাই কাজের যে ওটার ওপর নির্ভর করেই আমার রুটিরুজি চলে।"
"সেটা কীভাবে?" না ভেবেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল প্রশ্নটা।
"আমার একটা নিজস্ব ব্যবসা বা পেশা আছে। বলা যায়, পুরো পৃথিবীতে আমিই একমাত্র এই লাইনে আছি। আমি হলাম একজন 'পরামর্শদাতা গোয়েন্দা'—যদি আপনি ব্যাপারটা বোঝেন। এই লন্ডনে সরকারি আর বেসরকারি অনেক গোয়েন্দা আছে। তারা যখন কোনো মামলায় খেই হারিয়ে ফেলে, তখন দৌড়ে আসে আমার কাছে। আমি তাদের সঠিক গন্ধটা পাইয়ে দিই। তারা সব প্রমাণ আমার সামনে তুলে ধরে, আর অপরাধের ইতিহাস সংক্রান্ত জ্ঞানের সাহায্যে আমি আসল রাস্তাটা দেখিয়ে দিই। অপরাধের ছকের মধ্যে এক অদ্ভুত পারিবারিক মিল থাকে; আপনার কাছে যদি হাজারটা অপরাধের খুঁটিনাটি মুখস্থ থাকে, তবে হাজার-এক নম্বর অপরাধের জট খোলা কোনো ব্যাপারই নয়। ল্যাস্ট্রেড একজন নামজাদা গোয়েন্দা। সম্প্রতি একটা জালিয়াতির মামলায় সে ধন্দে পড়েছিল, আর সেই জন্যই সে আমার কাছে এসেছিল।"
"আর ওই যে অন্য লোকগুলো আসে?"
"তারা বেশিরভাগই বেসরকারি তদন্ত সংস্থার পাঠানো। তারা সবাই কোনো না কোনো সমস্যায় পড়ে একটু পথনির্দেশ চাইতে আসে। আমি তাদের গল্প শুনি, তারা আমার মতামত শোনে, আর তারপর আমি আমার ফি পকেটে পুরি।"
"কিন্তু আপনি কি বলতে চাইছেন," আমি বললাম, "যে ঘরে বসেই আপনি এমন সব জট ছাড়িয়ে ফেলেন, যা অন্যেরা চোখের সামনে সমস্ত খুঁটিনাটি দেখেও সমাধান করতে পারে না?"
"একদম তাই। ওটা আমার একধরনের সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে এমন মামলা আসে যা একটু বেশি জটিল; তখন আমাকে ছুটোছুটি করে নিজের চোখে সবকিছু দেখতে হয়। বুঝতে পারছেন তো, আমার কাছে কিছু বিশেষ জ্ঞান আছে যা আমি সমস্যার ওপর প্রয়োগ করি, আর তাতেই কেল্লাফতে হয়ে যায়! যে অনুমানের নিয়মগুলো পড়ে আপনার অত অবজ্ঞা জন্মাল, বাস্তব কাজে সেগুলোই আমার পরম হাতিয়ার। পর্যবেক্ষণ করাটা আমার দ্বিতীয় প্রকৃতি। প্রথম দেখা হওয়ার দিন আমি যখন বলেছিলাম যে আপনি আফগানিস্তান থেকে এসেছেন, তখন তো আপনি বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন!"
"আপনাকে নিশ্চয়ই কেউ বলে দিয়েছিল।"
"একদম নয়! আমি জানতাম আপনি আফগানিস্তান থেকে এসেছেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে চিন্তার তরঙ্গ আমার মাথায় এত দ্রুত খেলে যায় যে মাঝের ধাপগুলো টের পাওয়ার আগেই আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। তবে সেই ধাপগুলো কিন্তু ছিল। যুক্তির শৃঙ্খলাটা এইরকম ছিল—'এখানে একজন ভদ্রলোক রয়েছেন যার হাবভাব চিকিৎসকদের মতো, কিন্তু চলাফেরা ও চেহারায় এক সেনাকর্মীর ভাব রয়েছে। অর্থাৎ উনি নিশ্চয়ই সেনাবাহিনীর ডাক্তার! উনি এইমাত্র কোনো উষ্ণ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ থেকে ফিরেছেন, কারণ ওঁর মুখ রোদে পোড়া তামাটে; অথচ ওঁর কব্জির চামড়া ফর্সা, তাই ওটা ওঁর গায়ের আসল রঙ নয়। উনি কায়িক কষ্ট ও ব্যাধির মধ্য দিয়ে গেছেন, ওঁর শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখটাই তার প্রমাণ। ওঁর বাঁ হাতটা জখম হয়েছে, উনি সেটা শক্ত ও অস্বাভাবিকভাবে ধরে রেখেছেন। উষ্ণ অঞ্চলের কোথায় একজন ইংরেজ সামরিক ডাক্তার অত কষ্ট পেতে পারেন এবং হাতে আঘাত পেতে পারেন? স্পষ্টতই আফগানিস্তানে!' এই পুরো চিন্তার সারণিটা আমার মগজে এক সেকেন্ডের দশ ভাগের একভাগ সময়ও নেয়নি। তারপরই আমি মন্তব্য করলাম আপনি আফগানিস্তান থেকে এসেছেন, আর আপনি তাজ্জব বনে গেলেন!"
"আপনি যেভাবে বুঝিয়ে বললেন, তাতে তো জিনিসটা খুব সহজ মনে হচ্ছে," হেসে বললাম আমি, "আপনার কথা শুনে এডগার অ্যালান পোর 'দ্যুপাঁ'-র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গল্পের বাইরে যে বাস্তবেও এমন মানুষ থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিল না।"
শেরলক হোমস উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পাইপটা ধরাল। "আমাকে দ্যুপাঁর সঙ্গে তুলনা করে আপনি হয়তো ভাবছেন প্রশংসা করছেন," সে মন্তব্য করল, "কিন্তু আমার মতে দ্যুপাঁ অত্যন্ত নিম্নমানের একটা চরিত্র ছিল। পনেরো মিনিট চুপ করে থাকার পর বন্ধুর মনের কথা ধরে ফেলে হঠাৎ মন্তব্য ছুড়ে দেওয়ার যে চালাকিটা সে দেখাত, সেটা অত্যন্ত লোকদেখানো ও সস্তা। তার কিছুটা বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা ছিল, এতে সন্দেহ নেই; কিন্তু পো তাকে যতটা মহান বানিয়েছিলেন, সে মোটেই তেমন বস্তু ছিল না।"
"আপনি কি গাবোরিওর বই পড়েছেন?" আমি শুধালাম, "লে কক কি আপনার গোয়েন্দার সংজ্ঞায় ফেলে?"
শেরলক হোমস বিদ্রূপের হাসি হাসল। "লে কক ছিল একটা আস্ত আনাড়ি!" ক্রুদ্ধ গলায় বলল সে, "তার একমাত্র গুণ ছিল তার উদ্যম। ওই বইটা পড়ে আমার গা গুলিয়ে উঠেছিল। আসল প্রশ্নটা ছিল একটা অচেনা কয়েদিকে শনাক্ত করা। ওটা আমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে করে দিতাম, অথচ লে কক সময় নিল প্রায় ছয় মাস! গোয়েন্দাদের কোনটা কোনটা এড়িয়ে চলা উচিত, তা শেখানোর জন্য বইটাকে পাঠ্যবই বানানো যেতে পারে।"
আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় দুটো কাল্পনিক চরিত্রকে এমন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়াতে আমি মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হলাম। উঠে গিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম, "লোকটা হয়তো ভীষণ চালাক, কিন্তু তার অহংকারও আকাশছোঁয়া!"
"আজকালকার দিনে না আছে কোনো আসল অপরাধ, না আছে কোনো বুদ্ধিমান অপরাধী!" ঘ্যানঘ্যান করে উঠল হোমস, "আমাদের এই পেশায় মগজ রেখে লাভটাই বা কী? আমি ভালো করেই জানি নিজের নামটা অমর করে রাখার মতো ক্ষমতা আমার ভেতরে আছে। অপরাধের গোয়েন্দাগিরিতে আমি যতটা পড়াশোনা আর সহজাত প্রতিভা ঢেলেছি, অতটা আগে কেউ করেনি, আর ভবিষ্যতেও কেউ করবে না। কিন্তু তার ফল কী দাঁড়াল? তদন্ত করার মতো কোনো অপরাধই নেই! আর যা আছে তা হল আনাড়িদের ছ্যাবলামি—যার পেছনের উদ্দেশ্য এতই পরিষ্কার যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ওই গোঁয়ার অফিসাররাও তা ধরে ফেলতে পারে!"
তার এমন দেমাগি কথাবার্তায় আমি তখনও চটে ছিলাম। কথা ঘোরানোই শ্রেয় মনে হল।
"ওই লোকটা কী খুঁজছে বলুন তো?" রাস্তার ওপারে ধীরে ধীরে হেঁটে আসা এক শক্তসমর্থ, সাদামাটা পোশাক পরা লোককে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। লোকটা উদ্বেগের সঙ্গে বাড়ির নম্বরগুলো দেখছিল। তার হাতে একটা বড় নীল রঙের খাম ছিল—বোঝাই যাচ্ছিল সে কোনো চিঠিপত্র বিলি করতে এসেছে।
"আপনি ওই নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্টের কথা বলছেন তো?" শেরলক হোমস আলতো করে বলল।
"একদম গুলপট্টি আর চাপাবাজি!" মনে মনে বললাম আমি, "লোকটা জানে আমি ওর এই অনুমান যাচাই করতে পারব না।"
ভাবনাটা আমার মাথার ভেতর দিয়ে যেতে না যেতেই, ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার নজর পড়ল আমাদের দরজার নম্বরের ওপর। সে তড়িঘড়ি রাস্তা পার হয়ে এপারে চলে এল। আমরা শুনতে পেলাম নিচে দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ, গম্ভীর গলার আওয়াজ, আর সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসা ভারী বুটের শব্দ।
"মি. শেরলক হোমসের জন্য," ঘরে ঢুকে আমার বন্ধুর হাতে চিঠিটা তুলে দিয়ে বলল লোকটা।
হোমসের অহংকারের বেলুনটা ফুটো করার এমন মোক্ষম সুযোগ আর হয় না! আন্দাজে তির ছোঁড়ার সময় সে নিশ্চয়ই ভাবেনি যে ধরা পড়ে যাবে। সবচেয়ে মিষ্টি সুর এনে জিজ্ঞেস করলাম, "ওহে বাছা, তোমার পেশাটা কী জানতে পারি?"
"মেসেঞ্জার হুজুর," গম্ভীর গলায় জবাব দিল সে, "ইউনিফর্মটা মেরামতের জন্য দর্জির দোকানে গেছে।"
"আর আগে কী ছিলে?" আমার সঙ্গীর দিকে এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা নজর রেখে শুধালাম।
"রয়্যাল মেরিন লাইট ইনফ্যান্ট্রির সার্জেন্ট, হুজুর! জবাবের দরকার নেই তো? ঠিক আছে, হুজুর।"
জুতোয় জুতোয় ঠুকে কদম মেলাল লোকটা, কপালে হাত ঠেকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে একমুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল!
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.