Skip to content
Back to story
আনন্দমঠ Matribhasa Bangla · তৃতীয় খণ্ড — ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
A historical fiction-themed illustration for আনন্দমঠ

তৃতীয় খণ্ড — ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

10.6K 1.3K 0

মঠে না গিয়া ভবানন্দ গভীর বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন। সেই জঙ্গলমধ্যে এক স্থানে এক প্রাচীন অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ আছে। ভগ্নাবশিষ্ট ইষ্টকাদির উপর, লতাগুল্মকণ্টকাদি অতিশয় নিবিড়ভাবে জন্মিয়াছে। সেখানে অসংখ্য সর্পের বাস। ভগ্ন প্রকোষ্ঠের মধ্যে একটি অপেক্ষাকৃত অভগ্ন ও পরিষ্কৃত ছিল, ভবানন্দ গিয়া তাহার উপরে উপবেশন করিলেন। উপবেশন করিয়া ভবানন্দ চিন্তা করিতে লাগিলেন।

রজনী ঘোর তমোময়ী। তাহাতে সেই অরণ্য অতি বিস্তৃত, একেবারে জনশূন্য, অতিশয় নিবিড়, বৃক্ষলতা দুর্ভেদ্য, বন্য পশুরও গমনাগমনের বিরোধী। বিশাল জনশূন্য, অন্ধকার, দুর্ভেদ্য, নীরব! রবের মধ্যে দূরে ব্যাঘ্রের হুঙ্কার অথবা অন্য শ্বাপদের ক্ষুধা, ভীতি বা আস্ফালনের বিকট শব্দ। কদাচিৎ কোন বৃহৎ পক্ষীর পক্ষকম্পন, কদাচিৎ তাড়িত এবং তাড়নকারী, বধ্য এবং বধকারী পশুদিগের দ্রুতগমন-শব্দ। সেই বিজনে অন্ধকারে ভগ্ন অট্টালিকার উপর বসিয়া একা ভবানন্দ। তাঁহার পক্ষে তখন যেন পৃথিবী নাই, অথবা কেবল ভয়ের উপাদানময়ী হইয়া আছেন।

সেই সময় ভবানন্দ কপালে হাত দিয়া ভাবিতেছিলেন ; স্পন্দ নাই, নিশ্বাস নাই, ভয় নাই, অতি প্রগাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন। মনে মনে বলিতেছিলেন, “যাহা ভবিতব্য, তাহা অবশ্য হইবে। আমি ভাগীরথীজলতরঙ্গসমীপে ক্ষুদ্র গজের মত ইন্দ্রিয়স্রোতে ভাসিয়া গেলাম, ইহাই আমার দু:খ। এক মুহূর্তে দেহের ধ্বংস হতে পারে – দেহের ধ্বংসই ইন্দ্রিয়ের ধ্বংস – আমি সেই ইন্দ্রিয়ের বশীভূত হইলাম? আমার মরণ শ্রেয়। ধর্মত্যাগী? ছি! মরিব!” এমন সময়ে পেচক মাথার উপর গম্ভীর শব্দ করিল।

ভবানন্দ তখন মুক্তকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “ও কি শব্দ? কাণে যেন গেল, যম আমায় ডাকিতেছে। আমি জানি না –কে শব্দ করিল, কে আমায় ডাকিল, কে আমায় বিধি দিল, কে মরিতে বলিল! পুণ্যময়ি অনন্তে! তুমি শব্দময়ী, কিন্তু তোমার শব্দের ত মর্ম আমি বুঝিতে পারিতেছি না। আমায় ধর্মে মতি দাও, আমায় পাপ হইতে নিরত কর। ধর্মে,-হে গুরুদেব! ধর্মে যেন আমার মতি থাকে!”

তখন সেই ভীষণ কাননমধ্যে হইতে অতি মধুর অথচ গম্ভীর, মর্মভেদী মনুষ্যকণ্ঠ শ্রুত হইল ; কে বলিল, “ধর্মে তোমার মত থাকিবে – আশীর্বাদ করিলাম |”

ভবানন্দের শরীরে রোমাঞ্চ হইল। “এ কি এ? এ যে গুরুদেবের কণ্ঠ। মহারাজ, কোথায় আপনি! এ সময়ে দাসকে দর্শন দিন |”

কিন্তু কেহ দর্শন দিল না – কেহ উত্তর করিল না। ভবানন্দ পুন: পুন: ডাকিলেন – উত্তর পাইলেন না। এদিক ওদিক খুঁজিলেন – কোথাও কেহ নাই।

যখন রজনী প্রভাতে প্রাত:সূর্য উদিত হইয়া বৃহৎ অরণ্যের শির:স্থ শ্যামল পত্ররাশিতে প্রতিভাসিত হইতেছিল, তখন ভবানন্দ মঠে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কর্ণে প্রবেশ করিল–“হরে মুরারে! হরে মুরারে!” চিনিলেন – সত্যানন্দের কণ্ঠ। বুঝিলেন, প্রভু প্রত্যাগমন করিয়াছেন।

0 Next
Continue to next part Up next তৃতীয় খণ্ড — সপ্তম পরিচ্ছেদ
Previous part

Recommended for you

Comments (0)

Log in to join the conversation.