দিব্য ব্ল্যাক-আউটের রাত। আকাশে একফালি চাঁদ আছে বটে, কিন্তু নামে মাত্র। চারিদিকের গাছপালা ও ঘরবাড়ী প্রভৃতিকে দেখাচ্ছে কালো পটে আরো কালো কালি দিয়ে আঁকা ঝাপসা ছবির রেখার মত।
কনস্টেবল হনুমানপ্রসাদ পাঁড়ে রাস্তার ধারে একটি ভালো রোয়াক পেয়ে শুয়ে পড়ে মস্ত মস্ত মর্তমান কদলী কিংবা ছাতু মুন ও কাঁচালঙ্কার স্বপ্ন দেখছিল নির্বিঘ্নে।
হঠাৎ তার মুখের উপরে লাগল যেন একটা ঝড়ের ঝাপটা। স্বপ্ন হল অদৃশ্য, নাসাগর্জন হল বন্ধ এবং তার বদলে দেখা গেল অন্ধকারেরও চেয়ে অন্ধকার ও প্রকাণ্ড কি যেন একটা বিদঘুটে ব্যাপার। তারই মধ্যে জ্বলছে আবার দু-দুটো আগুনের গুলি।
এও স্বপ্ন নাকি? কিন্তু এ-রকম স্বপ্ন হনুমানপ্রসাদ পছন্দ করত না। সে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে চোখ পাকিয়ে দেখলে, একটা রীতিমত সচল অন্ধকার তার সামনে দাঁড়িয়ে হেলছে এবং দুলছে। আর সে অন্ধকারটা যেন কেমন একরকম বোটুকা গন্ধের এসেন্স মেখে এসেছে।
ব্যাপারটা তোমরা বুঝতে পেরেছ কি? চতুর্দিক নিঃসাড় ও নিরাপদ দেখে আমাদের ভাল্লু বৃক্ষের আশ্রয় ছেড়ে মৃত্তিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং হমুমানের নাসিকার হুঙ্কার শুনে সাগ্রহে ঘ্রাণ নিয়ে জানতে এসেছে, এ আবার কোন দুষ্ট জানোয়ার তাকে দেখে কি টিটকারি দিচ্ছে।
ম্লান আলোয় হনুমান সঠিক রহস্য উপলব্ধি করতে পারলে না বটে, কিন্তু আন্দাজে এটুকু বেশ বুঝতে পারলে যে, তার সামনে যে আবির্ভূত হয়েছে সে একটা মূর্তিমান বিভীষিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
হনুমান যখন ঠকঠক করে কাঁপতে আরম্ভ করলে তখন তাকে আশ্বাস দেবার জন্যে ভাল্লু একবার ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে উঠল।
পর-মুহূর্তে হনুমান পাঁড়ে রোয়াকের উপর থেকে এমন এক সুদীর্ঘ লম্ফ ত্যাগ করলে যে আসল হনুমানরা পর্যন্ত তা দেখলে দস্তুরমত অবাক হয়ে যেত। তারপরই এক-মাইলব্যাপী বিকট চীৎকার— বাপ রে বাপ, জান গিয়া রে জান গিয়া?
ভাল্লু, মাথা খাটিয়ে বুঝলে, এই চীৎকারের ফল ভালো হবে না।
এখনি এ মুল্লুকের যত মানুষ ঘটনাস্থলে তদারক করতে আসবে এবং তারপর আবার গলায় পড়বে দড়ি। ভাল্লু তার চারখানা পা যতটা পারে তাড়াতাড়ি চালিয়ে একদিকে ছুটতে সুরু করলে।
দৌড়, দৌড়, দৌড়। উত্তরদিকে দৌড়তে দৌড়তে হনুমান পাঁড়ে বারংবার পিছনপানে তাকিয়ে দেখছে সেই অগ্নিচক্ষু অন্ধকারটা তাকে গ্রাস করবার জন্যে এখনো পিছনে পিছনে আসছে কি না এবং দক্ষিণ দিকে দৌড়তে দৌড়তে ভাল্লু বারংবার পিছনপানে তাকিয়ে দেখছে, তার হিমালয়ের স্বপ্নে বাদ সাধবার জন্যে মানুষেরা দড়ি নিয়ে বোঁ-বোঁ করে ছুটে আসছে কি না। তাদের দু-জনেরই দৌড় দেখে বোঝা শক্ত, কে বেশি ভয় পেয়েছে।
পাহারাওয়ালা কত দূরে গিয়ে দৌড় থামালে জানি না, কিন্তু ভাল্লু আধঘণ্টার পর একটি নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁপ ছাড়তে লাগল।
তখন রাত এসেছে ফুরিয়ে। পূৰ্ব-আকাশে কে যেন কালোর সঙ্গে গুলে দিচ্ছে আলোর রং। ভোর হতে আর দেরি নেই দেখে ভাল্লু আবার একটা খুব উঁচু ও ঝাঁকড়া গাছ বেছে নিয়ে তড় তড়, করে তার উপরে উঠে ঘন পাতার আড়ালে মিলিয়ে গেল। একদল কাক আর শালিক পাখি তখন সবে জেগে উঠে প্রভাতী রাগিণী ভাঁজবার আয়োজন করছিল, আচমকা দুঃস্বপ্নের মতন তাদের মধ্যিখানে ভাল্লুর আবির্ভাব দেখেই তারা বেসুরো চীৎকার করে যে যেদিকে পারলে উড়ে পালাল।
ভাল্লু মনে মনে বললে, পাখিগুলো কেন যে আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ওরে কাক, ওরে শালিকের দল, তোরা আবার বাসায় ফিরে আয়। আমি যে পরম বৈষ্ণব, মাছমাংস স্পর্শ করি না। তার উপরে আমি দেখেছি হিমাচলের সুন্দর স্বপন—আমার মন ছুটছে এখন অনন্ত হিমারণ্যের শীতল স্তব্ধতার দিকে, সেই যেখানে ঝরে তুষারের ঝরনা, বুনো বাতাস আনে অজানা ফুলের গন্ধ, গাছে গাছে ফলে থাকে পাকা পাকা মিষ্টি ফল। আজ আমি স্বাধীন, আজ আমি দেশে চলেছি, আজ কি আমি জীব-হিংস৷ করতে পারি?...ভাল্লু ঠিক এই কথাগুলোই ভাবছিল কিনা হলপ করে আমি বলতে পারি না, এসব আন্দাজ মাত্র। তবে সে কিছুনা-কিছু ভাবছিল নিশ্চয়ই, এবং চার পা দিয়ে গাছের একটা মোটা ডাল জড়িয়ে ভাবতে ভাবতে ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল।.
বেশ খানিকক্ষণ পরে তার ঘুম গেল ভেঙে। পিট পিট করে চোখ মেলে নীচের দিকে তাকিয়ে সে দেখলে একটা দৃশ্য।
একটি বাগান। ভাল্লুর গাছটা বাগানের পাঁচিলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু তার আধাআধি ডালপাল শূন্যে বাগানের ভিতরদিকেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভাল্লু যে মোটা ডালটাকে অবলম্বন করেছে সেটা আবার বেঁকে নেমে গিয়েছে বাগানের জমির কাছাকাছি।
সেদিন রবিবার। কলকাতার কোন মেয়ে-ইস্কুলের একদল ছাত্রী সেই বাগানে এসেছে বনভোজনে।
দশটি মেয়ে-বয়স তাদের বারে-তেরো থেকে পনেরো-ষোলোর মধ্যে! সঙ্গে চারজন শিক্ষয়িত্ৰীও আছেন।
প্রধান শিক্ষয়িত্রী হচ্ছেন মিসেস দস্তিদার। শুকনো ও লিকলিকে সরল কাঠের মতন তার দেহ–মাথায় উঁচু সাড়ে-পাঁচ ফুটেরও বেশী। পুরুষই হোক আর মেয়েই হোক, এ-রকম রোগা চেহারায় যা সুলভ নয়, মিসেস দস্তিদার ছিলেন সেই বেজায় ভারিক্কে ভাবের অধিকারিণী। চশমা-পরা চোখে কড়া চাহনি, এবং একজোড়া পুরু ঠোঁটের উপরে উল্লেখযোগ্য একটি গোঁফের রেখা। মেয়েদের ভিতরে একবার প্রশ্ন উঠেছিল, জীবনে হাসেনি এমন কোন মানুষের অস্তিত্ব আছে কি না? উত্তরে একটি মেয়ে বলেছিল, ‘আছে। তার নাম মিসেস্ দস্তিদার।
তা মিসেস দস্তিদারের মুখে হাসির অভাব হলেও বাক্যের অভাব হয়নি কোনদিন। তার মুখে সর্বদাই ফোটে কথার তুবড়ি এবং এ তুবড়ি মৌন হয় না এক মিনিটও। তার বাক্যের স্রোত বস্তার মত ভেঙে পড়ে শ্রোতাদের কর্ণকুহরকে অভিভূত করে দেয় এবং খানিকক্ষণ তাঁর কাছে থাকতে বাধ্য হলে প্রত্যেক শ্রোতাই মনে মনে বলতে থাকে—ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। মিসেস দস্তিদারও সঙ্গে থাকবেন শুনে ইস্কুলের অধিকাংশ মেয়েই চাঁদা দিয়েও আজ বনভোজনে আসতে রাজি হয়নি।
গলা দিয়ে ফাট। কাঁসির মতন আওয়াজ বার করে মিসেস দস্তিদার দস্তুরমতন ভারিক্কে-চালে বলেছিলেন, ‘ইন্দু, অমন করে আলুর দমের আলু কাটে না –কী বললে? তোমার মা ঐ-রকম করেই আলু কাটেন? তোমার মা তাহলে রান্না-বান্নার কিছুই বোঝেন না.শীলা; তুমি হার্মোনিয়াম নিয়ে টানাটানি করছ কেন? গান গাইবে? কী গান? মনে রেখ, আমার সামনে তোমাদের একেলে ন্যাকা-ন্যাকা গজল কি ঠুংরি গাওয়া চলবে না। গান বলতে আমি কেবল বুঝি ব্রহ্মসঙ্গীত।.(গলা চড়িয়ে ) নমিতা, ঢালু পুকুর-পাড়ে দাঁড়িয়ে তোমার ও কী হচ্ছে শুনি? যদি গড়িয়ে জলে পড়ে যাও? কী বললে? তুমি সাঁতার জানো? ও সাঁতার জানলে মানুষ বুঝি জলে ডোবে না? অত আর সাহস দেখিয়ে কাজ নেই, শীগগির এখানে চলে এস! দুঃসাহস আর সাহস এক কথা নয়। সাহস কাকে বলে আমার কাছ থেকে শুনে যাও। মিঃ দস্তিদার— অর্থাৎ আমার স্বামী ফরেস্ট অফিসারের পদ পেয়ে প্রথম-প্রথম বড় ভয় পেতেন। তাকে সাহস দেবার জন্যে শেষটা আমাকেও বনে গিয়ে কিছুকাল বাস করতে হয়েছিল। যে-সে বন নয়—যাকে বলে একেবারে গহন অরণ্য, দিনে-দুপুরে সেখানে বেড়িয়ে বেড়ায় গণ্ডার, বরাহ, বাঘ, ভাল্লুক। কিন্তু আমার কিছুতেই ভয় হত না, বাঘভাল্লুককে আমি গ্রাহ্যের মধ্যেই আনতুম না। বাঘ-ভাল্লুক— বলতে বলতে হঠাৎ চমকে থেমে গিয়ে তিনি মাথার উপরকার গাছের দিকে বিস্ফারিত চক্ষে তাকিয়ে রইলেন।
ভাল্লু তখন পাতার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে অত্যন্ত লুব্ধ চোখে আহারের সরঞ্জামগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.