দিনের বেলায় যেখান দিয়ে যায় সেইখানেই নতুন নতুন গোলযোগের সৃষ্টি হয় দেখে ভাল্লু স্থির করেছে, এবার থেকে রাত না এলে সে আর পথের উপরে পদার্পণ করবে না।
অতএব যতক্ষণ দিনের আলো জ্বলত সে কোন ঝোপঝাপের ভিতরে গিয়ে আড্ডা গাড়ত। কখনো কুণ্ডলী পাকিয়ে পিছনের পা-দুটোর মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখত, কখনো চুপচাপ শুয়ে শুয়ে ভাবত তার সাধের হিমালয়ের কথা।
রাতের অন্ধকারে আরম্ভ হত তার যাত্রা ক্ষুধা পেলে ফলমূল সংগ্রহ করত, তেষ্টা পেলে পাওয়া যেত নদী বা পুকুরের জল। চিড়িয়াখানায় বন্দী অবস্থায় তার খাওয়া-দাওয়ার ভাবনা একটুও ছিল না বটে, কিন্তু কোন-কোনদিন পেট-ভরা খাবার না জুটলেও চিড়িয়াখানায় ফিরে যাবার কথা ভুলেও সে ভাবতে পারত না। স্বাধীনতা যে কত মিষ্টি, ভাল্প তা ভালো করেই অনুভব করতে পেরেছে।
একরাতে ভাল্লু হেলে-দুলে মনের মুখে পথ চলছে, হঠাৎ এল ঝমঝম করে জল। সে তখন একটা নিঃসাড় গ্রামের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। ভাল্লু অন্ধকারেও চোখ চালাতে পারত, চারিদিকে তাকিয়ে একটা মাথা গোজবার জায়গা খুজতে লাগল। তারপর একখানা বাড়ীর দেওয়ালের তলার দিকে একটা গর্ত দেখে সুড় সুড়, করে সে তার ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
ঢুকে দেখে, বাঃ দিব্যি একটি শুকনো খটখটে ঘর। সে ভাবতে লাগল, ‘মানুষেরা তাদের বাড়ীর চারিদিকের দেওয়ালেই বড় বড় গর্ত কাটে বটে, কিন্তু গর্তগুলো আবার লোহার ডাণ্ড বসিয়ে এমনভাবে আগলে রাখে যে মাথা গলাবার ফাঁকটুকুও পাওয়া যায় না। খামোকা এ-র কম গর্ত কেটে বোকামি করবার কারণ কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু এ-গর্তটা তো সে-রকম নয়। এতে লোহার ডাণ্ডা বসানো নেই, এর ভিতর দিয়ে মুণ্ডুর সঙ্গে সঙ্গে অনায়াসেই ধড়টাও গলিয়ে ফেলা গেল। নিশ্চয় এ হচ্ছে কোন বুদ্ধিমান মামুষের কীৰ্তি।
ভাল্লুর আন্দাজ মিথ্যা নয়। এ গর্তটা কেটেছে দুজন অতি বুদ্ধিমান মানুষ, তাদের নাম সোনা ও মোনা। এ অঞ্চলের চোরেদের সর্দার হচ্ছে সোনা আর মোনা, দেওয়ালে সিদ্ধ কেটে তার ঢুকেছে গৃহস্থের বাড়ীতে।
নিশুত রাত, তার উপরে বাদলার ঠাণ্ডা পেয়ে বাড়ীর লোকরা আরামে ঘুম দিচ্ছে, ঘরে ঘরে শোনা যাচ্ছে নাসা-যন্ত্রে নিদ্রাদেবীর পুজা-মন্ত্র। সোনা-মোনা নির্বিবাদে কাজ সারলে। সোনার হাতে টাকা ও গহনার বাক্স এবং মোনার হাতে একখানা কাপড়ে বাঁধা এককাঁড়ি রূপোর গেলাস-বাটি-থালা।
তার যে-ঘরে সিঁধ কেটেছিল সেই ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।
মোনা চুপিচুপি বললে, ‘দাদা, আজ মার দিয়া কেল্লা!’
সোনা বললে, ‘চুপ, আগে বাইরে যাই, তারপর কথা।’
পা টিপে টিপে তার ঘরের ভিতরে ঢুকল। অমনি ভাল্লু বললে, ‘ঘোঁৎ-ঘোঁৎ-ঘোঁৎ—অর্থাৎ, ‘তোমরা আবার কে বটে হে?
এখানে একটা বিষয় পরিস্কার করে বলা দরকার। তোমরা বোধহয় ভাবছ, ভাল্লুর এক ‘ঘোঁৎ-ঘোঁৎ শব্দের রকম-রকম মানে হয় কেন? তার কারণ হচ্ছে, বাঘ ভাল্লুক শৃগাল কুকুর বিড়াল প্রভৃতির, এবং পক্ষীদেরও শব্দ-ভাণ্ডারে আমাদের মতন বেশী শব্দ নেই। অধিকাংশ সময়েই তারা একই রকম শব্দ করে বটে, কিন্তু উচ্চারণের তারতম্য অনুসারে সেই একই রকম শব্দের অর্থ হয় ভিন্ন-ভিন্ন রকম। যেমন, কুকুর ডাকে ঘেউ-ঘেউ করে, কিন্তু শক্রকে দেখলে সে ঘেউঘেউ করে বলে—‘ভাগো হিয়াসে, নইলে কামড়ে দেব? আর মনিবকে দেখলেও ঐ এক ঘেউঘেউ রবেই জানায়—‘এস প্রভু আমি তোমার পা চেটে দি।’
অন্ধকারে ভাল্লুর সম্ভাষণ শুনেই সোনা-মোনা ভয়ানক চমকে গেল।
মোনা টর্চ জ্বেলেই ‘ই-হি-হি-হি-হি’বলে চীৎকার করে চিৎ পটাং! তারপর একে বারে অজ্ঞান। তার হাতের রূপার বাসন গুলো মেঝের উপরে ছড়িয়ে পড়ে ৰেজে উঠল ঝন-ঝন-ঝন।
সোনাও ভাল্লুর বিপুল মুখখান দেখতে পেলে। সে অজ্ঞান হয়ে গেল না বটে, কিন্তু সেইখানেই দাঁড়িয়ে ঠক্-ঠক করে কাঁপতে লাগল।
তোমরা ভাল্লুকের জ্বর দেখেছ? যখন-তখন ভাল্লুকদের দেহে একরকম কাঁপুনি আসে এবং খানিক পরেই আবার তা থেমে যায় ;– একেই বলে ভাল্লুকের জ্বর। সে সময় তাদের অবস্থ দেখলে মনে হয়, তারা ভারি কষ্ট পাচ্ছে।
সোনার কাঁপুনি দেখে ভাল্লুও ভাবলে, লোকটার দেখছি আমারই মতন জ্বর এসেছে। সহানুভূতি-মাখা স্বরে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে সে বলতে চাইলে, ‘ভয় নেই ভায়া, ও-রকম জ্বর বেশীক্ষণ থাকে না।’
কিন্তু তার কথা শুনে সোনার কাঁপুনি দ্বিগুণ বেড়ে উঠল। তাকে ভালো করে সান্তনা দেবার জন্যে ভাল্লু কয় পা এগিয়ে গেল।
অমনি ছুটে গেল সোনার আচ্ছন্ন ভাবটা। সে বিকট স্বরে ‘ওরে বাবা রে, গেছি রে’ বলে চেঁচিয়ে উঠে ঘরের বাইরে মারলে এক লাফ।
ইতিমধ্যে চীৎকারে ও বাসন ফেলে দেওয়ার শব্দে বাড়ীশুদ্ধ সবাই জেগে উঠেছে এবং চারিদিকে ছুটোছুটি করছে লোকজন— বাড়ীর উপরে-নীচে জ্বলে উঠেছে অনেকগুলো লণ্ঠন ৷
সোনা ভারি হুঁসিয়ার চোর। ভাল্লুকে দেখেও সে গহনার বাক্স ছাড়েনি। তার আবির্ভাবে ‘চোর, চোর' রব জাগল। এবং উঠোনে লোকের ভিড় দেখে সে তড় বড় করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে সিঁড়ির মুখে দোতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বাড়ীর কর্তা স্বয়ং। তিনি বামাল সমেত সোনাকে গ্রেপ্তার করলেন।
সোনা কর্তার দুই পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করে বললে, ‘হুজুর। আমাকে মারুন ধরুন, থানায় দিন–কিন্তু আর ভাল্লুক লেলিয়ে দেবেন না। চোর ধরার জন্য আপনার ভাল্লুক পুষেছেন জানলে আমরা কি আর এ-বাড়ীতে পা বাড়াতুম?
কর্তা মহা বিস্ময়ে বললেন, ‘ভাল্লুক’? আচম্বিতে উঠোনে আবার রব উঠল—“ভাল্লুক, ভাল্লুক! চোখের পলক পড়তেই সকলে যে যার ঘরে ঢুকে দরজায় খিল এঁটে দিলে।
লোকের জ্বলন্ত লণ্ঠনগুলো উঠোনেই ফেলে রেখে গেল! উঠানের উপরে দাঁড়িয়েছিল কেবল কর্তার ছোট ছেলে খোকাবাবু—বয়স দেড় বৎসর।
কর্তা স্তম্ভিত চোখে দেখলেন, একটা প্রকাণ্ড ভাল্লুক খোকার কাছে এসে দাঁড়াল। নিজের চোখকে তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না বটে, কিন্তু ভয়ে তার প্রাণ উড়ে গেল!
এদিকে খোকার কিন্তু ভয়-ডর কিচ্ছু নেই। সে কুকুর ভারি ভালোবাসত এবং ভাল্লুকে ঠাউরে নিলে বোধহয় বড়জাতের কোন কুকুর বলেই। সে রাঙা রাঙা ঠোটে ফিক-ফিক করে হেসে, নধর নধর হাত দুখানি নেড়ে ভাল্লুকে ডাকতে লাগল—‘আয়, আয়, আয়।’
ভাল্লু যখন পথে পথে নর্তক-জীবন ও চিড়িয়াখানায় বন্দী-জীবনযাপন করত, তখনি সে আবিষ্কার করেছিল একটি মস্তবড় সত্য। মানুষের খোকা-খুকিরা তাকে যত ভালোবাসে ও আদর করে, এত আর কেউ নয়। আজ পর্যন্ত সে যত খাবার বখ শিস পেয়েছে তার বেশীর ভাগই এসেছে খোকা-খুকিদের নরম নরম হাত থেকে। তাই সে খোকা-খুকি দেখলেই নিজের বিশেষ বন্ধু বলে মনে করত।
আজও সবাই যখন ভয় পেয়ে লম্বা দিলে, তখন এই নির্ভীক ছোট্ট খোকাটির সাদর আহবান শুনে ভাল্লুর মন বড় খুসি হয়ে উঠল। সে তখনি খোকার পায়ের তলায় চার পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে আনন্দে গদ-গদ হয়ে একবার এপাশে, আর একবার ওপাশে ফিরতে লাগল।
খোকাও তার পাশে বসে একবার ফিক্ করে হাসে এবং একবার কচি-কচি হাত বাড়িয়ে ভাল্লুর বড়বড় লোম গুছি করে ধরে টান মারে।
ওদিকে খোকার মা প্রথমটা ভয়ে পালিয়ে গেলেও ছেলেকে উদ্ধার করবার জন্যে আবার উঠোনের উপরে ছুটে এসে, ব্যাপার দেখে অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
ভাল্লু তখন তার পায়ের কাছেও গিয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। খোকার মা ভরসা পেয়ে বললেন, "কী ভালোমানুষ ভাল্লুক গো! সিঁড়ির উপরে কর্তাও তখন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। ভয় ও বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে তিনি বললেন, কিন্তু আমার বাড়ীতে ভল্লুক এল কোথা থেকে?
সিঁধেল সোনা তখন আসল ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। সে বললে, ‘হুজুর, ঐ ঘরে আমরা সিঁধ কেটেছি। সিঁধের গর্ত দিয়ে ঐ বনের ভাল্লুকটা নিশ্চয় বাড়ীর ভেতর ঢুকে পড়েছে।
ভাল্লুক কারুকে আক্রমণ করে না, উল্টো পোষা কুকুরের মতন খেলা করে দেখে বাড়ীর লোকেরা আবার উঠোনের আনাচ-কানাচ থেকে উকিঝুঁকি মারতে লাগল। খোকার মা ছেলেকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে ভয়ে ভয়ে ভাল্লুর গায়ে-একবার হাত বুলিয়ে নিলেন।
কর্তা সোনাকে চাকরদের হাতে সমর্পণ করে নীচে নেমে সিঁধের ঘরে ঢুকলেন। তখনো মোনার ভির্মি ভাঙেনি। সেও ধরা পড়ল। সিঁধের গর্তটা পরীক্ষা করে তিনি ঘরের বাইরে এসে সানন্দে বললেন, ‘আমার সর্বস্ব যেতে বসেছিল, ভাগ্যে ঐ কাদের পোষা ভাল্লুক এসে চোর ধরেছে, তাই আবার সব ফিরে পেলুম।
খোকা মায়ের কোল থেকে ভাল্লুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।
কর্তা বললেন, ‘এই ভাল্লুকটিকে আমি পুষব, ও আমার খোকার খেলার সাথী হবে।’
গাঁটছড়ার ‘টাগ-অব-ওয়ার’
বড়ই বিপদ যে-বাঁধন ছিঁড়ে পালাতে চাই আবার সেই বন্ধন?
ভাল্লুর মুখ শুকিয়ে গেল মনের অসুখে।
ভাল্লুকে পুষেছেন খোকার বাবা। তার কুকুর ছিল, এখন মরে গেছে, তারই শিকল দিয়ে ভাল্লুকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
যদিও ভাল্লুর আদর-যত্বের অভাব নেই, তার জন্যে আসে ভালো ভালো খাবার, খোকার মা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন, খোকন এসে তার সঙ্গে প্রায় সারাদিনই কথা কয়, খেলা করে, সে-পাড়ার যত ছোট ছোট ছেলেমেয়েও তার চারিপাশ ঘিরে খেলাধুলো করে, তবু ভাল্লু খুসি হতে পারে না। মুখখানি বিমর্ষ করে চুপ মেরে বসে থাকে। আর খেলাধুলো করবে কি, দু-পা এগুতে গেলেই শিকলে পড়ে টান। গলায় দড়ি দিয়ে কার খেলার সাধ হয় বল?
হপ্তাখানেক গেল। সন্ধ্যাবেলা আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। খোকা ঘুমোতে গিয়েছে। ভাল্লু একলা।
উঠোনের চারিধারে ঘর—কোনদিকেই চোখ ছোটাবার উপায় নেই। ভাল্লু যেদিকে তাকায় দৃষ্টি বাঁধা পেয়ে ফিরে আসে। এই হুঃখ ভাল্লুকে আরো কাতর করে তোলে।
কেবল উপর-দিকটা খোলা। মুখ তুললে দেখা যায় তারার চুমকি বসানো নীলাকাশের খানিকটা, আর একখানি বড় চাঁদ।
ভাল্লু দীর্ঘশ্বাস ফেললে কিনা জানি না, কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। চাঁদ দেখলে জীবজন্তুদের মনে কি-রকম ভাবের উদয় হয়, আমার পক্ষে তা বলা অসম্ভব। তবে একট। বিষয় লক্ষ্য করেছি। চাঁদনি রাতে পথের কুকুরগুলোর চীৎকার বড় বেড়ে ওঠে। কিন্তু কেন? কুকুররা চেঁচিয়ে চাঁদকে কী বলতে চায়?
ভাল্লু কী ভাবছিল? হয়ত সে ভাবছিল যে, হিমালয়ের দিকে গিয়েছে যে-পথ, এই চাঁদ তার উপরেও ফেলেছে রূপোলি আলো। পথের ধারে ধীরে হাওয়ার দোলায় তুলছে নীল বন, চন্দ্রকিরণ জ্বলছে তার পাতায় পাতায়। সেখানে চোখ ছোটে দিকে দিকে মুদুরে, নড়লে-চড়লে বাজে না শিকলের বেসুরো সঙ্গীত। সেখানে যত খুসি ছুটোছুটি কর, কোন পাচিল, কোন বন্ধ দরজা, কোন বঁাধন বাধা দেয় না। ভাবতে ভাবতে ভাল্লুর মনটা কাদো-কাদো হয়ে এল। তার ভাবট তখন বোধহয় এইরকম—
‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে,
কে বাঁচিতে চায়?’
ঐ তো সদর-দরজাটা এখনো খোলা রয়েছে! ঐ দরজার ওপারেই তো স্বাধীনতার পথ। একবার যদি শৃঙ্খল ছিঁড়তে পারি তাহলে আর আমাকে পায় কে? কুকুর-বাঁধা শিকল যে ভাল্লুকের পক্ষে নগণ্য, বাড়ীর কর্তা সেটা খেয়ালে আনেননি।
ভাল্লুর এক টানে ঝনাং করে ছিড়ে গেল শিকল। ভাল্লু মারলে দৌড়। যে-সে দৌড় নয়—যাকে বলে ভোঁ-দেড়ি।
গ্রাম পার হয়ে মাঠ, মাঠ পার হয়ে বন, বুন পার হয়ে একট। নদী।
ভাল্লু মনের মুখে খানিকক্ষণ নদীতে সাঁতার কাটতে লাগল। তার সাড়া পেয়ে একটা কুমির ভেসে উঠে তদারক করতে এল। ভাল্লু মুখ খিঁচিয়ে তাকে দিলে এক জোর ধমক ৷ শিকারটা সুবিধাজনক নয় বুঝে কুমির আবার ডুব মারলে। এবং ভাল্লুও বুঝলে, যেখানে জলে বেড়ায় প্রকাণ্ড টিকটিকি সে-ঠাঁই মোটেই নিরাপদ নয়। সে তাড়াতাড়ি নদীর ওপারে গিয়ে উঠল।
তারপরেই ভাল্লুর নাকে এল একটা মিষ্টি স্বগন্ধ—অর্থাৎ খাবারের গন্ধ।
এখানেই তার দুর্বলতা। তাকে অনায়াসেই পেটুকচুড়ামণি উপাধি দেওয়া যেতে পারে। নাকে খাবারের গন্ধ এলে সে আর স্থির থাকতে পারে না—তার ভরা পেটেও জেগে ওঠে নতুন ক্ষুধার তাড়ন।
শূন্যে নাক তুলে সে অগ্রসর হতে লাগল। একট। গ্রামে ঢুকল। গ্রামের এক বাড়ীতে আজ বিয়ের ঘটা সাজানো আলোর মালা। লোকজনের ছুটোছুটি ও হাক-ডাক। লুচি-তরকারির গন্ধ।
বাইরের উঠোনে বরযাত্রীর আসর জাঁকিয়ে বসে আছে। পানতামাক নিয়ে চাকররা আনাগোন করছে। বালকরা ফুলের মালা ও প্রীতি-উপহারের কবিতা বিতরণ করছে। একজন বড় ওস্তাদ তানপুর কাঁধে নিয়ে, কানে এক হাত চেপে মস্ত বড় হাঁ করে পিলেচমকানো তান ছাড়ছেন আর সমঝদাররা তারিফ করে বলছেন, বাহবা-কি-বাহবা! এবং একদল ফাজিল ছেলে মাঝে মাঝে আড়াল থেকে চ্যাঁচাচ্ছে—বাহবা-কি-ছা-ছ্যা!
ভাল্লু কোনদিনই মানুষকে ভয় করত না; কারণ বরাবরই সে দেখে আসছে মানুষরাই তাকে যমের মতন ভয় করে। সুতরাং সে অম্লান বদনে গদাই-লস্করি চালে আসরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
পর-মুহুর্তেই কী যে দক্ষযজ্ঞ ছত্রভঙ্গ কাণ্ড বাধল, সেটা তোমরা অনায়াসেই অনুমান করতে পারবে। বরযাত্রীরা পালাল পায়ের জুতো ফেলে, তানপুরাহীন ওস্তাদজী লম্ব দিলেন ওস্তাদি তান ভুলে, বরকর্তা পালাতে গিয়ে খেলেন ভীষণ আছাড় এবং সেই অবস্থাতেই তাঁর মনে পড়ল ভাল্লুকরা মরা মানুষ ছোয় না, সুতরাং দুই চোখ বুজে ফেলে আড়ষ্ট হয়ে এমন ভাব দেখালেন, যেন তিনি মরে কাঠ হয়ে গিয়েছেন—যদিও মস্ত ভুড়ির হাঁপরের মতন হাঁপানি তিনি বন্ধ করতে পারলেন না। আধ মিনিটের মধ্যেই আসর জনশূন্য ও শব্দহীন।
ভাল্লু দু-একগাছা ফুলের মালা শুকে বুঝলে, সেগুলো খাবার জিনিস নয়। একটা ভরতি চায়ের পেয়ালায় জিভ ডুবিয়ে চাখলে, তাও অখাদ্য বলে মনে হল। তার পরেই তাকে আহবান করলে ভিয়ান-ঘরের লুচি-তরকারির গন্ধ। সেই গন্ধের উৎপত্তি কোথায় জানবার জন্যে ভাল্লু আবার ক্রতপদে অগ্রসর হল।
অন্দর-মহলের উঠোন। দালানে ঠিক যেন একটি লাল চেলির পুঁটলির পাশে টোপর মাথায় বর-বাবাজী ঘাড় হেঁট করে বসে আছে, পুরোহিত করছে মন্ত্র উচ্চারণ এবং তাদের ঘিরে গয়না ও রংচঙে কাপড়-পরা মেয়েদের ভিড়।
কনের মা বিন্দি-দাসীকে ডেকে বললেন, "ওরে, সদরে গিয়ে দেখে আর তো, ওখানে অত হৈ-চৈ কিসের?
বিন্দি সদরের দিকে গেল এবং তারপরেই মাটিতে আঁচল লোটাতে লোটাতে দুই চোখ কপালে তুলে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ফিরে এন্স এবং দুম-দাম্ শব্দে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
কনের মা সবিস্ময়ে বললেন, ‘ওরে বিন্দি, কী হল রে, হঠাৎ তুই ক্ষেপে গেলি নাকি?’
বিন্দির জবাব পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু ভাল্লুর দেখা পাওয়া গেল।
পুরুত-ঠাকুর বুড়ো-থুত্থুড়ো হলেও অতি চটপটে, তিড়িং করে লাফ মেরে তখনি চম্পট দিলেন। বর রীতিমত হতভম্ব। তার পাশের পুঁটলিটা আশ্চর্যরকম জ্যান্ত হয়ে উঠল।
বর-কনের পিছনকার দেওয়ালের গায়ে ছিল একটা মস্ত কুলুঙ্গি। কনের বুঝতে দেরি লাগল না যে, এখন লজ্জা করবার সময় নয়। সে টপ করে গাত্রোথন করলে এবং ভ্যাবাচ্যাক খাওয়া বরের দুই কঁধে দুই পা দিয়ে উঠে উঁচু কুলুঙ্গিটার ভিতরে ঢুকে বসল। অন্যান্য মেয়েরা যখন কলরব তুলে উধাও হল, বরও তখন বুঝতে পারলে ‘যঃ পলায়তি স জীবতি।’
কিন্তু পালাতে গিয়ে পড়ল গাটছড়ায় টান। বর গাটছড়া ধরে টান মারতেই কুলুঙ্গির ভিতর থেকে কনেও গাঁটছড়ার অন্য প্রান্ত ধরে প্রাণপণে টেনে রইল। বরও ছাড়বে না, কনেও ছাড়বে না—সে এক অপূর্ব ‘টাগ-অব-ওয়ার’।
ভাল্লুর ভাব দেখলে বোধ হয়, এখানে উল্লেখযোগ্য কিছুই যেন হয়নি। খাবারের গন্ধ তাকে ডাক দিয়েছে, কোনদিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করবার সময় তার নেই। ভিয়েন-ঘর খুজে বার করতে বিলম্ব হল না।
সেখানেও হল আর-এক দফা হাঁউ-মাউ, হুটোহুটি, ছুটোছুটি, লুটোপুটির পালা। তারপর সব ঠাণ্ডা।
ভাল্লু তখন মনের সাধে বেছে বেছে খাবার খেতে বসল।
খেতে খেতে যখন শ্রান্ত হয়ে পড়েছে, তখন বাড়ীর ভিতরে কোথায় উপরি-উপরি দুইবার গুড়ুম্ গুড়ুম করে বেজায় আওয়াজ হল।
ভাল্লু চমকে উঠল। ওরে বাবা, এখানেও নতুন রকম লাঠির গোলমাল? মানুষগুলো কি পাজি, খেয়ে-দেয়ে যে একটু জিরিয়ে নেৰ তারও জো নেই।
ভাল্লু হস্তদন্তের মত সেখান থেকে সরে পড়ল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.