গ্রামের অন্নদা রায় মহাশয় সম্প্রতি বড় বিপদে পড়িয়াছেন।
গ্রামের জরীপ আসাতে উত্তর মাঠে তাঁবু পড়িয়াছে। জরীপের বড় কর্মচারী মাঠের মধ্যে নদীর ধারে অফিস খুলিয়াছেন, ছোটখাটো আমলাও সঙ্গে আসিয়াছে বিস্তর। গ্রামের সকল ভদ্রলোকই কিছু জমিজমার মালিক; পিতৃপুরুষের অর্জিত এই সব সম্পত্তির নিরাপদ কূলে জীবনতরণীর লগি কষিয়া পুঁতিয়া জড় পদার্থের ন্যায় উদ্যমহীন, গতিহীন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দিনগুলি একরূপ বেশই কাটিতেছিল কিন্তু এবার সকলেই একটু বিপদগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছেন। রাম হয়ত শ্যামের জমি নির্বিবাদে নিজের বলিয়া ভোগ করিয়া আসিতেছে, যদু দশ বিঘার খাজনায় বারো বিঘা নিরুপদ্রবে দখল করিতেছে, এতদিন যাহা পূর্ণ শান্তিতে নিষ্পন্ন হইতেছিল, এইবার সেই সকলের মধ্যে গোলমাল পৌঁছিল।
বিপদ একরূপ সর্বজনীন হইলেও অন্নদা রায়ের বিপদ একটু অন্য ধরনের বা একটু বেশী গুরু তর। তাঁহার এক জ্ঞাতিভ্রাতা বহুদিন যাবৎ পশ্চিম-প্রবাসী। এতদিন তিনি উক্ত প্রবাসী জ্ঞাতির আম-কাঁঠালের বাগান ও জমি নির্বিঘ্নে ভোগ করিতেছিলেন এবং সম্পূর্ণ ভরসা ছিল জরীপের সময় পারিয়া উঠিলে সবই, অন্ততঃপক্ষে কতকাংশ নিজের বলিয়া লিখাইয়া লইবেন, কিন্তু কি জানি গ্রামের কে উক্ত প্রবাসী জ্ঞাতিকে কি পত্র লিখিয়াছে—ফলে অদ্য দিন দশেক হইল জ্ঞাতিভ্রাতার জ্যেষ্ঠপুত্রটি জরীপের সময় বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনা করিতে আসিয়াছে। মুখের গ্রাস তো গেলই, তাহা ছাড়া বিপদ আরও আছে। ঐ আত্মীয়ের অংশের ঘরগুলিই বাড়ীর মধ্যে ভাল, রায় মহাশয় গত বিশ বৎসর সেগুলি নিজে দখল করিয়া আসিতেছেন, সেগুলি ছাড়িয়া দিতে হইয়াছে—জ্ঞাতিপুত্রটি শৌখীন ধরনের কলেজের ছেলে, একখানিতে শোয়, একখানিতে পড়াশুনা করে— উপরের ঘরখানি হইতে সিন্দুক, বন্ধকী মাল, কাগজপত্রাদি সরাইয়া ফেলিতে হইয়াছে। নীচের যে ঘরে পালিতপাড়া হইতে সস্তাদরে কেনা কড়িবরগা রক্ষিত ছিল, সে ঘরও শীঘ্র ছাড়িয়া দিতে হইবে।
বৈকালবেলা। অন্নদা রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে পাড়ার কয়েকটি লোক আসিয়াছেন—এই সময়েই পাশা খেলার মজলিস বসে। কিন্তু অদ্য এখনও কাজ মেটে নাই। অন্নদা রায় একে একে সমাগত খাতক-পত্র বিদায় করিতেছিলেন।
উঠানের রোয়াকের ঠিক নীচেই এক অল্পবয়সী কৃষক-বধূ একটা ছোট ছেলে সঙ্গে লইয়া অনেকক্ষণ হইতে ঘোমটা দিয়া বসিয়া ছিল, সে এইবার তাহার পালা অসিয়াছে ভাবিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। রায় মহাশয় মাথা সামনে একটু নীচু করিয়া চশমার উপর হইতে তাহার দিকে চাহিয়া বলিলেন—কে? তোর আবার কি?
কৃষক-বধূটি আঁচলের খুঁট খুলিতে খুলিতে নিম্নকণ্ঠে বলিল—মুই কিছু টাকার যোগাড় করিচি অনেক কষ্টে, মোর টাকাডা নেন... আর গোলার চাবিটা খুলে দ্যান, বড্ড কষ্ট যাচ্ছে মনিব ঠাকুর, সে আর কি বলবো—
অন্নদা রায়ের মুখ প্রসন্ন হইল, বলিলেন—হরি, নেও তো ওর টাকাটা গুনে। খাতাখানায় দেখো— তারিখটা, সুদটা আর একবার হিসেব করে দেখো!
কৃষক-বধূ আঁচলের খুঁট হইতে টাকা বাহির করিয়া হরিহরের সম্মুখে রোয়াকের ধারে রাখিয়া দিল। হরিহর গুনিয়া বলিল—পাঁচ টাকা?
রায় মহাশয় বলিলেন—আচ্ছা—জমা করে নাও—তার পর আর টাকা কৈ?
—ওই এখন ন্যান, তারপর দোবো—মুই গতর খাটিয়ে—শোধ করে তোলবো, এখন ওই নিয়ে মোর গোলার চাবিডা খুলে দ্যান্, মোর মাতোরে দুটো খেইয়ে তো আগে বাঁচাই, তা পর ঘরদোর ফুটো হয়ে গিয়েচে, সে না হয়—
এমন নিরুদ্বেগে কথা বলিতেছিল যেন গোলার চাবি তাহার করতলগত হইয়া গিয়াছে। রায় মহাশয়কে চিনিতে তাহার বিলম্ব ছিল।
রায় মহাশয় কথা শেষ করিতে না দিয়াই বলিলেন—ওঃ, ভারী যে দেখছি মাগীর আব্দার, চল্লিশ টাকার কাছাকাছি সুদে আসলে বাকী—পাঁচ টাকা এনিচি, নিয়ে গোলা খুলে দ্যান, ছোট লোকের কাণ্ডই আলাদা। যা এখন দুপুরবেলা দিক্ করিস্ নে—
কৃষক-বধূ চণ্ডীমণ্ডপের অন্য কাহারও অপরিচিতা নহে, দীনু ভট্টচায্যি চোখে ভাল দেখিতেন না, বলিলেন— কে ও অন্নদা?
—ওই ও-পাড়ার তমরেজের বৌ দিন চারেক হোলো তমরেজ না মারা গিয়েছে? সুদে আসলে চল্লিশ টাকা বাকী, তাই মরবার দিনই বিকেল থেকে গোলায় চাবি দিয়ে রেখেচি, এখন গোলা খুলিয়ে দ্যান্— হেন করুন— তেন করুন-
পায়ের তলা হইতে মাটি সরিয়া গেলেও তমরেজের বৌ অত চমকিয়া উঠিত না— সে ব্যাপার এখন অনেকটা বুঝিল, আগাইয়া আসিয়া বলিল—ওকথা বলবেন না মনিব ঠাকুর, মোর খোকার একটা রুপোর নিমফল ছেল, ও বছর গড়িয়ে দিইছিল! তাই ভোঁদা সেক্রার দোকানে বিক্রী কল্লে পাঁচটা টাকা দেলে— ছেলেমানুষের জিনিস ব্যাচবার ইচ্ছে ছেল না, তা কি করি, এখন দুটো খেইয়ে বাঁচি, ভাবলাম এর পর দিন দেন মালিক তো মোর বাছারে মুই আবার নিমফল গড়িয়ে দেবো। তা দেন মনিব ঠাকুর চাবিডা গিয়ে—
যা যা--এখন যা—এ সব টাকাকড়ির কাণ্ড কি নাকে কাঁদ্লেই মেটে? তা মেটে না। সে তুই কি বুঝবি, থাক্তো তোর সোয়ামী তো বুঝতো, যা এখন দিক্ করিস্ নি—ওই পাঁচ টাকা তোর নামে জমা রৈল— বাকী টাকা নিয়ে আয় তারপর দেখা যাবে-
অন্নদা রায় চশমা খুলিয়া খাপের মধ্যে পুরিতে পুরিতে উঠিয়া পড়িলেন ও বাড়ীর ভিতর চলিয়া যাইবার উদ্যোগ করিলেন। তমরেজের বৌ আকুল সুরে বলিয়া উঠিল- কনে যান্ ও মনিব ঠাকুর, মোর খোকার একটা উপায় করে যান, ওরে মুই খাওয়াবো কি, এক পয়সার মুড়ি কিনে দেবার যে পয়সা নেই—মোর গোলা না খুলে দ্যান্, মোর টাকা কডা মোরে ফেরত দ্যান্,
রায় মহাশয় মুখ খিঁচাইয়া বলিলেন—যা যা সন্ধে বেলা মাগী ফ্যাচ্ ফ্যাচ্ করিস নে—এক মুঠো টাকা জলে যাচ্চে তার সঙ্গে খোঁজ নেই, গোলা খুলে দাও, টাকা ফেরত দাও—গোলায় আছে কি তোর? জোর শলি চারেক ধান, তাতে টাকা শোধ যাবে? ও পাঁচ টাকাও উসুল হয়ে রৈল, আমার টাকা দেখ্বো না! ওঁর ছেলে কি খাবে বলে দ্যাও—ছেলে কি খাবে তা আমি কি জানি? যা, পারিস্ তো নালিশ করে খোলাগে যা!
রায় মহাশয় বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেলে দীনু ভট্চায্যি বলিলেন—হ্যাঁগো বৌ, তমরেজ কদিন হোলো—কৈ তা তো-
—বুধবারের দিন বাবা ঠাকুর, হাট থে ভাঙন মাছ আন্লে, পেঁয়াজ দিয়ে রাঁধলাম—ভাত দেলাম—সহজ মানুষ ভাল খেলে দিব্যি- খেয়ে বল্লে মোর শীত করচে, কাঁথা চাপা দিয়ে দ্যাও, দেলাম—ওমা সঁইতে তারা উঠতি না উঠতি মানুষ দেখি আর সাড়াশব্দ দয়ে না, দুপুর হতি না হতি মোরে পথে বসিয়ে—মোর খোকারে পথে বসিয়ে—চোখের জলে তাহার গলা আটকাইয়া গেল। মিনতির সুরে বলিল—আপনারা এট্টু বলেন— বলে গোলার চাবিডা দিইয়ে দ্যান, সংসারে বড্ড কষ্ট হয়েচে—কর্জ কি মুই বাকী রাখবো—ঝে করে হোক্।
এই সময়ে নবাগত জ্ঞাতিপুত্রটি আসিয়া পড়াতে কথাবার্তা বন্ধ হইল। দীনু বলিলেন—এস হে নীরেন বাবাজী, মাঠের দিকে বেড়াতে গিয়েছিলে বুঝি? এই তোমার বাপ-ঠাকুরদার দেশ বুঝ্লে হে, কি রকম দেখলে বলো?
নীরেন একটু হাসিল। তাহার বয়স একুশ-বাইশের বেশী নয়, বেশ বলিষ্ঠ গড়ন, সুপুরুষ। কলিকাতার কলেজে আইন পড়ে, অত্যন্ত মৌনী প্রকৃতির মানুষ—দেখিবার জন্য পিতা কর্তৃক প্রেরিত হইলেও কাজকর্ম সে কিছুই দেখে না বোঝেও না, দিনরাত নভেল পড়িয়া ও বন্দুক ছুঁড়িয়া কাটায়। সঙ্গে একটি বন্দুক আনিয়াছে, শিকারের ঝোঁক খুব।
নীরেন উপরে নিজের ঘরে ঢুকিতে গিয়া দেখিল, গোকুলের স্ত্রী ঘরের মেঝেতে বসিয়া পড়িয়া মেঝে হইতে কি খুঁটিয়া তুলিতেছে। দোরের কাছে যাইতেই তাহার নজর পড়িল, তাহার দামী বিলাতী আলোটা মেজেতে বসানো। উহার কাচের ডুমটা ভাঙিয়া চুরমার হইয়াছে, সারা মেজেতে কাচ ছড়ানো। দোরের কাছে জুতার শব্দ পাইয়া গোকুলের স্ত্রী চম্কাইয়া পিছন ফিরিয়া চাহিল, সে আঁচল পাতিয়া মেজে হইতে কাচের টুকরাগুলি খুঁটিয়া খুঁটিয়া তুলিতেছিল, ভাবে মনে হয় প্রতিদিনের মত ঘর পরিষ্কার করিতে আসিয়া আলোটি জ্বালিতে গিয়াছিল, কি করিয়া ভাঙিয়া ফেলিয়াছে, এবং আলোর মালিক আসিবার পূর্বেই নিজেই অপরাধের চিহ্নগুলি তাড়াতাড়ি সরাইয়া ফেলিবার চেষ্টায় ছিল হঠাৎ বামাল ধরা পড়িয়া অত্যন্ত অপ্রতিভ হইল। ক্ষতিকারিণীর লজ্জার ভারটা লঘু করিয়া দিবার জন্যই নীরেন হাসিয়া বলিয়া উঠিল—এই যে বৌদি, আলোটা ভেঙে বসে আছেন বুঝি? এই দেখুন ধরা পড়ে গেলেন, জানেন তো আইন পড়ি। আচ্ছা এখন একটু চা ক'রে নিয়ে আসুন তো বৌদি, চট্ করে, দেখি কেমন কাজের লোক। দাঁড়ান আলোটা জ্বেলে নিই, ভাগ্যিস বাক্সে আর একটা ডুম আছে।
গোকুলের স্ত্রী সলজ্জ সুরে বলিল, দেশলাই আনবো ঠাকুরপো?
নীরেন কৌতুকের সুরে বলিল—দেশলাই আনেননি তবে আলো পেড়ে কি করছিলেন শুনি?
বধূ এবার হাসিয়া ফেলিল, নিম্নসুরে বলিল—ঝুল পড়ে রয়েছে, ভাবলুম একটু মুছে দিই, তা যেমন কাচটা নামাতে গেলাম, কি জানি ও সব ইংরিজি কলের আলো— কথা শেষ না করিয়াই সে পুনরায় সলজ্জ হাসিয়া নীচে পলাইল!
নীরেন দশ বারো দিন আসিয়াছে বটে, সম্পর্কে বৌদিদি হইলেও গোকুলের স্ত্রীর সঙ্গে তাহার বিশেষ আলাপ হয় নাই। কাচ ভাঙার সন্ধ্যা হইতে উভয়ের মধ্যে নতুন পরিচয়ের সঙ্কোচটা কাটিয়া গেল। নীরেন অবস্থাপন্ন পিতার পুত্র, তাহার উপর বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে এই প্রথম আসা, নিঃসঙ্গ আনন্দহীন প্রবাসে দিনগুলি কাটিতে চাহিতেছিল না। সমবয়সী বৌদির সহিত পরিচয়ের পথটা সহজ হইয়া যাওয়ার পর হইতে সকাল-সন্ধ্যায় চা- পানের সময়টি সহজ আদান-প্রদানের মাধুর্যে আনন্দপূর্ণ হইয়া উঠিল!...
দুপুরে সেদিন দুর্গা বেড়াইতে আসিল। রান্নাঘরের দুয়ারে উঁকি মারিয়া বলিল—কি রাঁধচো ও খুড়ীমা? বধূ বলিল—আয় মা আয়, একটু কাজ করে দিবি? একা আর পেরে উঠ্চিনে।...দুর্গা মাঝে মাঝে যখনই আসে, খুড়ীমার কার্যে সাহায্য করে। সে মাছ কুটিতে কুটিতে বলিল—হ্যাঁ খুড়ীমা, এ কাঁকড়া কোথায় পেলে? এ কাঁকড়া তো খায় না।
—কেন খাবে না রে, দূর! বিধু জেলেনী ব'লে গেল এ কাঁকড়া সবাই খায়।
হ্যাঁ খুড়ীমা, ওমা সেকি, তুমি কিনলে? —
কিন্লামই তো, ওই অতগুলো পাঁচ পয়সায় দিয়েছে বিধু।
দুর্গা কিছু বলিল না। মনে মনে ভাবিল—খুড়ীমার আর সব ভাল, কেবল একটু বোকা! এ কাঁকড়া আবার পয়সা দিয়ে কেনেই বা কে, খায়ই বা কে? ভালমানুষ পেয়ে বিধু ঠকিয়ে নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এই সরলা খুড়ীমাটির উপর তাহার স্নেহ নিবিড়তর হইয়া উঠিল।
সেদিন নাকি গোকুল-কাকা খুড়ীমার মাথায় খড়মের বাড়ি মারিয়াছিল—স্বর্ণ গোয়ালিনী তাহাদের বাড়ী গল্প করে। সে-ও সেদিন নদীর ঘাটে স্নান করিতে গিয়েছিল। খুড়ীমা স্নান করিতে আসিয়া মাথা ডুবাইয়া স্নান করিল না, পাছে জ্বালা করে। সেদিন দুঃখে তাহার বুক ফাটিয়া যাইতেছিল; কিন্তু কিছু বলে নাই পাছে খুড়ীমা অপ্রতিভ হয়—এক ঘাট লোকের সামনে লজ্জা পায়। তবুও রায়-জেঠি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন বৌমা নাইলে না?...খুড়ীমা হাসিয়া উত্তর দিল নাবো না আজ আর দিদিমা, শরীরটা ভাল নেই।...
খুড়ীমা ভাবিয়াছিল তাহার মার খাওয়ার কথা বুঝি কেহ জানে না। কিন্তু খুড়ীমা ঘাট হইতে উঠিয়া গেলেই রায়-জেঠি বলিল—দেখেচো বৌটাকে কি রকম মেরেচে গোক্লো, মাথার চুলে রক্ত একেবারে আটা হয়ে এঁটে আছে।...রায়-জেঠির ভারি অন্যায়। জানো তো বাপু, তবে আবার জিজ্ঞেস করাই বা কেন, আর সকলকে বলাই বা কেন?....
মাছ ধুইয়া রাখিয়া চলিয়া যাইবার সময় দুর্গা ভয়ে ভয়ে বলিল—খুড়ীমা, তোমাদের চিঁড়ের ধান আছে? মা বলছিল অপু চিঁড়ে খেতে চেয়েছে, তা আমাদের তো এবার ধান কেনা হয়নি।...গোকুলের বউ চুপিচুপি বলিল— আসিস এখন দুপুরের পর।...দালানের দিকে ইশারায় দেখাইয়া কহিল—ঘুমুলে আসিস্!
দুর্গা জিজ্ঞাসা করিল—খুড়ীমা, তোমাদের বাড়ী কে এসেছে, আমি একদিনও দেখিনি কিন্তু।
–ঠাকুরপোকে দেখিসনি? এখন নেই কোথায় বেরিয়েছে, বিকেলবেলা আসিস্, দেখা হবে এখন।...তারপর গোকুলের বউ হাসিয়া বলিল—তোর সঙ্গে ঠাকুরপোর বিয়ে হলে কিন্তু দিব্যি মানায়।
দুর্গা লজ্জায় রাঙা হইয়া বলিল—দূর!
গোকুলের বউ আবার হাসিয়া বলিল—কেন রে, দূর কেন? কেন, আমাদের মেয়ে কি খারাপ? দেখি?...সে দুর্গার চিবুকে হাত দিয়া মুখখানা একটু উঁচু করিয়া তুলিয়া ধরিয়া বলিল— দ্যাখ তো এমন দুগ্গা-প্রতিমার মত সুন্দর মুখখানি? হোলোই বা বাপের পয়সা নেই?
দুর্গা ঝাঁকুনি দিয়া নিজেকে ছাড়াইয়া লইয়া কহিল—যাও, খুড়ীমা যেন কি...পরে সে একপ্রকার ছুটিয়াই খিড়কী দোর দিয়া বাহির হইয়া গেল। যাইতে যাইতে সে ভাবিল —খুড়ীমার আর সব ভাল, কেবল একটু বোকা, নৈলে দ্যাখো না...? দূর!....
দুর্গা চলিয়া যাইতে না যাইতে স্বর্ণ গোয়ালিনী দুধ দুহিতে আসিল। বধূ ঘর হইতে বলিল—ও সন্ন, আমার হাত জোড়া, বাছুরটা ওই বাইরের উঠোনে পিটুলি-গাছে বাঁধা আছে—নিয়ে আয়, আর রোয়াকে ঘটিটা মাজা আছে দ্যাখ।
সখী ঠাক্রুণের এতক্ষণে পূজাহ্নিক সমাপ্ত হইল। তিনি বাহিরে আসিয়া উত্তর দিকে স্থানীয় কালীমন্দিরের উদ্দেশে মুখ ফিরাইয়া প্রণাম করিতে করিতে টানিয়া টানিয়া আবৃত্তির সুরে বলিতে লাগিলেন—দোহাই মা সিদ্ধেশ্বরী, দিন দিও মা, ভবসমুদ্দুর পার কোরো মা—মা রক্ষেকালী, রক্ষে কোরো, মা-গো!
গোকুলের বউ রান্নাঘর হইতে ডাকিয়া বলিল—ও পিসিমা, নারকোলের নাড়ু রেখে দিইচি, দুটো খেয়ে জল খান।
হঠাৎ সখী ঠাক্রুণ রোয়াক হইতে ডাক দিলেন—বৌমা, দেখে যাও তো এদিকে।
স্বর শুনিয়া গোকুলের বউ—এর প্রাণ উড়িয়া গেল। সখী ঠাক্রুণকে সে যমের মত ভয় করে। মায়া-দয়া বিতরণ সম্বন্ধে ভগবান সখী ঠাক্রুণের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখান নাই—একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। রোয়াকের কোণে জড়ো-করা মাজা বাসনগুলির উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া, আঙুল দিয়া দেখাইয়া কহিলেন—দ্যাখো তো চক্ষু দিয়ে, দেখতে পাচ্ছো? একেবারে স্পষ্ট জলের দাগ দেখলে তো? এইখান থেকে সন্ন ঘটি তুলে নিয়ে গিয়েছে, তারপর সেই শূদ্দুরের ছোঁয়া এঁটো বাসন আবার হেঁসেলে নিয়ে সাত-রাজ্যি জজানো হয়েচে! হাঃ! জাতজম্মো একেবারে গেল!
সখী ঠাক্রুণ হতাশভাবে রোয়াকে বসিয়া পড়িলেন। যেন উপযুক্ত পুত্রের মৃত্যু-সংবাদ পাইলে ইহার চেয়ে বেশী হতাশ হইতে পারিতেন না।
হাঘরে হাড়হাবাতে ঘরের মেয়ে আন্লেই অমনি হয়, ভদ্দর লোকের রীত শিখ্বেই বা কোথা থেকে— জানবেই বা কোথা থেকে? বাসন মাজলি তো দেখলি নে এঁটো গেল কি রৈল? তিনপহর বেলা হয়েচে, ভাব্লাম একটু জল মুখে দিই! শূদ্দুরের এঁটো, এখ্খনি নেয়ে মরতে হোত—ভাগ্যিস ঘটিটা ছুঁইনি!
গোকুলের বউ বিষণ্ণমুখে দাঁড়াইয়া ভাবিতেছিল—কেন মত্তে সন্ন পোড়ারমুখীকে ঘটি তুলে নিতে বল্লাম, নিজে দিলেই হোত-
সখী ঠাক্রুণ মুখ খিঁচাইয়া বলিলেন—ধিঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়ে রৈলে যে? যাও হাঁড়ি কুড়ি ফেলে দাও গিয়ে। বাসন-কোসন মেজে আনো র্ফে। রান্নাঘরে গোবর দিয়ে নেয়ে এসো। যত লক্ষ্মীছাড়া ঘরের মেয়ে জুটে সংসারটাকে ছারখারে দিলে।...সখী ঠাক্রুণ রাগে র্গর্গ করিতে করিতে ঘরে ঢুকিলেন, বাহিরের খররৌদ্র তাঁহার সহ্য হইতেছিল না।
হুকুম-মত সকল কাজ সারিতে বেলা একেবারে পড়িয়া গেল। নদীতে সে যখন পুনরায় স্নান করিতে গেল, তখন রৌদ্র, ক্ষুধাতৃষ্ণায় ও পরিশ্রমে তাহার মুখ শুকাইয়া ছোট হইয়া গিয়াছে।
ঘাটে বৈকালের ছায়া খুব ঘন, ওপারে বড় শিমুল গাছটায় রোদ চিক্চিক্ করিতেছে। নদীর বাঁকে একখানা পাল-তোলা নৌকা দাঁড় বাহিয়া বাঁক ঘুরিয়া যাইতেছে। হালের কাছে একজন লোক দাঁড়াইয়া কাপড় শুকাইতেছে, কাপড়টা ছাড়িয়া দিয়াছে, বাতাসে নিশানের মত উড়িতেছে। মাঝনদীতে একটা বড় কচ্ছপ মুখ তুলিয়া নিঃশ্বাস লইয়া আবার ডুবিয়া গেল—সোঁ-ও-ও-ও-ভুস্!
নদীর জলের কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা গন্ধ আসে, ছোট্ট নদী; ওপারের চরে একটা পানকৌড়ি মাছ-ধরা বাঁশের দোয়াড়ির উপর বসিয়া আছে।
এই সময় প্রতিদিন তাহার শৈশবের কথা মনে পড়ে—
পানকৌড়ি পানকৌড়ি, ডাঙায় ওঠোসে...
গোকুলের বউ খানিকক্ষণ পানকৌড়িটির দিকে চাহিয়া রহিল। মায়ের মুখ মনে পড়ে। সংসারে আর কেহ নাই যে, মুখের দিকে চায়। মায়ের কি মরিবার বয়স হইয়াছিল? গরীব পিতৃকুলে কেবল এক গাঁজাখোর ভাই আছে, সে কোথায় কখন থাকে— তার ঠিকানা নাই। গত বৎসর পূজার সময় এখানে আসিয়া চারদিন ছিল। সে লুকাইয়া লুকাইয়া ভাইকে নিজের বাক্স হইতে যাহা সামান্য কিছু পুঁজি— সিকিটা দু’য়ানিটা বাহির করিয়া দিত। পরে একদিন সে হঠাৎ এখান হইতে উধাও হয়। চলিয়া গেলে প্রকাশ পাইল যে, এক কাবুলি আলোয়ান— বিক্রেতার নিকট একখানি আলোয়ান ধারে কিনিয়া তাহার খাতায় ভগ্নীপতির নাম লিখাইয়া দিয়াছে। তাহা লইয়া অনেক হৈচৈ হইল। পিতৃকুলের অনেক সমালোচনা, অনেক অপমান! ভাইটির সেই হইতে আর কোন সন্ধান নাই।
নিঃসহায় ছন্নছাড়া ভাইটার জন্য সন্ধ্যাবেলা কাজের ফাঁকে মনটা হু-হু করে। নির্জন মাঠের পথের দিকে চাহিয়া মনে হয়, গৃহহারা পথিক ভাইটা হয়তো দূরের কোন জনহীন আঁধার মেঠোপথ বাহিয়া একা কোথায় চলিয়াছে, রাত্রে মাথা গুঁজিবার স্থান নাই, মুখের দিকে চাহিবার কোনো মানুষ নাই।...
বুকের মধ্যে উদ্বেল হইয়া উঠে, চোখের জলে ছায়াভরা নদীর জল, মাঠ, ঘাট, ওপারের শিমুল গাছটা, বাঁকের মোড়ে বড় নৌকাখানা—সব ঝাপ্সা হইয়া আসে।
© 2026 Matribhasa Bangla. Public Domain
Comments (0)
Log in to join the conversation.