দুপুরের পর রাণাঘাট স্টেশনে গাড়ী বদল করিতে হইল। অপুর চোখে দু-দুবার কয়লার গড়ুঁা পড়া সত্ত্বেও সে গাড়ীর জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া সারাদিনটা বাহিরের দিকে চাহিয়া আছে। স্টেশনে স্টেশনে ওগুলোকে কি বলে? সিগন্যাল? পড়িতেছে উঠিতেছে কেন? গাড়ী যেখানে লাগিতেছে সেখানটা উঁচুমত ইঁটের গাঁথা, ঠিক যেন রোয়াকের মত। তাকে প্ল্যাটফর্ম বলে? কাঠের গায়ে বড় বড় অক্ষরে ইংরাজী ও বাংলাতে সব স্টেশনের নাম লেখা আছে কুড়ুলগাছি, গোবিন্দপুর, বানপুর। গাড়ী ছাড়িবার সময় ঘণ্টা পড়ে -ঢং ঢং ঢং ঢং চার ঘা—অপু গুনিয়াছে, একটা বড় লোহার চাকার চারিধারে হাতলপরানো, তাহাই ঘুরাইলে সিগন্যাল পড়ে—কুড়ুলগাছি স্টেশনে অপু লক্ষ্য করিয়া দেখিল।
সর্বজয়া এবার লইয়া মোটে দুইবার রেলে চড়িল। আর একবার সেই কোন্ কালে—উনি তখন নতুন কাশী হইতে আসিয়া দেশে সংসার পাতিয়াছেন—জ্যৈষ্ঠমাসে আড়ংঘাটায় যুগলকিশোর ঠাকুর দেখিতে গিয়াছিল—সে কি আজকার কথা? সে খুশির সহিত স্টেশনে স্টেশনে মুখ বাড়াইয়া লোকজনের ওঠা-নামা লক্ষ্য করিতেছিল বউঝিরা উঠিতেছে নামিতেছে—কেমন সব চেহারা, কেমন কাপড়-চোপড়, গহনাপত্র। জগন্নাথপুর স্টেশনে ভাল মুড়ির মোয়া ফিরি করিতেছে দেখিয়া সে ছেলেকে বলিল—অপু, মুড়ির মোয়া খাবি? তুই তো ভালবাসিস্, নেবো তোর জন্যে? স্টেশনে টেলিগ্রাফের তারের ওপর কি পাখী বসিয়া দোল খাইতেছে, অপু ভাল করিয়া চাহিয়া চাহিয়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া বলিল দ্যাখো মা, কাদের বাড়ীর খাঁচা থেকে একটা ময়নাপাখী পালিয়ে এসেচে!
নৈহাটি স্টেশনে গাড়ী বদলাইয়া গঙ্গার প্রকাণ্ড পুলটার উপর দিয়া যাইবার সময় সূর্য অস্ত যাইতেছিল, সর্বজয়া একদৃষ্টে চাহিয়া ছিল—ওপার হইতে হুহুবাতাস বহিতেছে, গঙ্গার জলে নৌকা, দুপারে কত ভাল ভাল বাড়ী বাগান, এ সব দৃশ্য জীবনে সে কখনো দেখে নাই। ছেলেকে দেখাইয়া বলিল—দেখেচিস্ অপু, একখানা ধোঁয়ার জাহাজ? পরে সে যুক্তকর কপালে ঠেকাইয়া আপন মনে বলিল—মা গঙ্গা, তোমার ওপর দিয়ে যাচ্চি, অপরাধ নিও না মা, কাশীতে গিয়ে ফুল—বিল্বপত্রে তোমায় পুজো করবো, অপুকে ভালো রেখো, যে জন্যে যাওয়া তা যেন হয়, সেখানে যেন আশ্রয় হয় মা—
আনন্দে পুলকে, অনিশ্চিততার রহস্যে তার হৃদয় দুলিতেছিল—এরকম মনোভাব এর আগে সে কখনো অনুভব করে নাই। সুবিধায় হৌক, অসুবিধায় হৌক, অবাধ মুক্ত জীবনের আনন্দ সে পাইল এই প্রথম, তার চিরকালের বাঁশবনের বেড়া ঘেরা ক্ষুদ্র সীমায় বদ্ধ পল্লীজীবনে এরকম সচল দৃশ্যরাজি, এরকম অভিনব গতির বেগ, এত অনিশ্চয়ের পুলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় কখনও হয় নাই—যে জীবন চারিধারে পাঁচিল দেওয়াল তুলিয়া আপনাকে আপনি ছোট করিয়া রাখিয়াছিল, তাহা আজ চলিয়াছে, চলিয়াছে, সম্মুখে চলিয়াছে—ওই পশ্চিম আকাশের অস্তমান সূর্যকে লক্ষ্য করিয়া— নদ-নদী, দেশবিদেশ—ডিঙাইয়া ছুটিয়াছে—এই চলিয়া চলার বাস্তবতাকে সে প্রতি হৃদয় দিয়া অনুভব করিতেছিল আজ!—এই তো সেদিন এক বৎসর আগেও নিশ্চিন্দিপুরের বাড়ীতে কত রাত্রে শুইয়া সে যখন ভাবিত, সুবিধা হইলে একবার চাকদা কি কালীগঞ্জে গঙ্গাস্নানে যাইবে, তখনই তাহা সম্ভবের ও নিশ্চয়তার বহু বাহিরের জিনিস বলিয়া মনে হইয়াছে—আর আজ :
ব্যান্ডেল স্টেশনে গাড়ী আসিবার একটু আগে সম্মুখের বড় লাইন দিয়া একখানা বড় গাড়ী হু হু শব্দে ঝড়ের বেগে বাহির হইয়া চলিয়া গেল। অপু বিস্ময়ের সঙ্গে সেদিকে চাহিয়া রহিল। কি আওয়াজ!–উঃ! ব্যান্ডেল স্টেশনে পৌঁছিয়া তাহারা গাড়ী হইতে নামিল। এদিকে-ওদিকে এঞ্জিন দৌড়িতেছে, বড় বড় মালগাড়ীগুলা স্টেশন কাঁপাইয়া প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর না থামিয়া চলিয়া যাইতেছে। হৈ হৈ শব্দ—এদিকে এঞ্জিনের সিটির কানে-তালা-ধরা আওয়াজ, ওদিকে আর একখানা যাত্রীগাড়ী ছাড়িয়া যাইতেছে, গার্ড সবুজ নিশান দুলাইতেছে—সন্ধ্যার সময় স্টেশনের পূর্বে পশ্চিমে লাইনের ওপর এত সিগন্যাল ঝাঁকে ঝাঁকে—লাল সবুজ আলো জ্বলিতেছে—রেল, এঞ্জিন, গাড়ী, লোকজন।
একটু রাত্রি হইলে তাহাদের কাশী যাইবার গাড়ী আসিয়া বিকট শব্দে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইল। বিশাল স্টেশন, বেজায় লোকের ভিড়—সর্বজয়া কেমন দিশেহারা হইয়া গেল—তাড়া খাইয়া অনভ্যস্ত আড়ষ্ট পায়ে পায়ে স্বামীর পিছনে একখানা কামরার দুয়ারে আসিয়া দাঁড়াইতেই হরিহর অতিকষ্টে দুর্জয় ভিড় ঠেলিয়া বেপথুমানা স্ত্রীকে ও দিশেহারা পুত্রকে কায়ক্লেশে গাড়ীর বেঞ্চিতে বসাইয়া দিয়া কুলীর সাহায্যে মোট—গাঁট উঠাইয়া দিল।
ভোরের দিকে সর্বজয়ার তন্দ্রা গেল ছুটিয়া। ট্রেন ঝড়ের বেগে ছুটিয়াছে—মাঠ, মাটি, গাছপালা একাকার করিয়া ছুটিয়াছে— রাত্রের গাড়ী বলিয়া তাহারা সকলে একগাড়ীতেই উঠিয়াছে—হরিহর তাহাকে মেয়ে-কামরায় দয়ে নাই। গাড়ীতে ভিড় আগের চেয়ে কম—এক এক বেঞ্চে এক একজন লম্বা হইয়া শুইয়া ঘুমাইতেছে। উপরের বেঞ্চে একজন কাবুলী নাক ডাকাইতেছে। অপু কখন উঠিয়া হাঁ করিয়া জানালা দিয়া মুখ বাহির করিয়া একদৃষ্টে চাহিয়া আছে।
হরিহর জাগিয়া উঠিয়া ছেলেকে বলিল—ওরকম ক’রে বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকো না খোকা, এখ্খুনি চোখে কয়লার গুঁড়া পড়বে—
কয়লার গুঁড়া তো নিরীহ জিনিস, চোখ দুটা যদি উপড়াইয়া চলিয়াও যায় তবুও অপুর সাধ্য নাই যে, জানালার দিক হইতে এখন সে চোখ ফিরাইয়া লইতে পারে। সে প্রায় সারারাত্রি ঠায় এইভাবে বসিয়া। বাবা মা তো ঘুমাইতেছিল—সে যে কত কি দেখিয়াছে! কত স্টেশনে গাড়ী দাঁড়ায় নাই, আলো লোকজনসুদ্ধ স্টেশনটা হস করিয়া হাউইবাজির মত পাশ কাটাইয়া উড়িয়া চলিয়া যাইতেছিল— রাত্রে কখন তাহার একটু তন্দ্রা আসিয়াছিল, হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়া যাইতেই সে মুখ বাহির করিয়া দেখিল যে, গভীর রাত্রির জ্যোৎস্নায় রেলগাড়ীখানা ঝড়ের বেগে একটা কোন নদীর ছোট সাঁকো পার হইতেছে,—সাম্নে খুব উঁচু একটা কালোমত ঢিবি, ঢিবিটার ওপরে অনেক গাছপালা, নদীর জলে জ্যোৎস্না পড়িয়া চিকচিক্ করিয়া উঠিল, আকাশে সাদা সাদা মেঘ— তারপর সেই ধরনের বড় বড় আরও কয়েকটা ঢিবি, আরও সেই রকম গাছপালা। তাহার পর একটা বড় স্টেশন, লোকজন, আলো—পাশের লাইনে একখানা গাড়ী আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল—একজন পানওয়ালার সঙ্গে একটা লোকের যা ঝগড়া হইয়া গেল —স্টেশনে একটা বড় ঘড়ি ছিল—সে তাহার মাস্টার মশায় নীরেনবাবুর কাছে ঘড়ি দেখিতে শিখিয়াছিল, গুনিয়া গুনিয়া দেখিল রাত্রি তিনটা বাজিয়া বাইশ মিনিট হইয়াছে। তারপর আবার গাড়ী ছাড়িল—আবার কত গাছ, আবার সেই ধরনের উঁচু উঁচু ঢিবি—অনেক সময়ে রেলের রাস্তার দু’ধারেই সেইরকম ঢিবি—গাড়ীতে সবাই ঘুমাইতেছে, ইহারা যদি কিছু দেখিবে না তবে রেলগাড়ী চড়িয়াছে যে কেন! কাহাকে সে জিজ্ঞাসা করে যে অত ঢিবি কিসের? এক একবার সে জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া ঝুঁকিয়া মাটির দিকে চাহিয়া নিরূপণ করিবার চেষ্টা করিতেছিল গাড়ীখানা কত জোরে যাইতেছে—চুল বাতাসে উড়িয়া মুখে পড়ে, মাটি দেখা যায় না, যেন কে মাটির গায়ে কতকগুলি সরল রেখা টানিয়া চলিয়াছে—উঃ! রেলগাড়ী কি জোরে যায়!- কৌতূহলে, উত্তেজনায় সে একবার এদিকের জানালায়, একবার ওদিকের জানালায় মুখ বাড়াইয়া দেখিতেছিল।
মাঝে মাঝে পূর্বদিকের দ্রুতবিলীয়মান অস্পষ্ট জ্যোৎস্না-ভরা মাঠের দিকে চাহিয়া চাহিয়া তাহার মনে হইতেছিল, কত দূর তাহারা আসিয়াছে! এ কোন দেশের উঁচু নীচু মাঠ দিয়া তাহারা চলিয়াছে?
সকালের দিকে সে আবার একটু ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, একটা প্রকাণ্ড স্টেশনে সশব্দে গাড়ী আসিয়া দাঁড়াইতেই তাহার তন্দ্রা ছুটিয়া গেল— প্ল্যাটফর্মের পাথরের ফলকে নাম লেখা আছে—পাটনা সিটি।
তাহার পর কত স্টেশন চলিয়া গেল। কি বড় বড় পুল! গাড়ী চলিয়াছে, চলিয়াছে, মনে হয় বুঝি পুলটা শেষ হইবে না—কত ধরনের সিগন্যাল, কত কল-কারখানা, একটা কোন্ স্টেশনের ঘরের মধ্যে একটা লোহার থামের গায়ে চোঙলাগানো মত—তাহারই মধ্যে মুখ দিয়া একজন রেলের বাবু কি কথা কহিতেছে—প্রাইভেট নম্বর?...হাঁ আচ্ছা সিক্স্টি নাইন্—সিক্সটি নাইন্—হাঁ?....ঊনসত্তর...ছয়ের পিঠে নয়—হাঁ-হাঁ।
সে অবাক্ হইয়া বাবাকে জিজ্ঞাসা করিল—ও কি কল বাবা? ওর মধ্যে মুখ দিয়ে ওরকম বল্চে কেন?
তখন বেলা খুব পড়িয়া গিয়াছে, এমন সময় হরিহর বলিল—এইবার আমরা কাশী পৌঁছে যাবো, বাঁ দিকে চেয়ে থেকো, গঙ্গার পুলের উপর গাড়ী উঠলেই কাশী দেখা যাবে
অপু একটা কথা অনেকক্ষণ ধরিয়া ভাবিতেছিল। আজ সে সারা পথ টেলিগিরাপের তার ও খুঁটি দেখিতে দেখিতে আসিতেছে—সেই একটিবার ছাড়া এমন করিয়া এর আগে কখনও দেখে নাই জীবনে। এইবার যদি সে রেল-রেল খেলার সুযোগ পায়, তখনই সে ওই ধরণের তারের খুঁটি বসাইবে। কি ভুলটাই করিত আগে। যেখানে যাইতেছে, সেখানকার বনে গুলঞ্চলতা পাওয়া যায় তো?
দিন পনেরো কাটিয়া গিয়াছে। বাঁশফট্কা গলির একখানা মাঝারি গোছের তেতলা বাড়ীর একতলায় হরিহর বাসা লইয়া আছে। কোনো পূর্বপরিচিত লোকের সন্ধান সে মিলাইতে পারে নাই। আগে যাহারা যেসব জায়গায় ছিল, এখন সেসব স্থানে তাহাদের সন্ধান কেহ দিতে পারে না। কেবল বিশ্বেশ্বরের গলির পুরাতন হলুইকর রামগোপাল সাহু এখনও বাঁচিয়া আছে।
বাড়ীর ওপরের তলায় একজন পাঞ্জাবী সপরিবারে থাকে, মাঝের তলায় এক বাঙালী ব্যবসায়ী থাকে, বাইরের ঘরটা তার দোকান ও গুদাম—আশেপাশের দু’তিন ঘরে তাঁর রন্ধন ও শয়নঘর।
এ পাঁচছয় দিনে সর্বজয়া নিকটবর্তী সকল জায়গা স্বামীর সঙ্গে ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিয়াছে। স্বপ্নেও কখনো সে এমন দৃশ্যের কল্পনা করে নাই,—এমন মন্দির! এমন ঠাকুর-দেবতা! এত ঘরবাড়ী। আড়ংঘাটার যুগলকিশোরের মন্দির এতদিন তাহার কাছে স্থাপত্য শিল্পের চরম উৎকষের্র নিদর্শন জানা ছিল—কিন্তু বিশ্বনাথের মন্দির?—অন্নপূর্ণার মন্দির? দশাশ্বমেধ ঘাটের ওপরকার লালপাথরের মন্দিরগুলা?
মধ্যে একদিন সে পাঞ্জাবী ভদ্রলোকটির স্ত্রীর সঙ্গে রাত্রে বিশ্বনাথের আরতি দেখিতে গিয়াছিল—সে যে কি ব্যাপার তাহা সে মুখে বলিতে পারে না। ধূপ-ধূনার ধোঁয়ায় মন্দির অন্ধকার হইয়া গেল—সাতআটজন পূজারী একসঙ্গে মন্ত্র পড়িতে লাগিল কি ভিড়, কি জাঁকজমক, কত বড় ঘরের মেয়েরা দেখিতে আসিয়াছিল, তাহাদের বেশভূষারই বা কি বাহার! কোথাকার একজন রাণী আসিয়াছিলেন—সঙ্গে চার-পাঁচজন চাকরাণী। দামী বারাণসী শাড়ী পরনে, সোনার কল্কাবসানো আঁচলটা আরতির পঞ্চপ্রদীপের আলোয় আগুনের মত জ্বলিতেছিল—কি টানা ডাগর চোখ—কি ভুরু কি মুখশ্রী--সত্যিকার রাণী সে কখনো দেখে নাই—গল্পেই শুনিয়াছে—হাঁ, রাণীর মত রূপ বটে। তাঁহাকে বেশীক্ষণ ধরিয়া দেখিয়াছে, কি ঠাকুরের আরতি বেশিক্ষণ দেখিয়াছে, তাহা সে জানে না।
ঠাকুর-দেবতার মন্দির ছাড়া এক-একখানা বসতবাড়ীই বা কি!..দুর্গোৎসবের নিমন্ত্রণে নিশ্চিন্দিপুরের গাঙ্গুলীবাড়ী গিয়া সে গাঙ্গুলীদের নাটমন্দির, দো-মহলা বাড়ী, বাঁধানো পুকুরঘাট দেখিয়া মনে মনে কত ঈর্ষান্বিত হইত—মনে আছে একবার দুর্গাকে বলিয়াছিল—দেখেচিস্ বড়লোকের বাড়ীঘরের কি লক্ষ্মীছিরি?—এখন সে যেসব বাড়ী রাস্তার দুধারে দেখিতেছে—তাহার কাছে গাঙ্গুলীবাড়ী—
এত গাড়ীঘোড়া একসঙ্গে যাইতে কখনও সে দেখে নাই। গাড়ীই বা কত ধরনের! আসিবার দিন রাণাঘাটে, নৈহাটিতে সে ঘোড়ার গাড়ী দেখিয়াছে বটে, কিন্তু এত ধরনের গাড়ী সে আগে কখনো দেখে নাই। দু-চাকার গাড়ীই যে কত যায়।...তাহার তো ইচ্ছা করে পথের ধারে দাঁড়াইয়া দুদণ্ড এইসব দ্যাখে—কিন্তু পাঞ্জাবী স্ত্রীলোকটি সঙ্গে থাকে বলিয়া লজ্জায় পারে না।
অপু তো একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছে। এরকম কাণ্ডকারখানা সে কখনো কল্পনায় আনিতে পারে নাই। তাদের বাসা হইতে দশাশ্বমেধ ঘাট বেশী দূর নয়, রোজ বিকালে সে সেখানে বেড়াইতে যায়। রোজই যেন চড়কের মেলা লাগিয়াই আছে। এখানে গান হইতেছে, ওখানে কথা হইতেছে, ওদিকে কে একজন রামায়ণ পড়িতেছে, লোকজনের ভিড়, হাসিমুখ, উৎসব, অপু সেখানে শুধু ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইয়া দেখে আর সন্ধ্যার পর বাড়ী আসিয়া মহাউৎসাহে গল্প করে।
কাহাদের চাকর একটি ছোট ছেলেকে কোমরে দড়ি বাঁধিয়া রোজ বেড়াইতে আনে, অপু ভাব করিয়াছে—তার নাম পল্টু, ভাল কথা কহিতে জানে না, ভারী চঞ্চল, তাই পাছে হারাইয়া যায় বলিয়া বাড়ীর লোকেদের এই জেল-কয়েদীর মত ব্যবস্থা। অপু হাসিয়া খুন। চাকরকে অনুরোধ করিয়াছিল, কিন্তু সে ভয়ে দড়ি খুলিতে চাহে না। বন্দী নিতান্ত ক্ষুদ্র ও অবোধ—এ ধরনের ব্যবহার যে প্রতিবাদযোগ্য, সে জ্ঞানই তাহার নাই। আসিলে সর্বজয়া রোজ তাহাকে বকে—এক্লা এক্লা ওরকম যাস্ কেন? শহর বাজার জায়গা, যদি রাস্তা হারিয়ে ফেলিস্?...মায়ের আশঙ্কা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, একথা সে মাকে হাত নাড়িয়া দুবেলা অধ্যবসায়সহকারে বুঝায়। কাশীতে আসিয়া হরিহরের আয়ও বাড়িল। কয়েক স্থানে হাঁটাহাঁটি করিয়া সে কয়েকটি মন্দিরে নিত্য পুরাণ- পাঠের কার্য যোগাড় করিল। তাহা ছাড়া একদিন সর্বজয়া স্বামীকে বলিল—দশাশ্বমেধ ঘাটে রোজ বিকেলে পুঁথি নিয়ে বোসো না কেন? কত ফিকিরে লোক পয়সা আনে, তোমার কেবল ব’সে ব’সে পরামর্শ আঁটা—
স্ত্রীর তাড়া খাইয়া হরিহর কাশীখণ্ডের পুঁথি লইয়া বৈকালে দশাশ্বমেধ ঘাটে বসে। পুরাণ পাঠ করা তাহার কিছু নতুন ব্যবসায় নহে, দেশে শিষ্যবাড়ী গিয়া কত ব্রতপার্বণ উপলক্ষ্যে সে এ কাজ করিয়াছে। পুঁথি খুলিয়া সুস্বরে সে বন্দনা গান শুরু করে—
বর্হাপীড়াভিরামং মৃগমদতিলকং কুণ্ডলাক্রান্তগণ্ডং।.....স্মিতসুভগমুখং স্বাধরে ন্যস্ত বেণুং
.....ব্রহ্মগোপালবেশং।
ভিড় মন্দ হয় না।
বাসায় ফিরিয়া বালির কাগজে কি লেখে। স্ত্রীকে বলে, শুধু শ্লোক প’ড়ে গেলে কেউ শুনতে চায় না—ওই বাঙাল কথকটার ওখানে আমার চেয়ে বেশী ভিড় হয়—ভেবেচি গোটাকতক পালা লিখবো, গান থাক্বে, কথকতার মতও থাক্বে, নৈলে লোক জমে নে— বাঙালটার সঙ্গে পরশু আলাপ হোলো, দেবনাগরীর অক্ষর- পরিচয় নেই, শুধু ছড়া কেটে মেয়ে ভুলিয়ে পয়সা নয়ে... আমার রেকাবী কুড়িয়ে ছ’ আনা, আট আনা, আর ওর একটা টাকার কম নয়....শুন্বে একটু কেমন লিখ্চি।
খানিকটা সে পড়িয়া শোনায়। বলে—ওই কথকের পুঁথি দেখে বনের বর্ণনাটা লিখে নেবো ভেবেচি —তা কি দেবে?
—তুমি কোনখানটায় ব’সে কথা বলো বল তো? একদিন শুন্তে যেতে হবে—
—যেও না, ষষ্ঠীর মন্দিরের নীচেই বসি—কালই যেও, নূতন পালাটা বল্বো, কাল একাদশী আছে, দিনটা ভালো—
—আস্বার সময় বিশ্বেশ্বরের গলির দোকান থেকে চার পয়সার পানফলের জিলিপী এনো দিকি অপুর জন্যে- সেদিন ওপরের খোট্টা বউ কি পুজো ক'রে আমায় ডেকে নিয়ে গিয়ে জল খেতে দিলে, বল্লে, পানফলের জিলিপী, বিশ্বেশ্বরের গলিতে পাওয়া যায়, খেতে গিয়ে ভাব্লাম অপু জিলিপী খেতে বড় ভালবাসে—তা জল খেতে দিয়েছে আমি আর কি ব’লে নিয়ে আসি—এনো দিকি আজ চার পয়সার।।
কয়েকদিন ধরিয়া হরিহরের কথকতা শুনিতে বেশ ভিড় হইতেছে। একখানা বড় বারকোষে করিয়া নারদঘাটের কালীবাড়ীর ঝি বড় একটা সিধা আনিয়া অপুদের দাওয়ায় নামাইল। সর্বজয়া হাসিমুখে বলিল— আজ বুঝি বারের পুজো? উনি বাড়ী আসচেন দেখ্লে, হাঁ ঝি? চলিয়া গেলে ছেলেকে ডাকিয়া বলিল—এদিকে আয় অপু—এই দ্যাখ্ তোর সেই নারকেলের ফোঁপল তুই ভালবাসিস্? কিশ্মিশ্, কলা, কত বড় বড় আম দেখেছিস্, আয় খাবি, দিই—বোস্ এখানে—
উৎসাহ পাইয়া হরিহর পুরাতন খাতাপত্রের তাড়া আবার বাহির করে। সর্বজয়া বলে—ধ্রুবচরিত্র শুন্তে শুন্তে লোকের কান যে ঝালাপালা হোলো, নতুন একটা কিছু ধরো না? সারা সকাল ও দুপুর বসিয়া হরিহর একমনে জড়ভরতের উপাখ্যানকে কথকতার পালার আকারে লিখিয়া শেষ করে। মনে পড়ে এই কাশীতেই বসিয়া আজ বাইশ বৎসর পূর্বে যখন সে গীতগোবিন্দের পদ্যানুবাদ করে, তখন তাহার বয়স ছিল চব্বিশ বৎসর। দেশে গিয়া জীবনের উদ্দেশ্য যেন নিজের কাছে আরও পরিস্ফুট হইয়া উঠিল। কাশীতে এত ছিল না— দেশে ফিরিয়া চারিধারে দাশুরায়ের গান, দেওয়ানজীর গান, গোবিন্দ অধিকারীর শকুসারীর দ্বন্দ্ব, লোকা ধোপার দলের মতি জুড়ির গানের বিস্তৃত প্রচলন ও পসার তাহার মনে একটা নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তার করিল।
রাত্রে স্ত্রীর কাছে গল্প করিত বাজারের বারোয়ারীতে কবির গান হচ্ছে বুঝ্লে? ব'সে ব'সে শনু্লাম, বুঝলে?....সোজা পদ সব...কিছুই না, রও না, সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে বসি ভাল হয়ে— নতুন ধরনের পালা বাঁধবো—এরা সকলে গায় সেই সব মান্ধাতা আমলের পদ—রাজুকে তাই কাল বল্ছিলাম—
অনেক রাত্রে উঠিয়া এক-একদিন হরিহর বাহিরে দাওয়ায় বসিয়া কি ভাবিত, অনির্দিষ্ট কোন্ আনন্দে তাহার মন যেন পালকের মত হালকা হইয়া উঠিত।
কি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাহার সম্মুখে!...
ঝাড়লণ্ঠনের আলো-দোলানো বড় আসরে সে দেখিতে পায়, দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে তাহার ছড়া, গান, শ্যামা-সঙ্গীত, পদ, রাত্রির পর রাত্রি ধরিয়া গাওনা হইতেছে। কত দূর-দূরান্তর হইতে মাঠ ঘাট ভাঙিয়া লোক খাবারের পুঁটুলি বাঁধিয়া আনিয়া বসিয়া আছে শুনিতে। দলের অধিকারীর তাহার বাড়ী আসিয়া সাধিয়া পালা চাহিয়া লইয়া গিয়াছে।।
বাঃ! ভারী চমৎকার তো! কার বাঁধা ছড়া?—“কবির গুরু ঠাকুর হরু-" হরু ঠাকুরের? না। নিশ্চিন্দিপুরের হরিহর রায় মহাশয়ের।
এই দশাশ্বমেধ ঘাটেই বসিয়া তো বাইশ বৎসর পূর্বে মনে মনে কত ভাঙাগড়া করিয়াছে—তারপর কবে সে সব ধীরে ধীরে ভুলিয়া গেল কবে ধীরে ধীরে নূতন খাতাপত্রের তাড়া বাক্সের অনাদৃত, গুপ্ত কোণ আশ্রয় করিয়া দিনের আলো হইতে মুখ লুকাইয়া রহিল—যৌবনের স্বপ্নজাল জীবনমধ্যাহ্নে কুয়াসার মত দিগন্তে মিলাইয়া গেল।
হারানো যৌবনের দিকে চাহিয়া দেখিলে বুকের মধ্যে কেমন করিয়া ওঠে, কত কথা মনে পড়ে— জীবনের সে সব দিনকে আর একটিবারও ফেরানো যায় না?
দশাশ্বমেধ ঘাটে অনেক ছেলের সঙ্গে অপুর ভাব হইয়াছে। কিন্তু এখানে তাহার বয়সী সব ছেলেই স্কুলে পড়ে, সে-ই কেবল এখনো স্কুলে পড়ে নাই। নিশ্চিন্দিপুরে মাছ ধরিয়া ও নৌকায় বেড়াইয়া দিন কাটানো চলিত বটে, কিন্তু এখানে সমবয়সীদের কাছে কিছু পড়ে না বলিতে লজ্জা করে।
তাহা ছাড়া দশাশ্বমেধ ঘাটে যেসব ছেলের সঙ্গে তাহার ভাব হইয়াছে, সবাই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। পল্টুর দাদা একদিন কথায় কথায় বলিয়াছিল যে তাহার বাবাকে খুব বিদেশে বেড়াইতে হয়। অপু বলিয়াছিল—কেন, তোমাদের বুঝি খুব শিষ্য-বাড়ী আছে?
পল্টুর দাদা আশ্চর্য হইয়া বলিল—শিষ্য-বাড়ী? কিসের ভাই?...
অপু সদুত্তর দিবার পূর্বেই সে বলিল—আমার বাবা কন্ট্রাক্টরী করেন কি না? তা ছাড়া কাঁথিতে ছোট জমিদারী আছে—তবে আজকাল কিস্তি দিয়ে কিই বা থাকে?
এক-একদিন বৈকালে অপু দশাশ্বমেধ ঘাটে বেড়াইতে গিয়া বাবার মুখে পুরাণপাঠ শোনে। হরিণশিশু শ্বাপদ কর্তৃক নিহত হইলে হরিণবালকের স্নেহাসক্ত রাজর্ষি ভরতের করুণ বিরহবেদনা ও পরিশেষে তাঁহার মৃত্যুর কাহিনী ষষ্ঠী মন্দিরে পৈঠার উপর বসিয়া একমনে শুনিতে শুনিতে তাহার চোখে জল আসে—এদিকে আবার যখন সিন্ধু সৌবীরের রাজা রহুগণ তাঁহার স্বরূপ না জানিয়া ব্রহ্মর্ষি ভরতকে শিবিকাবাহক নিযুক্ত করেন—তখন হইতে কৌতূহলে ও উৎকণ্ঠায় তাহার বুক দুরু দুরু করে, মনে হয় এইবার একটা কিছু ঘটিবে; ঠিক ঘটিবে। কথকতার শেষ পূরবী সুরের আশীর্বচনটি তাহার ভারী ভাল লাগে—
কালে বর্ষতু পর্জন্যং পৃথিবী শস্যশালিনী...
লোকাঃ সন্তু নিরাময়াঃ.....
সন্ধ্যার দিকে মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খঘণ্টার ধ্বনির সঙ্গে অস্তসূর্যের রাঙা আভা ও পূরবীর মূর্ছনার সঙ্গে হরিণ- বালকের বিয়োগবেদনাতুর রাজর্ষির ব্যথা যেন মিশাইয়া থাকে।
বাড়ীতে কাগজ কলম বাবার কাছে লইয়া গিয়া বলে—আমায় লিখে দাও না বাবা, ঐ যে তুমি গাও—কালে বর্ষতু পর্জন্যং?
হরিহর খুশী হইয়া বলে—তুই বুঝি শুনিস্ খোকা?
—আমি তো রোজই থাকি—তুমি কাল যখন ভরতের মা মারা যাওয়ার কথা বল্ছিলে আমি তখন তো তোমার পিছন দিকে বসে—ষষ্ঠীর মন্দিরের ধাপে—
—তোর কি রকম লাগে—ভাল লাগে?
—খু-উ-উ-উ-ব। আমি তো রোজ রোজ শুনি—
অপু কিন্তু একটা কথা লুকায়। যেদিন তাহার সঙ্গীরা থাকে, সেদিন কিন্তু বাবার দিকে সে যায় না। সেদিন বাবার নিকট দিয়া যাইতেছিল, তাহার বাবা দেখিতে পাইয়া ডাকিল—খোকা, ও খোকা—
তাহার সঙ্গের বন্ধুটি বলিল—তোমাকে চেনে নাকি?
অপু শুধু ঘাড় নাড়িয়া জানায়, হাঁ। সে বাবার কাছে আসে নাই সেদিন। তাহার বাবা ঘাটে কথকতা করিতেছে, একথা বন্ধুরা পাছে টের পায়! সে পল্টুর দাদা ছাড়া অন্য বন্ধুদের কাছে গল্প করিয়াছে, কাশীতে তাহাদের বাড়ী আছে, তাহারা কাশীতে হাওয়া বদলাইতে আসিয়াছে, দেশে খুব বড় বাড়ী, তাহার বাবা কন্ট্রাক্টারী করেন, তা ছাড়া দেশে জমিদারীও আছে। শেষে বলে—কিন্তু জমিদারী থাকলে কি হবে, কিস্তি দিয়ে কিই বা থাকে?
তাহার বন্ধুদের বয়স তাহার অপেক্ষা খুব বেশী নয় বলিয়াই বোধ হয় তাহার বর্ণিত গল্পের সঙ্গে তাহার পোশাক-পরিচ্ছদের অসঙ্গতি ধরা পড়ে না, বিশেষতঃ তাহার সুন্দর মুখের গুণে সব মানাইয়া যায়।
পূর্ণিমার দিন কথক ঠাকুরের ওখানে বেশ ভিড় হইল। সন্ধ্যার পর হরিহর কথা শেষ করিয়া ঘাটের রাণায় বসিয়া বিশ্রাম করিতেছে, কথক ঠাকুর জলে হাত মুখ ধুইতে নামিল। হরিহরকে দেখিয়া বলিল—এই যে আপনিও আছেন, দেখলেন তো কাণ্ড, পুন্নিমের দিনটা বলি আজ দিনটা ভাল আছে, বামন-ভিক্ষে লাগাই—মাসে মাসে এই কাশীতে বামন-ভিক্ষা হোলে পরে পনের সের আধমণ ক’রে চাল পড়তো—আজকাল মশাই মহা বামন-ভিক্ষেতেও লোকে আর ভেজে না—চালের তো একটা দানাও না—এদিকে সিকে পাঁচেক হবে, তার মধ্যে আবার দুটো অচল দোয়ানি!...মশায়ের শিক্ষা কোথায়?
—শিক্ষা তো ছিল এই কাশীতেই অনেকদিন আগে। তবে এত দিন দেশেই ছিলাম—এইবার এখানে এসে বাসা ক’রে আছি...।
—মশায়ের বাসা কি নিকটে?...একটু চা খাওয়াতে পারেন?...ক’দিন থেকে ভাব্চি একটু চা খাবো—এই দেখুন না, চাদরের মুড়োয় চা বেঁধে নিয়ে ঘুরি, বলি না হয় কোনো হালুইকরের দোকানে একটু গরম জল করিগে... গলা বসে গিয়েছে, একটু লোন্-চা খেলে গলাটা...
—হাঁ হাঁ, আসুন না এই তো নিকটেই আমার বাসা—চলুন না? কথককে লইয়া হরিহর বাড়ী আসিল।
চা খাওয়ার পাট কোন কালে নাই। কড়ায় জল গরম করিয়া চা তৈরী হইল। অপু কাঁসার গ্লাসে চা ও রেকাবীতে কিছু খাবার কথকের সামনে লইয়া আসিল। খাবার দেখিয়া কথকঠাকুর ভারি খুশি হইল—খাবারের আশা সে করে নাই।
—এটি ছেলে বুঝি! বাঃ, বেশ ছেলে তো আপনার? ভারী সুন্দর দেখতে বাঃ—এসো এসো বাবা, থাক থাক্ কল্যাণ হোক্- লোন্-চা করিয়েছেন তো মশায়?...দেখি—
হরিহর বলিল—আপনার কি ছেলেপিলে সব এখানেই—
—সংসারই নেই তো ছেলেপিলে?....দশ বিঘে জমিও বেরিয়ে গেল অথচ ও মূলেও হাভাতজমি ক’বিঘে যদি আজ থাক্তো—তো আজ কি এই এতদূরে আসি—আপনিও যেমন!...এসব কি আর দেশ মশাই?...বিশ্বেশ্বর অবিশ্যি মাথায় থাকুন—এমন শীতকাল যাচ্চে মশাই— না একটু খেজুর রস, না একটু গুড় পাটালি— আমার নিজের মশাই দু’কুড়ি খেজুর গাছ-
—মশাইয়ের দেশটা কোথায়?
—সাতক্ষীরের সন্নিকট বাদুড়ে—শীতলকাটি জানেন? শীতলকাটির চক্কত্তিরা খুব ঘরানা—
হরিহর তামাক সাজিয়া নিজে কয়েক টান্ দিয়া কথকঠাকুরের হাতে দিয়া বলিল—খান—কিছু না মশায়, ফাগুন মাসের দিকে তো যাই—একটা বাগান আছে, দিয়ে আসি বিক্রি ক’রে—আমরা আবার শ্রোত্রিয় কিনা?...তা জমি দশ বিঘে ছিল তাই বন্ধক দিয়ে পণ যোগাড় করলাম—বিয়েও করলাম,— মশাই দশ বছর ঘর করলাম—হোল কি জানেন? সন্ধ্যাবেলা রান্নাঘরের চাল থেকে কুমড়ো কাটতে গিয়েছে— ছিল মশাই সেখানে সাপ আমার জন্যে তৈরী হয়ে— হাতে দিয়েচে কামড়ে— আমি আবার নেই সেদিন বাড়ী— কেই বা বদ্যি কবরেজ দেখিয়েছে, কেই বা করেচে—পাটুলির ঘাট পার হচ্চি–গাঁয়ের মহেশ সাধুখাঁ ওপার থেকে আস্চে, আমায় বল্লে—শিগ্গির বাড়ী যান মশায়—আপনার বাড়ী বড় বিপদ—কি বিপদ তা বলে না-বাড়ী পৌঁছে দেখি আগের রাত্রিতেই বৌ তো গিয়েচে মরে! এই গেল ব্যাপার মশাই...জমিকে জমি গেল—এদিকেও। সেই থেকে বলি যাই, দেশে থেকে আর কিই বা হবে— কোত্থেকে পাবো তিন-চারশো টাকা যে আবার বিয়ে করবো?...যাই বিশ্বনাথের ওখানে...অন্নকষ্টটা তো হবে না...আজ বছর আষ্টেক হয়ে গেল—এক খুড়তুতো ভাই আছে—জমিজমা সামান্য যা একটু আছে, দখল ক’রে ব’সে আছে— বলে তোমার ভাগ নেই—বেশ বাপু নেই তো নেই গোলমালের মধ্যে কখ্খনো আমি যাবো না— করগে যা দখল। উঠি মশাই—আপনার এখানে বেশ চা খাওয়া গেল—আপনার ছেলেটি কোথায় গেল?...বেশ ছেলে, খাসা ছেলে—
পুরানো চামড়ায় তালি দেওয়া ক্যাম্বিসের জুতা জোড়াটা ঝাড়িয়া লইয়া কথকঠাকুর পায়ে দিয়া দরজার কাছে আসিল—যাইতে যাইতে বলিল—কালও লাগাবো বামনভিক্ষে—দেখি কি হয়—
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.