জ্বালালে রে, ভারি জ্বলালে! যেখানে যাব, সেখানেই ঐ নতুন রকম লাঠি গুড়ুম-গুড়ুম করে আক্কেল গুড়ুম করে দেবে?
ভাল্লু পাই-পাই করে ছুটতে লাগল। অত বড় আর ভারি দেহ নিয়ে কী করে যে সে অত তাড়াতাড়ি দৌড়তে পারে, ভাবলেও অবাক হতে হয়।
আবার গ্রামের পর গ্রাম, বনের পর বন, মাঠের পর মাঠ, নদীর পর নদী। মাথার উপরে সোনার চাঁদ খালি হাসে আর হাসে, পরীদের উড়ন্ত ফানুসের মতন জোনাকীরা টিপ টপ করে জ্বলতে জুলতে উড়ে যায়, মাঝে মাঝে ‘কা-হুয়া, কা-হুয়া’ বলে চেঁচিয়ে শেয়ালরা খবরদারি করতে আসে।
স্বাধীনভাবে পথ চলার আনন্দে ভাল্লুর মন যখন রীতিমত মেতে উঠেছে, বনের ঝোপ নেড়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল হামদোমুখে বাঘা।
ভাল্লু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাঘা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগল। ভাল্লুও আড়চোখে তাকে দেখে নিয়ে বুঝে ফেললে, এ জীবটিকে বৈষ্ণব বলে সন্দেহ হয় না।
বাঘা দু-পা এগিয়ে এল। ভাল্লু বললে, ‘ঘোৎ? ( ‘কে তুমি? )
বাঘা মাটিতে ল্যাজ আছড়ে বললে, “গরর গরর গরর।’ (‘আমি বাঘা। তোমার ঘাড় মটকাতে চাই।)
মাটিতে আছড়াবার মতন ল্যাজ ভাল্লুর ছিল না। তবু বাঘাকে ভড়কে দেবার জন্যে একটা কিছু করা উচিত বুঝে সে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে সামনের দুই থাবা মেড়ে নেড়ে বললে, ‘ঘোঁৎ-ঘোঁৎ-ঘোঁৎ-ঘোঁৎ ' ('মট করে মটকাবার মতন ঘাড় আমার নয়। তফাতে সরে যা হতভাগা?)
বাঘা মনে মনে তারিফ করে বললে,—এই কুকুরমুখে ধিঙ্গিটা আমার ওপরে বেশ এক হাত নিলে দেখছি। আমি ল্যাজটা আছড়াতে পারি বটে, কিন্তু আমার পক্ষে এমন মানুষের মতন পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব –প্রকাশ্যে বললে, ‘হালুম্ হুলুম, হালুম হুলুম।'
ভাল্লু বললে, ‘ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক।’
বাঘা বললে, ‘রক্ত খাব।’
ভাল্লু বললে, ‘থাবড়ে বদন বিগড়ে দেব!’
—‘আও, আও!’
—‘নিকালো হিঁয়াসে?’
—’হোঁদল-কুতকুতে।'
—‘থ্যাবড়ানাকী চেরণদাতী!’
তারপর বাক্যযুদ্ধের পালা সাঙ্গ। ভাল্লুর ঘাড়ে পড়বার জন্যে বাঘা মারলে লাফ—ভাল্লু গেল চট করে একপাশে সরে। বাঘ মাটিতে পড়েই ফিরে ঘ্যাঁক করে ভাল্লুর পিছনে কামড়ে দিলে। ভাল্লুও ফিরে বাঘার মুখে মারলে ধা করে এক থাবড়া।
ভাল্লুর পিছনে ছিল পুরু লোম, বাঘার কামড়ে তার কিছুই হল না। কিন্তু ভাল্লুর থাবড়ায় বাঘার বাহারি মুখের যে দুর্দশা হল তা আর বলবার নয়।
তখন অরণ্য-রাজ্যের প্রজার চারিপাশে এসে জড়ো হয়েছে মজা দেখবার জন্যে। শিয়াল, বনবিড়াল, সঞ্জারু এবং গাছের ডালে লাঙ্গুল ঝুলিয়ে তিনটে হনুমান। এমন কি একটা ভীতু খরগোসও গর্তের ফাঁক দিয়ে একবার উঁকি না মেরে থাকতে পারলে না। মজা দেখতে এল না কেবল হরিণরা।
এর আগে বাঘা কোনদিন ভাল্লুক দেখেনি, কারণ ভাল্লুকরা এ বনে বসবাস করত না। আজ প্রথম ভাল্লুকের পরিচয় পেয়ে সে দস্তুর মত হতভম্ব হয়ে গেল।
ভাল্লু বললে, ‘ভায়, আর একহাত লড়াই করবে নাকি?
বাঘার গা যেন জ্বলে গেল। কিন্তু কোন জবাব না দিয়ে সে আবার ঝোপের ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
শেয়ালরা সুধোলে, “কা-হুয়া, কা-হুয়া?
“কুছ নেহি হুয়া” বলে ভাল্লু আবার চলতে সুরু করলে।
চাঁদের আলোয় ধবধব, করছে বনের পথ। পাপিয়ারা মেতেছে গানের জলসায়। নিঝুম রাতের কানে কানে বাতাস বাজাচ্ছে সবুজ পাতার বীণা৷ পথের শেষে ঘাস-বিছানায় শুয়ে একটি নদী কলতানের ছন্দে গাঁথছিল হীরার মালা।
ভাল্লুর তেষ্ট পেয়েছে। সে নদীর ধারে গিয়ে চুক-চুক করে জলপান করছে, এমন সময় এখানেও একটা কুমির তার সঙ্গে আলাপ করতে এল। কিন্তু ভাল্ল জলে নামলে না। সে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, আলিপুরের চিড়িয়াখানায়, মানুষদের ঘরের দেওয়ালে আমি তো অনেক টিকটিকি দেখেছি, কিন্তু জলের টিকটিকিগুলো এত বড় হয় কেন?
কুমিরটা প্রায় তীরের কাছে এসে বললে, ‘ভাল্লুক ভায়া, একবার জলে নামো না হে! তোমার সঙ্গে দুটো মনের কথা কই?
ভাল্লু বললে, 'না হে ধুমসে টিকটিকি, আমার সময় নেই।
—‘এত ব্যস্ত কেন? কোথা যাও?’
—‘ক্ষিধে পেয়েছে। বটতলায় চললুম বটফল কুড়িয়ে খেতে।’
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.