Skip to content
An adventure-themed illustration for হিমাচলের স্বপ্ন

কালুসর্দার ও টুনু-ঝুনু

1.3K 251 0

ভাল্লু সাঁতার কেটে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ফিরে দেখলে, ভল্লুকী তার পিছনে নেই, কখন জল থেকে উঠে গিয়ে চুপ করে ডাঙার উপরে দাঁড়িয়ে আছে।

ভাল্লু চীৎকার করে তাকে ডাকলে।

কিন্তু ভাল্লুকী তবু সাড়া দিলে না।

ভাল্লু বুঝলে, নদীর জলে ধুম্‌সে টিকটিকিকে দেখে ভলকী ভয়ে ভড়কে গিয়েছে। বউকে অভয় দেবার জন্যে ভাল্লু যখন ফিরব ফিরব করছে, তখন আবার গুড়ুম করে বন্দুকের আওয়াজ, এবং সে করে কি একটা জিনিস এসে ভাল্লুর ঠিক পাশ দিয়ে জলের উপরে ছোঁ মেরে চলে গেল।

ভাল্লু বোকা নয়। নতুন রকম লাঠির চীৎকার শুনেই কালুয়াসুন্দরীর কথা ভুলে সে বেগে সাঁতার কাটতে শুরু করলে। মিনিট কয় পরে ওপারে গিয়ে উঠে ফিরে দেখলে, ভাল্লুকওয়ালা এসে আবার কালুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাল্লু ধরলে বনের পথ।

নয়নপুরের জমিদারের নাম প্রশান্ত চৌধুরী। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। তাদের ডাকনাম টুনু ও ঝুনু।

ঝুমু হচ্ছে দিদি, বয়স ছয় বৎসর। টুমুর বয়স চারের বেশী নয়।

ঝুমু একেবারে পাকা গিন্নিটি, এই বয়সেই তার নাকি কিছুই জানতে বাকি নেই। সে জানে আকাশের তারারা হচ্ছে চাঁদামামার খোকা-খুকি। ফুলপরীরা রাত্রে যেসব ফানুস উড়িয়ে দেয়, মানুষরা যে তাদেরই জোনাকি বলে ডাকে এ বিষয়েও ঝুনুর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। ঝুনু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে বনগাঁবাসী মাসি-পিসির বাড়ীতে গিয়ে নিমন্ত্রণ খেয়ে আসে, তারপর সকালে সেখানকার গল্প বলে টুনুকে অবাক করে দেয়।

আজ সে হঠাৎ বললে, ‘টুনু, হরিণ দেখেছিস?’

—‘না।’

—‘হরিণরা কোথায় থাকে জানিস?’

—‘উহু।’

—‘বনে।’

—‘কোন বনে?’

—‘মাঠের ওপারে যে বনটা দেখা যাচ্ছে, ঐ বনে।’

টুনু বললে, ‘আমি হরিণ দেখব।’

ঝুমু বললে, ‘হাঁটতে পারবি?’

—‘হুঁ-উ-উ।’

—‘তবে আয় আমার সঙ্গে।’

তেপান্তর মাঠ। যেখানে বনরেখা দেখা যাচ্ছে সেখানে যেতে মাইল তিনেক পথ পেরুতে হয়। পায়ে হাঁটা মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চলল ঝুনু আর টুনু৷

মাইল খানেক পথ চলতে না চলতেই টুকু বসে পড়ে বললে, ‘দিদি, আমায় কোলে নে।’

ঝুমু কী আর করে, টুনুকে কোলে তুলে নিলে। কিন্তু চার বছরের খোকাকে কোলে নিয়ে ছয় বছরের খুকি আর কতক্ষণ পথ চলতে পারে? খানিক পরেই হাঁপিয়ে পড়ে ঝুমুও পথের উপরে বসে পড়ল।

এমন সময়ে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করল কালাচাঁদ মণ্ডল বা কালুসর্দার। সে হচ্ছে এ অঞ্চলের চোর-ডাকাতদের দলপতি। প্রথমেই তার শিকারী চোখ পড়ল ঝুমুর গলার সোনার হার ও হাতের সোনার চুড়ির উপরে।

কালু গলার আওয়াজ যথাসাধ্য নরম করে সুধোলে, ‘তোমরা কাদের খোকা-খুকি গো?’

ঝুনু বললে, ‘আমার বাবা জমিদারবাবু।’

—‘এখানে কেন?’

—‘ঐ বনে যাব।’

—‘বনে গিয়ে কী করবে খুকুমনি?’

—'হরিণ দেখব।’

—‘ও, তাই নাকি? তা হরিণ তো ও-বনে থাকে না?’

—‘হরিণ তবে কোথায় থাকে শুনি?’

খানিক দূরের একটা জঙ্গল দেখিয়ে কালু বললে, ‘ওখানে অনেক হরিণ আছে। দেখবে?’

—‘দেখব বলেই তো এসেছি?’

—‘এস, তবে আমার কোলে ওঠ।’

ঝুনু আর টুনুকে নিয়ে কালু জঙ্গলের দিকে অগ্রসর হল।

এখন, সেই জঙ্গলেরই ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের ভাল্লু। একটা ঝুপসি ঝোপের তলায় ঢুকে সে তখন ঘুমিয়ে পড়বার চেষ্টা করছিল, হঠাৎ তার কানে গেল শিশুর কান্না।

ব্যাপারটা তদারক করবার জন্যে ভাল্লু ধড়মড় কবে উঠে দাঁড়িয়ে ঝোপের ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে দিলে।

কালু তখন এক হাতে ঝুমুকে মাটির উপরে চেপে ধরে আর এক হাতে তার গলা থেকে সোনার হার ছিনিয়ে নিচ্ছে।

আগেই বলেছি আমাদের ভালু প্রত্যেক খোকা-খুকিকে বন্ধু বলে মনে করত। এতটুকু একটি খুঁকির উপরে এমন বিষম অত্যাচার সে সহ্য করতে পারলে না। ভয়ানক গর্জন করে তেড়ে গিয়ে কালুকে মারলে প্রচণ্ড এক চড়। কালু আর্তনাদ করে ঠিকরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।

কালুর কবল থেকে মুক্তি পেয়েও ঝুনু ও টুনুর পিলে গেল চমকে। সামনে তাদের প্রকাণ্ড এক ভালুক! সে আবার চড় মেরে মানুষকে রক্তাক্ত করে দেয়। তারা দুজনেই কেঁদে উঠল।

ভালু বুঝলে, তাকে দেখে শিশুরা ভয় পেয়েছে। সে তখন তুই পায়ে ভর দিয়ে ধেই-ধেই করে নাচতে আরম্ভ করলে—কারণ বরাবরই সে দেখে আসছে, তাকে নাচতে দেখলেই শিশুরা হেসে উঠে খুসি হয়ে হাততালি দেয়।

যা ভেবেছে তাই! ভালুক-নাচ দেখেই ঝুনু আর টুনু কান্না ভুলে গেল।

খানিক্ষণ নাচানাচি করে ভালু মাটির উপরে লম্ব হয়ে শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি দিতে দিতে ঝুনু আর টুনুর পায়ের কাছে গিয়ে, চার থাবা তুলে একেবারে স্থির হয়ে রইল।

টুমুর মনে হল, ভানু যেন মিটমিট করে তাদের পানে তাকিয়ে হাসছে। সে ভয়ে ভয়ে ভালুর গায়ে হাত দিলে, ভালু তবু নড়ল না। ঝুনু তখন সাহস সঞ্চয় করে তার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে নিলে, ভালু তখনও আড়ষ্ট।

ঝুনু বললে, “ভাল্লুকটা ভারি ভালোমানুষ রে! টুনু বললে, “একে আমি পুষব।”

জমিদার বাড়ীতে তখন হুলুস্থলু পড়ে গিয়েছে –ঝুমু ও টুনুর অন্তৰ্ধানে.চারিদিকে উঠেছে খোঁজ খোঁজ রব।

জমিদার প্রশান্ত চৌধুরী অনেক লোকজন নিয়ে নিজেই বেরিয়ে পড়েছেন। সঙ্গে আছে তার বাল্যবন্ধু নবীনবাবু। তিনি আলিপুর চিড়িয়াখানার একজন পদস্থ কর্মচারী, ছুটি পেলে মাঝেমাঝে এখানে বেড়াতে আসেন।

একজন লোকের মুখে শোনা গেল, ঝুনু ও টুনুকে দেখা গিয়েছে মাঠের ধারে।

তারপর মাঠের এক চাষী খবর দিলে, কালুসর্দার দুটি শিশুকে কোলে করে নিয়ে গিয়েছে জঙ্গলের দিকে।

ডাকাত কালুসর্দার? প্রশাস্তবাবুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। দলবল নিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটলেন তিনি পাগলের মত।

জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে দেখা গেল এক দৃশ্য-যেমন ভয়াবহ, তেমনি অদ্ভুত।

একদিকে মাটির উপরে পড়ে রয়েছে কালুর রক্তাক্ত ও অচেতন দেহ, হাতে তার ঝুনুর সোনার হার। আর একদিকে হেলে-ফুলে পায়চারি করছে বিরাট এক ভালুক, পিঠে তার বসে রয়েছে ঝুনু ও টুনু।

টুনু সকৌতুকে বলছে, “হট হট, ঘোড়া, হট হট, জোরসে চল, জোরসে চল।’

নবীনবাবু সবিস্ময়ে বললেন, ‘আরে, এ যে আমাদের চিড়িয়াখানার সেই ভালুকটা! আজ কদিন হল পালিয়ে এসেছে!

ভালু বেগতিক দেখে ঝুনু ও টুনুকে পিঠে করেই চম্পট দেবার চেষ্টা করলে, কিন্তু এবার সে আর ফাঁকি দিতে পারলে না, মানুষের উপকার করতে গিয়ে আবার মানুষের হাতেই বন্দী হল।

ঝুমুর মুখে সমস্ত শুনে প্রশান্তবাবু কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বললেন, “এই ভালুকটি আমার ছেলে-মেয়ের প্রাণরক্ষা করেছে। একে আমি যত্ব করে বাড়ীতে রেখে দেব।’

নবীনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘অসম্ভব। এই ভালুকটি হচ্ছে সরকারের সম্পত্তি। ওকে আবার যেতে হবে চিড়িয়াখানায়।’

হায় ভাল্লু! হায় রে হিমাচলের স্বপ্ন!

0
That's the end (so far) Follow this author to know when the next part arrives.
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.