ফরেস্ট অফিসারের সাহসিনী গৃহিণী মিসেস দস্তিদার স্বামীর মনে সাহস সঞ্চার করবার জন্যে গভীর অরণ্যে গিয়ে বাস করেছিলেন এবং গণ্ডার, বরাহ, বাঘ ও ভাল্লুককে তিনি গ্রাহের মধ্যেও আনতেন না, এ তথ্য তাঁর নিজের মুখেই প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তাঁর মাথার উপরকার গাছের দিকে তাকিয়ে আমাদের ভাল্লুর দাঁত-বার-করা মুখখান দেখেই তিনি যে-ব্যবহারটা করলেন তা অত্যন্ত অদ্ভূত ও কল্পনাতীত।
মিসেস দস্তিদার প্রথমটা ভাবলেন, তিনি একটা অত্যন্ত অসম্ভব দুঃস্বপ্ন দর্শন করছেন। এটা সুন্দরবন বা হিমালয় বা সাঁওতাল পরগনার দুর্গম জঙ্গল নয়, এ হচ্ছে খাস কলকাতার কাছাকাছি সাজানো বাগান, এখানে স্বাধীন বাঘ-ভাল্লুকের আবির্ভাব হতে পারে না-কখনোই হতে পারে না!
এই বলে মিসেস দস্তিদার নিজের মনকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু তাঁর চেষ্টা সফল হল না। কারণ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঐ যে ভয়ঙ্কর মুখখান বেরিয়ে আছে, ওটা একটা রীতিমত জ্যান্ত ভাল্লুকের মুখ ছাড়া আর কী বস্তু হতে পারে? মিসেস দস্তিদারের লেকচার বন্ধ হয়ে গেল, সাতিশয় হতভম্ব হয়ে তিনি পায়ে পায়ে পিছু হটতে লাগলেন।
ভাল্লু কিন্তু তখন পর্যন্ত মিসেস দস্তিদারকে নিয়ে একটুও মাথা ঘামায়নি। কাল থেকে তার পেটে এক টুকরো খাবার বা একফোট জল পর্যন্ত পড়েনি, কাজেই নিষ্পলক চোখে সে কেবল চড়ি-ভাতির খাবারগুলোর দিকেই তাকিয়ে ছিল।
একটু পরেই ভাল্লু আর লোভ সামলাতে পারলে না, হঠাৎ তড়বড় করে গাছের উপর থেকে নেমে এল।
গাছের উপর থেকে যে একটা প্রকাণ্ড ভাল্লুক নেমে এল, এ-সম্বন্ধে মিসেস দস্তিদারের আর কোন সন্দেহ রইল না।
মিসেস দস্তিদারের মুখের পানে তাকিয়ে ভাল্লু বললে, ‘ঘোঁৎ ঘোঁৎ ঘোঁৎ!—অর্থাৎ কিছু খাবার দেবে গো?
কিন্তু মিসেস দস্তিদার ভাল্লুকের ভাষা শেখেননি, কাজেই কিছু বুঝতেও পারলেন না। তবে ভাল্লুর ঘোঁৎ শুনে সাধারণ ভীরু নারীর মতন তিনি যে তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলেন না, এইটুকুই তাঁর পক্ষে বিশেষ বাহাদুরির কথা। এমন কি তিনি উপস্থিতবুদ্ধিও হারিয়ে ফেললেন না। ভাল্লুর প্রথম ঘোঁৎ শুনেই তিনি চমকে একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিলেন। বাগানের বাংলো অনেক দূরে এবং কাছাকাছি একটা গাছ ছাড়া অন্য কোন আশ্রয়ও নেই। অতএব মিসেস্ দস্তিদার কালবিলম্ব না করে গাছের উপরেই চড়তে আরম্ভ করলেন।
নমিতা ছিল পুকুর-পাড়ে, সে ঝাঁপ খেয়ে ঝপাং করে জলে গিয়ে পড়ল।
শীলা দেখালে আশ্চর্য তৎপরতা। কাছেই ছিল মালীর কুঁড়েঘর। সে যে কেমন করে বেড়া পেয়ে মালীর ঘরের চালের উপরে গিয়ে উঠল, কেউ এটা দেখবার সময় পেলে না।
আর আর মেয়েরাও ‘ওগো-মাগো’ বলে চেঁচিয়ে যে যেদিকে পারলে সরে পড়ল। কেবল ইন্দু আর নিভা পালাতে পারলে না, সেইখানেই ভয়ে কাবু হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল।
ভাল্লু মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে প্রথমটা ভাবলে, আচ্ছ, এদের কাছে খাবার চাইলে পাওয়া যাবে কি? তারপরেই তার মনে পড়ল, সে যখন পথে পথে নাচ দেখিয়ে বেড়াত, দর্শকের। তখন খুসি হয়ে তাকে ফলমূল বখশিস দিত। হয়ত তার নাচের কায়দা দেখে এরাও তাকে কিছু খাবার উপহার দিতে পারে। এই ভেবে ভাল্লু তখনি পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং ধেই-ধেই করে ঘুরে-ফিরে নাচতে আরম্ভ করলে।
তার নৃত্য দেখেই ইন্দু আর নিভার স্তম্ভিত ভাবটা কেটে গেল— তারাও প্রাণপণে দৌড় মারলে।
ওদিকে মেয়েদের চীৎকার শুনে কয়েকজন উড়ে মালী ছুটে এসে দেখে, চড়ি-ভাতির খাবারগুলো নিয়ে একটা মস্তবড় ভল্লুক যার-পরনাই ব্যস্ত হয়ে আছে। তারাও অদৃশ্য হয়ে গেল এক মুহুর্তে।
ভাল্লু তখন মনে মনে ভাবছে, তার নাচে মোহিত হয়েই মেয়েরা এত ভালো ভালো খাবার ছেড়ে দিয়ে গেল।
মিনিট-চারেকের মধ্যেই পায়েস, সন্দেশ ও রসগোল্লার হাড়ি খালি করে ভাল্লু আস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। থাবা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে একবার উপরপানে তাকিয়ে দেখলে।
মালীর ঘরের চালের উপরে বসে শীলা চেঁচিয়ে মিসেস দস্তিদারকে ডেকে বললে, ‘দেখুন দিদিমণি, ভাল্লুকটা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে?’
মিসেস দস্তিদার আরো বেশী উঁচু একটা ডালে গিয়ে উঠে বসে ভারিকে চালে বললেন, ‘তাকিয়ে থাকুক-গে! আমি ওকে ভয় করি না।”
শীলা বলে, ‘দিদিমণি, ভাল্লুকটা বোধহয় আপনার সঙ্গে ভাব করতে চায়।”
মিসেস দস্তিদার আরো বেশী গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘শীল, তুমি কি আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছ?’
শীলা সকৌতুকে বললে, ‘না দিদিমণি, বলেন কী! আপনি যখন বনের গণ্ডার-বাঘ চরিয়ে এসেছেন, তখন এই সামান্য পোষা ভাল্লুকটা দেখে আপনি কি ভয় পেতে পারেন? কার সাধ্য এ কথা বলে।’
মিসেস দস্তিদার বললেন, ‘শীলা, আমি তোমার ঠাট্টার পাত্রী নই। কে তোমাকে বললে এ ভাল্লুকটা পোষা? ওর বড় বড় দাঁত আর নখ দেখেছ? ওর শয়তানি-মাখা চোখ দুটোও দেখ! এ হচ্ছে দস্তুরমত বন্য ভাল্লুক, পথ ভুলে এখানে এসে পড়েছে।
শীলা বললে, ‘ভাল্লুকটা শহরেই হোক আর বন্যই হোক ওকে দেখে আমার একটুও ভয় হচ্ছে না।’
চশমার ভিতর থেকে মিসেস দস্তিদারের গোল গোল চোখ আরো ড্যাব ডেবে হয়ে উঠল। বিস্মিত স্বরে তিনি বললেন, ‘ভয় হচ্ছে না মানে?’
শীলা বললে, ‘ভাল্লুকটার ভাব দেখে মনে হচ্ছে না যে ও এই খোলার চালটার উপরে উঠতে চাইবে। ওরা গাছে চড়তেই ভালোবাসে।’
মিসেস্ দস্তিদার বললেন, ‘শীলা, তোমার চেয়ে দুষ্ট, মেয়ে আমি দেখিনি। তুমি আবার আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছ।
শীলা খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, ‘ঐ দেখুন দিদিমণি, ভাল্লুকট আবার গাছের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে?’
সত্যই তাই। একপেট খাবার খেয়ে ভাল্লুর মনে খুব ফুর্তির উদয় হল। তার সাধ হল মিসেস দস্তিদারের সঙ্গে একটু খেলাধুলে করবে। সে আবার গাছের গুড়ি জড়িয়ে ধরে উপরপানে উঠতে আরম্ভ করলে।
ঘোড়ার উপরে লোকে যেমন করে বসে, মিসেস দস্তিদার সেইভাবে একটা ডালের উপরে বসে ধীরে ধীরে ডগার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে ভাল্লুব ভারি আমোদ হল। সে মিসেস দস্তিদারের ডালের কাছে গিয়ে বললে, ‘ঘোঁৎ।’
সড়াৎ করে মিসেস দস্তিদার আরো এক হাত সরে গিয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে হাজির হলেন।
ভাল্লুও জিভ দিয়ে নিজের নাক চাটতে চাটতে সেই ডাল ধরে এগুতে লাগল। আর কোন উপায় না দেখে মিসেস দস্তিদার ডাল ধরে ঝুলে পড়লেন। তিনি স্থির করলেন, যা থাকে কপালে— এইবারে তিনি মাটির দিকে লাফ মারবেন। ভাল্লুকের ফলার হওয়ার চেয়ে হাত-পা ভাঙা ভালো।
ঠিক সেই সময়ে ভাল্লু দেখতে পেলে, দূর থেকে একদল লোক লাঠি-সোট। নিয়ে হৈ হৈ করতে করতে ছুটে আসছে। সে বুঝলে, গতিক বড় ভালো নয়।
ভাল্লু তাড়াতাড়ি গাছের অন্যদিকে গিয়ে বাগানের পাঁচিলের উপরে লাফিয়ে পড়ল। তারপর সেখান থেকে একেবারে রাস্তার উপরে।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.