বটগাছের ঝিলমিলে পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদ হাসিমুখে উঁকি মেরে দেখলে, ভাল্লু মনের সাধে কুড়িয়ে খাচ্ছে মাটির উপর ঝরে-পড়া বটের ফল।
তারপর চাঁদ নিলে ছুটি। সমস্ত পৃথিবী পড়ল অন্ধকারের ঢাকনা চাপ,—শুন্যে জেগে রইল খালি তারা-ছড়ানো আকাশের মায়াময় আবস্থায়।
ভাল্লুর ঘুম পেলে। নরম বিছানার খোজে সে একটা ঝোপের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। সেখানে তার আগেই ঢুকে ঘুমোচ্ছিল একটা মস্ত গোখরো সাপ, ভাল্লুর সাড়া পেয়ে সে কালে বিদ্যুতের মত মাথা তুলে বলে উঠল, ফোস, ফোঁস্! রোস তো, রোস তো,—দেখবি মজা—রোস তো, রোস তো! ফোঁস সাপ মারলে ছোবল, কিন্তু তার আগেই চটপটে ভাল্লু চালালে থাবা, গোখরোর বিষ-দাঁত শুদ্ধ মুণ্ডু গেল কোথায় উড়ে। ভাল্লু একটু তফাতে গিয়ে থেবড়ি খেয়ে বসে দেখতে লাগল, গোখরোর মুণ্ডহীন লটপটে ধড়টা ক্রমাগত পাকসাট মারছে আর পাক খাচ্ছে। ভাল্লু অবাক হয়ে ভাবলে, এ কি রকম জানোয়ার রে বাবা। মাথা না থাকলেও মরবার নাম করে না! আবার তেড়ে কামড়াতে আসবে নাকি? দরকার নেই এখানে ঘুমিয়ে, অন্য ঝোপে যাওয়া যাক।
পুব-আকাশে রামধনু-রঙের খেলা দেখে পাখিরা খুসি হয়ে ঘুমভাঙানিয়া তান সাধতে লাগল, কিন্তু ভাল্লুর ঘুম তবু ভাঙল না। গেল রাতে তার কম খাটুনি হয়নি তো, স্বপ্নলোক থেকে সে সহজে ফিরে আসতে রাজি হল না।
বেলা বাড়ছে, চাষার মাঠে মাঠে লাঙল চষছে, ক্ষেতের আশপাশ দিয়ে হাটের লোক আনাগোনা করছে।
হঠাৎ কোত্থেকে বাজল কার ডুগডুগির ডিমি-ডিমি ভাল্লু চমকে জেগে উঠল। কান খাড়া করে শুনলে ডুগডুগির বাজনা। ভাবলে, কে বাজায় এখানে এ বাজনা?
ডুগডুগির সঙ্গে সঙ্গে শোনা যাচ্ছে মানুষদের উল্লাস-ধ্বনি ও হাততালির শব্দ। এই উল্লাস-ধ্বনি ও ডুগডুগির ভাষা যে ভাল্লুর কাছে অত্যন্ত পরিচিত। পথে পথে ডুগডুগির তালে তালে কত নাচের আসর সে যে মাত করে দিয়েছে, তা কি ভোলবার কথা? ভাল্লুর মনটা আনচান করতে লাগল। কথায় বলে, ‘চড়কে-পিঠ ঢাকে কাটি পড়লেই সড়-সড় করে ওঠে, ভাল্লুর অবস্থাও হল তাই। নিজেকে সে একজন উঁচু-দরের নৃত্যশিল্পী বলে জানে, সুতরাং ডুগডুগির ছন্দ শুনে আর স্থির থাকতে পারলে না। ধড়মড় করে উঠে বসে ঝোপের ফাঁক দিয়ে সাবধানে একটুখানি মুখ বাড়ালে।
খানিক তফাতেই নদীর ধার দিয়ে নদীরই মতন এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে হাটের পথের রেখা। পথের পাশে প্রকাণ্ড একটা অশত্থগাছ এবং তারই ছায়ার নীচে জমেছে লোকের ভিড়। সেইখানে ডুগডুগি বাজিয়ে একটা লোক দেখাচ্ছে ভাল্লুক-নাচ। যে ভাল্লুকটা নাচছে সে ভাল্লুর মতন জোয়ান মস্ত-বড় নয় বটে, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায়, তারা দুজনেই হচ্ছে একই জাতের জীব।
চাঙ্গা হয়ে উঠল ভাল্লুর শিল্পী-প্রাণ। সে মাথা তুলে, মাথা নামিয়ে, এপাশে-ওপাশে মাথা কাত করে—নানানভাবে দস্তুরমত সমালোচকের দৃষ্টিতে নতুন ভাল্লুকটার নাচ খানিকক্ষণ ধরে দেখে বেশ বুঝে ফেললে, এ এখনো নৃত্যকলার ছাত্র মাত্র—তার মতন উচ্চশ্রেণীতে উঠতে, এর এখনো অনেক দিন লাগবে।
ভাল্লু মনে মনে ভাবলে, বোকা মানুষগুলো এই বাজে নাচ দেখেই এত হাততালি আর বাহবা দিচ্ছে, সেরা আর্ট কাকে বলে নিশ্চয় এরা তার খবর রাখে না! ঝোপ থেকে বেরিয়ে একবার দেখিয়ে দেব নাকি আমার পায়ের কায়দা?...ধেই-ধেই করে নাচবার জন্যে তার দুই পা যেন নিসপিস করতে লাগল।
নাচ দেখতে দেখতে ভাল্লু হঠাৎ আর-একটা আবিষ্কার করে ফেললে। যে নাচছে, সে তার মতন পুরুষ নয়—সে হচ্ছে ভলুকী।
সঙ্গে সঙ্গে ভাল্লুর মত গেল বদলে। মনে মনে সে বললে, ‘আহা মরি মরি, ভলুকীর কী সুন্দর দেহের গড়নটি। মাঝে মাঝে নাচের তাল কেটে যাচ্ছে বটে—তা একটু-আধটু তাল অমন কেটেই থাকে, কিন্তু কী চমৎকার ওর নাচের ধরনটি। ওগো ভাল্লুক-মেয়ে, তুমি হিমালয়ের কোন বনের ঋক্ষরাজকুমারী? কোন পামর মানুষ তোমাকে বাপ-মায়ের আদর-ভরা কোল থেকে ছিনিয়ে এনে এমন পথের ধুলোয় নামিয়েছে? হায় হায়, কত কষ্টই পাচ্ছ না জানি!
হঠাৎ বোধহয় নাচের তাল বেশিরকমই কেটে গেল, ভাল্লুকওয়াল লাঠি তুলে ভল্লুকীর উপরে ঠকাস করে এক ঘাঁ বসিয়ে দিলে। ভল্লুকী কেঁদে উঠল, তার কান্নার আওয়াজ শাখের ডাকের মত।
ভাল্লুক-মেয়ের গায়ে হাত তোলা? এ নিদারুণ দৃশ্য ভাল্লু সহ্য করতে পারলে না, ভয়ঙ্কর এক গর্জন করে সে একেবারে ঝোঁপের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ল। যারা একমনে নাচ দেখবার আমোদে মেতেছিল, সেই ভয়ঙ্কর গর্জন শুনে বেজায় চমকে তারা ফিরে দেখে, ঝোপ ভেদ করে ছুটন্ত বিভীষিকার মত আবির্ভূত হয়ে একটা সুবৃহৎ ভাল্লুক বেগে তেড়ে আসছে তাদের দিকেই। গ্রামের প্রান্তে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন অসম্ভব ব্যাপার কল্পনাতীত বলে প্রথমটা নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে না পেরে দু-এক মুহূর্ত সকলে দাঁড়িয়ে রইল হতভম্বের মত ; এবং তারপরেই হাউ-মাউ করে চেঁচিয়ে যে যেদিকে পারলে টেনে লম্ব দিলে।
ভাল্লুকওয়ালাদের ব্যবসা ভাল্লুক নিয়ে, কাজেই প্রথমটা সে ভয় পেয়ে সেখান থেকে নড়তে রাজি হল না।
কিন্তু ভাল্লু যখন কাছে এসে মানুষের মতন দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে, সামনের দুই পায়ের নখ বার করা ধাবা বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করতে উদ্যত হল তখন ভলুকীর বাঁধন-দড়ি ছেড়ে বিকট চীৎকার করে সেও দিলে চোঁ-চোঁ চম্পট।
ভাল্লু খানিক দূর পর্যন্ত ভাল্লুকওয়ালার পিছনে পিছনে তাড়া করে গেল। তারপর ফিরে আবার গদাইলস্করি চালে ভলুকীর দিকে আসতে লাগল।
ইতিমধ্যে ভল্লুকী মাটিতে চার থাবা পেতে বসে চোখের কোণ দিয়ে তাকিয়ে ভাল্লুকে ভালো করে দেখে নিয়েছে এবং বলতে কি— তাকে তার পছন্দও হয়েছে।
ভাল্লু কাছে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে আবার কিছুক্ষণ ধরে ভল্লুকীকে মুগ্ধ চোখে নিরীক্ষণ করলে। তারপর এগিয়ে ভল্লুকীর ঠাণ্ডা নাকে নিজের ঠাণ্ডা নাক ঘসে মধুর স্বরে বললে, ‘ঘোঁৎ ঘোঁৎ?
ভল্লুকীও লজ্জিত চোখ নামিয়ে মেয়েলি মিহি গলায় বললে, ‘ঘোৎ-ঘোঁৎ!’
তারপর তাদের দুজনের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হল, আমার বিশ্বাস তা হচ্ছে এইরকম:
ভাল্লু বললে, ‘ওগো রাজকন্যে, তোমার নাম কী, তোমার বাসা কোন বনে?
ভল্লুকী মাছি তাড়াবার জন্যে গা-ঝাড়া দিয়ে বললে, ‘জানি না। জ্ঞান হবার আগেই উমুনমুখো মানুষরা আমাকে ধরে এনেছে।’
—‘মানুষরা তোমার কোন নাম রাখেনি?
—‘ওমা, তা আবার রাখেনি! মানুষরা আমাকে কালুয়া বলে ডাকে?
—‘কলুয়া! আ মরি মরি, কী মিষ্টি নাম!’ ভাল্লু দুই চোখ মুদে একেবারে অভিভূত হয়ে গেল।
ভল্লুকী খুসি হয়ে সুধোলে, ‘বীরবর, তোমার নামটি তো শোনা হল না।’
ভাল্লু ভরাট গলায় বললে, “আমার নাম ভাল্লু? —
‘ভাল্লু? হু, যোদ্ধার মতন নামই বটে..ঘ্যাঁক, ঘ্যাঁক —ঘ্যাঁক?
—‘ওকি?’
—‘একঝাঁক মাছি গো। তিনটেকে খেয়ে ফেলেছি। বাকিগুলো ভারি জ্বালাচ্ছে।’
ভল্লুকীর মন রাখবার জন্যে ভাল্লু তখন মক্ষিকাদের সঙ্গে তুমুল সংগ্রামে প্রবৃত্ত হল। খামিকক্ষণ চেষ্টার পর বললে, ‘নাঃ, অসম্ভব! কাল আমি বনের বাঘের সঙ্গেও যুদ্ধে জিতেছি কিন্তু পাজির পা-ঝাড়া এই উড়ন্ত শত্রুগুলো ধরাই দেয় না, যুদ্ধ করব কী? এক বেটা আবার আমার কানে ঢুকে “বোঁ বোঁ” বলে গান গাইছে। রাজকন্যে, এখান থেকে সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
দুজনে হন-হন করে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে ভলুকী বললে, ‘ক্ষিধের চোটে আমার নাড়ী চোঁ-চোঁ করছে।’
ভাল্লু বললে, ‘বটফল খেতে চাও তো ঐ বটতলায় চল। বটফল খেতে খেতে ভলুকী বললে, ‘হ্যাঁ গো, তুমি অমন ছট্ফট, করছ কেন?"
—‘বললুম তো কানে ঢুকেছে মাছি।’
—‘কই, দেখি?’
ভাল্লু শুয়ে পড়ে মুখ কাত করে রইল। ভল্লুকী তার কানের কাছে নিজের নাক নিয়ে গিয়ে হুসহাস করে ছাড়তে লাগল প্রচণ্ড নিশ্বাস। মাছিটা টুপ করে বেরিয়েই ভলুকীর বদন-বিবরে ঢুকে পড়ল।
ভাল্লু কৃতজ্ঞ স্বরে বললে, ‘কালুয়া সুন্দরী, তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছ?’
ভল্লুকী আনন্দে গদগদ হয়ে হেলে-তুলে বললে, ‘রাজি।’
ব্যস, তাদের বিয়ে হয়ে গেল। মানুষের বিয়ের মতন জানোয়ারদের বিবাহ ব্যাপারে লক্ষ কথা, পুরুত, মন্ত্র, বরপণ ও আরো হাজার ঝঞ্জাটের দরকার হয় না-এ একটা মস্ত সুবিধা।
ঠিক এমনি সময়ে দূরে উঠল একটা গোলমাল। নতুন বর-বউ চমকে ফিরে দেখে, শত শত লোক আকাশ ফাটানো চীৎকার করতে করতে মাঠ দিয়ে ঝড়ের মতন ছুটে আসছে এবং সকলের আগে আগে আসছে সেই ভাল্লুকওয়ালা।
ভল্লুকী ভাল্লুর পেটের তলায় মুখ গুজে সভয়ে বললে, ‘ওমা, কী হবে গো"
ভাল্লু পিছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে সদম্ভে বললে, 'কুছ পরোয় নেহি। মাছির মতন কানের মধ্যে ঢুকে ওরা বোঁ-ও-ও বলে গান গাইতেও পারে না। যুদ্ধং দেহি, যুদ্ধং দেহি।’
ভল্লুকী সাহস পেয়ে বললে, ‘বীরবর তুমিই ধন্য? গুড়ুম গুড়ুম করে বন্দুকের শব্দ হল। ভাল্লু বিনা বাক্যব্যয়ে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে চাৱ পায়ে দৌড়তে আরম্ভ করলে।
ভল্লুকী বললে, “তুমি কি ওদের আক্রমণ করতে যাচ্ছ?”
—‘পাগল, আমি পালাচ্ছি।”
—“সে কী গো, আমাকে ফেলে?”
—“উপায় কী গিন্নি, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আমি নতুন রকম লাঠির শব্দ শুনেছি, আর কি এখানে থাকি?”
নদীর ধারে গিয়ে ভাল্লু ফিরে দেখলে, ভলুকী তার সঙ্গ ছাড়েনি। খুসি হয়ে বললে, “এই যে, তুমিও এসেছ, ভালোই হয়েছে। এখন জলে ঝাপ দাও তো দেখি! কিন্তু সাবধান, ধুমসে টিকটিকিকে কাছে ঘেঁষতে দিও না?”
—“ধুম্সে টিকটিকি আবার কে?”
জলে ঝাঁপ খেয়ে ভাল্লু বললে, ঐ দেখ?
কিন্তু কুমির-ভায়া হাঁদা-গঙ্গারাম নয়। একসঙ্গে ডবল ভাল্লুক দেখে সে ডুব মেরে অন্যদিকে চলে গেল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.