Skip to content
An adventure-themed illustration for হিমাচলের স্বপ্ন

ভোট-বিভ্রাট

1.3K 251 0

কলকাতা থেকে কিছু দূরে ছিল একটি শহর, তার নাম আমি বলব না। সেইখানে আজ মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার না চেয়ারম্যান কিংবা জেলাবোর্ডের প্রেসিডেন্ট বা অন্ত কিছু নির্বাচনের জন্যে মহা ধুমধাম পড়ে গিয়েছে। ধূমধামের কারণটা বলি।

শহরে বাস করতেন মুকুন্দপুরের জমিদারদের দুই তরফ—বড় এবং ছোট। বড় তরফের নাম আনন্দ চৌধুরী। জ্ঞানে, চরিত্রে ও সহৃদয়তায় তার মতন লোক ও-তল্লাটে আর কেউ ছিল না। লোকের উপকার করবার সুযোগ পেলে আনন্দবাবু নিজেকে ধন্য বলে মনে করতেন। আর লোকের উপকার করবার উদেশ্য নিয়েই তিনি দাঁড়িয়েছিলেন এই নির্বাচন ব্যাপারে।

ছোট তরফের সাধুচরণ চৌধুরী ছিলেন ঠিক উল্টো রকম মানুষ। ‘সাধু’ নামের এমন অপব্যবহার আর কখনো হয়নি। সাধু তামাক খেতে শিখেছিলেন গোঁফ গজাবার অনেক আগেই—অর্থাৎ এগারো উৎরে বারোতে পা দিয়েই। জীবনে তিনি কখনো একটিমাত্র আধলাও দান করেননি-—অথচ নানানরকম বদ-খেয়ালিতে উড়িয়ে দিয়েছেন কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা। শোনা যায় একবার এক বিড়ালের বিয়েতে তিনি নাকি পনেরো হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। নিষ্ঠুরতায়ও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর মা ছেলের অসৎ ব্যবহারের প্রতিবাদ করতেন বলে নিজের মাকেও তিনি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাড়ী থেকে। তার লেখাপড়ার কথা না বলাই ভালো— কোনরকমে তিনি নিজের নামটি সই করতে পারতেন মাত্র।

আনন্দ ছিলেন সাধুর খুড়তুতো ভাই। আনন্দকে সবাই শ্রদ্ধা করত বলে সাধুর মন জ্বলত দারুণ হিংসার আগুনে। আনন্দকে জব্দ ও লোকের চোখে খাটো করবার জন্যে সর্বদাই তিনি হরেক-রকম ফন্দি আঁটতেন। সেইজন্যেই নির্বাচন ব্যাপারে তিনি হয়েছেন আনন্দের প্রতিদ্বন্দ্বী। -

যেমন বিষ্ঠা-বুদ্ধি, সাধুর চেহারাও তেমনি। তাঁর ঘাড়ে-গর্দানে, বিশাল-ভুড়িওয়ালা বেঁটে-সেটে কালো কুচকুচ মুখখানি দেখলেই চোখ বুজে ফেলবার ইচ্ছা হয়। তাঁর কেশহীন মাথাটি কুমড়োর মতন তেল, ঠোঁট খান কাফ্রির মতন পুরু, নাক এত বেশী চ্যাপ্টা যে দেখলে মনে পড়ে ওরাং-ওটাংকে, এবং গর্তে-বসা চোখ দুটো হচ্ছে রীতিমত কুতকুতে।

তা বলে তোমরা কেউ যেন সাধুকে বোকা ঠাউরে বোসে না। তাঁর ঘটে এটুকু বুদ্ধি ছিল যাতে করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর পক্ষে বৈধ সৎ-উপায়ে আনন্দের বিরুদ্ধে ভোট সংগ্রহ করা অসম্ভব। লোকে আনন্দকে ভালোবাসে এবং তাকে ঘৃণা করে।

দেশের একদল ওঁচা লোক করত সাধুর মোসাহেবি৷ ভোটারদের কাছে গিয়ে তারা রটিয়ে বেড়াতে লাগল, যারা সাধুর পক্ষে ভোট দেবে তার প্রত্যেকেই ভোটের এক হপ্তা আগে থেকে রোজ এক টাকার মণ্ডা-মিঠাই-রসগোল্লা উপহার পাবে এবং ভোটের দিন সকালে সাধুর বাড়ীতে তাদের জন্যে হবে যে বিরাট ভোজের আয়োজন, তার মধ্যে থাকবে পুরো একশো রকম চর্ব্য-চোস্য-লেহ-পেয়।

আনন্দের কানেও এ-খবর উঠতে দেরি লাগল না। তিনি আরো শুনলেন, অধিকাংশ ভোটারই সাধুর পাঠানো দৈনিক মণ্ডা-মিঠাইরসগোল্লার সদ্ব্যবহার করছে এবং অনেকে আবার খাবারের বদলে নিচ্ছে একটি করে নগদ টাকা।

আনন্দ মনে মনে দুঃখিত হলেন মানুষের অকৃতজ্ঞতা দেখে, দেশের ভালোর জন্যে কতকাল ধরে তিনি কত কাজ করেছেন, আজি সামান্য জলখাবারের লোভেই লোকে তা ভুলে গেল! বুঝলেন, এযাত্রায় তার পরাজয় অনিবার্য।

ভোটের দিন দুপুরবেলায় সাধুর বাড়ীতে পড়ল শত শত পাত। একশো রকম খাবারকে হস্তগত করার জন্যে প্রত্যেক লোককে আসন থেকে হাত বাড়িয়ে রীতিমত হামাগুড়ি দিতে হল। খাওয়া-দাওয়ার পর প্রত্যেক ভোটারের ভুড়ি এত ভারি আর ডাগর হয়ে উঠল যে, সাধুর প্রশস্ত বৈঠকখানার ঢালা-বিছানার উপরে ঘণ্ট-দুই চিৎপাত হয়ে বিশ্রাম না করে কেউ আর খাড়া হয়ে দাড়াতে পারলে না।

ওদিকে আনন্দের বাড়ী দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন নীরবে কাঁদছে। সেখানে না আছে ভিড়, না আছে গোলমাল।

ভোটের পরিণাম সম্বন্ধে নিশ্চিন্তু হয়ে সাধু খুব জমকালো গরদের জামা-কাপড়-চাদর পরে মোসাহেবদের সঙ্গে পান চিবোতে চিবোতে মোটরে গিয়ে উঠলেন। মোটরখানা লতা-পাতা-ফুল দিয়ে সাজানে, তাঁর হাতেও জড়ানো বেলের গোড়ে এবং তিনি কপালে পরেছিলেন মা-কালীকে পূজে দিয়ে মস্ত একটি সিঁদুরের ফোঁটা।

যেখানে ভোট নেওয়া হচ্ছিল মোটর সেই মণ্ডপের দিকে চলল। সাধুর দলের কর্মীরা তাকে দেখে জয়নাদ করে উঠল।

ঠিক সেই সময় দেখা গেল মোটরে চড়ে আনন্দবাবুও ঘটনাক্ষেত্রের দিকে যাত্রা করেছেন। তিনি একলা। তাকে দেখে কেউ জয়ধ্বনিও করলে না।

একগাল হেসে নিজের মোটর থেকে সাধু চেঁচিয়ে বললেন, ‘আনন্দদাদা, খামোকা মন খারাপ করবার জন্যে কেন তুমি বাড়ী থেকে বেরিয়েছ বল দেখি? এবারে তোমার কোন আশাই নেই।’

আনন্দ বললেন, ‘জানি ভাই, জানি। ধরে নাও আমি বেরিয়েছি তোমাকেই অভিনন্দন দেবার জন্যে!’

আনন্দের গাড়ী এগিয়ে গেল। সাধুর এক মোসাহেব বললে, দেখছেন কর্তা। আনন্দবাবু ভাঙবেন তবু মচকাবেন না! আবার আপনাকে ঘুরিয়ে ঠাট্টা করে যাওয়া হল!’

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সাধু বললেন, ‘রোসে না, আগে ভোটাভুটির হাঙ্গামাটা চুকে যাক, তারপর-ওরে বাপ রে বাপ ও আবার কে রে?

মোসাহেবদেরও চক্ষু ছানাবড়া!

ব্যাপারটা হচ্ছে এই। ভোটের মণ্ডপের খানিক আগেই পথের পাশে ছিল একটা ছোটখাটো জঙ্গল। হিমালয়ের যাত্রী শ্রীমান ভাল্লু এই পথ দিয়ে যেতে যেতে রাস্তায় হৈ-চৈ আর অসম্ভব লোকের ভিড় দেখে ঐ জঙ্গলের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু একে বহুক্ষণ আহারাদির অভাবে তার পথশ্রান্ত দেহ এলিয়ে পড়েছে, তার উপরে তার সূক্ষ্ম ভলুকনাসা তাকে খবর দিলে যে, খুব কাছেই কোথায় হরেক-রকম খাবার-দাবার অপেক্ষা করছে ক্ষুধার্ত উদরের জন্যে ;—কাজেই ব্যাপারটা তদারক করবার জন্যে জঙ্গল ছেড়ে তাকে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হয়েছে।

পর-মুহূর্তে সাধুর মোটরখানা বোঁ-বোঁ করে একেবারে তার উপরে এসে পড়ল—তাকে চাপা দেয় আর কি!

কিন্তু হিমাচলের ভাল্লুক এত সহজে মোটর চাপা পড়বার জন্যে জন্মায়নি। এক লাফ মেরে সে মোটরের সামনের দিকে উঠে পড়ল —কিন্তু ইস্! এখানটা যে আগুনের মতন গরম! তড়াক করে আর এক লাফ—ভাল্লু হাজির হল মোটরের ছাদে। গাড়ীর ছাদে একটা স্বাধীন ও বন্য ভাল্লুক নিয়ে কোন অতি-সাহসী লোকও মোটর চালাতে পারে না। কাজেই ড্রাইভার মোটর থামিয়ে, দিলে চোঁ-জোঁ চম্পট! সাধুর তিন মোসাহেবও বিনা বাক্যব্যয়ে মোটরের দরজা খুলে হুড়মুড় করে রাস্তার উপরে ঝাপ খেলে এবং দেখতে দেখতে তারাও অদৃশ্য। সাধুর আর্তনাদ তারা আমলেও আনলে না। সাধুও এই বিপদজনক গাড়ীখানা ত্যাগ করবার জন্যে চটপট গাত্রোথন করেই সভয়ে চোখ পাকিয়ে দেখলেন, ছাদের উপর থেকে মুখ বাড়িয়ে ভাল্লু তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। অমনি তিনি ধপাস করে আবার বসে পড়ে কেঁদে উঠলেন, ‘ওগো, মাগোG”

তারপরেই হল একটা আরো ভয়ানক কাও। ভাল্লুর বিপুল ভার সইতে না পেরে সাধুর মাথার উপরে ছাদ ভেঙে পড়ল।

ভাল্লুও ভয়ে অ্যাঁৎকে উঠে দুই হাত—অর্থাৎ সামনের দুই পা বাড়িয়ে একটা কিছু ধরতে গিয়ে জড়িয়ে ধরলে সাধুচরণকেই এবং তারপর সেই অবস্থাতেই টলে গাড়ীর বাইরে গিয়ে পড়ল।

পায়ের তলায় শক্ত মাটি পেয়ে ভাল্লু নিজের আলিঙ্গন থেকে সাধুকে মুক্তি দিলে সাধু ভয়ে আর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ওঠবার সময় পেলেন না, নিজের গোলগাল বপুখানি নিয়ে পথের ধুলোর উপর দিয়ে ক্রমাগত গড়াতে আর গড়াতে সুরু করলেন, তারপর অদৃশ্য হলেন পথের পাশে পচা জলের খানায়।

ভাল্লু চমকে গিয়েছিল বটে, কিন্তু তার একটুও লাগেনি। তার নাসিকা তখন খাবারের সুগন্ধ পেয়ে আবার উৎসাহিত হয়ে উঠেছে।

ভোটমণ্ডপের একপ্রাস্তে সাধুচরণ নিজের পক্ষের ভোটারদের লোভ দেখাবার জন্যে বৈকাল জলযোগের যে বিপুল আয়োজন করেছিলেন, সুগন্ধ আসছিল এইখান থেকেই। ভল্লুর সুচতুর নাসিক পথনির্দেশ করলে, সে অগ্রসর হল দ্রুতপদে ভোটমণ্ডপ দৃষ্টিগোচর হবামাত্র সে একবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকের ভিড় দেখে। কিন্তু তীক্ষ্ণ নেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ্য করেও সে যখন কারুর হাতে সেই নতুন-রকম লাঠি দেখতে পেলে না, তখন আশ্বস্ত হয়ে এগিয়ে চলল দ্বিগুণ বেগে। ওদিকে একটা বিরাট ভাল্লুককে লাফাতে লাফাতে ছুটে আসতে দেখেই দিকে দিকে রব উঠল—‘মা রে, বাবা রে, পালা রে, খেলে রে এক মিনিটের মধ্যে ভোটমণ্ডপ জনশূন্য হয়ে গেল। তারপর সাধুর খাবারগুলো যে কার বিপুল উদর-গহবরে স্থানলাভ করলে, সেটা বোধহয় আর বলে দিতে হবে না।

সাধু ভাল্লুকের ভয়ে কিছুকাল আর বাড়ীর বাইরে পা বাড়াননি। ভোটের ফলাফল যখন বেরুল তখন তিনি জানলেন যে, ভোটাররা তাঁর খাবার খেয়ে পেট ভরিয়েছে বটে, কিন্তু ভোট দিয়েছে আনন্দ চৌধুরীকেই। সুতরাং এ-যাত্রা সাধুচরণের হল লাভে ব্যাং, অপচয়ে ঠ্যাং’।

0 Next
Continue to next part Up next অতি-বুদ্ধিমান সোনা-মোনা
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.