কয়দিন খুব বর্ষা চলিতেছে। অন্নদা রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে সন্ধ্যাবেলায় মজলিস বসে। সেদিন সেখানে নীলকুঠির ভুয়ো গল্প হইতে শুরু হইয়া পুরীর কোন্ মন্দিরের মাথায় পাঁচ মণ ভারী চুম্বক পাথর বসানো আছে, যাহার আকর্ষণের বলে নিকটবর্তী সমুদ্রগামী জাহাজ প্রায়ই পথভ্রষ্ট হইয়া আসিয়া তীরবর্তী মগ্ন শৈলে লাগিয়া ভাঙিয়া যায় প্রভৃতি—আরব্য উপন্যাসের গল্পের মত নানা আজগুবী কাহিনীর বর্ণনা চলিতেছিল। শ্রোতাদের কাহারও উঠিবার ইচ্ছা ছিল না, এরকম আজগুবি গল্প ছাড়িয়া কাহারও বাড়ী যাইতে মন সরিতেছিল না। ভূগোল হইতে শীঘ্রই গল্পের ধারা আসিয়া জ্যোতিষে পৌঁছিল। দীন চৌধুরী বলিতেছিলেন—ভৃগু সংহিতার মত অমন বই তো আর নেই! তুমি যাও, শুধু জন্মরাশিটা গিয়ে দিয়ে দাও, তোমার বাবার নাম, কোন্ কুলে জন্ম, ভূত ভবিষ্যৎ সব বলে দেবে—তুমি মিলিয়ে নাও—গ্রহ ও রাশিচক্রের যত রকম ইয়ে হয়—তা সব দেওয়া আছে কি না? মায় তোমার পূর্বজন্ম পর্যন্ত—
সকলে সাগ্রহে শুনিতেছিলেন, কিন্তু রামময় হঠাৎ বাহিরের দিকে চাহিয়া বলিলেন—না, ওঠা যাক্, এর পর যাওয়া যাবে না—দেখচো না—দেখচো না কাণ্ডখানা? একটা বড় ঝট্কা-টট্কা না হোলে বাঁচি, গতিক বড় খারাপ, চলো সব—
বৃষ্টির বিরাম নাই। একটু থামে, আবার অমনি জোরে আসে, বৃষ্টির ছাটে চারিধার ধোঁয়া ধোঁয়া।
হরিহর মোট পাঁচটা টাকা পাঠাইয়াছিল, তাহার পর আর পত্রও নাই, টাকাও নাই। সেও অনেক দিন হইয়া গেল—রোজ সকালে উঠিয়া সর্বজয়া ভাবে আজ ঠিক খরচ আসিবে। ছেলেকে বলে, তুই খেলে খেলে বেড়াস ব’লে দেখতে পাস্নে, ডাক বাক্সটার কাছে ব’সে থাক্বি—পিওন যেমন আস্বে আর অম্নি জিগ্যেস করবি—
অপু বলে—বা, আমি বুঝি ব’সে থাকি নে? কালও তো এলো পুঁটিদের চিঠি, আমাদের খবরের কাগজ দিয়ে গেল—জিগ্যেস্ করে এস দিকি পুঁটিকে? কাল তবে আমাদের খবরের কাগজ কি ক’রে এল? আমি থাকিনে বৈ কি?
বর্ষা রীতিমত নামিয়াছে। অপু মায়ের কথায় ঠায় রায়েদের চণ্ডীমণ্ডপে পিওনের প্রত্যাশায় বসিয়া থাকে। সাধু কর্মকারের ঘরে চালা হইতে গোলা পায়রার দল ভিজিতে ভিজিতে ঝটাপট্ করিয়া উড়িতে উড়িতে রায়েদের পশ্চিমের ঘরের কার্নিসে আসিতেছে, চাহিয়া চাহিয়া দ্যাখে। আকাশের ডাককে সে বড় ভয় করে। বিদ্যুৎ চম্কাইলে মনে মনে ভাবে—দেবতা কিরকম নলপাচ্চে দেখেচো, এইবার ঠিক ডাক্বে—পরে সে চোখ বুজিয়া কানে আঙুল দিয়া থাকে।
বাড়ী ফিরিয়া দ্যাখে মা ও দিদি সারা বিকাল ভিজিতে ভিজিতে রাশীকৃত কচুর শাক তুলিয়া রান্নাঘরের দাওয়ায় জড়ো করিয়াছে।
অপু বলে—কোত্থেকে আন্লে মা? উঃ কত!
দুর্গা হাসিয়া বলে—কত! উঁ-উঃ! তোমার তো ব'সে ব'সে বড় সুবিধে!...ওই ওদের ডোবার জামতলা থেকে—এই এতটা এক হাঁটু জল! যাও দিকি?....
সকালে ঘাটে গিয়া নাপিত-বৌয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সর্বজয়া কাপড়ের ভিতর হইতে কাঁসার একখানা রেকাবী বাহির করিয়া বলে, এই দ্যাখো জিনিসখানা, খুব ভালো-ভরণ না, কিছু না, ফুল কাঁসা। তুমি বলেছিলে, তাই বলি যাই নিয়ে—এ সে জিনিস নয়, এ আমার বিয়ের দান—এখন এ জিনিস আর মেলে না—
অনেক দরদস্তুরের পর নাপিত-বৌ নগদ একটি আধুলি আঁচল হইতে খুলিয়া দিয়া রেকাবীখানা কাপড়ের মধ্যে লুকাইয়া লয়। কাউকে যেন না প্রকাশ করে—সর্বজয়া এ অনুরোধ বার বার করে।
দুই একদিনে ঘনীভূত বর্ষা নামিল। হু-হু পুবে হাওয়া, খানাডোবা সব থৈ-থৈ করিতেছে—পথে ঘাটে একহাঁটু জল, দিনরাত সোঁ সোঁ, বাঁশবনে ঝড় বাধে— বাঁশের মাথা মাটিতে লুটাইয়া পড়ে— আকাশের কোথাও ফাঁক নাই— মাঝে মাঝে আগেকার চেয়ে অন্ধকার করিয়া আসে—কালো কালো মেঘের রাশ হু-হু উড়িয়া পূর্ব হইতে পশ্চিমে চলিয়াছে—দূর আকাশের কোথায় যেন দেবাসুরের মহাসংগ্রাম বাধিয়াছে, কোন্ কৌশলী সেনানায়কের চালনায় জলস্থল-আকাশ একাকারে ছাইয়া ফেলিয়া বিরাট দৈত্যসৈন্য, বাহিনীর পর বাহিনী, অক্ষৌহিণীর পর অক্ষৌহিণী, অদৃশ্য রথী মহারথীদের নায়কত্বে ঝড়ের বেগে অগ্রসর হইতেছে—প্রজ্বলন্ত অত্যুগ্র দেববজ্র আগুন উড়াইয়া চক্ষের নিমেষে বিশাল কৃষ্ণচমূর এদিক্-ওদিক্ পর্যন্ত ছিঁড়িয়া ফাঁড়িয়া এই ছিন্ন ভিন্ন করিয়া দিতেছে— এই আবার কোথা হইতে রক্তবীজের বংশ করাল কৃষ্ণছায়ায় পৃথিবী অন্তরীক্ষ অন্ধকার করিয়া ঘিরিয়া আসিতেছে।
মহাঝড়!
দিন রাত সোঁ-সোঁ শব্দ-নদীর জল বাড়ে—কত ঘরদোর কত জায়গায় যে পড়িয়া গেল!...নদীনালা জলে ভাসিয়া গিয়াছে—গরু-বাছুর গাছের তলে, বাঁশবনে, বাড়ীর ছাঁচতলায় অঝোরে দাঁড়াইয়া ভিজিতেছে, পাখ- পাখালীর শব্দ নাই কোনোদিকে! চার পাঁচ দিন সমান ভাবে কাটিল কেবল ঝড়ের শব্দ আর অবিশ্রান্ত ধারাবর্ষণ! —অপু দাওয়ায় উঠিয়া তাড়াতাড়ি ভিজা মাথা মুছিতে মুছিতে বলিল—আমাদের বাঁশতলায় জল এসেচে দিদি, দেখবি? দুর্গা কাঁথা মুড়ি দিয়া শুইয়াছিল—না উঠিয়াই বলিল কতখানি জল এসেচে রে?...অপু বলে, তোর জ্বর র্সালে কাল দেখে আসিস্।... তেঁতুলতলার পথে হাঁটু জল! পরে জিজ্ঞাসা করে—মা কোথায় রে?....
ঘরে একটা দানা নেই—দুটোখানি বাসি চালভাজা মাত্র আছে। অপু কান্নাকাটি করে, তা হবে না মা, আমার খিদে পায় না বুঝি—আমি দুটি ভাত খাবো হুঁ-উ—
তার মা বলিল, লক্ষ্মী মাণিক আমার—ও রকম কি করে! অনেক ক'রে চালভাজা মেখে দেবো এখন— রাঁধবো কেমন ক’রে, দেখচিস্নে কি রকম সেঁওটা করেচে? — উনুনের মধ্যে এক উনুন জল যে? পরে সে কাপড়ের ভিতর হইতে একটা কি বাহির করিয়া হাসিমুখে দেখাইয়া বলে—এই দ্যাখ একটা কইমাছ বাঁশতলায় কানে হেঁটে দেখি বেড়াচ্চে—বন্যের জল পেয়ে সব উঠে আসছে গাঙ থেকে—বরোজ পোতার ডোবা ভেসে নদীর সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছে কিনা?...তাই সব উঠে আস্চে—
দুর্গা কাঁথা ফেলিয়া ওঠে—অবাক হইয়া যায়। বলে, দেখি মা মাছটা? হাঁ মা, কইমাছ বুঝি কানে হেঁটে বেড়ায়? আর আছে?...
অপু এখনি বৃষ্টি মাথায় ছুটিয়া যায় আর কি—অনেক কষ্টে তাহার মা তাহাকে থামায়।
দুর্গা বলে—একটু জ্বর সারলে কাল সকালে চল্ অপু, তুই আর আমি বাঁশবাগান থেকে মাছ নিয়ে আসে বা এখন। পরে সে অবাক্ হইয়া ভাবে—বাঁশবাগানে মাছ! কী ক’রে এল? বাঃ তো!—মা কি ভাল ক’রে খুঁজেচে। খুঁজলে আরও সেখানে আছে—দেখতে পেলাম না কি রকম কইমাছ কানে হাঁটে কাল সকালে দেখবো—সকালে জ্বর সেরে যাবে—
চারিদিকের বন-বাগান ঘিরিয়া সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যার মেঘে এয়োদশীর অন্ধকারে চারিধার একাকার। দুর্গা যে বিছানা পাতিয়া শুইয়া আছে, তাহারই এক পাশে তাহার মা ও অপু বসে। সর্বজয়া ভাবে—আজ যদি এখ্খুনি একখানা পত্তর আসে নীরেন বাবাজীর? কি জানি, তা হ'তে কি আর পারে না? নীরেন তো পছন্দই করে গিয়েচেন—কি জানি কি হোল অদেষ্টে! নাঃ, সে সব কি আর আমার অদেষ্টে হবে? তুমিও যেমন! তা হোলে আর ভাবনা ছিল কি?
ওদিকে ভাইবোনে তুমুল তর্ক বাধিয়া যায়। অপু সরিয়া মায়ের কাছে ঘেঁষিয়া বসে—ঠান্ডা হাওয়ায় বেজায় শীত করে। হাসিয়া বলে—মা—কি? সেই শামলঙ্কা বাট্না বাটে মাটিতে লুটায় কেশ?...
দুর্গা বলে—ততক্ষণে মা আমার ছেড়ে গিয়েছেন দেশ—
অপু বলে—দূর হাঁ মা তাই? ততক্ষণে মা আমার ছেড়ে গিয়েছেন দেশ? কথা বলিয়াই সে দিদির অজ্ঞতায় হাসে।।
সর্বজয়ার বুকে ছেলের অবোধ উল্লাসের হাসি শেলের মত বেঁধে। মনে মনে ভাবে—সাতটা নয়, পাঁচটা নয়—এই তো একটা ছেলে—কি অদেষ্ট যে ক’রে এসেছিলাম—তার মুখের আবদার রাখতে পারিনে—ঘি না, লুচি না, সন্দেশ না—কি না শুধু দুটো ভাত—নিনক্যি!... আবার ভাবে—এই ভাঙা ঘর, টানাটানির সংসার—অপু মানুষ হোলে আর এ দুঃখ থাকবে না—ভগবান তাকে মানুষ কোরে তোলেন যেন।....
তাহার পর সে বসিয়া বসিয়া গল্প করে, যখন প্রথম সে নিশ্চিন্দিপুরে ঘর করিতে আসিয়াছিল, তখন এক বৎসর এই রকম অবিশ্রান্ত বর্ষায় নদীর জল এত বাড়িয়াছিল যে ঘাটের পথে মুখুয্যে বাগানের কাছে বড় বোঝাই নৌকা পর্যন্ত আসিয়াছিল।
অপু বলে—কত বড় নৌকো মা?
—মস্ত-ওই যে খোট্টাদের চূণের নৌকো, সাজিমাটির নৌকো মাঝে মাঝে আসে দেখিচিস্ তো—অত বড়—
দুর্গা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে—মা তুমি চারগুছির বিনুনি করতে জানো?
অনেক রাত্রে সর্বজয়ার ঘুম ভাঙিয়া যায়—অপু ডাকিতেছে—মা, ওমা ওঠো—আমার গায়ে জল পড়চে-
সর্বজয়া উঠিয়া আলো জ্বালে— বাহিরে ভয়ানক বৃষ্টির শব্দ হইতেছে। ফুটা ছাদ দিয়া ঘরের সর্বত্র জল পড়িতেছে। সে বিছানা সরাইয়া পাতিয়া দয়ে। দুর্গা অঘোর জ্বরে শুই য়া আছে—তাহার মা গায়ে হাত দিয়া দ্যাখে তাহার গায়ের কাঁথা ভিজিয়া সপসপ করিতেছে। ডাকিয়া বলে—দুর্গা—ও দুর্গা শুন্ছিস্?... একটু ওঠ দিকি? বিছানাটা সরিয়েনি—ও দুর্গা—শীগ্গির, একেবারে ভিজে গেল
যে সব?...
ছেলেমেয়ে ঘুমাইয়া পড়িলেও সর্বজয়ার ঘুম আসে না। অন্ধকার রাত—এই ঘন বর্ষা...তাহার মন ছম্ছম্ করে—ভয় হয় একটা যেন কিছু ঘটিবে...কিছু ঘটিবে। বুকের মধ্যে কেমন যেন করে। ভাবে—সে মানুষেরই বা কি হোল? কোন পত্তরও আসে না—টাকা মরুক্গে যাক। এরকম তো কোনোবার হয় না?..তাঁর শরীরটা ভাল আছে তো? মা সিদ্ধেশ্বরী, স-পাঁচ আনার ভোগ দেবো, ভাল খবর এনে দাও মা
তার পরদিন সকালের দিকে সামান্য একটু বৃষ্টি থামিল। সর্বজয়া বাটীর বাহির হইয়া দেখিল বাঁশবনের মধ্যের ছোট ডোবাটা জলে ভর্তি হইয়া গিয়াছে। ঘাটের পথে নিবারণের মা ভিজিতে ভিজিতে কোথায় যাইতেছিল, সর্বজয়া ডাকিয়া বলিল—ও নিবারণের মা শোন্—পরে সলজ্জভাবে বলিল—সেই তুই একবার বলিছিলি না, বিন্দাবুনি চাদরের কথা তোর ছেলের জন্যে—তা নিবি?...
নিবারণের মা বলিল—আছে? দেয়া একটু ধরুক, মোর ছেলেরে সঙ্গে করে এখনি আসে বা এখন— নতুন আছে মা-ঠাক্রুণ, না পুরোনো?...
সর্বজয়া বলিল, তুই আয় না—এখুনি দেখ্বি?...একটু পুরোনো, কিন্তু সে কেউ গায়ে দয়েনি—ধোয়া তোলা আছে—পরে একটু থামিয়া বলিল—তোরা আজকাল চাল ভান্চিস্নে?...
নিবারণের মা বলিল—এই বাদলায় কি ধান শুকোয় মা-ঠাক্রোণ...খাবার বলে দুটোখানি রেখে দিইচি অম্নি—
সর্বজয়া বলিল—এক কাজ কর না—তাই গিয়ে আমায় আধকাঠা খানেক আজ দিয়ে যাবি?...একটু সরিয়া আসিয়া মিনতির সুরে বলিল—বৃষ্টির জন্যে বাজার থেকে চাল আনাবার লোক পাচ্ছিনে—টাকা নিয়ে নিয়ে বেড়াচ্চি তা কেউ যদি রাজী হয়—বড় মুস্কিলে পড়িচি মা—
নিবারণের মা স্বীকার হইয়া গেল, বলিল—আস্বো এখন নিয়ে, কিন্তু সে ভেটেল ধানের চালির ভাত কি আপনারা খেতে পারবেন মা-ঠাক্রোণ?...বড্ড মোটা—
নিমছাল সিদ্ধ দুর্গা আর খাইতে পারে না। তাহার অসুখ একভাবেই আছে। ঔষধ নাই, ডাক্তার নাই, বৈদ্য নাই। বলে—এক পয়সার বিস্কুট আনিয়ে দেবে মা, নোন্তা, মুখে বেশ লাগে।
সাবু তাই জোটে না, তার বিস্কুট!!
বৈকালবেলা হইতে আবার ভয়ানক বৃষ্টি নামিল। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ও যেন বেশী করিয়া আসে—ঘোর বর্ষণমুখর নির্জন, জলে থৈ-থৈ, হু-হু পুবে হাওয়া বওয়া, মেঘে অন্ধকারে একাকার ভাদ্র-সন্ধ্যা! আবার সেই রকম কালো কালো পেঁজা তুলোর মত মেঘ উড়িয়া চলিয়াছে...বৃষ্টির শব্দে কান পাতা যায় না—দরজা জানালা দিয়া ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটার সঙ্গে বৃষ্টির ছাট হু-হুকরিয়া ঢোকে—ছেঁড়া থলে ছেঁড়া কাপড় গোঁজা ভাঙা কবাটের আড়ালের সাধ্য কি যে ঝড়ের ভীম আক্রমণের মুখে দাঁড়ায়।
বেশী রাত্রে সকলে ঘুমাইলে বেশী বৃষ্টি নামিল। সর্বজয়ার ঘুম আসে না— সে বিছানায় উঠিয়া বসে। বাহিরে শুধু একটানা হুস্ হুস্ জলের শব্দ; ক্রুদ্ধ দৈত্যের মত গর্জমান একটানা গোঁ গোঁ। রবে ঝড়ের দমকা বাড়ীতে বাধিতেছে!...জীর্ণ কোঠাখানা এক একবারের দম্কায় যেন থর থর করিয়া কাঁপে...ভয়ে তাহার প্রাণ উড়িয়া যায়...গ্রামের একধারে বাঁশবনের মধ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে লইয়া নিঃসহায়!..মনে মনে বলে—ঠাকুর, আমি মরি তাতে খেতি নেই—এদের কি করি?—এই রাত্তিরে যাই বা কোথায়?...মনে মনে বসিয়া বসিয়া ভাবে— আচ্ছা যদি কোঠা পড়ে, তবে দালানের দেওয়ালটা বোধ হয় আগে পড়বে—যেমন শব্দ হবে অম্নি পান্চালার দোর দিয়ে এদের টেনে বার ক’রে নেবো—
সে যেন আর বসিয়া থাকিতে পারে না—কয়দিন সে ওলশাক কচুশাক সিদ্ধ করিয়া খাইয়া দিন কাটাইতেছে—নিজে উপবাসের পর উপবাস দিয়া ছেলেমেয়েকে যাহা কিছু সামান্য খাদ্য ছিল খাওয়াইতেছে— শরীর ভাবনায় অনাহারে দুর্বল, মাথার মধ্যে কেমন করে।
ঝড়ের গোঁ গোঁ শব্দ, অনেক রাত্রে ঝড় বাড়িল। বাহিরে কি ঝট্কা আসিল! উপায়! একবার বড় একটা দম্কায় ভয় পাইয়া সে ঝড়ের গতিক বুঝিবার জন্য সন্তর্পণে দালানের দুয়ার খুলিয়া বাহিরের রোয়াকে মুখ বাড়াইল...বৃষ্টির ছাটে কাপড় চুল সব ভিজিয়া গেল—হু-হুএকটানা হাওয়ার শব্দে বৃষ্টিপতনের ঝড়ের শব্দ ঢাকিয়া গিয়াছে বাহিরে কিছু দেখা যায় না—অন্ধকারে মেঘে আকাশে-বাতাসে গাছপালায় সব একাকার! ঝড়- বৃষ্টির শব্দে আর কিছু শোনা যায় না।
এই হিংস্র অন্ধকার ও ক্রূর ঝটিকাময়ী রজনীর আত্মা যেন প্রলয়দেবের দূতরূপে ভীম ভৈরব বেগে সৃষ্টি গ্রাস করিতে ছুটিয়া আসিতেছে—অন্ধকারে, রাত্রে, গাছপালায়, আকাশে, মাটিতে তাহার গতিবেগ বাধিয়া শব্দ উঠিতেছে—সু-ইশ সু-উ-উ-উইশ্...সু উ উ উ ই শ...এই শব্দের প্রথমাংশের দিকে বিশ্বগ্রাসী দূতটা যেন পিছু হটিয়া বল সঞ্চয় করিতেছে—সু উ উ এবং শেষের অংশটায় পৃথিবীর উচ্চ নীচ তাবৎ বায়ুস্তর আলোড়ন, মন্থন করিয়া বায়ুস্তরে বিশাল তুফান তুলিয়া তাহার সমস্ত আসুরিকতার বলে সর্বজয়াদের জীর্ণ কোঠাটার পিছনে ধাক্কা দিতেছে—ই ই-শ্...! কোঠা দুলিয়া দুলিয়া উঠিতেছে...আর থাকে না। ইহার মধ্যে যেন কোনো অধীরতা, বিশৃঙ্খলতা, ভ্রম-ভ্রান্তি নাই—যেন দৃঢ়, অভ্যস্ত, প্রণালীবদ্ধ ভাবের কর্তব্যকার্য!..বিশ্বটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চূর্ণ করিয়া উড়াইয়া দেওয়ার ভার যে লইয়াছে, যুগে যুগে এরকম কত হাস্যমুখী সৃষ্টিকে বিধ্বস্ত করিয়া অনন্ত আকাশের অন্ধকারে তারাবাজির মত ছড়াইয়া দিয়া আসিয়াছে সে মহাশক্তিমান্ ধ্বংসদূত—এ তার অভ্যস্ত কার্য...এতে তার অধীরতা উন্মত্ততা সাজে না...
আতঙ্কে সর্বজয়া দোর বন্ধ করিয়া দিল...আচ্ছা যদি এখন একটা কিছু ঘরে ঢোকে? মানুষ কি অন্য কোন জানোয়ার? চারিদিকে ঘন বাঁশবন, জঙ্গল, লোকজনের বসতি নাই—মাগো! জলের ছাটে ঘর ভাসিয়া যাইতেছে...হাত দিয়া দেখিল ঘুমন্ত অপুর গা জলে ভিজিয়া ন্যাতা হইয়া যাইতেছে...সে কি করে? আর কত রাত আছে? সে বিছানা হাতড়াইয়া দেশলাই খুঁজিয়া কেরোসিনের ডিবাটা জ্বালে। ডাকে—ও অপু ওঠ্ তো? জল পড়চে—। অপু ঘুমচোখে জড়িত গলায় কি বলে বোঝা যায় না। আবার ডাকে—অপু? শনুচিস্ ও অপু? ওঠ দিকি। দুর্গাকে বলে—পাশ ফিরে শো তো দুগ্গা। বড্ড জল পড়চে—একটু স’রে, পাশ ফের দিকি—
অপু উঠিয়া বসিয়া ঘুমচোখে চারিদিকে চায়—পরে আবার শুইয়া পড়ে। হুড়ুম করিয়া বিষম কি শব্দ হয়, সর্বজয়া তাড়াতাড়ি আবার দুয়ার খুলিয়া বাহিরের দিকে উঁকি মারিয়া দেখিল—বাঁশবাগানের দিকটা ফাঁকা ফাঁকা দেখাইতেছে—রান্নাঘরের দেওয়াল পড়িয়া গিয়াছে।...তাহার বুক কাঁপিয়া ওঠে—এইবার বুঝি পুরানো কোঠাটা-? কে আছে কাহাকে সে এখন ডাকে? মনে মনে বলে—হে ঠাকুর, আজকার রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে দাও, হে ঠাকুর, ওদের মুখের দিকে তাকাও—
তখন ভাল করিয়া ভোর হয় নাই, ঝড় থামিয়া গিয়াছে কিন্তু বৃষ্টি তখনও অল্প অল্প পড়িতেছে। পাড়ার নীলমণি মুখুয্যের স্ত্রী গোহালে গরুর অবস্থা দেখিতে আসিতেছেন, এমন সময় খিড়্কীদোরে বার বার ধাক্কা শুনিয়া দোর খুলিয়া বিস্ময়ের সুরে বলিলেন নতুন বৌ!....সর্বজয়া ব্যস্তভাবে বলিল—ন’দি একবার বট্ঠাকুরকে ডাকো দিকি?...একবার শীগ্গির আমাদের বাড়ীতে আসতে বললো—দুগ্গা কেমন করচে!
নীলমণি মুখুয্যের স্ত্রী আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—দুগ্গা? কেন কি হয়েচে দুগ্গার?...।
সর্বজয়া বলিল—ক'দিন থেকে তো জ্বর হচ্ছিল হচ্ছে আবার যাচ্ছে—ম্যালেরিয়ার জ্বর, কাল সন্দে থেকে জ্বর বড্ড বেশি—তার ওপর কাল রাত্রে কি রকম কাণ্ড তো জানই —একবার শীগ্গির বট্ঠাকুরকে—
তাহার বিস্রস্ত কেশ ও রাত-জাগা রাঙা রাঙা চোখের কেমন দিশাহারা চাহনি দেখিয়া নীলমণি মুখুয্যের স্ত্রী বলিলেন—ভয় কি বৌ—দাঁড়াও আমি এখুনি ডেকে দিচ্চি চল আমিও যাচ্ছি— কাল আবার রাত্তিরে গোয়ালের চালখানা পড়ে গেল—বাবা কাল রাত্তিরের মত কাণ্ড আমি তো কখনো দেখিনি—শেষরাত্রে সব উঠে গরু—টরু সরিয়ে রেখে আবার শুয়েছে কিনা?...দাঁড়াও আমি ডাকি—
একটু পরে নীলমণি মুখুয্যে, তাহার বড় ছেলে ফণি, স্ত্রী ও দুই মেয়ে সকলে অপুদের বাড়িতে আসিলেন। রাত্রের অন্ধকারে সেই দৈত্যটা যেন সারা গ্রামখানা দলিত, পিষ্ট, মথিত করিয়া দিয়া আকাশ-পথে অন্তর্হিত হইয়াছে—ভাঙা গাছের ডাল, পাতা, চালের খড়, কাঁচা বাঁশপাতা, বাঁশের কঞ্চিতে পথ ঢাকিয়া দিয়াছে— ঝড়ের বাঁশ নুইয়া পথ আটকাইয়া রহিয়াছে। ফণি বলিল—দেখেচেন বাবা কাণ্ডখানা? সেই নবাবগঞ্জের পাকা রাস্তা থেকে বিলিতি চট্কা গাছটার পাতা উড়িয়ে এনেচে।...নীলমণি মুখুয্যের ছোট ছেলে একটা মরা চড়ুই পাখী বাঁশপাতার ভিতর হইতে টানিয়া বাহির করিল।
দুর্গার বিছানার পাশে অপু বসিয়া আছে নীলমণি মুখুয্যে ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন—কি হয়েছে বাবা অপু?
অপুর মুখে উদ্বেগের চিহ্ন। বলিল, দিদি কি সব বক্ছিল জেঠামশায়।
নীলমণি বিছানার পাশে বসিয়া বলিলেন—দেখি হাতখানা?...জ্বরটা একটু বেশী, আচ্ছা কোনো ভয় নেই— ফনী, তুমি একবার চট ক’রে নবাবগঞ্জে চলে যাও দিকি শরৎ ডাক্তারের কাছে—একেবারে ডেকে নিয়ে আস্বে। পরে তিনি ডাকিলেন—দুর্গা, ও দুর্গা? দুর্গার আঘোর আচ্ছন্ন ভাব, সাড়াশব্দ নাই। নীলমণি বলিলেন, এঃ, ঘরদোরের অবস্থা তো বড্ড খারাপ? জল প’ড়ে কাল রাত্রে ভেসে গিয়েছে... তা বৌমার লজ্জার কারণই বা কি—আমাদের ওখানে না হয় উঠ্লেই হোত? হরিটারও কাণ্ডজ্ঞান আর হোল না এ জীবনে—এই অবস্থায় এইরকম ঘরদোর সারানোর একটা ব্যবস্থা না ক’রে কি যে করচে, তাও জানিনে—চিরকালটা ওর সমান গেল—
তাঁহার স্ত্রী বলিলেন—ঘর সারাবে কি, খাবার নেই ঘরে, নৈলে কি এরকম আতান্তরে ফেলে কেউ বিদেশে যায়? আহা, রোগা মেয়েটা কাল সারারাত ভিজেছে—একটু জল গরম করতে দাও—ওই জানালাটা খুলে দাও তো ফনী?
একটু বেলায় নবাবগঞ্জ হইতে শরৎ ডাক্তার আসিলেন—দেখিয়া শুনিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করিলেন। বলিয়া গেলেন যে বিশেষ ভয়ের কোনো কারণ নাই, জ্বর বেশী হইয়াছে, মাথায় জলপটি নিয়মিত ভাবে দেওয়ার বন্দোবস্ত করিলেন। হরিহর কোথায় আছে জানা নাই তবুও তাহার পূর্ব ঠিকানায় তাহাকে একখানি পত্র দেওয়া হইল।
পরদিন ঝড় বৃষ্টি থামিয়া গেল—আকাশের মেঘ কাটিতে শুরু করিল। নীলমণি মুখুয্যে দুবেলা নিয়মিত দেখাশোনা করিতে লাগিলেন। ঝড় বৃষ্টি থামিবার পরদিন হইতেই দুর্গার জ্বর আবার বড় বাড়িল। শরৎ ডাক্তার সুবিধা বুঝিলেন না। হরিহরকে আর একখানা পত্র দেওয়া হইল।
অপু তাহার দিদির মাথার কাছে বসিয়া জলপটি দিতেছিল। দিদিকে দু-একবার ডাকিল—ও দিদি শুন্ছিস্, কেমন আছিস্, ও দিদি? দুর্গার কেমন আচ্ছন্ন ভাব। ঠোঁট নড়িতেছে কি যেন আপন মনে বলিতেছে, ঘোর ঘোর। অপু কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া দু-একবার চেষ্টা করিয়াও কিছু বুঝিতে পারিল না।
বৈকালের দিকে জ্বর ছাড়িয়া গেল। দুর্গা আবার চোখ মেলিয়া চাহিতে পারিল এতক্ষণ পরে। ভারী দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, চিঁচিঁ করিয়া কথা বলিতেছে, ভাল করিয়া না শুনিলে বোঝা যায় না কি বলিতেছে।
মা গৃহকার্যে উঠিয়া গেলে অপু দিদির কাছে বসিয়া রহিল। দুর্গা চোখ তুলিয়া তাহার দিকে চাহিয়া বলিল— বেলা কত রে?
অপু বলিল—বেলা এখনও অনেক আছে—রোদ্দুর উঠেচে আজ দেখিচিস্ দিদি? এখনও আমাদের নারকেল গাছের মাথায় রোদ্দুর রয়েচে—
খানিকক্ষণ দুজনেই কোনো কথা বলিল না। অনেকদিন পরে রৌদ্র ওঠাতে অপুর ভারি আহ্লাদ হইয়াছে। সে জানালার বাহিরে রৌদ্রালোকিত গাছটার মাথায় চাহিয়া রহিল। খানিকটা পরে দুর্গা বলিল—শোন্ অপু—একটা কথা শোন্—
—কি রে দিদি? পরে সে দিদির মুখের আরও কাছে মুখ লইয়া গেল। —আমায় একদিন তুই রেলগাড়ী দেখাবি?
—দেখাবো এখন—তুই সেরে উঠলে বাবাকে ব’লে আমরা সব একদিন গঙ্গা নাইতে যাবো রেলগাড়ী ক’রে—
সারা দিন রাত্রি কাটিয়া গেল। ঝড় বৃষ্টি কোনও কালে হইয়াছিল মনে হয় না। চারিধারে দারুণ শরতের রৌদ্র।
সকাল দশটার সময় নীলমণি মুখুয্যে অনেকদিন পরে নদীতে স্নান করিতে যাইবেন বলিয়া তেল মাখিতে বসিয়াছেন, তাঁহার স্ত্রীর উত্তেজিত সুর তাঁর কানে গেল—ওগো, এসো তো একবার এদিকে শীগ্গির—অপুদের বাড়ীর দিক থেকে যেন একটা কান্নার গলা পাওয়া যাচ্চে—
ব্যাপার কি দেখিতে সকলে ছুটিয়া গেলেন।
সর্বজয়া মেয়ের মুখের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিতেছে—ও দুগ্গা চা দিকি—ওমা, ভাল ক’রে চা দিকি ও দুগ্গা—
নীলমণি মুখুয্যে ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন—কি হয়েচে—সরো সব সরো দিকি—আহা কি সব বাতাসটা বন্ধ ক’রে দাঁড়াও?
সর্বজয়া ভাসুর সম্পর্কের প্রবীণ প্রতিবেশীর ঘরের মধ্যে উপস্থিতি ভুলিয়া গিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল— ওগো, কি হোলো, মেয়ে অমন করচে কেন?
দুর্গা আর চাহিল না।
আকাশের নীল আস্তরণ ভেদ করিয়া মাঝে মাঝে অনন্তের হাতছানি আসে—পৃথিবীর বুক থেকে ছেলেমেয়েরা চঞ্চল হইয়া ছুটিয়া গিয়া অনন্ত নীলিমার মধ্যে ডুবিয়া নিজেদের হারাইয়া ফেলে—পরিচিত ও গতানুগতিক পথের বহুদূর পারে কোন পথহীন পথে—দুর্গার অশান্ত, চঞ্চল প্রাণের বেলায় জীবনের সেই সর্বাপেক্ষা বড় অজানার ডাক আসিয়া পৌঁছিয়াছে!
তখন আবার শরৎ ডাক্তারকে ডাকা হইল— বলিলেন—ম্যালেরিয়ার শেষ স্টেজটা আর কি—খুব জ্বরের পর যেমন বিরাম হয়েচে আর অমনি হার্টফেল ক’রে—ঠিক এরকম একটা case হয়ে গেল। সেদিন দশঘরায়—
আধঘণ্টার মধ্যে পাড়ার লোকে উঠান ভাঙিয়া পড়িল।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.