ভাল্লু যে বিদায় নিয়েছে, মিসেস দস্তিদার তা দেখতে পেলেন না, কারণ পাছে তার কিম্ভূতকিমাকার হেঁড়ে মুখখান আবার নজরে পড়ে যায়, সেই ভয়ে তিনি প্রাণপণে দুই চোখ মুদে ফেলে গাছের ডালে ঝুলতে ঝুলতে দুই পা ছুড়ছিলেন ক্রমাগত।
কিন্তু ভল্লুর পলায়ন আর কারুর নজর এড়ালো না। নমিতা সাঁতার কাটা বন্ধ করে ঘাটে এসে উঠল। শীলা মালীর ঘরের চাল থেকে চট্ করে নেমে পড়ল। নিভা, ইন্দু প্রভৃতি অন্যান্য মেয়েরাও কেউ গাছের গুড়ির আড়াল আর কেউ-বা ঝোপঝাপ থেকে বেরিয়ে এল। সবাই ডালে দোদুল্যমান মিসেস দস্তিদারের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতন দাঁড়িয়ে রইল।
শীলা বললে, ‘আর দোল খাবেন না দিদিমণি! চোখ খুলে দেখুন, সেই পথভোলা ভল্লুকট্ আর এখানে নেই।’
মিসেস্ দস্তিদার তখনো চোখ খুললেন না। তাঁর সন্দেহ হল, দুষ্ট, শীলা এখনো তাকে ভয় দেখাবার চেষ্টায় আছে।
ইতিমধ্যে লাঠি-সোটা নিয়ে পনেরো-ষোলো জন লোক ঘটনাস্থলে এসে হাজির হল। তারাও যখন অভয় দিলে, মিসেস দস্তিদার তখন অতি সন্তপর্ণে চোখ খুলে সেই অবস্থায় যতটা সম্ভব মাথা ঘুরিয়ে চারিদিক দেখে নিলেন।
শীলা বললে, ‘দিদিমণি, আপনি যে গভীর জঙ্গলে গিয়ে এমন চমৎকার গাছে চড়তে আর এমন মজার দোল খেতে শিখেছেন, আমরা কেউ তা জানতুম না। কী বলিস, না রে নমিতা?
কিন্তু নমিতা হচ্ছে মুখচোরা মেয়ে, মনে মনে হেসেও মুখে কিছু বলতে সাহস করলে না।
মিসেস দস্তিদার বেশ বুঝতে পারলেন, আজ যে অভাবনীয় কাণ্ডটা হয়ে গেল, এর পরে আর প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া সম্ভবপর নয়। তবু অনেক কষ্টে নিজের কঠিন গাম্ভীর্য কতকটা বজায় রাখার চেষ্টা করে তিনি বললেন, ‘আমার হাত ফুটে ছিড়ে যাচ্ছে। আর আমি বুলতে পারছি না। শীগগির আমাকে নামিয়ে নাও, নইলে আমি ধপাস করে পড়ে যাব।’
সকলে মহা সমস্যায় পড়ে গেল, কেমন করে মিসেস দস্তিদারকে গাছ থেকে আবার মাটির উপরে ফিরিয়ে আনা যায়? খানিকক্ষণ পরামর্শের পর দুজন লোক লম্ব দড়ি নিয়ে গাছের উপরে গিয়ে উঠল। আরো খানিকক্ষণ চেষ্টার পর তারা মিসেস দস্তিদারকে ছুই বাহুমূলে দড়ির বাধন লাগিয়ে তাকে আবার পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে পাঠিয়ে দিলে। আমরা খবর পেয়েছি, সেইদিনই বাগান থেকে ফিরে এসে মিসেস দস্তিদার তিনমাসের ছুটির জন্যে দরখাস্ত করেছিলেন। অন্ততঃ কিছুকালের জন্যে তিনি আর কারুর কাছে মুখ দেখাতে রাজি নন।
যারা লাঠি-সোটা নিয়ে এসেছিল ভাল্লুর খোঁজে, তারা বাগান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
এদিকে ভাল্লু-বেচারি একটু বিপদে পড়েছে। সে মনসা গাছ চিনত না। পাঁচিলের উপর থেকে সে যেখানে লাফিয়ে পড়েছিল সেখানে ছিল মস্ত-বড় একট। মনসার ঝোপ। সুতরাং তার অবস্থা বুঝতেই পারছ! যদিও বড় বড় ঘন লোম থাকার দরুন তার দেহের অনেক জায়গাই মনসা-কাটার খোঁচা থেকে বেঁচে গেল, তবু তার নাকের ডগায় এবং চার পায়ের তলায় বিধে গেল অনেকগুলো মনসা-কাঁটা।
ভাল্লু রক্তাক্ত নাকের ডগায় থাবা ঘষছে, জিভ দিয়ে পায়ের তলা চাটছে আর মনে মনে বলছে, ‘এ কি রকম গাছ রে বাবা একসঙ্গে এতগুলো কামড় মারে। হুঁ, এ গাছটাকে ভালো করে চিনে রাখা দরকার- ভবিষ্যতে যেখানে এমন সর্বনেশে গাছ থাকবে সেদিকে আর মাড়াব না!’
হঠাৎ গোলমাল শুনে ভাল্লু চমকে মুখ তুলে দেখে, বাগানের লাঠিধারী লোকগুলো আবার তার দিকে ছুটে আসছে।
ভাল্লু তখন মরছে কাঁটার জ্বালায়, তার উপরে আবার এই নুতন বিপদ দেখে তার মেজাজ গেল চটে। সে বুঝলে এরা তাকে ধরতে পারলেই ফের সেই চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেবে—হিমালয়ে যাবার পথ যেখানে লোহার দরজা দিয়ে বন্ধ। সে তখনি পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল এবং শুন্যে সামনের দুই থাবা নেড়ে নিজের ভাষায় আস্ফালন করে বললে, 'আয় না মানুষের বাচ্চারা,— বুকের পাট থাকে তো এগিয়ে আয়!’
কিন্তু তার চমকপ্রদ হুঙ্কার শুনে এবং রোমাঞ্চকর মুখভঙ্গি দেখে বুদ্ধিমান মানুষের বাচ্চারা আর অগ্রসর হল না। কয়েকজন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং কয়েকজন দৌড় মেরে আবার বাগানের ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
ভাল্লু বুঝলে এই কাপুরুষদের দেখে তার কোনরকম ভয় পাবার দরকার নেই। সে তখন আবার বসে পড়ে আড় চোখে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখেই নিজের আহত থাবাগুলো চাটতে লাগল। তার ছুটে পায়ের ভিতরে দুটো মনস-কাঁটা ঢুকে বসে গিয়েছিল।
এমন সময়ে অন্য কোন বাগান থেকে খবর পেয়ে একজন বন্দুকধারী লোক সেখানে ছুটে এল। কিন্তু তাকে দেখেও ভ'লুর ভাবাস্তর হল না, তার কারণ সে এখনো বন্দুককে চেনবার সুযোগ পায়নি। সে ভাবলে, ও-লোকটার হাতে যা রয়েছে তা একটা নতুন-রকম লাঠি ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিন্তু সেই নতুন-রকম লাঠিট যখন দপ করে জ্বলে উঠে বেয়াড়া এক গর্জন করলে ভাল্লুকে তখনি চার পা তুলে ভড়াক করে লাফ মেরে রীতিমত আর্তনাদ করতে হল।
ভাগ্যে বন্দুকটা ছিল পাখিমারা, তার ভিতরে বুলেটের বদলে ছিল ছররার কার্তুজ। কতকগুলো ছররা মাটির উপরে ছড়িয়ে পড়ে ধুলো ওড়ালে, কতকগুলো তার লোমের আবরণ ভেদ করতে পারলে না এবং একটা তার বাঁ-কানকে ফুটো করে দিল।
ভাল্লুর পক্ষে তাই যথেষ্ট হল। বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে সে বেগে পলায়ন করলে। পিছন থেকে আবার সেই নতুন-রকম লাঠির গর্জন শোনা গেল, তার কানের কাছ দিয়ে কতকগুলো কি সোঁ-সোঁ করে চলে গেল এবং সেও নিজের গতি আরো বাড়িয়ে দিলে।
ছুটতে ছুটতে সে ভাবতে লাগল, ‘বাপ রে বাপ, এ কোন আজব দেশে এসে পড়লুম? মানুষের মেয়ে এখানে গাছে উঠে ডাল ধরে দোল খায়, গাছ এখানে কামড় মারে, লাঠি এখানে বিদ্যুৎ জ্বেলে ধমকে ওঠে, আর কী যে ছুড়ে কান ফুটো করে দেয়, কিছুই বোঝা যায় না। হিমালয়ের পথে যে এত বাধা, সেটা তো জানা ছিল না, এখন মানে মানে দেশে গিয়ে পৌছতে পারলেই যে বাঁচি।
ভাল্লু দৌড়চ্ছে আর দৌড়চ্ছেই—-বিশেষ করে নতুন-রকম লাঠি দেখে তার পেটের পিলে চমকে গেছে দস্তুরমত। অনেক পথ, অনেক গ্রাম পার হয়ে গেল, তবুও সে থামতে রাজি নয়। যেখান দিয়ে সে যাচ্ছে সেখানেই উঠছে হৈ-হৈ রব। একজন সাইকেলের আরোহী বেশী ব্যস্ত হয়ে পালাতে গিয়ে মাটির উপরে মুখ থুবড়ে খেলে প্রচণ্ড আছাড়, একখানা গরুর গাড়ীর গরু দুটো মহা ভয়ে দৌড়তে লাগল রেসের ঘোড়ার মত, ছেলেরা কেঁদে কঁকিয়ে ওঠে, মেয়ের আঁৎকে মূর্ছা যায়, অথর্ব বৃদ্ধরাও দৌড়-বাজিতে হারিয়ে দেয় জোয়ান যুবকদের। এমন কি একটা এক-ঠেঙে খোড়াও অদ্ভুত তৎপরতা দেখিয়ে একটা খুব উচু বটগাছের মগ-ডালে না ওঠা পর্যন্ত থামল না।
ছুটতে ছুটতে ভাল্লুর দম বেরিয়ে যাবার মত হল। হঠাৎ সামনে একখানা বাড়ী দেখে সে স্থির করলে, তার ভিতরই আশ্রয় নেবে।
বাড়ীর ভিতরে ঢুকেই উঠোন। উঠোনের এক কোণের এক ঘরে বসে একটা উড়িয়া বামুন উনুনে কি তরকারি রাঁধছিল। আচমকা স্তম্ভিত চক্ষে সে দেখলে, ঘরের দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিপুলদেহ এক ভাল্লুক। পরমুহুর্তেই সে ‘হা জগড়নাথঅ’ বলে দাঁতকপাটি লেগে চিৎপাত হয়ে একেবারে অজ্ঞান!
খাবার দেখেই ভল্লুর পেটে ক্ষিধে আবার চোঁ-চোঁ করে উঠল। সে গুটি-গুটি এগিয়ে একখানা থালা থেকে কি-একটা তরকারি একগ্রাস তুলে নিলে –ওরে বাবা রে, কী ভয়ঙ্কর ঝাল রে। মনসার কাটা এবং বন্দুকের ছররাও যা পারেনি, তরকারির লঙ্কা করলে তার সেই দুর্দশা। সে ঘরের মেঝেয় পড়ে ছট্ফট্ করতে ও গড়াগড়ি দিতে লাগল।
হঠাৎ দুম করে একখানা প্রকাণ্ড থান-ইট এসে পড়ল তার পিঠের উপরে। ঘোঁৎ-ঘোঁৎ (অর্থাৎ কে রে) বলে চেঁচিয়ে ভাল্লু একলাফে দাঁড়িয়ে উঠল, কিন্তু কেউ কোথাও নেই, মেঝের উপরে কেবল উড়িয়া বামুনটার অচেতন দেহ ছাড়া।
আসল কথা হচ্ছে, বাড়ীরই একজন লোক জানলা দিয়ে ইটখানা ছুঁড়েই লম্ব দিয়েছে।
কিন্তু ভ'লু ভাবলে, এও একটা আজগুবি কাণ্ড। কেউ কোথাও নেই—ইট ছোড়ে ঘর! কে কবে এমন কথা শুনেছে? আরে ছোঃ, এমন জায়গায় কোন ভদ্র ভাল্লুকের থাকা উচিত নয়। ভারি বিরক্ত হয়ে ভাল্লু আবার পথে বেরিয়ে পড়ল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.